Skip to main content

Full text of "In Search Of The Castaways"

See other formats


)107111 

10118, 

51 

01 1611 
101১1), 
11)%1101 





এর 


জুল ভের্ন 
ইন সার্চ অভ দ্য কাস্টআ্যাওয়েজ 


অনুবাদ: 





পি ঢ) 
৮1 


দেসজ পাবলিশিং || কলকাতা ৭০০ ০৭৩ 


7 924 0 2722 (0452 চ/বে 5 
হা /৯৫1৬০১৪৪৫৪৪৪৩ 
০% 

07177: হা কবি 

'1851210 0% 
18281001012 132780900720185 25 
20০55 হ৯510115181185 
13 হ321855672 €51890052755 1০০1 (91089002700 073 


প্রথম প্রকাশ : ১৯৬০ 
স্বত্ব : কৌশল্যা বন্দ্যোপাধ্যায় 
প্রচ্ছদ : দেবব্রত ঘোষ 


প্রকাশক : সুধাংশুশেখর দে | দে'জ পাবলিশিং 
১৩ বক্ষিম চ্যাটার্জি স্টিটি । কলকাতা ৭০০ ০৭৩ 


শব্দগ্রন্থছন : অব্রিজি কুমার | লেজার ইস্প্রেশন্স 
২ শগণেন্দ মিত্র লেন 1 কজকাতা ৭২০০ ০০৪ 


সুদ্রক : স্বপনকুমার দে 1 দেস্জা অফসেট 
১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্টিট । কলকাতা ৯০০ ০৭৩ 


অনুব/লিতকির উহ স্রশ্গর্ট 


ওলা ও আবার্জি বুম 


২৬9০৬ তভহত ও ভ7০্নান্কি) সদা? 


কাণ্তেন নেমোকে নিয়ে তিনটি আশ্চর্য অভিযান লিখেছিলেন জুল ভের্ন 
_- যার দুটিতে কাণ্তেন নেমো সশরীরে দেখা দেন, কিন্তু মধ্যবর্তী যে- 
কাহিনী, ইন সার্চ অভ দ/ কাস্টআ্যাওয়েজ, সেটা পড়ে ফেলবার পর 
একবারও আমরা দেখা পাই না কান্তেন নেমোর - এমনকী বই শেষ 
করবার পরও এটা অব্দি জানি না কাণ্তেন নেমোর কাহিনীর সঙ্গে এর 
যোগ কোথায়, কেমন ক'রে কাণ্তেন নেমোর অশরীরী উপস্থিতি এই 
বইতেও আছে ? সেটা অবশ্য স্পষ্ট হবে পরে, জুল ভের্-এর কুহকের 
দ্বীপের কাহিনী মিস্টিরিয়াস আইল্যাণও পড়বার পরই। 

কিন্তু কাপ্তেন নেমো সশরীরে এখানে দেখা দিন বা না-দিন, এই 
দুর্বার গতির অভিযান চলেছে ইওরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া _ তিন- 
তিন মহাদেশ জুড়ে, জলে-ডাঙায় কত বিপদ, কত রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত, 
কতবার শেষমুহূর্তে উদ্ধার_যখন মনে হচ্ছে উদ্ধারের কোনো আশাই 
নেই কোথাও, তখনই. আসছে চমক । আর আছে রহস্যলিপি, মুশকিল 
আসানের তিন তলব, জল লেগে যে-রহস্যলিপির বেশির ভাগ শব্দই 
মুছে গিয়েছে, পঞ্ড়ে মানে বুঝতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যেতে হয়। 
আর এই উপন্যাসে জুল ভের্ন নিজেকে ঠাট্টা ক'রেই এক ভূগোলবিদের 
অধ্যাপক __ জাক পাঞয়ল, জুল ভেন্ন-এর €তরি-করা কাপ্তেন নেমো, 
ফিলিয়াস ফগ, মিখায়েল সুঁগফ, হবু বা ইম্পে বার্বিকেনের মতোই 
এক চরিত্র, খার সঙ্গে পরিচয় হবার পর যাঁকে ভুলে-যাওয়া কিছুতেই 
আর সম্ভব নয়। শেষ অনুচ্ছেদটিও বিস্ময়কর, কেননা সেখানেও জুল 
ভের্নণ আমাদের জন্যে রেখে গেছেন আরেকটা চমক । 

একবার এ-বই থেকেই তৈরি হয়েছিলো গানেভরা এক চলচ্চিত্র 
_যাতে জাক পাঞ্চয়লের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন মরিস 
শেভালিয়ে। 


মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অনূদিত 
জুল ভের্ন-এর অন্যান্য বই 


শ্রোষ্গ গল 
আ্যড্বিফুট ইন দ্য প্যাসিফিক 
জার্নি টু দ্য সেন্টার অভ দি আর্থ 
ফ্রম দি আর্থ টু দ্য মুন 
পারচেজ অভ দ্য নর্থ পোল 

ফাইভ উইক্‌স ইন এ বেলুন 
এর্লাউণ্ু দ্য ওয়াম্ড ইন এইটি ডেজ 


ইন সার্চ অভ দ্য কাস্টআাওয়েজ 


প্রথম 


এক 


হাঙরের পেটে এ-কোন লেখা 


হাওয়া আসছিলো দক্ষিণপশ্চিম থেকে। সেই হাওয়া ঠেলে ভেসে চলেছিলো মন্ত-একটা 
প্রমোদতরী, উত্তর প্রণালী দিয়ে। মাস্তুলের ডগায় পৎপৎ ক'রে উড়ছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের 
ঝাণ্ডা, তার নিচে নীল বলয়ের ওপর সোনালি জরিতে লেখা 7.0. আর তাকে ঘিরে 
আছে বংশপ্রতাক. ছোটো-একটি মুকুট, কোনো আর্ল-এর পারিবারিক আভিজাত্যের চিহ্ন 
নিশ্চয়ই। বাস্পেচলা এই প্রমোদতরীটির নাম “ডানকান'। “ডানকান -এর মালিক লর্ড 
এডওয়ার্ড গ্রেনারভন হাউস অভ লর্ডস-এ যান বটে, দেশের ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান নিয়ে 
সেখানে কথাও বলেন, তবে তার রক্তের মধ্যে আছে নীল সমুদ্র নেশা : লালরজ্ত 
যতটা-না নীল, তার চাইতেও বেশি-নীল বোধহয় এই সমুদ্রের টানই। রয়্যাল টেমস 
ইয়ট ক্লাবের তিনি নামজাদা সদস্য-- কতবার যে তার বিলাসবহুল ইয়ট নিয়ে পাড়ি 
দিয়েছেন, বাজি লড়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই। এবার কিন্তু নিছক দৌড়ের বাজি বা 
আডভেনচারের নেশায় তিনি তার এই মন্ত প্রমোদতরীাটি নিয়ে এই প্রণালীর জলে 
বেরিয়ে পড়েননি, এবার তিনি বেরিয়েছেন তার নবপরিণীতা পত্রী তরুণী লেডি 
হেলেনাকে নিয়ে, নিছকই শখের বেড়ানো । সঙ্গে আছেন তার তুতোভাই মেজর 
মাকন্যাব্স। গোড়ায় যাবেন গ্রাসগো, তারপর বারদরিয়ায় প্রমোদত্রমণে। 

জুলাই মাস শেষ হ'তে চলেছে, আজ ২৬ তারিখ, বছরটা ১৮৬৪, ভরা গ্রীন্ম। 
কিন্তু গ্রেটব্রিটেনে শ্রীঘ্মকাল সবসময়ে তো! ঠিক শ্রীষ্মকাল নয়, আবহাওয়ার মর্জি কারু 
বোঝাই দায়; হয়তো দিনের পর দিন সূর্যের দেখাই পাওয়া গেলো না, আকাশ ভরা 
রইলো নিচু, ভারি মেঘে, কালো বা ধূসর; বৃষ্টি পড়লো টিপটিপ বা ঝমঝম; হাওয়া 
গর্জালো তারই সাথে পাল্লা দিয়ে, উত্তুরে হাওয়া, কনকনে-ঠাগ্ডা। অতএব শ্রীষ্মকালেও 
ঠাণ্ডা এড়াবার জন্যে প'রে থাকো জবড়জং ভারি পশমি পোশাক ; শুধু-যে কনকনে ঠাণ্ডা 
তা-ই নয়, তারই সঙ্গে অসহ্য হয়ে ওঠে দিনরাত্তির এই ভেজা-ভেজা ভাবটা । মনে 
হয় হাড়গোড়ও এই বর্ষার হাওয়ায় শ্যাওলা গজিয়ে জ'মে যাচ্ছে। এবার কিন্তু গ্রীষ্মের 
চালটা একটু অন্যরকম। বেশ ঝকঝকে রোদ্দুর ছিলো গত কয়েক সপ্তাহ, আকাশ ছিলো 


৩ 


নীল, আর অবহাওয়া ছিলো মোলায়েম। সেইজন্যেই হঠাৎ মাথায় এসেছিলো নতুন-বিয়ে- 
করা স্ত্রীকে নিয়ে সমুদ্রে কোথাও বেরিয়ে পড়লে কেমন হয়। এরপর আবহাওয়া যদি 
দুম ক'রে ঝোড়ো হ'য়ে ওঠে, তাহলেও অবশ্যি ভাবনা নেই--ডানকান চলে বাষ্পের 
জোরে, মাস্তুলের পাল হাওয়ার কৃপা পাবে ব'লে হা-পিত্যেশ ক'রে ব'সে থাকে না; 
বিলাসের সমস্ত আধুনিক উপকরণ আছে জাহাজে, বাড়ির আরামের চাইতে কোনোদিক 
থেকেই কম নয়। আর বাড়িতে থেকেই বা করতেন কী? ক্লাব, পার্টি, নাচের মজলিশ, 
সাম্রাজ্যের কোথায় কী অঘটন ঘটছে সে নিয়ে আলোচনা আর তর্কাতর্কি, আর নয়তো 
কখনও-কখনও কোথাও পিকনিকে বেরিয়ে-পড়া: একঘেয়ে কাটছিলো ব্জীবন, 
উত্তেজনাহীন, অলস, নিস্তরঙ্গ। বরং সমুদ্র সবসময়েই চঞ্চল--সবসময়েই বিষম তাড়া 
ক'রে কোথাও চলেছে, আর ঢেউয়েরা রহস্যময় কোন-এক ভাষায় অস্ফুট স্বরে সারাক্ষণই 
কী কথা শুনিয়ে চলেছে। জাহাজ মানে হ'লো “চলস্তের মধ্যে আরেক চলস্ত'- কোথায় 
যেন এ-রকম একটা কথা একবার শুনেছিলেন লর্ড এডওয়ার্ড। “চলো কোথাও,- 
সমুদ্রেরও তো এটাই সুর। কাজেই চলো, বেরিয়ে-পড়া যাক। 

তাছাড়াও আরো-একটা উদ্দেশ্য ছিলো বৈকি লর্ড এডওয়ার্ডের। তারই নিরেশি- 
মাফিক, তারই নকশা অনুযায়ী, সদ্য কারখানা থেকে বেরিয়ে এসেছে ডানকান, তার 
নবপরিণীতা স্ত্রীকে এটাই তার বিশেষ উপহার। কিন্তু এই ঝকঝকে জাহাজটি নিয়ে যদি 
বারদরিয়ায় পাড়ি জমিয়ে পরথ ক'রেই দেখা না-গেলো তবে বুঝবেন কী ক'রে ডানকান 
কেমন জাহাজ-কেমন মজবূত আর কাজের। অন্তত মহড়া দেবার জন্যও একবার 
ধেরুতে হয় বৈ কি। আর এইজন্যেই তরতর ক'রে ডানকান এখন চলেছে প্রণালীর 
জলে-.আগে হ'লে বলা যেতো মন্ত-এক রাজহাস যেন অনায়াসে সাবলীলভাবে চলেছে; 
এখন অবশ্য এই কলের জাহাজ, যার চোও থেকে গলগল ক'রে ধোঁয়া বেরুচ্ছে, তাকে 
একটা নতুন-কোনো প্রাণীর কথা ভেবে নিতে হয়, কিন্তু মোদ্দা কথাটা মানতেই হয় : 
ডানকানের চলবার.ভঙ্গি ছন্দোময়, সাবলীল, অনায়াস-.এমন সহজ-স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে 
পুরোনো পালের জাহাজ সচরাচর যেতে পারতো না! লর্ড এডওয়ার্ড ভারি খুশি ডানকান 
জাহাজের চলবার ভঙ্গি দেখে। কাপ্তেন জন ম্যাঙ্গল্‌সও এই জাহাজের ভার পেয়ে খুব 
খুশি। সপ্তসিদ্ধু দশদিশন্ত তিনি চ'ষে বেরিয়েছেন জাহাজে-জাহাজে, অনেক ভালো 
'জাহাজেও কাজ করেছেন আগে, তবে এই ডানকান জাহাজের সঙ্গে সেগুলোর কোনো 
তুলনাই হয় না। 

লর্ড এডওয়ার্ড রক্তের মধ্যে চাঞ্চল্য বোধ করছিলেন ব'লে নিজেই স্ত্রীকে নিয়ে 
জাহাল্মে এসে উঠেছেন। তখনও তিনি ঘৃণাক্ষরেও জানতে পারেননি তার এই ছটফল্টে 
অস্বস্থিটায় আসলে আরো-কোনো বড়ো অভিযানেরই পূর্ববোধ ছিলো- সত্যি-বলতে 


কোনো অভিযানের কথাই তিনি ভাবেননি, শুধু একটু বেড়ানো সমুদ্রে, আর নতুন 
জাহাজটার কেরামতি হাতে-কলমে বা জলে ভাসিয়ে পরখ ক'রে দেখা-এই ছিলো তার 
উদ্দেশ্য। 

বেশ-খানিকটা পথ অনায়াসেই চলে এসেছে ডানকান-কোনো অস্বস্তি বা 
অস্বাচ্ছন্দ্য বোঝা যায়নি, একটুক্ষণের মধ্যেই গতি দ্রুত ক'রে ফেলতে পারে এই কলের 
জাহাজ, আবার ইচ্ছে করলে তাকে মস্থরও ক'রে আনতে পারে ;-তাকে বাতাতসর গতি 
বা জলের উচ্ছ্বাস-কোনোকিছুর ওপরই নির্ভর করতে হয় না। মাঝি-মাল্লারাও এই নতুন 
জাহাজটা হাতে পেয়ে উৎসাহভরে কাজে লেগেছে। সত্যি-বলতে, কেউ যদি একবার 
নাবিক হয়, রক্তে যদি একবার সমুদ্বের নেশা ঢুকে যায়, তাহ'লে ডাঙায় আর কিছুতেই 
তার মন ওঠে না-এই মাঝিমাল্লারাও ডাঙায় বসে কবে ডানকান জলে ভাসবে তারই 
প্রতীক্ষায় ছটফট করছিলো। এখন তারা এই আনকোরা মজবুত জাহাজটা হাতে পেয়ে 
ভারি খুশি। | 

আজকের দিনটা ভারি চমৎকার। ঝকঝকে মুচমুচে রোদ্দুর, আকাশ ঘন-নীল, শুধু 
অনেক ওপরে ধূসর ও শাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, সমুদ্রের সবুজ জলেও বাড়তি কোনো 
ঢেউ বা ছটফটানি নেই : ডানকান জাহাজ তার এই ট্ীয়াল রানে চমৎকার চলেছে। 

সেইজন্যই একটু বাদে যখন দূরে জলের ওপর একটা ক্ষুদ্ধ আলোড়ন দেখা গেলো 
তখন লর্ড এডওয়ার্ড বেশ অবাকই হ'য়ে গেলেন-মনে হ'লো সমুদ্রের জল তোলপাড় 
ক'রে কী-একটা যেন ওদিকটায় এক ধুন্ধুমার কাণ্ড বাধিয়ে বসেছে। কাণ্তেন ম্যাঙ্গলস 
নিশ্চয়ই বলতে পারবেন ব্যাপারটা কী-এঁ আজব, অতিকায় জলস্তস্ে্ই বা কী কারণ। 
দুরবিনে চোখ লাগিয়ে মনে হচ্ছে কোনো মাছ--কিন্তু হঠাৎ এই সময়ে স্কটল্যাণ্ডের সমুদ্রে 
এ কোথাকার অতিকায় মাছ? 

লর্ড এডওয়ার্ডের প্রশ্নের উত্তরে কাণ্তেন মাঙ্গল্স দুরবিনে চোখ এঁটেই ব'লে 
উঠলেন : “এ তো হাঙরেরই এক জাতভাই !, 

“হাঙর!” লর্ড এডওয়ার্ড বিস্মিত। “এখানকার সমুদ্রে হাঙর আছে নাকি ?' 

প্রায়ই আসে। এ অবশা কোনো সাধারণ জাতের খুদে হাঙর নয়-.বরং সাধারণ 
হাঙরের চাইতে একে আলাদাই দেখায়। যদি অনুমতি করেন তো লেডি হেলেনাকে আমরা 
হাঙর কী ক'রে ধরে তারই একটা নমুনা দেখিয়ে দিই। মাছটা সত্যি বড়ো, তাছাড়া 
স্বতাবটাও বেয়াড়া। জেলেদের ছোটো নৌকোগুলোর ওপর উৎপাত করতে পারে--ফলে 
একে নির্মূল করাই ভালো।' 

“তাহ'লে তা-ই 'করো। এ-বিষয়ে তুমি যা বলবে তা-ই হবে 

লর্ড এডওয়ার্ড গিয়ে লেডি হেলেনাকে ডেকের ওপর ডেকে নিয়ে এলেন। 

বঝকরে রোদ্দুর আর সমুদ্রও প্রধানত শান্তই-তাই এই অতিকায় হাঙরটার 


৫ 


দাপাদাপি স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গলসের হুকুমে মাল্লারা সাজো-সাজো ভঙ্গিতে লড়াইয়ের প্রাথমিক 
প্রশ্তুতিটা সেরে ফেললে। মন্ত-একটা আংটায়_-তাকে বড়শি বলাই ভালো, যেমন 
অতিকায় মাছ তেমনি অতিকায় বঁড়শি- মাংসের টুকরো গেঁথে মাল্লারা জলে ফেলে 
দিলে। আংটটা শক্ত কাছিতে বাঁধা, অনেকটাই বড়ো, দরকার হ'লে দড়ি ছেড়ে দিয়ে 
জলের মধ্যে হাঙউরটাকে খেলানো যাবে। কাপ্তেন ম্যাঙ্গল্স অবিশ্যি নিছক মাছধরা 
দেখাবেন বলেই এটাকে ধরবার উদ্যোগ নেননি। এত-বড়ো মাছটা ধরতে পারলে 
অনেকটা তেল পাওয়া যাবে। হাঙরের তেল তো সবসময়েই কাজে লাগে। ওষুধ হিশেবে 
তো বটেই, তবে দরকার হ'লে এই চর্বিতে অন্য কাজও করা যাবে। 

অনেকটা দূর থেকেই মাংসের গন্ধটা পেয়েছিলো মাছটা, কিংবা তার দৃষ্টিও 
ঘ্বাণশক্তির মতোই প্রখর ছিলো। তীরের মতো ছুটে এলো সে, যেন ছো মেরে পড়বে। 
জলের ওপর দেখা ঘাচ্ছে প্রচণ্ড গতিতে তার কালো পাখনাটা ছুটে আসছে, ডগাটা 
ছাইয়ের মতো ধূসর। কাছে এলে চোখে পড়লো তার মস্ত দুটি ভাটার মতো চোখ, রাক্ষুসে 
খিদেয় মুখটা হা-করা, সারি-সারি দাত দেখা যাচ্ছে। প্রকাণ্ড মাথাটাকে দেখাচ্ছে অতিকায় 
কোনো হাতুড়ির মতো। এর পাখনার ঝাপ্ট, জোয়ালের জাতিকল কিংবা মুগুরের মতো 
মাথাটার ঘা- কোনোটাই সাধারণ ছোটো জেলেডিঙির পক্ষে মনোরম হ'তো না। কাণ্তেন 
ম্যাঙ্গল্সই ঠিক বলেছেন | এ-জীবকে বাচিয়ে রাখতে নেই। 

কাছে এসেই মাছটা একটা গৌঁত্তা খেয়ে ছোঁ মেরে পড়লো মাংসের টোপটার ওপর, 
আর সে মাংসের টুকরোটা গিলতেই মাল্লারা হঠাৎ একটা হ্াচকা টান দিলে আর অমনি 
আংটাটা তার গলায় আটকে গেলো। তারপর শুরু হ'লো দড়ি টানাটানির খেলা । অতজন 
মাল্লা মিলে কাছিটাকে ধ'রে টান দিচ্ছে, হাঙউরটা গলায় বড়শি বিধে যাওয়াতে ছটফটও 
করছে, কিন্তু তাই ব'লে মোটেই জল ছেড়ে ওঠবার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। ও-রকম 
অস্থিরভাবে দাপাচ্ছে দেখে তার ঝটপটি কমাবার জন্যে পাখনার ওপর দিয়ে একটা দড়ির 
ফাসও পরিয়ে দেয়া হলো তাকে। তারপর আধঘন্টা ধূন্ধুমার কাগুডর পর তাকে তোলা 
হলো ডেকে, মাল্লাদের একজন তক্ষুনি একটা কুঠারের কোপে তার পুচ্ছটাকে আলগা 
ক'রে দিলে। কিন্তু তার আগেই দেখা হ"য়ে গেছে দুই পাখনা, লম্বা পুচ্ছ, ফোলা পেট, 
লম্বা শরীর, মুণ্ডতরের মতো মাথা--সব মিলিয়ে প্রকৃতিঠাকরুন কী-একটা অদ্ভুত কারখানা 
সৃষ্টি করেছেন। সে যখন ছোটে জলের মধ্যে তখন তার এঁ পাখনা আর পুচ্ছই তাকে 
গতি- বা লক্ষ্য- ভুষ্ট হ'তে দেয় না। হাওরটার ল্যাজে যে-কোপ দেয়৷ হয়েছিলো তার 
কারণ অতর্কিতে সে যাতে ল্যাজটা দিয়ে একটা মরণঝাপট দিতে না-পারে। লেডি হেলেনা 
কিন্তু এই ভয়ানক রক্তক্ষয়ী দৃশ্যটা দেখে কেমন আতকে উঠেছিলেন, তিনি চটপট তার 
ক্যাবিনে ফিরে গেলেন। এই রক্তারক্তি কাণ্ডটার জন্যে তিনি তার মনোরম প্রমোদভ্রমণের 


৬ 


অভিজ্ঞতাটাকে মাটি ক'রে দিতে চান না। 

অনেক প্রাণী আছে, মাংসাশী বটে, তবে খিদে না-থাকলে অন্য প্রাণীকে স্তাক্রমণ 
করে না। হাঙররা মোটেই তা নয়, তারা ঝাক বেঁধে থাকে, সবাই মিলে একসঙ্গে ঝাপিয়ে 
পড়ে শিকারের ওপর, মুহূর্তে সব সাবাড় ক'রে দেয়। কুকুরমাছের জাতের এই মাছটা 
দলছাড়া হ'য়ে পড়েছিলো--সে কি একাই তার রাক্ষুসে খিদেটাকে নিবৃত্ত করবার জন্যে ? 
সে অবশ্য একাই একশো। 

মাল্লারা সাধারণত হাঙর ধরলেই পেট চিরে দেখে নেয় কী-কী সে গলাধঃকরণ 
করেছে ম'রে যাবার আগে। পুচ্ছহীন হ'লেও তার দাপাদাপি তখনও আদৌ তুচ্ছ নয়। 
সে তখনও ফৌস-ফৌস ক'রে নিশ্বেস নিচ্ছে আর ছটফট করছে। লম্বায় সে দশফুটের 
ওপর, ওজনটাও কোন-না ছশো-সাড়ে ছশো পাউগু। মাল্লারা কয়েকজন মিলে তার 
ওপর ঝাপিয়ে পড়লো, কিন্ত্ব প্রথমেই পেট চিরে দেখা গেলো পেট খালি, পেটের মধ্যে 
কিচ্ছু নেই। মাংসের টুকরেটার গন্ধ পেয়েই সে-যে অমনভাবে ধেয়ে এসেছিলো তা 
সম্ভবত খিদেয় এমন হন্যে হ'য়ে ছিলো ব'লেই। কেটে সেটাকে টুকরো-টুকরো ক'রে 
ফেললে মাল্লারা, চবিটা সরিয়ে রেখে এই জলরাক্ষসের দেহাবশেষ জলে ফেলতে গিয়েও 
মাল্লারা থমকে গেলো, কেননা তাদের মধ্যে একজন তখন চেঁচিয়ে উঠেছে, 'আরে ! 
ওটা কি আটকে আছে পাকস্থলিতে ? 

“হবে কোনো নুড়িপাথর ! যা রাক্ষুসে খাই-খাই, খিদের জ্বালায় হয়তো তা-ই খেয়ে 
ফেলেছে।' বললে আরেকজন। 

টম অস্টিন_সে এই ডানকান জাহাজের ফার্টমেট-বললে, 'ধুর আহাদ্মক ! 
দেখছিস না এ ছিলো পাঁড়মাতাল। ওটা নুড়িপাথর নয় মোটেই। আমি তো স্পষ্ট দেখতে 
পাচ্ছি একটা বোতল !' 

এই শোরগোল শুনে লর্ড এডওয়ার্ড এগিয়ে এসেছিলেন কাছে। অবাক হ'য়ে 
বললেন : “বোতল ! হাঙরের পেটে বোতল ! এমন কথা তো কস্মিন্কালেও শুনিনি 
যে হাঙর বোতলশুদ্ধু মদ খেয়ে ফ্যালে ! বোতলটা বার করো পেট থেকে ! অনেক 
সময় লোকে দরকারি কাগজপত্র পুরে ছিপি এঁটে সমুদ্রে বোতল ভাসিয়ে দেয়। এটা 
হয়তো সে-রকমই কিছু । কই, নিয়ে এসো ওটা। 

হাঙরের পেট থেকে বোতলটা বার ক'রে নিয়ে আসা হ'লো। তাকে ধুয়েটুয়ে 
সাফসুতরো ক'রে বোতলটা রাখা হলো টেবিলে। লর্ড এডওয়ার্ড, মেজর ম্যাকন্যাব্ঁ, 
কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স--এদের উত্তেজিত কথাবার্তা শুনে লেডি হেলেনাও কৌতুহলী হ'য়ে 
পাশে এসে দীড়ালেন। 

লর্ড এডওয়ার্ড বোতলটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আগাপাশতলা সেটা নিরীক্ষণ 
করলেন। 


পাশ থেকে উকি মেরে দেখে মেজর ম্যাকন্যাব্স বললেন, “হুম! শ্যাম্পেনের 
বোতল 1” তিনি সেটা জানতেই পারেন, সামরিক ব্যারাকে অস্ত্রশস্ত্র, কুচকাওয়াজের সঙ্গে- 
সঙ্গে 'নানাবিধ পানীয়রও চর্চা হয়ে থাকে। 

“কীসের বোতল জেনে আর কী হবে» লেডি হেলেনা উদ্শ্রীব হ'য়ে বললেন, “হঠাৎ 
হাঙরের "পেটে কোথেকে এলো, সেটাই জানতে চাই।, 

“অনেকদিন নিশ্চয়ই জলে ভেসেছিলো। কী-রকম শ্যাওলা পড়েছে ওপরটায় 
দেখেছো ?” লর্ড এডওয়ার্ড বললেন, “হাউরটার পেটে হয়তো খুব বেশিদিন যায়নি।, 

ছিপিটা খুলতে শিয়ে দেখা গেলো এতদিন জলে থাকার ফল ফলেছে--ভেতরটায় 
জল ঢুকে গিয়েছে। ৃ 

“বিচ্ছিরি কাণ্ড হ'লো তো! ভেতরে জল ঢুকেছে দেখছি। তাহ'লে কি আর ভেতরে 
যা ছিলো তা আর অটুটু থাকবে? 

বোতলের ছিপিটা খোলবার পর একটা বিশ্রী আশটে গন্ধে আশপাশ ঝিমঝিম ক'রে 
উঠলো। 

ভেতরে কিন্তু সত্যি-কিছু আছে। কাগজ? সে-রকমই তো দেখাচ্ছে। কিন্তু ভেতরে 
সেটা আটকে গিয়েছে-সম্ভবত জলে ভিজে গিয়েই। 

“বোতলটা ভেঙে ফেললেই তো হয় ?' মেজর ম্যাকন্যাব্স অমনি সমাধানটা বাৎলে 
দিলেন। 

“তার চাইতে বরং বোতলের মাথাটাই ভাঙা যাক, কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্সের সুপরামর্শ। 
“তাহ'লে হয়তো ভেতরের জিনিশটা নষ্ট হবে না।' 

হাতুড়ি ঠুকে বোতলের মাথাটা ভাঙা হ'লো। ঝনঝন ক'রে চারপাশে ছড়িয়ে পড়লো 
ভাঙা কাচ। সন্তর্পণে কাচের টুকরো ছাড়িয়ে নিয়ে ভেতর থেকে তিন-তিনটে পার্চমেন্ট 
বার ক'রে এনে বিছিয়ে রাখা হ'লো টান-টান ক'রে। 

দেখা গেলো, তিনটে পার্চমেন্টেই জল লেগে লেখা প্রায় ঝাপসা হ"য়ে এসেছে। 
অনেকক্ষণ ধ'রে আলোর সামনে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখলেন লর্ড এডওয়ার্ড। কী লেখা 
আছে এগুলোয় ? 


দুই 
একে তিন তিনে এক 


ভালো ক'রে দেখে নিয়ে লড এডওয়ার্ড বললেন, “এ-যে দেখছি তিন-তিনটে আলাদা 
দলিল। একেকটা একেক ভাষায় লেখা । এটা আলেমান, এটা ইংরেজি-আর এইটে 
ফরাশিতে লেখা । 

“কী লেখা আছে ? পাঠোদ্ধার করা যায়?” লেডি হেলেনা কৌতুহলী হ'য়ে জিগেস 
করলেন। 

“উহু। সব কথা পড়া যাচ্ছে না যে। কিছু-কিছু লেখা জলে মুছে গিয়েছে যে। 

“তিনটে দলিলে যদি একই কথা তিন ভাষায় লেখা হ'য়ে থাকে, তাহ'লে হয়তো 
তিনটে একসঙ্গে মিলিয়ে পসড়ে দেখলে একটা মর্মোদ্ধার করা যাবে। 

হ্যা, ঠিক বলেছো। আচ্ছা, প্রথমে ইংরেজিটা দেখা যাক।, 

ইংরেজিতে লেখা বলছি 
তা থেকে শুধু এটুকুই পাঠোদ্ধার করা যাচ্ছে : 





বেশ-খানিকক্ষণ লেখাটা প'ড়ে মর্মেদ্ধার করার ব্যর্থচেষ্টা ক'রে হতাশ হ'য়ে মেজর 
ম্যাকন্যাব্স মন্তব্য করলেন, “উহু, কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না। একটা বাক্যও আস্ত নেই 
_-কিছু বোঝা যাবে কী ক'রে? 


“কোনো গেটা বাক্য না-থাকলেও কতগুলো শব্দ তো আন্ত আছে । এই-যে, দ্যাখো 
না, 5111. 81017, [7115, 010 105 এই শব্দগুলো কিন্তু ঠিকই আছে। আর এ 910 
নিশ্চয়ই 51109 কথাটারই গোড়ার দিক। 01-এটার 0 বড়োহাতের হরফ ব'লে মনে 
হয়, কোনোকিছুর নাম। 9101190 যদি আমরা ঠিকঠাক ভেবে থাকি, তবে এই 01 হয়তো 
জাহাজটারই নাম--আর 5515(91709 কথাটা থেকে মনে হয় সাহায্য চাচ্ছে। সম্ভবত 0ো 
জাহাজটা ডুবে গেছে, বা এমনভাবে ভেঙে গিয়েছে যে আর নাব্যতার উপযোগী নেই 
সেই জন্যেই এই 8551518706 চাইবার প্রার্থনা ।, 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স বললেন, “55151870০টা যে 8551518109এরই শেষাংশ সেটা 
আপনি ঠিকই ধরেছেন। 00০17 কথাটা সেভাবেই নিশ্চয়ই 9০৫10! কথাটার গোড়ার 
দিক-_শেষটা মুছে গিয়েছে । 

“হয়তো এই অনুমানগুলো ঠিক, তবে যেহেতু অনেকগুলো লাইন নেই, কোনো 
বাক্যই নেই পুরোপুরি, তাতে আসল ব্যাপারটাই জানা যাচ্ছে না। যদি জাহাজড়ুবির পর 
কেউ সাহায্য চেয়ে এই দলিলটা বোতলে পুরে জলে ভাসিয়ে দিয়ে থাকে, ধ'রে নিলুম 
তা-ই হয়েছে, কিন্তু এই তথাগুলো নেই জাহাজটার নাম কী, কোথায় যাচ্ছিলো ; কোন 
দেশের জাহাজ (কারণ বাকিগুলো তো ইংরেজিতে লেখা নয়--আলেমান আর ফরাশিতে) 
তাও বোঝা যাচ্ছে না। কবে কোথায় গিয়ে জাহাজটা বিপাকে পড়েছে তারও 
কোনো হদিশ নেই। আমরা যা জানতে পাচ্ছি, তার অনেকটাই অনুমানের ওপর নির্ভর 
ক'রে-' মেজর ম্যাকন্যাব্স জানালেন। 

দু-নম্বর পার্চমেন্টটার গায়ের লেখা প্রথমটার চাইতে আরো অবোধ্য-প্রায় পুরোটাই 
নষ্ট হ'য়ে গেছে। পার্চমেন্টে যা পড়া গেলো, তা এই : 





_ “ৎস্ভাই, আট্রোসেন, ব্রিংগ্ট ইরেন- * কান্তেন ম্যাঙ্গল্স কথাগুলো জোরে-জোরে 
উচ্চারণ করলেন। “আলেমান ভাষা, বললেন তিনি, “তাছাড়া হরফগুলো গথিক। সিবেন 
১০ 


ইউনি অর্থাৎ সাত জুন। ইংরেজি কাগজটার 62 যদি তারিখেরই অংশ হয় তাহ'লে এই 
দুটো জুড়ে পাওয়া যাচ্ছে সাত জুন, ১৮৬২। আলেমান দলিলে আছে 01855, 
ইংরেজিতে আছে 0০৬%--জুড়ে দিলে হবে 0185520/, অর্থাৎ জাহাজটা ছিলো 
গ্লাসগোর। পরের একটা লাইন কিছুই পড়া যাচ্ছে না--শুধু ঝাপসা কালির দাগ। কিন্তু 
তারপরেই রয়েছে ৎস্ভাই-৪2/০1-- মানে দুই, মাঝে ফাক দেখে মনে হয় ৪009501এর 
আগে অন্তত একটা হরফ ছিলো--যদি 718100567 হয় তবে বোঝাবে নাবিক, মাঝিমাল্লা। 
এ 8১ কথাটার মানে ঠিক ধরতে পারছি না। কিন্তু অন্য দুটো কথা তো আন্তই আছে 
টা) 110 মানে 01718 01০1-ওদের নিয়ে এসো; এখন 55158109 বা 
2551510709এর সঙ্গে যদি জোড়া যায় তাহলে দীড়াবে 0111) 106], 0551500100- মানে 
ওদের কাছে সাহায্য নিয়ে এসো। ওদের সাহায্য করো।, 

লর্ড এডওয়ার্ড বললেন : “সাহায্য চাইছে ? কারা? 

মেজর ম্যাকন্যবস বললেন : উই রনির হত রা 
আমরা জানি না।' 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স তৃতীয় পার্চমেন্টটা নেড়ে-চেড়ে বললেন : “কী ধরনের সহায়তা 
পাঠাতে হবে, তা সম্ভবত পরের লেখাটায় চোখ বুলিয়ে নিলেই বোঝা যাবে। যেহেতু 
ফরাশিতে লেখা, কারুপক্ষেই বুঝতে অসুবিধে হবে না) 





“ত্রোয়া-1/015-মানে তো তিন, আর 118১ সেটা সম্ভবত মাস্তুলই বোঝাচ্ছে 
__তিন মান্তুলের জাহাজ । লর্ড এডওয়ার্ড হঠাৎ উত্তেজিত হ'য়ে উঠলেন। "ইংরেজি আর 
ফরাশি লেখা মিলিয়ে তো জাহাজটার নামও পাওয়া যাচ্ছে-ব্রিটানিয়া_-87112771121 
অর্থাৎ গ্রেটব্রিটেনের জাহাজ ! আর 44570! ইংরেজিতেও যা বোঝাচ্ছে ফরাশিতেও তা- 
ই--অর্থা দক্ষিণ গোলার্ধের কথা-_ 


৯১ 


কাণ্ডেন ম্যাঙ্গল্‌্স বললেন : “তার মানে, দক্ষিণ গোলার্ধে জাহাজডুবি হয়েছে! 

কথাগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে-করতে লর্ড এডওয়ার্ড আরো-কতগুলো ব্যাপার 
আন্দাজ ক'রে নিলেন। শব্দের ভাঙাচোরা টুকরো থেকেই অনুমান ক'রে নিতে হবে গোটা 
শব্দটা-এবং কোনো নৌযাত্রার সঙ্গেই যেন সে-সব শব্দের একটা সংগতি থাকে । আর 
এই সৃত্রটা ধ'রেই সশব্দে অনুমান দাড় করালেন লর্ড এডওয়ার্ড : ৪৮০7 ধ'রে নিলুম 
2০7০7 এর প্রথম অংশ মানে জমিতে নামা । যাত্রীরা ডাঙায় নেমেছে। কিন্তু কোথায়? 
0০/1%--তা নিশ্চয়ই 00171017017!ই বোঝাচ্ছে-কোনো-একটা মহাদেশ-" 

“দক্ষিণ গোলার্ধের মহাদেশ ?” মেজর ম্যাকন্যাব্স তার অনুমানের টিল ছুঁড়লেন। 

“এটা খেয়াল করেছেন?” কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স ব'লে উঠলেন, “7৮ শব্দটা থেকে 
আলেমান শব্দ 2/2%$-এরও একটা আচ পাওয়া যাচ্ছে-278459/7- অর্থাৎ 271/50716 
_ভয়ংকর-নিষ্টর।' 

51741 তাহ'লে কি 17717-_-ভারতবর্ধ ? আর ০2 ই বা কী-আরে ! সেটা নিশ্চয়ই 
1০)211%44এরই ধবংসাবশেষ- দ্রাঘিমা। তাহ'লে 17 হ'লো অক্ষরেখা, 1917%72--৩৭ 
ডিগ্রি ১১। তাতে তো ঠিকানাটাই পেয়ে-যাওয়া গেলো, অন্তত তার একটা মোটামুটি 
আন্দাজ ।' 

'দ্রাঘিমা কত না-জানলে আর মোটামুটি ঠিকানা তুমি পেলে কোথায়? মেজর 
ম্যাক্ন্যাব্স ফ্যাকড়া তুললেন। 

“আগে তো তিনটের বয়ান মিলিয়ে সবটা লিখে ফেলা যাক- একসঙ্গে চোখের 
সামনে যদ্দি থাকে, তাহ'লে হয়তো হেয়ালিটার একটা নিষ্পত্তি হবে_' বললেম লর্ড 
এডওয়ার্ড। 

“যারা এই পার্চমেন্টগুলো ঝেঙলে পুরেছিলো, তারা কিন্তু কোনো ধাঁধা বা হেয়ালি 
তৈরি করতে চায়নি--তারা ঠিকঠাক জানাতে চেয়েছিলো কোথায় কী হয়েছে। শুধু 
প্রকৃতির কপাতেই খানিকটা লেখা মুছে গিয়ে জট পাকিয়ে গেছে ।" কাণ্ডেন ম্যাঙ্গলস 
বললেন। 

 *“সেইজন্যেই একসঙ্গে সাজিয়ে নিলে সুবিধে হবে। তাছাড়া লেখাগুলো সব পশ্চিম 
ইওরোপের নানা ভাষায়--আর আমরা যদি জাহাজের নামটা সঠিক অনুমান ক'রে থাকতে 
পারি, ব্রিটানিয়া, তাহ'লে সেটা মোটেই অস্বাভাবিক হয়েছে বলেও মনে হয় না। এবার 
সবগুলো লেখা একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাক তা থেকে জটটা খোলবার কোনো হদিশ 
মেলে কি না।' 

তিনটে পার্চমেন্টের লেখাকেই সাজিয়ে নিয়ে ইংরেজিতে লিখে ফেললেন লর্ড 
এডওয়ার্ড । 


৯৯ 


30176 711) 1862 15802 13111211012 19520৬/ 


৮/01)0 ৫0৮1) -_£01016 81131121-_ 
1)% 10170 [৮/0 59011015 

(0101911) 01-- 107 

€০011011-- [0 0106] 11001-- 
(100৬1 11015 [09101 17 10178110006 

81018111000 37911" 18165 07০]) 7611) 


10৩1 


লেখাটা যখন তারা খতিয়ে দেখছেন, তখন মাল্লাদের একজন এসে জানতে চাইলে 
এবার ডানকান জাহাজ কোন্দিকে যাবে। পুরোটাই তো এই আনকোরা জাহাজটার মহড়া 
চলেছে, এমনিতে তার বিশেষ-কোনো নিদিষ্ট গন্তব্ই নেই। এবার অবশ্য ঠিক ক'রে 
নেয়া দরকার ডানকান ফিরে যাবে কি না। 

প্রশ্ন শুনে লর্ড এডওয়ার্ড বললেন : “ডামবার্টন চলো। লেডি হেলেনা ম্যালকম 
কাস্ল-এ ফিরে যাবেন। আমি তারপর যাবো লগ্ডনে- নৌবাহিনীর দফতরে গিয়ে এটা 
দেখাতে হবে। তাছাড়া ব্রিটানিয়া সম্বন্ধেও খোঁজ-খবর নিতে হবে আমাদের ।, 

মাল্লাটি নির্দেশ নিয়ে চলে গেলে লর্ড এডওয়ার্ড লেখাটা তুলে নিয়ে বললেন : 
“আমরা তাহ'লে ধরে নিতে পারি যে ১৮৬২ সালের ৭ই জুন একটা ত্রিমাস্তল যুদ্ধজাহাজ 
--ব্রিটানিয়া-গ্লাসগো থেকে বেরিয়েছিলো--সেটা কোনো অজ্ঞাত কারণে ডুবে গিয়েছে। 
কাপ্তেন আর তার সঙ্গে দুজন মাল্লা ৩৭০১১ অক্ষাংশ থেকে তিনটি ভাষায় খবরটা 
জানিয়ে সাহায্যের প্রার্থনা ক'রে একটা বোতলে লেখাগুলো পুরে জলে ভাসিয়ে দিয়েছে। 
এর মধ্যে যদি তারা উদ্ধার না-পেয়ে থাকে, তাহ'লে দু-বছরেরও বেশি হ'লো কোথাও 
পড়ে আছে--' 

'যদি-না এর মধ্যে ম'রে গিয়ে থাকে, বললেন মেজর ম্যাক্ন্যাব্স। 

“আর যদি বেঁচেও থাকে, তাদের দশা এখন কী হয়েছে, সেটা খানিকটা কল্পনা 
ক'রে নেয়া যায়, এতক্ষণে লেডি হেলেনা মুখ খুললেন। 

“খুব-একটা ভালো অবস্থায় নেই সম্ভবত, লর্ড এডওয়ার্ডকে একটু উদ্ধিগ্নই 
দেখালো। “কিন্তু একটা মুশকিল হয়েছে, তার সমাধান কী, আমার মাথায় আসছে না। 
জাহাজটা ডুবেছে সম্ভবত দক্ষিণ গোলার্ধের কোথাও। কিন্তু & 80716 শব্দটার মানে কী” 
হ'তে পারে? 

“ওটা তো ফরাশি লেখাটার টুকরো--ফরাশি ভাষায় যাকে চ81880716 বলে, 
ইংরেজিতে তাকেই বলে 798801181 এটা সেই পাতাগোনিয়া কথাটারই ভগ্নাংশ নয় 
ভো?' 


১৯৩ 


'পাতাগোনিয়া কি ৩৭০ অক্ষরেখায় পড়ে?" মেজর ম্যাকন্যাব্স জিগেস করলেন। 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স তক্ষুনি আমেরিকার দক্ষিণভাগের মানচিত্র খুলে দেখিয়ে দিলেন 
সত্যি তা-ই। 

“দক্ষিণ আমেরিকা যদি হয় তাহ'লে ধাধার জট আরো-খানিকটা খোলা যায়। 
0017017- তাহ'লে 007017910, [0-হ'তে পারে 171507015, আর 0101 1701 
সেক্ষেত্রে হ'তে পারে 0186] [701075| আর এই অনুমান যদি ঠিক হয় তাহ'লে তারা 
হয়তো নিষ্ঠুর ইগ্ডিয়ানদের হাতে বন্দী হয়েছে। এবং সেক্ষেত্রে তারা এখনও বেচে আছে 
কি না, সে-সম্বদ্ধে সংশয়ও জাগতে পারে। 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স বললেন : “পাতাগোনিয়া দক্ষিণ আর্হেনতিনা আর দক্ষিণ চিলের 
মধ্যে অবস্থিত--তার একদিকে আন্দেয়াস গিরিমালা অন্যদিকে আ্যাটলান্টিক মহাসাগর। 
তিয়ের্রা দেল ফুয়েগো এই পাতাগোনিয়ারই অংশ।' 

“যদি আর্হেনতিনা বা চিলের দক্ষিণভাগেই তা হ'য়ে থাকে, তবে এটা আশ্চর্য 
যে অন্যান্য ইওরোগীয় ভাষার সঙ্গে এস্পানিওলে কিছু লেখা নেই। তাছাড়া 
আর্হেনতিনার পাম্পায় বা চিলেয় যে-ইগিডয়ানরা থাকে, তারাই বা কতটা নিষ্টুর? 
অকারণে কাউকে বন্দী ক'রে রেখে তারা কি অত্যাচার করবে? লেডি হেলেনা প্রশ্ন 
তুললেন। 

'এ-সব তো আমাদের অনুমান মাত্র,” লর্ড এডওয়ার্ড বললেন, 'গ্লাসগো গিয়ে না- 
হয় খোঁজ ক'রে দেখা যাবে ব্রিটানিয়া সত্যি-সত্যি কোথায় যাচ্ছিলো । সেখানে নিশ্চয়ই 
কোনো নথিপত্রে কিছু লেখা থাকবে। 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স বললেন তার কাছে নৌদফতরের গেজেট আছে--সেখানে হয়তো 
এক্ষুনি কোনো হদিশ পাওয়া যেতে পারে। দু-বছর আগেকার গেজেট বার ক'রেই একটা 
জরুরি তথ্য বার ক'রে নেয়া গেলো। 

“এখানে গেজেটে একটা জ্ঞাপনী আছে। ১৮৬২ সালের ৩০শে মে কাণ্তেন গ্রান্ট 
কাইয়াও থেকে ব্রিটানিয়া জাহাজ নিয়ে গ্লাসগোর উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।' 

“কাইয়াও ? সে আবার কোথায়?” মেজর ম্যাকন্যাব্স জিগেস করলেন। 

“কাইয়াও, গেজেট থেকে মুখ তুলে কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স জানালেন, “পশ্চিম পেরুর 
একটা নগর-বন্দর-লিমার পশ্চিমে, কাইয়াও উপসাগরের তীরে অবস্থিত। তেমন- 
ছোটো শহরও নয়-দেড় লাখের ওপর লোক আছে-_, 

লর্ড এডওয়ার্ড কিন্তু কাইয়াওয়ের খবর শুনছিলেন না। তিনি বরং ব্রিটানিয়া 
জাহাজের কাণ্তেনের নাম শুনে চমকে উঠেছেন। “ফাণ্ডেন গ্রান্ট? সেই যিনি প্রশাস্ত 
মহাসাগরে নোভাস্কোশিয়ার পত্তন করতে চেয়েছিলেন-_নয়াস্কটল্যাণ্ড? 

“হ্যা। তিনিই। কিন্তু ১৮৬২ সালে ব্রিটানিয়া জাহাজ নিয়ে তিনি কোথায় যে নিরুদ্দেশ 


৯৪. 


হ'য়ে গেছেন তা আজও কেউ জানতে পারেনি । 

“তাহ'লে তো আমরা অনেকটাই জেনে যেতে পেরোছ। ৩০শে মে তান কাইয়াও 
থেকে বেরিয়েছিলেন--৭ই জুন অর্থাৎ ঠিক আটদিন পরে পাতাগোনিয়ার কাছে কোথাও 
_হয়তো উপকূলেই--জাহাজডুবি হয়। এবার তাহ'লে দ্রাঘিমাটা জেনে যেতে পারলেই 
আমরা বুঝে যাবো সত্যি-কোথায় তার জাহাজডুবি হয়েছিলো।, 

“দ্রাঘিমা যদি নাও জানা যায়, কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স জানালেন, “পাতাগোনিয়া বা 
তিয়েররা দেল ফুয়েগো আমার জানা! আমরা সেখানটায় অনায়াসেই পৌছে যেতে 
পারবো।, 

“এবার তাহ'লে গোটা সন্দেশটা লিখে ফেলা যাক» লর্ড এডওয়ার্ড বললেন, “অন্তত 
যে-কথাগুলো সম্বন্ধে আমাদের আর-কোনো সন্দেহই নেই, সেগুলো পর-পর সাজিয়ে 
দেখা যাক কী দাঁড়ায়। 

১৮৬২ খিষ্টাব্দের জুন মাসের সাত তারিখে গ্লাসগোর ত্রিমান্তল যুদ্ধজাহাজ. ব্িটানিয়া 
দক্ষিণ গোলার্ধে পাতাগোনিয়ার কাছে কোথাও ডুবে গিয়েছে। দুজন মাল্লা আর কাণ্তেন 
রা বা নামবার' চেষ্টা 
_তাদের বলা হয়েছে ভয়ংকর অথবা নি্ঠুর_নামবার সময় ৩৭০১ ১১ অক্ষরেখায় তারা 
সাহায্য চেয়ে একটা বোতলে নানা ভাষায় খুঁটিনাটি জানিয়ে তিনটে চিরকুট ভাসিয়ে 
দিয়েছিলেন-অন্তত আর-কোনো বোতলে এই বার্তা জানিয়েছিলেন কি না জানা নেই: 
-তবে এটায় তার! তিনটি ভাষায় আবেদন জানিয়েছিলেন-যাতে যারই হাতে পড়ুক 
সে-ই মূল আবেদনটা পড়তে পেরে সাহায্য পাঠাতে পারে। 

এই মর্মার্ঘটা জানবার পর সকলেরই মত হ'লো যে, বাপারটা বাস্তবিকই নিশ্চয়ই 
তা-ই হয়েছিলো। 

লেডি হেলেনা কাণ্ডেন ম্যাঙ্গল্সকে জিগেস করলেন : “তারপর থেকে আজ অব্দি 
ক আদৌ কোনো খোঁজ মেলেনি তাদের ? 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স মাথা নেড়ে জানালেন, “না।' 

কিন্তু এই চিরকুটগুলো দেখালে কি সরকার থেকে কোনো সাহায্য পাওয়া যাবে 
না? ব্রিটানিয়া তো একটা যুদ্ধজাহাজ, ফ্রিগেট-তাতে কামানও তো আছে ! 

লেডি হেলেনা বললেন, 'আর কাণ্তেন গ্রান্টের পরিবার? তাঁর স্ত্রী বা ছেলে- 
'ময়ে_, 

লর্ড এডওয়ার্ড বললেন, 'এ নিয়ে তুমি মিথ্যে আর ভেবো না। আমিই তাদের 
ধবর .দেবো। দরকার হ'লে তাদের দায়িত্ব নেবো।' 

একটু প্রে ডানকান যখন ডামবারটনের বন্দরে ভিড়লো, লেডি হেলেনাকে নিয়ে 


এপস্য ০০০ উরস ক 








মেজর ম্যাকন্যাব্স গেলেন ম্যালকম কাসল-এর উদ্দেশে, আর লর্ড এডওয়ার্ড লগ্ডনের 
ট্রেন ধরবার আগে টাইমূস আর মনি ক্রুনিকল কাগজ দুটোয় একটা বিজ্ঞাপনের খশড়া 
পাঠিয়ে দিলেন ছাপবার জন্যে : 
নিচের ঠিকানায় লর্ড এডওয়ার্ড গ্রেনারভনের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।- ম্যালকম 
কাসূল, ডামবারটন, স্কটল্যাও। 


তিন 
কাণ্তেন গ্রান্টের ছেলেমেয়ে 


পশ্চিম স্কটল্যাণ্ডের লখ ফাইন-এর কাছে, যেখানে সমুদ্র থেকে একটা লম্বা ল্যাজ যেন 
দু-দিকে ডাঙা রেখে ভেতরে ঢুকে পড়েছে, তারই কাছে একটা টিলার ওপর তৈরি হয়েছে 
ম্যালকম কাস্ল, মস্ত-একটা দুর্গ, পুরোনো সমস্ত কিংবদ্তি কুয়াশা আর আলোছায়ায় 
ছাওয়া পরিখাঘেরা কেল্লা, তাকে জড়িয়ে কত-যে গল্প আছে তার ঠিক নেই। সেই কবে 
থেকেই গ্লেনারভনরা এই কেল্লার মালিক, কত যুদ্ধ-বিগ্রহ চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র কল্পকথা কিংবা 
প্রেমকাহিনীর সে সাক্ষী--ফার্গাস ম্যাকগ্রেগর বা তারই মতো কেউ-কেউ সে-সব কাহিনীর 
নায়ক। স্কটল্যাণ্ডে যখন তুলকালাম কাণ্ড চলছিলো, বিদ্রোহ রিক্ষোভ স্বাধীনতার লড়াই, 
তখন আযংলো-স্যাকসনদের অত্যাচারে কত-যে স্কট দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলো, 
তার ইয়ত্তা নেই, যদিও গ্লেনারভনরা শাণাঙ।বে টিকে থাকতে চেয়েছেন এখানে এবং 
টিকেও গিয়েছেন, আর তাদেরই সঙ্গে থেকে গিয়েছে-টিকেই গিয়েছে বলা যায়--তাদের 
কিছু অনুচর সহচর--বংশানুক্রমিকভাবে তাদের পরিবাররাও সুখে-দুঃখে বিপদে-আপদে 
গ্নেনারভনদের সঙ্গে ছিলো। ইংরেজদের অধীনতা মেনে নিতে হয়েছে ব'লে তাদের 
দুঃখের শেষ নেই। কিন্তু তারই মধ্যে তারা জিইয়ে রাখতে চেয়েছে তাদের স্বাতন্ত্র্য, তাদের 
সংস্কৃতি-কিল্ট পরে তারা, খাটো হাটু অব্দি নামা ছোটো স্কার্ট, কিংবা বলে গেলিকভাষা, 
কিংবা বাজায় ব্যাগপাইপ, ফ্লুট, হাইল্যাণ্ডের সংগীত। তারা না-থাকলে একা-একা 
গ্লেনারভনদের এই কেন্লায় থাকা মুশকিলের হ'তো, যতই কেননা ম্যালকম কাস্ল মজবুত 
হোক, কিংবা কাস্ল হোক সশস্ত্র, থাকুক জালিকাটা উপরদেয়াল, যেখান থেকে 
গোলন্দাজদের বন্দুকের নল বেরিয়ে থাকতে পারে হানাদারদের উদ্দেশে। এরা সবাই 
নিভীক, দুঃসাহসী, বেপরোয়া-আর বিশ্বস্ত ও অনুগত। সত্যি-বলতে, তারাই আছে 


১৬. 


ডানকান জাহাজে, ওস্তাদ মাল্লা একেকজন, দুর্ধর্ষ, সমুদ্ধ যখন রাগে ফৌসে, গর্জায়, 
একটুও না-টস্কে, একটুও বিচলিত না-হ'য়ে, মাথা ঠাণ্ডা রেখে তারা জাহাজ সামলাতে 
পারে। স্কটল্যাণ্ডের উপকূলে সমুদ্র প্রায়ই অশাস্ত হ'য়ে ওঠে, বিশেষত দীর্ঘস্থায়ী বর্ষায়, 
আর ছেলেবেলা থেকেই সেই জলে বেরোয় ব'লে তারা জানে কেমন ক'রে শামাল 
দিতে হয় সে-সময়।। তারা শুধু নির্ভরযোগ্য বা নিছক বেপরোয়াই নয়, তাদের দুর্দা্ত 
দুঃসাহস এসেছে তাদের অভিজ্ঞতা থেকে, দক্ষতা থেকে, একেকজন তারা ওস্তাদ মাঝি- 
মাল্লা, চৌকশ, দুর্ধর্ধ। 

লর্ড এডওয়ার্ড গ্লেনারভন অজন্ত্র বিস্তসম্পদের মালিক--কিস্তু এই বিপুল অর্থ তিনি 
কোনো মক্ষিচুষ কঞ্জুসের মতো শুধু সিন্দুকেই তুলে রাখেন না, অকাতরে সে-অর্থ তিনি 
সে-অঞ্চলের মানুষদের অবস্থা ফেরাবার জন্যে বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় করেন, দরকার হ'লে 
হাউস অভ লর্ডস-এ তাদের জন্যে বাগ্যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, লড়াই করেন, তাদের উন্নতির 
জন্যে নিপুণভাবে যুক্তি সাজিয়ে ও শানিয়ে ভাষণ দেন-_ সেইসব ভাষণে কেবল যে 
বুদ্ধির মারপ্যাচ থাকে, কুটজাল থাকে যুক্তির, তা-ই নয়--কখনও-কখনও সেইসব কথার 
সঙ্গে মিশে যায় তীব্র আবেগ--অর্থাৎ নীরক্ত, শীতল, হৃদয়হীন বুদ্ধির প্যাচই খেলেন 
না লর্ড এডওয়ার্ড--এ-দেশের মানুষের জন্য সত্যি ভাবেন তিনি, তাদের কথা ভাবেন 
সবসময়, আর এই দেশপ্রেম বা দেশবাসীর জন্যে প্রেম আছে ব'লেই অকুতোভয়ে এমন- 
সব পরিকল্পনা ফাদতে পারেন, যে-সব কাজে নামতে গিয়ে অনেক ডাকাবুকো লোকও 
দু-একবার ইতস্তত করবে। বিপদের সম্ভাবনা দেখে তিনি তার প্রস্তাবিত পরিকল্পনা থেকে 
পেছিয়ে আসেন না। তিনি রয়্যাল টেমস ইয়ট ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন, তা নিছক খেয়ালি 
বিস্তবান বলেই নন। এটা ঠিক যে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নামতে তার ভালোই লাগে, 
উত্তেজনা জাগে মনে, রক্তে জাগে চাঞ্চল্য, শিহরন। কিস্তু আরো-একটা উদ্দেশ্য থাকে 
আড়ালে-- প্রতিযোগিতায় তিনি কেবল ব্যক্তি হিশেবেই জেতেন না, জেতেন স্ষটল্যাণ্ডের 
প্রতিনিধি হিশেবে, স্বদেশের নাম উজ্জ্বল করবার জন্যে। কিন্তু তার এই দেশপ্রেম তাই 
ব'লে তাকে সংকীর্ণ মানুষ ক'রে তোলেনি--তার চিত্তের ওঁদার্যও তাকে অন্যদের চাইতে 
ভিন্ন ক'রে দিয়েছিলো-বিশেষত হাউস অভ লর্ডসে অন্য যে-সব ধনীর দুলাল 
অহংম্মন্যতায় বা আত্মকেন্দ্রিকতায় তিনি ঠিক তাদের মতো নন। এজন্যে তার বিস্তর 
সুনাম হয়েছিলো । আর তা যে কারু-কারু মধ্যে ঈর্ধার ছৃলুনি জাগিয়ে দিতো না, তাও 
নয়। কিন্তু ব্রিশবছর বয়সী এই সুপুরুষ ককৃখনো নিজে থেকে কাকে তার বির্ধাচরণ 
করবার সুযোগ দেননি-- প্রতিযোগিতা হয় জলে, ইয়টের বাজিতে, আর এই প্রতিদ্বস্িতার 
জের থাকে ততক্ষণই যতক্ষণ জলেয় মধ্যে চলে এই রেষায়েবি। সাধারণ মানুষের প্রতি 
তার দরদ এতই সহজে তার স্বভাবটার সঙ্গেই মানিয়ে যেতো যে তাতে কখনও ফোনো 


ইন সার্ট: ২. ১ 


আত্মস্তুরিতা প্রকাশ পেতো না। আর তার দরাজ দিলের সঙ্গে সংগতি রেখেই ছিলো 
তার প্রচণ্ড দুঃসাহস। এটা এমন ধরনের কোনো দুঃসাহস নয় যার মধ্যে দেখানেপনা 
আছে, শুধু দুঃসাহসী কীর্তি ক'রেই যা তুষ্ট হ'তো, অর্থাৎ নিছক বেপরোয়াভাব প্রকাশ 
করার জন্যেই তিনি বেপরোয়া কাজেকর্মে ঝাপিয়ে পড়তেন না, তার পেছনে তাগিদ 
থাকতো পরের উপকার করবার। আর এই পরোপকার-প্রবৃত্তি কারু কৃতজ্ঞতার প্রত্যাশী 
ছিলো না, বরং কারু জন্যে কোনো কাজ ক'রে দেবার পর সে যদি গদগদ হ'য়ে তাকে 
সম্ভাষণ.করতো তবে তিনি যেন লজ্জাই পেয়ে যেতেন, একটু সংকুচিত বোধ করতেন, 
আড়ুষ্ট। তিনি যদি অকাতরে দেশের মানুষের জন্যে সর্বস্ব বিলিয়ে দিতেন, অন্তত বিলিয়ে 
দেবার প্রয়োজন এলে তিনি যে তাতে পেছ-পা হতেন না এটা সুনিশ্চিতই ছিলো, তবু 
তিনি ঠিক চাইতেন না লোকে সেটা জানুক, জেনে তাকে বাহবা দিক, শাবাশি জানাক 
-_-পারলে নিজেই তিনি প্রসঙ্গটা হয়তো ভুলেই যেতেন। 
.. এহেন লর্ড এডওয়ার্ড বিয়ে করেছেন হেলেনাকে, সাধারণ ঘরের মেয়ে। সুশিক্ষিতা, 
বুদ্ধিমতী, সংবেদনশীল, কিন্তু তার ধমনীতে নীল রক্ত বয়ে যেতো না। অন্যান্য অনেক 
রূপসী তরুণী-অভিজাতঘরের মেয়ে সবাই--তার প্রেমে পড়বার জন্যে যেন তৈরি 
হ'য়েই ছিলো। তাদের সঙ্গে লর্ড এডওয়ার্ডের নানা উপলক্ষে মেলামেশাও হ'তো, নাচের 
উইলিয়াম টাফনেলের এই মেয়েকে-সেই অকুতোভয় টাফনেল, যিনি ছিলেন বিখ্যাত 
ভ্রমণবিদ, কত-যে দেশবিদেশ ঘুরে বেড়িয়ে এসেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। হেলেনার সঙ্গে 
যখন লর্ড এডওয়ার্ডের পরিচয় হ'লো টাফনেল পরিবার তখন বিষম দারিদ্রের মধ্যে 
দিন কাটাচ্ছিলো। হেলেনার বয়েস তখন সদ্য বাইশ ছুঁয়েছে। বিত্ত, কিংবা নীল রক্ত, 
কিংবা তথাকথিত জাগতিক খ্যাতি কিছু না-ই থাক, হেলেনার রূপগুণ ছাড়া আরো-একটা 
জিনিশ ছিলো, যা লর্ড এডওয়ার্ডের প্রণয়প্রার্থী অন্য মেয়েদের ছিলো না-আর তাতেই 
যেন সবাইকে টেক্কা দিয়ে গিয়েছিলেন লেডি হেলেনা, আর সেটা এই : তিনি স্কটল্যাণ্ডের 
দুহিতা। হেলেনা যে.স্কটিশ, এটাই ছিলো লর্ড এডওয়ার্ডের কাছে একটা বাড়তি আকর্ষণ। 
অবশ্য স্কটিশ না-হ'লেও হেলেনাকে তিনি বিয়ে করতেন ব'লেই মনে হয়--কেননা প্রথম 
পরিচয়ের মুহুর্তেই দুজনে দুজনের প্রতি অত্যন্ত আকৃষ্ট হয়েছিলেন, কিন্তু হেলেনা যে 
স্কটল্যাণ্ডের দুহিতা-এই তথ্যটা কাটান দিয়েছিলো এই সামাজিক রীতিকে--যে, 
অভিজাতরাই অভিজাতকে বিয়ে করবেন। লর্ড এডওয়ার্ডের কাছে স্কটল্যাণ্ডের মানুষ 
মাত্রেই অডিজাত। আর হেলেনা টাফনেল তো বিশেষ ক'রে তা-ই, যেহেতু দুজনের 
মনের মিল এতটাই হয়েছিলো যে সত্যি-বলতে কোনো সামাঙ্জিক রীতিনীতির অযৌক্তিক 
বিধানকেই নির্বিগরে, বিনাতর্কে মানতে দেয়মি। 

বিয়ের পর হেলেনাকে তাক লাগিয়ে দেবেন ব'লে লর্ড এডওয়ার্ড একটা বাল্পেচলা 


১৮ 


জাহাজ তৈরি করাচ্ছিলেন। লোকে মধুচন্দ্রিকা যাপন করতে যায় নিশ্চিন্ত নিরুপদ্রব কোনো 
ভূম্বর্গে; লর্ড এডওয়ার্ডের ধারণা ছিলো অন্যরকম। তারা বেরিয়ে পড়বেন সমুদ্রে, 
মধূচন্দ্রিকার সঙ্গে মিশবে প্রমোদভ্রমণ, অর্থাৎ কোথাও গিয়ে আস্তানা গেড়ে বসা নয় 
_ সারাক্ষণই চলতে থাকবেন দুজনে, রোজ নতুন জলে সূর্যোদয় বাঁ সূর্যাস্ত দেখবেন 
_অথচ জাহাজটি এমনভাবে তৈরি করা হবে যাতে সমস্ত সুখস্থাচ্ছন্দ্য থাকে, 
আরামবিরামের অবকাশ থাকে। সত্যি-বলতে, কোনো ইয়ট ক্লাবের সদস্য মিথ্যে কেন 
মধুচন্দ্রিকা যাপন করবে ডাঙায়? 

আর এই কারণেই তৈরি করা হয়েছিলো ডানকান। জাহাজের নীল-খশড়া--অর্থাৎ 
নকশাটা-অনেক ভাবনাচিস্তার পর লর্ড এডওয়ার্ডের মাথা থেকেই বেরিয়েছিলো। একই 
সঙ্গে মজবৃত হবে, সর্বাধুনিক এনজিন থাকবে তার, তরতর ক'রে জল কেটে এগিয়ে 
যাবে, কিন্তু তাতে থাকবে আরামেরও সব উপকরণ, যাতে কিছুতেই এ-কথা কখনও 
মনে না-হয় যে এর চাইতে কোনো ভালো হোটেলে গিয়ে উঠলেই হ'তো। 

আর তারপরে নতুন-তৈরি জাহাজ ডানকানকে নিয়ে মহড়ায় বেরুবামাত্র 
আকনম্মিকভাবে পাওয়া গেলো মুশকিল আসানের তিন তলব--তিন-তিনটে ভাষায় লেখা 
সাহায্যের প্রার্থনা। 

লর্ড এডওয়ার্ড টাইমস আর মনি ভ্রুনিকলে বিজ্ঞাপন দুটো পাঠিয়ে দিয়েই রওনা 
হয়ে গেলেন লগুনের উদ্দেশে, নৌদফতরে শিয়ে তিনি বিশদ জানাবেন কী হয়েছে, 
সেইসঙ্গে খোঁজ-খবরও নেবেন কাণ্তেন গ্রান্টের ব্রিটানিয়া সম্বন্ধে। আর লেডি হেলেনা 
চ'লে এলেন ম্যালকম কাস্ল-এ। 

পরদিনই লগ্ুন থেকে এক তার এসে হাজির। যত-শিগগির-সম্ভব লর্ড এডওয়ার্ড 
ডামবারটন ফিরে আসবেন; কিন্তু তারের পেছন-পেছন সেদিনই রাত্তিরে এলো এক 
চিঠি। তার সংক্ষিপ্ত বয়ানের ততোধিক সংক্ষিপ্ত সারমর্ম-লগুন থেকে ফিরতে দেরি 
হবে। নববিবাহিত বর তার কনেকে খুবই সোজাসুজি জানিয়েছে তাড়াতাড়ি ফেরা সম্ভব 
হবে না। চিঠিটার ষয়ানের ধরন দেখে লেডি হেলেনার একটু ভাবনাই হ'লো। যেন 
তাড়াহুড়ো ক'রে হঠাৎ লর্ড এডওয়ার্ড কোনো কারণে মতি পরিবর্তন ক'রে জানাচ্ছেন 
লগ্নে তার সময় লাগবে। কেন? হঠাৎ আবার কী হ'লো? 

এ-চিঠি পাবার পর লেডি হেলেনা যখন সাত-সতেরো অনেককিছুই ভাবছেন অথচ + 
কোনো হদিশই পাচ্ছেন না লর্ড এডওয়ার্ডের আকম্মিক সুচিবদল করার কারণের, এমন 
সময়ে তার খাশ পরিচারক এসে জানালে অনেক দূর থেকে ট্রেনে ক'রে দুই কিশোর- 
কিশোরী এসেছে, লর্ড গ্নেনারভনের সঙ্গে এক্ষুনি দেখা করতে চায়, জরুরি দরফার। 
তাদের নাফ বিষম বিচলিত দেখাচ্ছে 

কারা ঞারা-.লেডি হেলেনা ঠিক বুঝতে পারলেন না। লর্ড এডওয়ার্ডের তাড়াতাড়ি 


১৯ 


না-ফেরার সঙ্গে এদের কোনে যোগ আছে? থাকুক বা' না-থাকুক, তাদের খুব বিচলিত 
দেখাচ্ছে এ-কথ! শুনেই লেডি হেলেন তাদের ডেকে পাঠালেন। 

ঘরে যারা ঢুকলো, সত্যি তাদের বয়েস বেশি নয়। মেয়েটির বয়েস ষোলো-সতেরো 
হবে, সে-ই দূজনের মধ্যে বড়ো, পোশাক-আশাক দেখে বোঝা যায় এককালে যদি-বা 
অবস্থাপন্ন ঘরের মানুষ হয়েও থাকে এখন নিশ্চয়ই অবস্থাবিপাকে পড়েছে, কেননা 
পোশাক তার দামি, তাতে রুচির ছাপ আছে, পরিচ্ছন্নও, কিন্তু দেখে বোঝা যায় এই 
পোশাক পুরোনো, বহু ব্যবহারে তার রঙ একটু মিইয়ে এসেছে । ছিপছিপে সুশ্রী কিশোরী, 
ডাগর দুটি চোখ--লাল, ফোলা-ফোলা, দেখে মনে হয় এতক্ষণ কাদছিলো। ছেলেটির 
বয়েস বারো-তেরো, তারও পরনে দামি কিন্তু পুরোনো পোশাক-_ দুজনেরই মুখের আদলে 
মিল আছে, সম্ভবত এরা ভাই-বোন। একটু উদভ্রান্তই দেখাচ্ছে দুজনকে, উত্তেজিতও | 
তারা লর্ড এডওয়ার্ডের সঙ্গে দেখা করতে চায়, খবরকাগজে বিজ্ঞাপন পণড়ে ছুটে এসেছে, 
কাণ্ডেন গ্রান্টের খোজ নিতে চায় তারা৷ 

. “কান্তেন গ্রান্টের খোজ? তাদের উত্তেজিত অধীর চোখমুখ দেখে জিগেস করলেন 
লেডি হেলেনা : “কেন, বলো তো? কে তোমরা? 

“কাণ্তেন গ্রান্টের ছেলেমেয়ে ।' 

কাণ্ডেন গ্রান্টের ছেলেমেয়ে । 

“হ্যা।” মেয়েটি প্রায় যেন ফিশফিশ ক'রে কথাটা বললে, “আমার নাম মেরি, আর 
এ আমার ভাই, রবার্ট । 

রবার্ট বললে, “আমরা টাইমস-এ একটা বিজ্ঞাপন দেখেছি-কেউ যদি ত্রিমাস্তুল 
মানোয়ারি জাহাজ ব্রিটানিয়ার কোনো খোঁজ নিতে চায় তাহ'লে যেন এখানে এসে হিজ 
লর্ডশিপের সঙ্গে দেখা করে। কিন্তু এসে শুনি তিনি এখানে নেই, লগ্ন গেছেন। অথচ 
বিজ্ঞাপনে ব্রিটানিয়া জাহাজের নাম দেখে আমাদের আর তর সয়নি-' 

“আমরা আগে থেকে চিঠি লিখে দেখা করবার জন্যে কোনো সময় ঠিক ক'রে 
আসিনি, হিজ লর্ডশিপ তো আর জানতেন না আমরা আসবো--' মেরি বললে, “কিন্তু 
বাবার জাহাজের নাম দেখেই আমাদের এমন অস্থির লাগলো যে আমরা কোনো 
নিয়মকানুনের ধার না-ধ'রেই ছুটে এসেছি--' 

লেডি হেলেনা তাদের আশ্বস্ত করলেন। 'না-না, সেজন্যে ভেবো না। আসলে লর্ড 
গ্লেনারভন ব্রিটানিয়া সম্বন্ধে কথা বলতেই লগুনে নৌবাহিনীর সদর দফতরে 
শেছেন।' তারপর লেডি হেলেনা তাদের এক-এক ক'রে খুলে বললেন কেমন ক'রে 
হাঙরের পেটে বোতলটা পাওয়া গেছে, আর বোতলের ভেতরে তিনটে ছোট্ট পার্চমেন্ট 
-তাতেই ব্রিটানিয়ার খবর ছিলো। “লর্ড গ্লেনারভন কালকেই ফিরে আসবেন। তোমরা 
বরং এখানেই থেকে যাও--কোনো কর্মালিটি নেই--কাল লর্ড এডওয়ার্ড ফিরে এলেই 


২০ 


তোমাদের সঙ্গে কথা হবে-লগুনে তিনি কী জানতে পারবেন, তা আমিও জানি না, 
তাই আমিও তার ফেরার জন্যে অপেক্ষা ক'রে আছি।' 

লর্ড এডওয়ার্ডকে ম্যালকম কাস্ল-এ না-পেয়ে ভাইবোনে যেন একটু মুপসেই 
গিয়েছিলো। লেডি হেলেনার সদয় ব্যবহারে তারা রীতিমতো মুগ্ধ হ'য়ে গেলো। তারা 
রাতটা কেন্লাতেই কাটাতে রাজি হ'লো। বিশেষ ক'রে লেডি হেলেনা যখন বললেন যে 
তিনি কাণ্তেন গ্রান্ট সম্বন্ধে বিশেষ-কিছুই জানেন না, ভালোই হ'লো, এই ফাকে তাদের 
কাছ থেকে তার সম্বন্ধে সব জরুরি কথা জেনে নিতে পারবেন। তিনি অবশ্য সব কথা 
খুলে বলেননি তাদের কাছে, ব্রিটানিয়া যে জলে ডুবে গিয়েছে, কাণ্তেন গ্রান্ট যে বিদেশ- 
বিভুয়ে ইণ্ডিয়ানদের হাতে বন্দী হয়েছেন_.এ-সব কথা ব'লে তিনি ভাইবোনকে ঘাবড়ে 
দিতে চাননি। 

সত্যি-বলতে রবার্ট আর মেরি বাবার কথা বলবার জন্যে যেন উদগ্রীব হয়েই ছিলো। 
যেন তাদের দুঃখের কাহিনী শুনিয়ে তারা মনের বোঝা হালকা ক'রে নেবার সুযোগ 
পেয়েই বর্তে গিয়েছে । একটু বিশ্রামের পর, খাবার-টোবলে ব'সে ভাইবোনে তাকে 
কাণ্তেন গ্রান্টের কথা শোনালে। 

বেচারারা! বাবার কথা বলতে-বলতে তাদের যেন চোখ ফেটে জল বেরুচ্ছিলো। 
ছেলেবেলাতেই তারা মাকে হারিয়েছিলো। তারপর তাদের হারাতে হ'লো বাবাকেও। 

কাণ্তেন গ্রান্ট ডাকাবুকো বেপরোয়া মান্ষ। কিন্তু নিছক দুর্দান্ত আআডভেনচারে 
বেরুনোই নয়, তার চোখে ছিলো স্বাধীন স্কটলাগ্ডর স্বপ্ন । স্কটল্যাণ্ড যদি স্বাধীন না-ই 
হয়, অন্তত সে যদি কোথাও উপনিবেশ স্থাপন করতে পারে, তাহলেও হয়। সেই স্বপ্ন 
ছিলো ব'লেই একদিন তিনি নিজের সব স্্গল দিয়ে মানোয়ারি জাহাজ তরিটানিয়া নিয়ে 
প্রশান্ত মহাসাগরে বেরিয়ে পড়েছিলেন- কোনো নতুন স্বীণ খুজে বাব ক'রে সেখানে 
একটা উপনিবেশ স্থাপন করবার জন্য । ছেলেমেয়েকে রেখে শিযেছিলেন এক আত্তীয়ার 
কাছে -ইচ্ছে ছিলো, নতুন দ্বীপে বসবাসের ব্যবস্থা ক'রে ফিরে এসে একদিন তাদের 
সঙ্গে নিয়ে আবার পাড়ি জমাবেন। কিন্তু একদিন খবর এলো, ব্রিটানিয়া জাহাজের কোনো 
খবরই পাওয়া যাচ্ছে না।-_হয় সে-জাহাজ ডুবে গিয়েছে, নয়তো এমন-কোনো দুর্বিপাকে 
পড়েছে যা মৃত্যুরই শামিল--কিংবা হয়তো পড়েছেন মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর কোনো 
পরিস্থিতিতে! মেরির বয়েস তখন মাত্র চোদ্দ, রবাঠ আরো ছোটো। এমন সময় সেই 
বৃদ্ধা আত্মীয়াও মারা গেলেন। তারপর থেকে ছোটোভাইটিকে সে সমস্ত দুঃখকষ্টের মধ 
আগলে রেখেছে, তাকে সান্ত্বনা দিয়েছে, তাকে মানুষ ক'রে তৃলতে চেয়েছে। দু-বছর 
ধ'রে কাণ্তেন গ্রান্টের কোনো খোঁজ না-পেয়ে সে ধ'রেই নিয়েছিলো যে বাবা মারা 
গেছেন। এখন, কাগজে বিজ্ঞাপনটা প”ড়েই তার মধ্যে এক নতুন আশা জেগে উঠেছে। 
একমুহূর্তও দেরি না-কা'ে ছুটে এসেছে লর্ড গ্রেনারভনের কাছে। বাবা তাহ'লে মারা 


২১ 


যাননি-.নিশ্চয়ই বেচে আছেন। 

লেডি হেলেনা অবিশ্যি তাদের কাছে নিজের আশঙ্কার কথা খুলে বললেন না। 
প্রথমত, দু-বছর আগে সাহায্য চেয়ে এই বোতল জলে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিলো । কাণ্তেন 
গ্রান্ট যদি তখন দক্ষিণ আমেরিকার কোথাও ইগ্ডিয়ানদের হাতে বন্দী হ'য়ে থাকেন, 
তাহ'লে এখনও বেচে আছেন কি না কে জানে! তাছাড়া তারা তো এটা ঠিক ক'রে 
জানেন না কাণ্তেন গ্রান্ট সত্যি-বলতে কোথায় বন্দী হয়ে আছেন। অক্ষরেখা ও 
দ্রাঘিমারেখার মধ্যে একটা তারা জানেন, দ্রাঘিমারেখা যে কী, সেটার জন্যে তাদেরও 
তো অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াতে হবে। তাছাড়া লর্ড এডওয়ার্ডের ফিরে আসতে দেরি 
দেখে এটাই ভয় হয় যে নৌদফতর ব্যাপারটাকে কোনো পাত্তাই দেয়নি। তারা হয়তো 
কোনো সাহায্যই করতে ঢাইবে না। 

ভাইবোনকে শুতে পাঠিয়ে দিয়ে লেডি হেলেনা মেজর ম্যাকন্যাব্সের সঙ্গে 
ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনায় বসেছিলেন। মেজর ম্যাকন্যাব্সের মনে হচ্ছিলো লেডি 
হেলেনার আশঙ্কা হয়তো অমূলক নয়_নৌদফতর হয়তো এ হারানো জাহাজের সন্ধানে 
কাউকেই পাঠাতে রাজি হবে না। কিন্তু মেরির দৃঢ়তায় তিনি প্রায় মুগ্ধই হ'য়ে গেলেন। 
এইটুকু মেয়ে একটুও ভেঙে পড়েনি-সব দুর্বিপাকের মধ্যেও ছোটোভাইটির দেখাশুনো 
ক'রে এসেছে। এটা মানতেই হয় যে মনের জোর আছে মেয়েটির। তবে সবসময়ে 
তো আর শুধু মনের জোরে হয় না, পরিস্থিতি যদি প্রতিকূল হয় তাহ'লে মনের জোর 
তখন হয়তো ভেঙে পড়তে দেয় না-_শুধু প্রতীক্ষা করতে বলে কখন পরিস্থিতি অনুকূল 
হবে। এতদিন মেরি ধ'রে নিয়েছিলো যে তার বাবা বেচে নেই, সে নিজেই এক মনের 
জোরে সব দুর্বিপাকের মধ্যে ছোটোভাইটির দেখাশুনো করার দায়িত্ব পালন করছিলো। 
এখন সে বিজ্ঞাপন দেখে আশা ক'রে ছুটে এসেছিলো, এমনকী আজ লর্ড এডওয়ার্ডের 
সঙ্গে দেখা না-হ'লেও এই আশা আছে যে কাল দেখা হবেই, কাল বাঝর সব খবর 
জানতে পাবে-অথচ লর্ড এডওয়ার্ড সম্ভবত লগ্ন থেকে কোনো আশার খবর নিয়েই 
ফিরবেন না। মেজর ম্যাকন্যাবসের সঙ্গে এই নিয়েই কথা বলছিলেন লেডি হেলেনা, 
ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না এই অবস্থায় কী তার করণীয়। তবে এটা অনুমান করতে 
দেরি হয় না যে যতদিন রবার্ট আর মেরি মেনে নিয়েছিলো যে কাণ্তেন গ্রান্টের ফিরে- 
আসার কোনো আশাই নেই ততদিন অন্তত দুঃখকষ্ট মেনে নিয়েই একরকম চলছিলো, 
অভ্যস্ত হ'য়ে গিয়েছিলো তাতে, কিন্তু এখন হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো একবার 
আশা জেগে উঠেই যদি মিলিয়ে য়ায় তখন হয়তো তাদের কচি মনে আশাভঙ্গের আঘাত 
আরো-তীব্র হ'য়ে পড়বে। 

যতটা আশা ক'রে এসেছিলো, ততটা সম্ভবত আর ছিলো না ব'লেই মেরি নিশ্চয়ই 
সকালবেলায় একটু আড়ষ্ট ও সংকুচিত বোধ করছিলো; আর সেই অস্বস্তির জন্যেই, 


চে 


লেডি হেলেনা আর মেজর ম্যাকন্যাব্স তাদের যতই আপ্যায়ন করার চেষ্টা করুন না 
কেন, তারা একটু দূরে-দূরেই স'রে থাকছিলো। সেইজন্যেই লর্ড এডওয়ার্ড যখন জুড়ি- 
গাড়ি চ'ড়ে স্টেশন থেকে চৌদুনে ঘোড়া হাঁকিয়ে ফিরে এলেন, মেরি আর রবার্ট তখন 
ছিলো বাগানে। 

লর্ড এডওয়ার্ড কোনোদিকে না-তাকিয়ে হনহন ক'রে সটান চ'লে গেলেন লেডি 
হেলেনার কাছে। ইংরেজ সরকারের বানিয়া মনোভঙ্গিতে তিনি বিচলিত ; আরো বিচলিত 
এই কথা ভেবে যে মুখে “গ্রেটব্রিটেন* “গ্রেটব্রিটেন” ক'রে ট্যাচালেও ইংরেজরা সত্যি- 
সত্যি স্কটিশ, আইরিশ বা ওয়েল্সবাসীদের মানুষ বলেই যে মনে করে না, আরো-একবার 
হাতে-নাতে তার প্রমাণ পেয়ে গিয়েছেন তিনি লগ্ুনে। বিস্তর যুক্তি সাজিয়েও 
নৌদফতরের কর্তাদের তিনি এ-বিষয়ে আদৌ বোঝাতেই পারেননি, যে হারানো মানোয়ারি 
জাহাজ ব্রিটানিয়ার সন্ধানে বেরিয়ে-পড়া তাদের আশু কর্তব্য। 

তার মুখচোখের ভাব দেখেই লেডি হেলেনার বুঝতে মোটেই দেরি হয়নি যে লর্ড 
এডওয়ার্ডের লগুনসফর সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে-শুধু তা-ই নয়, কি-রকম যেন 
অপমানিতও বোধ করেছেন লর্ড এডওয়ার্ড । গ্লেনারভন যখন উত্তেজিত স্বরে বললেন, 
“খামকাই শিয়েছিলুম নৌ-দফতরে-কোনো কাজই হয়নি, লেডি হেলেনা তখন আদৌ 
বিস্মিত হননি। বরং এই আশঙ্কা নিয়েই যে কাল রাতে মেজর ম্যাকন্যাবস আর তিনি 
বলাবলি করছিলেন, এ-কথা তার মনে পড়ে গেলো। 

“তাদের মতে ব্রিটানিয়ার সন্ধানে বেরুনোটা হবে বুনোহাসের পেছনে ছোটা, 
আগের কথার জের ধ'রেই বললেন লর্ড এডওয়ার্ড। 

এদিকে জুড়িগাড়ি এসে থেমেছে, গটগট ক'রে একজন সে-গাড়ি থেকে নেমে 
লিভিংরুমের দিকে চ'লে গেছেন, তাকে দেখেই অনুচর-পরিচরেরা সেলাম ঠকেছে- 
এইসব লক্ষ ক'রে মেরি আর রবার্ট বুঝতে পেরেছিলো যে ইনিই লর্ড এডওয়ার্ড 
গ্নেনারভন। তারাও, তাই, তার পেছন-পেছন লিভিংরুমে চ'লে এসেছিলো । ঘরে ঢুকতে- 
ঢুকতে তারা শুনতে পেলে লর্ড এডওয়ার্ড বলছেন : 

“হাজারটা ফ্যাকড়া, হাজারটা ওজর, হাজারটা আপত্তি সরকারের । দু-বছর আগে 
যে-জাহাজ ডুবেছে-' 

“ডুবেছে বলে আমরা এখনও সঠিক জানি না, লেডি হেলেনা বললেন, বরং 
বলতে পারি দু-বছর আগে সে নিরুদ্দেশ হ'য়ে গেছে_ 

হ্যা, আমিও তা-ই বলতে চেষ্টা করেছিলুম। কিন্তু তাদের বক্তব্য : ডুবুক বা হারিয়ে 
যাক-দু-বছর আগে যা ঘটেছে, এতদিন পরে কেউ খামকা এত টাকা খরচ ক'রে তার 
সন্ধানে যায় ! তাছাড়া তাদের মতে এ তিনটে পার্চমেন্টই অসম্পূর্ণ-_পুরো হদিশ কোনো 
পার্টমেন্টেই দেয়া নেই। কিন্তু, আসল কথা কি জানো, মাত্র তিনজনের জন্যে--সে 


৩ 


তিনজনও তো পুরোমানুষ নয়, নেহাৎই স্কট--একটা আন্ত গোটা জাহাজ তারা কিছুতেই 
পাঠাবে না! এরা যে শুধু বানিয়া, শুধু মুনাফাই দ্যাখে--তা নয়_এরা নিজেদের ছাড়া 
আর-কাউকেই ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না। 

লর্ড এডওয়ার্ড রাগের স্বরে তেড়ে কথা ব'লে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সরকারের ফয়সালা 
শুনে তক্ষুনি মেরি আর রবার্ট নিজেদের আর সামলে রাখতে না-পেরে অস্ফুট স্বরে 
আর্তনাদ ক'রে উঠেছে : “বাবা ! বাবা !, যেন দ্বিতীয়বার মৃত্যু হয়েছে কাণ্তেন গ্রান্টের ! 

লর্ড এডওয়ার্ড এতটাই রেগে গিয়েছিলেন যে খেয়ালই করেননি কখন এই দুটি 
অচেনা কিশোর-কিশোরী এসে তার কথা শুনতে লেগেছে । হঠাৎ এই অস্ফুট আর্তনাদ 
শুনে অবাক হ'য়ে তিনি জিগেস করলেন, 'এরা কে ?' তারপর সরাসরি তাদেরই তিনি 
জিগেস করলেন : “বাবা! কে তোমাদের বাবা?, 

এবার লেডি হেলেনা সব কথা বুঝিয়ে দিলেন তার স্বামীকে । কেমন ক'রে 
কাণ্তেন গ্রাশ্টের এই ছেলেমেয়ে দুটি খবরকাগজে বিজ্ঞাপন পণড়ে তক্ষুনি, তড়িঘড়ি, 
তার সঙ্গে দেখা করতে চ*লে এসেছে, বিজ্ঞাপনের বয়ান থেকে কতটা আশা তাদের 
মধ্যে জেগে উঠেছিলো নতুন ক'রে, ভেবেছিলো অবশেষে বুঝি সত্যি হদিশ মিলেছে 
কাণ্তেন গ্রান্টের- আর এখন তারা তার প্রতিবেদন শুনে কতটাই মর্মাহত হ'য়ে পড়েছে ! 
“এড, এরা তোমার বিজ্ঞাপন পড়েই কাল এখানে চ'লে এসেছে । বলো, এখন এদের 
কী বলবে? 

“কিছুই বলার নেই, হেলেনা। এতক্ষণ তো সে-কথাই বলছিলুম। নৌদফতর 
কিছুতেই একজন হারিয়ে-যাওয়া স্কটের উদ্দেশে কোনো জাহাজ পাঠাবে না-' 

মেরির আত্মাভিমান প্রথর। এই কচি বয়সেই নানা দুর্বিপাকের মধ্যে পড়েও মাথা 
ঠাণ্ডা রাখতে হয়েছে তাকে, দেখাশুনো করতে হয়েছে ছোটোভাইটির, অভিভাবকহীন 
অবস্থাতেও সে কোনোদিন দোরে-দোরে সাহায্য ভিক্ষা ক'রে বেড়ায়নি। এখন পুরো. 
ব্যাপারটা শুনে ইংরেজ সরকারের হৃদয়হীনতা সম্বন্ধে সে যতটাই রেগে যাক, মুখে সে- 
কথা প্রকাশ না-ক'রে শুধু বললে : “তাহ'লে আমরা চলি। বাবার খবর যতটুকু পাওয়া 
গেছে, সেটাই অনেক। আদ্দিন বাদে অন্তত নতুন ক'রে একটা সম্ভাবনা জেগেছে যে 
তিনি বেচে আছেন। হয়তো একদিন নিজেই কোনো উপায় ক'রে ফিরে আসবেন। এই 
ব'লে রবার্টের হাত ধ'রে সে চ'লে যাবার জন্য পা বাড়ালে, বললে, “চল, রবার্ট, মিথ্যে 
মনখারাপ করিসনে। উপায় একটা বার করবোই। 

লেডি হেলেনা কাল রাত থেকেই এই অনাথ ছেলেমেয়ে দুটিকে নিয়ে অনেক 
ভেবেছেন। এবার একটু শঙ্কিতই হলেন তিনি, বিচলিত হ'য়ে এরা যদি ভয়ংকর-কিছু 
ক'রে বসে! তিনি বাধা দিয়ে বললেন, “তোমরা আবার এক্ষুনি কোথায় যাবে? 

দাঁতে দাত চেপে মেরি বললে : “শেষ ভরসা একজনই। যে-ক'রেই হোক মহারানীর 


২৪ 


কাছে গিয়ে সব কথা খুলে বলবো । যদি কোনোভাবে তার মনে দয়া জাগাতে পারি তাহ'লে 
হয়তো তিনি কোনো-একটা ব্যবস্থা ক'রে দেবেন। 

অন্যরা যা জানতো, তা মেরিও জানতো। এত সহজে রানীর দেখা পাওয়া যায় 
না। এতগুলো বাধা আসবে আমলা বা অনুচরদের কাছ থেকে যে কোনোদিনই হয়তো 
রানীর কাছে গিয়ে গৌছুনোই যাবে না। কোনো উটকো যে-সে লোককে রানীর সঙ্গে 
দেখা করতে দেয়াই হয় না। 

“মেরি, শোনো, যেয়ো না, লেডি হেলেনার গলার স্বর পালটে গিয়েছে ।'“এত সহজে 
হাল ছেড়ে দেবার কিছু হয়নি। রানীর বদলে আমরা নিজেরাই হয়তো কোনো-একটা 
ব্যবস্থা করতে পারবো।' তারপর লর্ড এডওয়ার্ডের দিকে ফিরে বললেন : “এডওয়ার্ড, 
ইংরেজরা যদি আমাদের মানুষ বলেই মনে না-করে, আমরা তবে খামকা তাদের কৃপার 
জন্যে অপেক্ষা করবো কেন। তুনি তো ডানকান জাহাজ বানিয়েছো আমাদের প্রমোদত্রমণের 
জন্যে। মজবুত, আধুনিক জাহাজ, বাস্পে চলে। কিন্তু প্রমোদভ্রমণ তো আর অকারণে 
যেখানে-সেখানে ভেসে-যাওয়া নয়, জাহাজ যদি জলে ভাসানো হয় তাহ'লে তার একটা 
গন্তব্য থাকে। পৃথিবীর সেরা দৌড়বীরের চাইতেও সেই লোকটাই দৌড়ের বাজিতে 
সর্বশ্রেষ্ঠ হয়েছিলো যে ম্যারাথনে দৌড়েছিলো--কেননা তার দৌড়টা নিছক দৌড় ছিলো 
না, ছিলো তার দেশকে বাঁচাবার উপায়। আমাদের প্রমোদভ্রমণও সার্থক হবে যদি তার 
সামনে একটা লক্ষ্য থাকে, একটা উদ্দেশ্য থাকে। 

“তুমি কি বলতে চাচ্ছো, হেলেনা ? আমি যা মনে-মনে ভেবেছি তা-ই কি তোমারও 
মনের কথা? লর্ড এডওয়ার্ড প্রশ্ন করলেন। 

“হ্যা, এডওয়ার্ড। আমি সত্যিকার সুখী হবো, সত্যিকার আনন্দ পাবো যদি আমাদের 
প্রমোদভ্রমণ শেষপর্যন্ত আর নিছক-প্রমোদভ্রমণ না-থাকে। আমরা তো এই উপলক্ষে 
ডানকান নিয়ে কাণ্ডেন গ্রান্টের খোঁজেই বেরিয়ে পড়তে পারি-সাগরপাড়ি যদি দিতেই 
হয়, তবে সামনে এই লক্ষ্যটা রাখলেই হয়। দরকার হ'লে সাতসমুদ্র তেরোনদী পাড়ি 
দিয়েই না-হয় আমরা কাণ্তেন গ্রান্টকে খুঁজে বার ক'রে নিয়ে আসবো! 

লর্ড এডওয়ার্ড আনন্দে যেন ফেটেই পড়বেন। “জানো, হেলেনা, লগুনে ব'সে- 
বসে আমিও ঠিক এই কথাই ভেবেছিলুম। কিন্তু ঠিক বুঝতে পারিনি তোমাকে একা 
ফেলে রেখে এত দূর পথ পাড়ি দেয়া ঠিক হবে কি নাঁ। তুমিও যে আমার সঙ্গে যেতে 
চাইবে, সেটা মোটেই ভাবিনি। জাহাজ যত আধুনিকই হোক বা মজবুতই হোক, দিনের 
পর দিন অজানা সমুদ্র পাড়ি দেয়ার মধ্যে ধকলও আছে, আবার একঘেয়েমিও আছে। 
দিনের পর দিন চারপাশে জল দেখতে সকলের সমান ভালো লাগে না কি না! 

মেরি আর রবার্ট গিয়ে ততক্ষণে লেডি হেলেনাকে জড়িয়ে ধরেছে । “আমরাও সঙ্গে 
যাবো,” একসঙ্গেই টেচিয়ে উঠেছে তারা, 'আপনারা যদি বাবার খোঁজে জাহাজ নিয়ে 


৫ 


দূর সাগরে পাড়ি জমান, তাহ'লে আমরাও সঙ্গে যাবো-- 

“নিশ্চয়ই যাবে, লর্ড এডওয়ার্ড বললেন, “ডানকানে বিস্তর জায়গা আছে। তাছাড়া 
হেলেনারও ভালো লাগবে তোমাদের সঙ্গী পেলে-অন্তত একঘেয়েমির হাত থেকে 
বাঁচবে ।, 

লেডি হেলেনাও সায় দিলেন : “তাছাড়া তাড়াটা তো তোমাদেরই বেশি। তোমরা 
সারাক্ষণ ব'সে-ব'সে অদ্ভুত সব কথা ভাববে, ভাববে ডানকান জাহাজের কী হ'লো, 
বাবার দেখা পেলো কিনা-তার চাইতে সঙ্গেই চলো, একই সঙ্গে আমরা খুঁজে দেখবো 
কাণ্তেন গ্রান্ট এখন কোথায় আছেন।' 

“তোমাদের কোনো অসুবিধেই হবে না। ডানকান নেহাৎ ছোটো জাহাজ নয়-_দুশো 
দশ টনের জাহাজ । এর চাইতেও ছোটো-ছোটো শাবেক আমলের জাহাজ নিয়ে ক্রিস্তেবাল 
কোলোন সম্পূর্ণ অজানা সমুদ্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন-_ কোথায় যাবেন, জানতেনই না। 
আমাদের তো তবু খানিকটা আন্দাজ আছে--অন্তত এটা তো জানি কত অক্ষরেখায় 
যেতে হবে।, 


চার 


পাড়ি 


একবার যখন ঠিক হ'য়ে গেছে যে ডানকান জাহাজই ব্রিটানিয়া আর কান্তেন গ্রান্টের 
সন্ধানে দক্ষিণ আমেরিকার সমুদ্রে পাড়ি দেবে, তখন আর একমুহূর্তও তর সইছিলো 
না কারু। কাণ্তেন ম্যাঙ্গলসরে ডেকে অভিযানের কথা বলতেই তিনি তো একপায়ে 
খাড়া : সমুদ্র যারা ভালোবাসে, ডাঙায় থাকতে তাদেব যে আদপেই ভালো লাগে না, 
সারাক্ষণ যে তারা উশখুশ করে কবে আবার জলে ভাসতে পারবে, কান্তেন ম্যাঙ্গল্‌সই 
তার সশরীর প্রমাণ। এখানে অবশ্য আরো-একটা কথা আছে । ইংরেজদের নৌদফতরকে 
পারে-_ শুধু তা-ই নয়, কোনো দায়িত্ব নিয়ে বেরুলে স্কটরা ছিনেজোকের মতো লেগে 
থেকে সে-দায়িত্ব পালনও করতে পারে। অন্তত লর্ড গ্রেনারভনের জেদও যে কাণ্তেন 
ম্যাঙ্গল্সের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছিলো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর তাছাড়া আছে 
মেরি আর রবার্ট-আর-কিছুর জন্যেও যদি না-হয় অন্তত তাদের কথা ভেবেও চট ক'রে 
অভিযানে বেরিয়ে-পড়া উচিত। 


২৬ 


কিন্তু এত-বড়ো একটা অভিযানে বেরুতে গেলে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই তো আর 
হুট ক'রে রওনা হওয়া যায় না। কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্সের ওপরই ভার পড়লো ডানকানকে 
গ্রাসগোর বন্দরে নিয়ে গিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে অভিযানের জন্যে যা-যা করা দরকার 
সবকিছুই নিজে তদারক ক'রে করবার। 

এটা ঠিক যে ডানকান বাস্পে চলে। কিন্তু ফোরকাস্লের সামনে বড়ো মাস্তুলটার 
ডগায় পাল খাটাবারও ব্যবস্থা আছে-_-সে কিন্তু নিছকই বিকল্প ব্যবস্থা হিশেবে নয়; হাওয়া 
যদি তোড়ে বয়, অনুকূল থাকে, তাহ'লে ডানকান পালতোলা জাহাজ হিশেবেই চলবে, 
আর অন্য সময় তো আছেই তার ১৬০ অশ্বশক্তির এনজিন। পুরোনোদিনের পালের 
জাহাজের সঙ্গে তার এখানেই তফাৎ-তাকে সবসময় অনুকূল হাওয়ার ওপর নির্ভর 
করতে হবে না। অন্য সময় সে বাণ্পের জোরেই ঘণ্টায় সতেরো সামুদ্রিক মাইল হিশেবে 
চলতে পারবে। কিন্তু সেই বাষ্প তৈরি করবার জন্য চাই কয়লা, বিস্তর কয়লা-আর 
এই দূরপাল্লার পাড়িতে সঙ্গে যতটা -সম্ভব কয়লা নিয়ে-যাওয়াই ভালো, না-হ'লে মাঝপথে 
হঠাৎ কয়লার দরকার হ'লে সব জায়গায় তো তা নাও মিলতে পারে। অপর্যাপ্ত রসদও 
চাই সঙ্গে, যাতে পথে খাবারের অভাবে ভূগতে না-হয়। তারপর জাহাজের সামনে 
আত্মরক্ষার খাতিরে একটা কামানও বসাতে হবে--পথে জলদস্যুদের পাল্লায় পড়লে যাতে 
সামলানো যায়। 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গলস প্রায় যেন জলে-জলেই মানুষ, কিন্তু সে তো সাধারণ খালাশিও। 
কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স বিপদে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে জানেন, উদ্ভাবনীশক্তি আছে, আছে অফুরন্ত 
আর অদম্য প্রাণশক্তি আর সাহস, উপস্থিতবুদ্ধির জোরে কোনো মুশকিলে পড়লে সেটা 
কাটান দেবার ক্ষমতা রাখেন। ম্যালকম কাসলেই তিনি মানুষ হয়েছেন, গ্রেনারভনদের 
পৃষ্ঠপোষকতাতেই নৌবিদ্যায় তার হাতেখড়ি হয়েছিলো, এখন তিনি অভিজ্ঞতার জোরে 
বলীয়ান হ'য়ে উঠেছেন। আর তারই সুযোগ্য সহযোগী টম অস্টিন-দক্ষ ও কুশলী নাবিক, 
কালে তিনিও কোনো জাহাজের পরিচালনভার নিজের হাতে পাবেন। আর তারা দুজনে 
মিলেই গ্রাসগোর ডকইয়ার্ড থেকে বাছাই ক'রে-ক'রে আরো পচিশজন মাল্লাকে ডানকান 
জাহাজে কাজ দিয়েছেন। দক্ষতা আর পরিশ্রমের ক্ষমতা ছাড়া তাদের সকলেরই আরো 
একটা পরিচয় আছে--তারা সবাই ডামবারটনের মানুষ, গ্রেনারভনদের প্রতি তাদের 
আনুগত্য অসীম। ্‌ 

প্রমোদভ্রমণের উপযোগী ক'রে আগেই ভালো ক'রে সবচেয়ে-বড়ো ক্যাবিনটা 
সাজানো হয়েছিলো, কিন্তু তখন তো আর জানা ছিলো না তাদের এত দীর্ঘ কোনো 
অভিযানে বেরুতে হবে। তাই এখন তাদের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের দিকে নজর রেখে দীর্ঘদিনের 
উপযোগী ক'রেই সাজানো হ'লো মাস্টার-ক্যাবিন-সত্যি-বলতে বিয়ের পর এই-প্রথম 
লর্ড এডওয়ার্ড তার নবপরিণীতা পত্রী লেডি হেলেনাকে নিয়ে দূর সমুদ্রে পাড়ি জমাবেন 


৭ 


-এ তো আর ডানকান জাহাজের নিছক কোনো মহড়া নয় কাছেপিঠের সমুদ্রে। তাছাড়া 
রবার্ট যে কতটা চৌকশ ছেলে সে তো আর গোড়ায় বোঝা যায়নি, কিন্তু পাড়ি জমাবার 
আগেই দেখা গেলো কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্সের সঙ্গে তার ভারি খাতির হ'য়ে গিয়েছে, ছায়ার 
মতো সে কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্সের পেছন-পেছন থাকে; সে-যে কাণ্ডেন গ্রান্টের ছেলে, 
গোড়ায় এটাই ছিলো তার প্রতি কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্সের অতিরিক্ত একটা আকর্ষণের কারণ, 
কিন্তু পরে দেখা গেলো এই অভিযানে শেষপর্যন্ত রবার্টেরও সমুদ্রে হাতেখড়ি হবে, তারও 
রক্তে তার বাবার মতোই আডভেনচারের নেশা আছে যেন। 

এরা ছাড়া সঙ্গে যাবেন মেজর ম্যাকন্যাব্সও ৷ বছর পঞ্চাশ বয়স, এমনিতে স্বল্পবাক 
কিন্তু কৌতুকবোধ প্রখর, অনেক অভিজ্ঞতায় পোড়খাওয়া মানুষ মেজর, জানেন, যে 
বিপদের সময় অহেতুক উত্তেজনা বরং ক্ষতিই করে- তখনই বরং মাথা ঠাণ্ডা রাখা 
দরকার। লর্ড এডওয়ার্ডের সঙ্গে রক্তের সম্বন্ধ আছে, কিন্ত শুধু সেইজন্যেই নয়, 
আডভেনচারের সম্ভাবনা দেখেই তিনি ডানকান জাহাজে এসে উঠেছেন--তাছাড়া মেরি 
আর রবার্টের প্রতি তার কেমন-একটা মায়াও জ'ম্মে গিয়েছিলো । এই দুর্ধর্ষ অকুতোভয় 
মানুষটার মধ্যে ভেতরে কোথাও যে শ্লেহের একটা অফুরন্ত প্রশ্রবণ ছিলো, এটা তারও 
একটা প্রমাণ--যদিও তিনি নিজে সে-কথা ঠিক জানেন না-তিনি ভেবেছেন ডানকানের 
লম্বা পাড়িতে তিনি যোগ দেবেন নিছক একঘেয়েমির হাত থেকে রেহাই পেতে। 

এমনিতে হয়তো কোন জাহাজ এলো, কোন জাহাজ গেলো--তাতে লোকের কিছুই 
এসে-যেতো না। কিন্তু ডানকান যে-উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাতে চাচ্ছে লোকের মুখে-মুখেই 
সে-কথা ছড়িয়ে পড়েছিলো। আর তাই যখন ২৫শে আগস্ট ০ঘন্টায়, অর্থাৎ ২৪ আর 
২৫এর মাঝরাত্রে, ঠিক বারোটার সময়, জাহাজ ছাড়লো, গ্লাসগোর লোক ঝেঁটিয়ে 
এসেছিলো জাহাজ দেখতে । চোঙ দিয়ে ভলকে-ভলকে ধোয়া উঠলো, ঝগঝগ আওয়াজ 
উঠলো এনজিনে, চাকাগুলো পাক খেলো, আর ডানকান বন্দর থেকে নোঙর তুললো। 
সকাল ছটার মধোই জাহাজ গিয়ে পড়লো বারদরিয়ায়। ডানকানের লম্বা পাড়ি শুরু হ'য়ে 
গেলো, কতদিনের জন্যে কে জানে। 


৮ 


পাচ 
ভ্রান্তিবিলাস ও অন্যমনস্ক অধ্যাপক 


ডানকান যখন ছেড়েছিলো, সবাই ভেবেছিলো এখানে স্কটল্যাণ্ডের কাছে সমুদ্র নিস্তরঙ্গ 
থাকবে, আচমকা এখন ঝড়বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা নেই। ঝড়তুফান হয়তো সত্যিই ওঠেনি, 
কিন্তু হাওয়া ছিলো প্রখর, সমুদ্র ছিলো ক্ষুনধ ও চঞ্চল, আর সমুদ্রযাত্রায় ততটা অভ্যস্ত 
নন ব'লেই প্রথম দিনে মেরি বা লেডি হেলেনা কেউই নিজেদের ক্যাবিন থেকে বেরোননি। 
দ্বিতীয় দিনে যখন হাওয়ার তোড় কমলো, সমুদ্র শান্ত হ'য়ে এলো, ঢেউয়ের দোলাও 
ক'মে এলো। সমুদ্র শাস্ত হ'য়ে যেতেই যাত্রীরা ডেকে এসে জড়ো হলেন : ঠিক যেন 
পুব দিগন্তে সমুদ্রের মধ্য থেকেই উঠে এলো সূর্য, আকাশের গায়ে একটা লালের ছোপ, 
আর সেখান থেকে রৌদ্রের ছটা বেরিয়ে আসছে, ডানকানের শাদা পালে এসে পড়েছে 
রোদ্দুর। স্লিগ্ধ একটা হাওয়া দিচ্ছে। 

কারুই যেন আর তর সইছিলো না। চট ক'রে যদি গন্তব্যে পৌছে যাওয়া যেতো, 
তাহ*লেই যেন খুশি হ'তো সবাই। কিন্তু ইওরোপ থেকে তাদের যেতে হবে দক্ষিণ 
আমেরিকায়, নতুন মহাদেশের তে-১৪৯২ সালে ক্রিস্তেবাল কোলোন (বা 
ক্রস্তোফোরো কোলোনম্বো বা ক্রিস্টফার কলম্বাস ) খুব-তো আর চট ক'রে যেতে পারেননি 
নতুন মহাদেশে । তাদের হয়তো অত সময় লাগবে না, কিন্তু এ তো আর ইওরোপের 
এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে যাওয়া নয়। 

লেডি হেলেনা যেন স্পষ্ট ক'রে মেরির জিজ্ঞাসাটাকেই উচ্চারণ করলেন : “আমাদের 
শীয়ে শৌছুতে কত সময় লাগবে, এড? 

'ম্যাঙ্গল্স, আমরা কত জোরে যচ্ছি বলো তো? 

“ঘন্টায় সতেরো সামুদ্রিক মাইল। যদি এই চলার এই গতি বজায় থাকে, তাহ'লে 
মামরা পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই কেপ হর্ন পৌছে যাবে। কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স জানালেন। 

“কেপ হর্ন? ভারি অদ্ভুত নাম তো?" 

“কেপ হর্ন আসলে দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণতম বিন্দু। ৫৫০৫ ৯ দক্ষিণ। তিয়ের্রা 
দেল ফুয়েগো হর্ন আইল্যাণ্ডেরই অংশ, মূল ডাঙা হচ্ছে দক্ষিণ চিলে,' কাণ্ডেন ম্যাঙ্গল্স” 
ঈানালেন, 'শিঙের মতো দেখতে ব'লেই অন্তরীপটার নাম কেপ হর্ন। সেখানে পৌছুবার 
পরই খোঁজখবর নিয়ে আমাদের পরবর্তী সূচি তৈরি করতে হবে। 

পাতাগোলিয়া যেতে হ'লে এ দক্ষিণতম বিন্দু পেরুতেই হবে ডানকানকে । 

“পীচ সপ্তাহ অবশ্য খুব বেশি সময় নয়--দেখতে-না-দেখতেই এই দিনগুলো কেটে 


২৯ 


যাবে।' লর্ড এডওয়ার্ড ঘুরে মেরির দিকে তাকিয়ে জিগেস করলেন, “মিস গ্রান্ট, ডানকান 
জাহাজকে কেমন লাগছে? 

ডানকান যদি তাকে আর রবার্টকে না-নিয়ে অভিযানে বেরিড়ে পড়তো, তাহ'লে 
মেরির তা মোটেই ভালো লাগতো না। এখন তার মনে হচ্ছে কাণ্তেন গ্রান্টের সন্ধানে 
যে-অভিযান রওনা হয়েছে, তাতে তারও মস্ত একটা ভূমিকা আছে। সে উদ্ভাসিত মুখে 
বললে : “দারুণ! চমৎকার !? 

'রবার্টের কী খবর ? জিগেস করলেন লর্ড এডওয়ার্ড । “কই? তাকে তো দেখছি 
না?' 
প্রধান সহকারী হয়ে উঠেছে । এই হয়তো সে আছে এনজিনের সামনে, পরক্ষণেই 
ফোরকাসল-এ, বা মান্তুলের ডগায়। এ তো, তাকিয়ে দেখুন না বড়ো মাস্তুলটার 
দিকে। 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্সের কথা শুনে সবাই মাস্তুলটার দিকে তাকিয়ে দ্যাখে, মান্তুলের 
ওপরে উঠে রবার্ট দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে । দেখেই, মেরির বুকটা ভয়ে কেপে 
উঠলো। কী ডাকাবুকো ছেলেই না হয়েছে সে, প্রাণে একটুও ভয়ডর নেই। জাহাজে 
উঠতে পেরে সে যেন ফুর্তিতে ডগমগ করছে। কিন্তু মেরি আতকে উঠে বললে, “কী 
সর্বনাশ ! প*ড়ে যাবে যে! 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স কিন্ত্ত তখনও হাসছেন। বললেন, “মিথ্যে ভয় পাবেন না, মিস 
গ্রান্ট। দু-দিনেই আপনার ভাইকে ওস্তাদ নাবিক বানিয়ে দেবো- দেখে এমনকী কাণ্তেন 
গ্রান্টেরও তাক লেগে যাবে। 

কিন্তু ওভাবে অকারণে: 

“সে-ই তো ভালো। জাহাজ যখন দুলছে না তখনই তো তরতর ক'রে ওপরে 
ওঠা-নামা অভ্যাস করতে হবে, যাতে পরে দরকারের সময় আচমকা এ-কাজ করতে 
গিয়ে ভয় না-গায় বা গুবলেট ক'রে না-ফ্যালে। দেখবেন মিস গ্রান্ট, আপনার বাবা 
বরং তার এইসব ওস্তাদি দেখে তারিফই করবেন।' 

“আপনি যদি বলেন, মেরির গলা থেকে শঙ্কার ভাব তখনও দূর হয়নি। “আপনার 
ওপরই কিস্তু ওর ভার রইলো । 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স আবার আশ্বস্ত করবার চেষ্টা করলেন মেরিকে। “কিচ্ছু ভাববেন 
না, মিস গ্রান্ট। আমি সবসময় ওর ওপর কড়া নজর রাখবো ।' 

লর্ড এডওয়ার্ড প্রসঙ্গটা পালটাবার জন্যে বলল্লেন, 'ম্যাঙ্গল্‌স, আমি বরং এই ফাকে 
এঁদের জাহাজটা ভালো ক'রে দেখিয়ে আনি। তুমি ততক্ষণে স্টুয়ার্ডকে বলো আমাদের 
ছোটোহাজরির ব্যবস্থা করতে ।' 


মেজর ম্যাকন্যাব্স ডেকের একপাশে রেলিঙের ধারে দাঁড়িয়ে সিগার টানছিলেন। 
একদিন নতুন মহাদেশ থেকেই তামাক এসেছিলো, আর এখন ইওরোপের অজস্র লোকই 
এই চুরুট খাবার নেশায় আটকে গিয়েছে । তার মধ্যে কোনো চাঞ্চল্যই নেই। সম্ভবত 
মেজর ম্যাকন্যাব্স সকালবেলায় ছোটোহাজরির আগে কোনো বিষয় নিয়েই অস্থির হন 
না। কোনো লড়াইয়ের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি কী করেন, এ নিয়ে লর্ড এডওয়ার্ড অনেক 
সময়েই ভাবতেন। মেজর ম্যাকন্যাব্স এর আগেই সারা জাহাজ ঘুরে দেখেছেন, ফলে 
ডানকান জাহাজ ঘুরে দেখবার জন্যে তার কোনো৷ কৌতৃহল ছিলো না। লর্ড গ্রেনারভন 
অন্যদের নিয়ে জাহাজের অন্যদিকে চ'লে গেলেন। মেজর ম্যাকন্যাব্স একা -একা দাড়িয়ে 
কী যেন ভাবতে-ভাবতে আনমনে দিগন্তের দিকে তাকিয়েছিলেন। হঠাৎ কাছেই কার 
পায়ের শব্দ শুনে ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে দ্যাখেন অচেনা এক ভদ্রলোক তার সামনে 
দাঁড়িয়ে আছেন। কাপ্ডতেন ম্যাঙ্গল্স, তার সহকারীরা, জাহাজে কাজ করতে এসেছে যে- 
সব মাঝিমাল্লা, তাদের প্রায় সবাইকেই *«মজর ম্যাকন্যাব্‌স চেনেন। এটা ঠিক যে নতুন 
অনেককেই অভিযানের আগে ডানকান জাহাজে নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু এই অচেনা 
ভদ্রলোক যে তাদের কেউ নয়, সে তার চেহারা বা পোশাক-আশাক দেখেই বোঝা যায়। 
খালাশির পোশাক পরা নেই তার, তাছাড়া খুব হস্টাকট্টরা গাট্টাগোর্টা পোড়খাওয়া লোকও 
নন তিনি। বরং ঢ্যাঙা রোগামতো এই ভদ্রলোককে দেখে মনে হয় একটা সরু লম্বা 
পেরেকের ডগায় কেউ মন্ত-একটা মাথা গেঁথে দিয়েছে । মাথার সামনের দিকে চুল পাহলা 
হ'য়ে এসেছে, ছুঁচলো চিবুক, চোখে পুরু পরকলার চশমা । ভদ্রলোক এখনও যেন ঘুমের 
ঘোর থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি, ঝকঝকে দিনের আলোয় চোখ কুচকে আলোটা 
যেন চোখে সইয়ে নেবার চেষ্টা করছেন। চোখমুখে বুদ্ধির দীপ্তি। আর কেমন-একটা 
কৌতুকের ছোপ। মাথায় কানঢাকা টুপি, হলদে রঙের বুটজুতো পায়ে, কোমরে সেই 
রঙের চামড়ারই বেলট, গায়ে খয়েরি রঙের মখমলের জ্যাকেট, ট্রাউজার জোড়ার রঙও 
তা-ই-পকেটগুলোয় রাশি-রাশি কাগজপত্তর, যেন একটা আস্ত টেবিলের সব জিনিশপত্র 
কোট-প্যান্টের পকেটে এসে আশ্রয় নিয়েছে । গলা থেকে ঝুলছে একটা টেলিস্কোপ । 
ভদ্রলোক মেজরকে ঘিরে ধুপধাপ আওয়াজ ক'রে একবার পাক খেয়ে নিলেন; এরই 
এই ধুপধাপ শব্দে মেজরের তম্ময়তা ভেঙেছিলো। 

মেজর ম্যাকন্যাব্স একটু অবাক হ'লেও কোনো কথাই বললেন না-বা তার 
চোখমুখে বিস্ময়ের কোনো ছাপ দেখা দিলো না। অথচ এমনিতে তার বিশ্মিত হবারই 
কথা ছিলো। তিনি যতদূর জানতেন তাতে তারা কয়েকজন ও মাঝিমাল্লারা ছাড়া ডানকান 
জাহাজে আর-কোনো যাল্ত্রীরই যাবার কথা নয়। তবু মেজর ম্যাকন্যাব্স মুখ ফুটে এই 
অচেনা যাত্রীটির কোনো পরিচয়ই জানতে চাইলেন না। এই ঢ্যাঙা ভদ্রলোকটি কিন্তু জিজ্ঞাসু 
চোখে হাজারো কৌতৃহল নিয়েই মেজর ম্যাকন্যাব্সের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। 


৩৯ 


মেজর ম্যাকন্যাবস তাকে নিজে থেকে কোনো সম্ভাষণ করলেন না দেখে এই অচেনা 
আগন্থকটি টেলিস্কোপটা টেনে লম্বা ক'রে দিগন্তের দিকে তাকালেন। তারপর 
টেলিস্কোপটা একটা ছড়ির মতো রেখে তাতে ভর দিয়ে দাড়াতে গিয়ে ভদ্রলোক টাল 
সামলাতে না-পেরে পণ্ড়ে গেলেন, কারণ টেলিস্কোপ তার ভারে ততক্ষণে খোপের মধ্যে 
ঢুকে গিয়েছে। তার কাণ্ড দেখে কেউ হয়তো এতক্ষণে হেসে ফেলতো, কিন্তু মেজর 
ম্যাক্ন্যাব্স তবু গায়ে পড়ে ভদ্রলোক সম্বন্ধে কোনো কৌতৃহলই প্রকাশ করলেন না। 

ঢ্যাঙা ভদ্রলোক উঠে পড়ে জ্যাকেটটা থেকে ধুলো ঝেড়ে টেলিস্কোপটা ফের গলায় 
ঝুলিয়ে দিয়ে নবাবিচালে হাক পাড়লেন। “স্টুয়ার্ড ! স্টুয়ার্ড!” 

ঠিক সেই সময়েই কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্সের নিদেশ অনুযায়ী স্টুয়ার্ড অলবিনেট 
সকলের ছোটোহাজরির ব্যবস্থা করতে ডাইনিংরুমে যাচ্ছিলো। হঠাৎ এমন হাক শুনে 
একটু থতমত খেয়ে ভদ্রলোকের সামনে এসে বললে : “আপনি কি আমায় কিছু 
বলছেন? 

“আপনিই কি স্টুয়ার্ড?" 

"হ্যা, কিন্তু আপনি? 

“আমি ছ-নম্বর ক্যাবিনের যাত্রী । 

“ছ-নম্বর ক্যাবিন!” স্টুয়ার্ড অলবিনেট এবার সত্যি হতভম্ব হ'য়ে পড়লো। ডানকান 
তো কোনো যাত্রীবাহী জাহাজ নয়, তাতে আবার ছ-নম্কর ক্যাবিন ব'লে কী আছে? 

“হ্যা। তা মসিয় স্টুয়ার্ড, আপনার নামটা আমি জানতে পারি? আমার আবার সারাক্ষণ 
“স্টুয়ার্ড-স্টুয়ার্ড” ক'রে ট্যাচাতে ভালো লাগে না। 

“অলবিনেট । অলবিনেট তখন সত্যি বুঝে উঠতে পারছিলো না কী বলবে। কাপ্তেন 
ম্যাঙ্গল্‌্স তাকে কখনও এই যাত্রীটির কথা বলেননি। 

“তা মঁসিয় অলবিনেট. প্রায় দু-দিন আমার পেটে কোনো দানাপানি পড়েনি। পারী 
থেকে গ্লাসগো অবি প্রায় ছুর্টেই এসেছি একটানা । চ্যানেল পেরুতে হ'লো-ক্যালে থেকে 
ডোভার, তারপ্র এখানে গ্লাস্গোতে। তা ছোটোহাজরি হবে কখন ? 

অলবিনেট ততক্ষণে তার হতচকিত দশা থেকে বেরুবার চেষ্টা করছে। বললে, 
“নটার সময়, ডাইনিংরুমে। 

ভদ্রলোক তার অগুনতি পকেট হাতড়াতে-হাতড়াতে শেষে কোন-এক পকেট থেকে 
একটা ঘড়ি বার ক'রে এনে অতীব মনোযোগ সহকারে সময়টা দেখলেন। “সবে তো 
দেখছি আটটা বাজে। আরো-একটি ঘণ্টা! তাহ'লে আমার ক্যাবিনে কিছু পানীয় আর 
খুচরো-কিছু বিস্কুট পাঠিয়ে দেবেন। খিদেয় আমার জঠর এখন চি-টি করছে। হ্যা, আর, 
ভালো কথা--কাণ্তেন কোথায় এখন ? কিংবা ফার্্টমেট? জাহাজ তো দেখছি চমৎকার 
চলেছে, পালে খোলা হাওয়া লাগিয়ে তোফা পাড়ি জমিয়েছে। 


৩২ 


স্টুয়ার্ড ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলো না এই অচেনা অভ্যাগতটিকে নিয়ে সে কী 
করবে । আর তখনই কাণ্তেন ম্যাঙ্গলসকে এদিকটায় আসতে দেখে সে হাপ ছেড়ে বাচলে। 
তার জানা নেই এই যাত্রীমহোদয় সত্যি কে, কাণ্তেন নিশ্চয়ই জানেন। তাই সে পরিচয় 
করিয়ে দিলে “ইনিই কাণ্তেন-" 

“কাণ্তেন? কাণ্তেন বার্টন, শেষ অব্দি তাহ'লে সাক্ষাৎ হ'লো আপনার সঙ্গে? 
চমতকার । আপনার সঙ্গে আলাপ ক'রে ভারি খুশি হয়েছি--১ ব'লে হাতঝাকুনির জন্যে 
অচেনা যাত্রীটি হাত বাড়িয়ে দিলেন। 

বাটন? নিজের পিতৃদত্ত দীক্ষান্ত নামটিকে এভাবে আদ্যন্ত বদলে যেতে দেখে 
কাণ্ডেন ম্যাঙ্গলস বেশ হকচকিয়েই গেলেন। অচেনা যাত্রীটি ততক্ষণে তার হাত ধ'রে 
ঝাকাচ্ছেন, 'নানান গোলেমালে পরশু তো দেখাই হ'লো না। অবশেষে আজ সকালেই 
একেবারে মুখোমুখি দেখা হ'য়ে গেলো। খুব ভালো লাগছে আমার । তা, কেমন লাগছে 
এই এস. এস. স্কটিয়া জাহাজটাকে ? 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স আরো ভড়কে গিয়ে, যেন বিষম খেয়েই, স্টুয়ার্ডের দিকে একবার 
তাকালেন! তারপর এই প্রথম তিনি সম্ভাষণ করলেন যাত্রীটিকে : “এস. এস. স্কাটিয়া 
মানে?, 

“যে-জাহাজ নিয়ে পাড়ি দিচ্ছেন, তারই নাম। কী-রকম ছিমছাম ঝকঝকে জাহাজ, 
দেখেছেন? খাশা ! ঠিক রাজহাসের মতো ভেসে চলেছে । আচ্ছা, বলুন তো, আপনি 
কি সেই বিখ্যাত বার্টনের কেউ হন, ঘিমি আফ্রিকার নানা দুর্গম অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়ে 
অমন চমৎকার একখানা বই লিখেছেন আফ্রিকা সম্বন্ধে ?' 

“কিন্ত, সার, আমি বার্টনের কেউ নই--বার্টন আমার নামই নয়।' 

“তবে কি আপনি ফার্টমেট মসিয় বার্ডনেস ? 

কাণ্তেনের পেছন-পেছনই গল্প করতে-করতে আসছিলেন লর্ড এডওয়ার্ডরা। 
তাদের দেখেই সাময়িকভাবে কাণ্তেনকে অব্যাহতি দিয়ে তাদের দিকে প্রায় ছুটেই চ'লে 
গেলেন এই অদ্ভুত নবাগত যাত্রী। 'এরাও তবে এই জাহাজেরই যাত্রী ? বেশ ভালো হ'লো। 
জমিয়ে আড্ডা দেয়া যাবে- একঘেয়ে নিরেস লাগবে না যাত্রাটা। আসুন, আপনাদের 
সঙ্গে আলাপ ক'রে নিই! লেডি হেলেনাকে সম্ভাষণ করলেন মাদমোয়াজেল, মেরিকে 
বললেন মাদাম, লর্ড এডওয়ার্ডকে বললেন মঁসিয়--আর খুব ক'রে সবাইকার হাত নেড়ে 
দিলেন। 

প্রহসনটা হুড়মুড় ক'রে ছাড়মুখ গুজড়ে এগুচ্ছে দেখে কাণ্ডেন ম্যাঙ্গল্স ততক্ষণে 
এগিয়ে এসেছেন। তার এই হতভম্ব ভড়কে-যাওয়া দশা এখনও কাটেনি বটে, তবে 
তার মনে হয়েছে এবারে সমস্ত ব্যাপারটা মাথা ঠাণ্ডা ক'রে একটু ভালো ক'রে অনুধাবন 
করা যাক। কিস্তু সেটা তার সাধ্যে কুলোলে তো ? যেই তিনি বলতে গেছেন, “ইনি হলেন 


ইন সার্চ : ৩ টু 


লেডি হেলেনা, আর উনি লর্ড এডওয়ার্ড গ্রেনারভন, আগন্তুক অমনি ব'লে উঠেছেন, 
'তাই নাকি? তা জাহাজে প্রথম আলাপেই অত নিখুঁতভাবে সহবৎ মেনে চলা যায় না। 
তবে স্টিয়ার ওপর দু-দিনেই প্রথম আলাপের এই আড়ুষ্টতা কেটে গিয়ে ঘনিষ্ঠতা 
গজিয়ে উঠবে। তখন কি আর এ-সব তুচ্ছ আদবকায়দার কথা কেউ মনে রাখবে? 

রকমসকম দেখে সকলেই তাজ্জব। শুধু যে-কথাটা প্রথমেই জিগেস করা উচিত 
ছিলো, সেই কথাটাই এবার জিগেস করলেন লর্ড এডওয়ার্ড-'কার সঙ্গে আলাপ হ'লো 
জানতে পারি কি!” 

“৩-হো, দুঃখিত । নিজের পরিচয়টাই তো এখনও দেয়। হয়নি। এই অধম পারী 
ভৌগোলিক সমিতির প্রধান সচিব, এবং বাঙ্গিন, বন্বাই, লাইপজিক, লণ্ডন, সেন্ট 
পিটার্সবুর্গ, চীন, মিউ-ইার্ক ভৌগোলিক সমিতির সদসা জাক-য়েলিয়াস ভ্রাসোয়। মারি 
পাঞয়ল। আমি বিস্ত্ু ইস্ট-ইনডিয়া ইনস্টিটিউটের রাযাল জিওগ্রাফিব্যাল আগ 
এথনোগ্রাফিকাল সোসাইটিরও সদসা। দই দশক ধ'রে গুধু আরামবেদারায় বসেই 
ভূগোলেন চা ঝরেছি-- এবারে সশবীরে যাচ্ছি ভারতবর্ষে, পদব্রজে ঘুরে-ুরে ভারতে? 
[ভীগোলিব বৈশিষ্টাগুলে। সরেজমিন তদন্ত ক'রে দেখতে।' 

জারা পাঞয়লের মামটা শোমবামার লর্ড এডগার মধে। একট সগ্রমের ভাথ 
জেগে উঠলো। ভিনিও অবসন্ন সময়ে এনূ"-আধটু ডুগোলচর্চা ক'রে থাকেনসআন 
ডাইতেই বিভিন্ন জার্নালে নানা সময়ে ভা পাঁঞয়লের্ নান্নাবিধ তয় ও আবিষ্ঠারৈর 
খবর বেরিয়েছে, আর যে-ররকম সম্মান দিয়ে সে-সধ প্রতিবেদন বেরিয়েছে তাডে বোঝা 
বায় পণ্ডিতেরা জাক পাঞয়লের বিদ্যাবত্তাকে যথেষ্টই সম্মান ক'রে থাকেন। ডানকান 
জাহাজে যে এভাবে আচমকা তারই সঙ্গে দেখা হ'য়ে যাবে, এটা একেবারেই অগপ্রত॥শিত। 
পুরোটাই রীতিমতো চমকপ্রদ এক ভ্রান্তিবিলাস ব'লেই মনে হচ্ছে, আরামকেদারা থেকে 
পা বাড়াবামাত্র ভূুগোলবিদ কোণাও একটা গগুগোল পাকিয়ে বসে আছেন- কিন্তু বিভ্রম 
যা-ই কিংবা যেভাবে ঘ'টে থাকুক না কেন, লর্ড এডওয়ার্ড ভাবলেন এই ছিটগ্রস্ত 
অধ্যাপকটিকে সমাদর করা কর্তব্য, এবার তিনি নিজেই তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে জিগেস 
করলেন, 'আচ্ছা, একটা কথা যদি জানতে চাই--? 

“একটা কেন? অনেক কথাই জানতে চাইতে পারেন। কী জানতে চান, 
বলুন-_.' 

“আপনার কথা থেকে মনে হ'লো আপনি বোধকরি পরশু রাতের বেলা জাহাজে 
এসে উঠেছেন--' 

“হ্যা, রাত অর্টটায়। তিরিশ ঘণ্টা রেলের ঝাকুনি খেয়েছি সমানে, তারপর ঘোড়ার 
গাড়িতে ক'রে স্টেশন থেকে জাহাজখাটা-যা ধকল গেছে, কী আর বলবো। আমার 
তো আর জরমণ ক'রে অভ্যাস নেই। তাই এস. এ, স্করটিয়ায় উঠেই সোজ। ছ-নম্বর 


৩৪ 


ক্যাবিনে গিয়ে চিৎপাত হ'য়ে শুয়ে পড়েছি--একটানা ছত্রিশ ঘণ্টা ঘুমিয়েছি, নইলে আবার 
অসুখবিশুখ বাধিয়ে মুশকিলে প'ড়ে যেতে হ'তো। 

এতক্ষণে এই বিভ্রমের রহস্য বোঝা গেলো। ডানকান ছাড়বার আগে সবাই যখন 
শির্জোয় গেছে, জাহাজে যে কোনো পাহারার দরকার আছে সেটাও কারু তখন খেয়াল 
হয়নি, আর রাতের অন্ধকারে বিধবস্ত পাঞয়ল ডানকানকেই এস. এস. হ্কটিয়া মনে 
ক'রে সোজা গিয়ে ঢুকে পড়েছেন তার জন্যে নি্িষ্ট-করা ছ-নহর ক্যাবিনে। 

“কথা ছিলো সোজা কলকাতার বন্দরে পৌছে, সেখান থেকেই স্থলপথে আমাদের 
ভৌগোলিক অভিযান শুরু হবে। ভৌগোলিক সমিতির পক্ষ থেকে বড়োলাটবাহাদুরকে 
সেই মর্মেই বিশদ বিবরণ জানানো হয়েছিলো। আমাদের ভৌগোলিক সমিতি জানতে 
চাচ্ছিলো, তিব্বতের ইয়ারো-জাঙবো-চউ নগীটা ছিমালয়ের দক্ষিণদেশ থেকে বেরিয়ে 
শেষটায় আসামের ব্রক্ষপুত্র মদে গিয়ে পড়েছে কি না। সেটাই সরেজমিন দেখে"-আসা 
আমার উদ্দেশ্য ছিলো। এ রাস্তায় বেরিয়ে, নদীয় গতিপথ আবিষ্কার করতে গিয়ে, এই 
'৪৬ সালে ক্রিক ব্যর্থ হয়েছিলেন-.আমার ধারণা, আমি নিশ্টযাই সফল ছবো। 

স্বাক পাঞয়ল যেন দ্বৈতালাগে বিশ্বাসই করেন নাং হ্লাসে গড়িয়ে ভার অত্যাসটা 
এমনই বিগড়ে গেছে যে সারাক্ষণ, অনগল, মুখ থেকে ডখড়ির মতো বাকোর ফুলধুরি 
ছিটিয়ে চলেন! রেলভ্রমণের ধকলে ভিনি কতটা কাহিল হয়েছিলেন এখন জার সেট। 
বোধবার কোনো জো নেই-সন্তধত এ ছত্রিশ ঘণ্টা একটানা খুমিয়ে নেবার পর শরীরটা 
ভার এতই বরধারে লাগছে; এতই চাঙ্গ! লাগছে যে তোড়ে বাক্যবর্ধণ ধ'রে খাচ্ছেন। 
একটু খারাপই লাগলো তার ভূলটা ভাঙিয়ে দিতে, কিন্তু গোড়াতেই ভুলটা ভাঙিয়ে না- 
দেয়াটাও অন্যায় হবে। “মসিয় পাঞয়ল, লর্ড গ্রেনারভন খুব স্পষ্ট ক'রে বললেন, 
“আপনি কিন্তু মোটেই কলকাতা যাচ্ছেন না। 

তড়াক ক'রে কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্সের দিকে ঘুরে দাড়ালেন জাক পাঞয়ল, “অথচ 
কাণ্তেন বার্টন-_, 

“আপনি ভুল করেছেন, মসিয় পাঞয়ল* ম্যাঙ্গল্স বললেন, 'আমি কিন্তু কাপ্তেন 
বার্টন নই--. 

“তাহ'লে স্কটিয়া-. 

“এবং এটা এস. এস. স্কটিয়াও নয়।, 

বাক পাঞয়ল শুধু হতচকিত নন, স্তপ্তিত। জীবনে এই-প্রথম সম্ভবত তার কোনো 
বাকৃম্বুর্তি হ'তে চাচ্ছিলো না। এক-এক ক'রে সকলের মুখের উপর চোখ বুলিয়ে গেলেন 
তিনি; না, মোটেই কোনো রসিকতা নয় এটা, সকলেরই মুখ গস্ভীর। শুধু কাণ্তেন 
ম্যাঙ্গল্সের ওষ্ঠাধর মুচকি-এক হাসিতে ফুসকায়িত হ'য়ে আছে। আর তারপরেই তার 
চোখ পড়লো হালের ঢাকায়, সেখানে বড়ো-বড়ো হরফে স্পষ্ট ক'রে লেখা : 


৩৫ 


ডানকান 


গ্লাসগো 

“আটা! ডানকান !, 

প্রায় অর্ধস্ুট একটা আর্তনাদের মতোই কথটা পাঞয়লের মুখ থেকে নিঃসৃত 
হ'লো। কী-রকম হতাশভাবে ছুটে গিয়ে তিনি ঢুকে পড়লেন তার এঁ ছ-নম্বর ক্যাবিনে। 

এই ভ্রাস্তিবিলাসে সকলেরই হাসি পাচ্ছিলো, শুধু মেজর ম্যাকন্যাব্সই সারাক্ষণ 
চুপচাপ গন্তীর হয়ে পাশে দীড়িয়েছিলেন। 

লর্ড গ্রেনারভন বললেন, “বেচারা ! এটা অবিশ্যি সববাই জানে যে জাক পাঞ্য়ল 
প্রায় গল্পের বইয়েরই চরিত্রের মতো, অন্যমনস্ক অধ্যাপক বলতে যা বোঝায়, উনি তারই 
সশরীর জলজ্যান্ত প্রমাণ-_ 

“বেচারি বললে কী হবে, মেজর ম্যাকন্যাব্সের গলা শোনা গেলো এতক্ষণে, “ওকে 
এখন কলকাতার বদলে আমাদের সঙ্গে পাতাগোনিয়াতেই যেতে হবে-কিছুতেই আর 
ফেরা হবে না।' 

“তবে প্রথম যে-বন্দরে ডানকান নোঙর ফেলবে,» লর্ড গ্লেনারভন সহানুভূতির সুরে 
বললেন, “সেখানেই বেচারিকে নামিয়ে দেয়া যাবে না-হয়।, 

জ্লাক পাঞ্য়লের এই গোড়ায় গলদের শেষরক্ষা কী ক'রে করা যায়, এ নিয়ে 
যখন পরামর্শ করতে সবাই ব্যস্ত, ঠিক তখনই তার বিখ্যাত ছ-নশ্বর ক্যাবিন থেকে কাচুমাচু 
মুখ ক'রে বেরিয়ে এলেন জাক পাঞয়ল, তাকে কেমন-একটু সংকুচিত দেখালো । কোনো 
কথা না.ব'লে তিনি নিরীক্ষণ করলেন বড়ো মাস্তলটা, তাকিয়ে দেখলেন সমুদ্রের 
ফেনোচ্ছল জল, আর দূরের ঝাপসা দিগস্তরেখা। তারপর আস্তে হেটে লর্ড গ্নেনারভনের 
কাছে এসে দীড়ালেন। 

“আপনাদের জাহাজ কোথায় যাচ্ছে? 

“চিলেয়__ দক্ষিণ আমেরিকায়। 

“সর্বনাশ | সে-যে একেবারে উলটো দিকে-, 

“আপনি না-হয় আমাদের সঙ্গে চলুন--* 

'উঁছ, তা হয় না। আমাদের একটা আন্তর্জাতিক অধিবেশন রয়েছে যে 
সামনেই--' 

'তাহ'লে মাদেইরাতে নেমে পড়বেন-তারপর সেখান থেকে ফিরতি কোনো 
জাহাজ ধ'রে ইওরোপেই ফিরে যাবেন না-হয়।! 

'ডানকান তো আর মালপত্র নিয়ে যাচ্ছে না, নৌসেনারও জাহাজ নয়-এ তো 
নিছকই একটা প্রমোদতরী । আপনারা নিশ্চয় নৌবিহারেই বেরিয়েছেন। তাহ'লে আর 
কলকাতা বেড়াতে গেলেই বা ক্ষতি কী? তাছাড়া ব্রিটিশ সাশ্রাজ্যের দ্বিতীয় নগরী 


৩৬ 


কলকাতা, লগুনের পরেই; সেখানে বা তার আশপাশে ঘুরে বেড়িয়ে কতকিছু দেখতেও 
তো পাবেন। সম্পূর্ণ অন্যরকম এক জীবনযাত্রা, একেবারেই আলাদা এক সংস্কৃতি ! 

“আপনি কলকাতা নিয়ে ওকালুতি না-করলেও আমার নিজে থেকেই তো কতকাল 
ধ'রে কলকাতা--শুধু কলকাতা কেন, আস্ত ভারতভূমিই ঘুরে বেড়াবার ইচ্ছে হচ্ছিলো। 
কিন্তু এখন, এই-মুহূর্তে, ডানকানকে নিয়ে বঙ্গোপসাগরে বেড়াতে যাবার লোভ আমাকে 
ংবরণ করতেই হবে। এখন দক্ষিণ আমেরিকা না-শিয়ে আমার কোনোই উপায় 
নেই। 

লর্ড গ্লেনারভন তখন বিস্তারিতভাবে খুলে বললেন কী উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি 
পাতাগোনিয়া যাচ্ছেন। একটুও সবুর করার উপায় নেই, এমনিতেই বড্ড দেরি হ*য়ে 
গেছে, একটা দিনও অন্যকোথাও গিয়ে নষ্ট করা চলবে না। তাছাড়া মেরি আর রবার্টও 
খুব ব্যাকুল হ'য়ে আছে । এই বেচারিদের কথা ভাবলে মনে হয় জলযানের বদলে কোনো 
উড়োযানে ক'রে উড়াল দিতে পারলেই ভালো হ*তো-চট ক'রে পেরিয়ে যাওয়া যেতো 
এই বিপুল জলধি। এককালে হয়তো লোকে কোনো উড়োজাহাজ আবিষ্কার করবে- তখন 
হয়তো দৃর-দুরাস্তেও আরো-অল্প সময়ে চ'লে-যাওয়া যাবে। 

সব কথা খুলে ব'লে লর্ড গ্লেনারভন পাঞয়লকেও তাদের সঙ্গে যেতে আমন্ত্রণ 
জানালেন। “তার চেয়ে আপনিই বরং চলুন না আমাদের সঙ্গে । কলকাতা তো আর পালিয়ে 
যাচ্ছে না- সেখানে পরেও যাওয়া যাবে। তাছাড়া আপনি তো আর দক্ষিণ আমেরিকা 
চক্ষেও দ্যাখেননি--চর্মচক্ষুতে সব দেখে আপনি নতুন মহাদেশ সম্বন্ধে অজন্র নতুন তথ্য 
জানতে পারবেন। 

জাক পাঞয়ল প্রস্তাবটায় মোটেই রাজি হলেন না-তবে লেডি হেলেনার 
দয়ামায়াসহানৃভূতিয় প্রশংসা করলেন সাতকাহন ক'রে, বোতল থেকে উদ্ধার করা 
সাহায্যের জন্যে তিন তলবও দেখলেন, সে-সমন্বন্ধে অবশ্য নতুন-কোনো ব্যাখ্যা দিতে 
পারলেন না। কিন্তু যখন জানলেন যে লেডি হেলেনা বিখ্যাত ভূপর্যটক উইলিয়াম 
টাফনেলের দুহিতা, তখন হৈ-হৈ ক'রে উঠলেন : “তাই নাকি ! বিল টাফনেল তো আমার 
বন্ধুমানুষ ! ইনি তারই মেয়ে ! কী আশ্চর্য, দৈব যে কখন কী করে, তা কেউ বুঝতেও 
পারে না। কে জানতো যে একদিন বিল টাফনেলের মেয়ের সঙ্গে একই জাহাজে ক'রে 
আমি সাগরপাড়ি দেবো ! 


৩৭ 


ছয় 
জাক পাঞয়লের মতিবদল 


আগস্টের তিরিশ তারিখে দেখা গেলো মাদেইরা, উত্তর আ্যাটলাশ্টিকের ক্যানারি 
আইল্যাগুসের উত্তরে, এলোমেলো ছড়িয়ে আছে ছোটো-ছোটো কতগুলো দ্বীপ, 
পোত্ুগালের অধান এই দ্বীপগুলোর রাজধানী ফুনশাল, “তিনশো-দুই বর্গমাইল তার বেড়, 
আর কী দারুণ আঙুর হয়, "ওহ, মাদেইরা ওয়াইন দারুণ খেতে” তবে, “মূল মাদেইরা 
দ্বীপ, যার বেড় দুশো পঁচাশি বর্গমাইল, সেখানে খামকা নোঙর ফেলতে চাচ্ছেন কেন? 
এখানে তে দেখার কিছুই নেই, আগেকার যত ভূগোলবিশারদেরাই তো যা দেখার সবকিছু 
দেখে গিয়েছেন। হ'তো যদি ব্রাজিল, যেখানে পশ্চিমে আমাজোন থেকে বেরিয়েছে 
মাদেইরা, নঈা-পোর্তুগিসরা আশ্চর্য, নতুন-কিছু দেখলেও পুরোনো নামেরই স্মরণ নেয় 
_এই মাদেইরা নদী মামোরে আর বেনির মোহানায় পণ্ড়ে বোলিভিয়ার সীমান্তটাকে 
চিনিয়ে দিচ্ছে, তাহ'লে না-হয় একবার নামা যেতো,-এত-সমস্ত কথা ভূগোলবিশারদ 
জাক পাঞয়লের, জাহাজ থেকে না-নামবার অনেকগুলো ছুতোর মধ্যে একটি । “এখান 
থেকে নিশ্চয়ই আপনারা ক্যানারি আইল্যাণ্ডে যাবেন, এঁ যে-দ্বাীপগুলো আছে 
আটলাস্টিকে, আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিম, রৌদ্রোজ্্ল, চমতকার, সবশুদ্ধু ২৮০৭ 
বর্গমাইল, এখনও এস্পানিয়ারই অধীন, তার রাজধানী লাস্‌ পাল্মাস সান্তা ভ্ুস দে 
তেনেরিফে, সেখানে পাহাড়ের চুড়োয় উঠলে হয়তো অনেককিছু দেখা যাবে। পূর্ব 
ক্যানারির এই লাস্‌ পাল্মাস খুব-একটা ছোটো দ্বীণ নয়, সবশুদ্ধ ১২৭৯ বর্গমাইল 
বেড়, সেখানে অবশ্য ঘৃরে-ঘুরে কিছু দেখা যেতে পারে।' 

এই মর্মে ছেটোখাটো বক্তৃতা শুনে, এবং মাদেইরায় নামতে এই ভৌগোলিকের 
অনিচ্ছা দেখে, লর্ড গ্লেনারভন মৃদু একটু হাসলেনই শুধু, কিছু বললেন না। না-হ'লে 
বলতে পারতেন, মাদেইরার যত খবর আপনি জানেন ততটাই তো আপনি জানেন লাস্‌ 
পাল্মাস্-এর, আর জীনেন ব'লেই যদি খামকা নামতে না-চান মাদেইরায়, তবে সেই 
একই যুক্তিতে লাস্‌ পাল্মাস-এই বা নামবেন কেন? একটা দ্বীপ পোর্তুগালের, আর 
অন্যটা এস্পানিয়ার_-তফাৎ তো শুধু এটাই। এ-ধরনের কোনো প্রসঙ্গ উথাপন ক'রে 
যে কোনো লাভ নেই, এটা বুঝতে পেরেই লর্ড গ্রেনারভন মাথা নেডে সম্মিত মুখে 
জাক পাঞয়লের প্রস্তাবটাই মেনে নিলেন। 

মাদেইরা থেকে ক্যানারি আইল্যাগুসের দূরত্ব আড়াইশো মাইলের মতো। পরের 
দিন অপরাহ্ দুটো নাগাদ ডেক থেকে দূরে, দিগন্তের কাছে, লাস পালিমাস্‌ সান্তা ভ্রুস 


দে তেনেরিফের পাহাড়চুড়ো দেখা গেলো, ঘন-সবুজ ছায়ার মতো। জাক পাঞয়লও 
তখন দীড়িয়েছিলেন ডেকে। তাকে ডেকে নিয়ে চোখে দুরবিন গুজে গিয়ে কাপ্তেন 
ম্যাঙ্গলস জিগেস করলেন, "চিনতে পারছেন-এঁ যে আপনার লাস পাল্মাস্‌-এর পাহাড় 
_তেনেরিফে। পাঞ্ুয়ল যেন দেখেও দেখতে পেলেন না। তিনি আরামকেদারার 
ভূগোলবিশারদ, জানা পৃথিবীটা তার নখের ডগায়, কিন্তু সেটা স্বচক্ষে দেখে বাড়তি কী 
আর উৎসাহ দেখাবেন তিনি। তার চোখমুখে কেমন-একটা ওঁদাসীনোর ভাবই লেপটে 
রইলো। তবে গোল হ*'লো তখন যখন কয়েকঘস্টা পরে খালি চোখেই দেখা গেলে পাহাড, 
ডানকান এখন তার অনেকটাই কাছে গিয়ে পৌছেছে-এমন জলজ্যান্ত দ্বীপটা চাক্ষুষ 
দেখে ফেলবার পরে আর না-দেখবার ভান করা যায় কী ক'রে ? কিন্তু এবার তার মুখচোখ 
তাচ্ছিল্যের ভাবে ভ'রে গেলো । কাণ্তেন ম্যাঙগলসকে তিনি জানালেন, 'ধুর ! এ পাহাড়ে 
উঠে আর কী হবে? ও-পাহাড়ে তো হমবোস্টও উঠেছে, বপ্রাও উঠেছে। এ-পাহাড় 
আর তবে নতুন বা অজানা হলো কী ক'রে? হুমবোল্ট তো ঘুরে-ঘৃূরে পাহাড়ের পাঁচ- 
পাঁচটা আলাদা-আলাদা জায়গায় গিয়েছিলো, পাহাড়ের উঁচু চুড়োটায় উঠে দেখেছে 
এস্পনিয়ার সিকিভাগ, তারপর এমনকী আগ্নেয়গিরির ভেতরে গিয়ে পর্যন্ত জমাট লাভার 
স্তর দখে এসেছে। ওখানে আর নতুন-কী দেখবো আমি। তার চেয়ে বরং কেপ ভেদ 
গিষে ঘুরে দেখা যেতে পারে : পশ্চিম আফ্রিকার এই এই দ্বীপগুলো পোর্তুগালের অধীন, 
রাজধানী প্রাইয়া সাউ তিয়াশ্ডর ওপর ঠিক যেন ছবির মতো বসিয়ে রেখেছে কেউ- 
তাছাড়া সেনেগলের অংশ এটা, আফ্রিকার একেবারে পশ্চিমতম বিন্দু-অন্তরীপটা 
যেভাবে আযটলান্টিকে ঢুকে এসেছে ১৭১৩০তে তাতে মনে হয় গোটা আফ্রিকাই যেন 
পশ্চিমদিকে মুখ বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনারা কেপ ভেদূ-এ থামবেন তো? 

“তা তো থামতেহ হবে” কথার তোড়ে ভেসে যেতে-শেতি কাতগুন মাঙগলস 

“আমি তাহ'লে সেখানেই নেমে যাবো, পাঞয়ল অমনি ঘোষণা ক'রে বসলেন, 
'ফ্রানসের কিছু লোকজন তো থাকবেই ওখানে, ব্যাবসা করতে যারা ওখানে গেছে। অবশা 
লোকে বলে ওখানেও কিছু দেখার নেই, সেনেগল তো ফরাশিদেরই অধীন-_ আরেকটা 
ফ্রানস বানিয়ে দেবার চেষ্টা করেছে আর-কি ওখানে । তবে চোখ থাকলে, খুঁটিয়ে দেখতে 
জানলে, অনেবকিছুই চোখে পড়ে যেতে পারে। অন্তরীপটা সেনেগলের ক'লে 
ফরাশিদের, দ্বীপগুলো সব পোর্তৃণিসদের- পাশাপাশি দেখতে গেলে দুটো দেশের তফাৎ 
ভালো ক'রে ফ্লালুম হ'য়ে যাবে? 

কেপ ভেদ বা কাপ ভার্দ যখন এলো, সেদিন আকাশ ফেটে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। 
কাণ্তেন ম্যাঙ্গলস পরিকল্পনা মতোই নিদিষ্ট সময়ের মধোই এসে পৌছেছেন, দিনটা 
সেপ্টেম্বরের তিন তারিখ। কিন্তু কেউ যেন আকাশ উপুড় ক'রে ঘড়া-ঘড়া জল ঢেলে 


৩৯ 


যাচ্ছে। ডানকান ঠিক সেনেগলের অন্তরীপে এসে ভেড়েনি, ভিড়েছে দ্বীপের রাজধানী 
পোর্তু প্রাইয়াতে। কককটক্রান্তি পেরিয়ে আসার পর থেকেই আকাশ ছিলো মেঘলা, কালো- 
কালো মেঘে ঢাকা পড়ে গিয়েছিলো সূর্য, তারই মধ্যে মরা মিয়োনো আলোতে দূর থেকেই 
দেখা যাচ্ছিলো আগ্নেয়গিরির চুড়াটা- সম্ভবত শ-তিনেক ফুট উচু হবে। 

পোর্তু প্রাইয়াতে ডানকান নোঙর ফেলবামাত্র দেখা গেলো ভূগোলবিশারদ জাক 
পাঞয়ল তার তন্লিতন্না জিনিশপত্র সব গুছিয়ে নিয়ে নামবার জন্যে প্রায় একপায়ে খাড়া, 
কিন্তু তারই মধ্যে বেশ গজর-গজর ক'রে চলেছেন । তার অন্তহীন বিড়বিড় থেকে অচিরেই 
অবশ্য মর্মার্থ উদ্ধার করা গেলো! তার সঙ্গে রয়েছে আনকোরা সব দামি-দামি যন্ত্রপাতি, 
যে-রকম বৃষ্টির ঢল নেমেছে তাতে সব ভিজে-টিজে একেবারে বিকল হ'য়ে যাবে যে। 

কেবল এইই নয়-তার ভ্যাজর-ভ্যাজর এমনকী পোর্তু প্রাইয়ার আদ্যশ্রাদ্ধ করে 
ছাড়লো- অবশ্যই কোনো ভৌগোলিকের দিক থেকে। এ-দেশটায় নাকি উল্লেখ করার 
মতো নদী নেই--“ভেবে দেখুন, পাহাড় আছে, খাতও আছে, জমি ঢাল থেকে গড়িয়ে 
গিয়ে পড়েছে সমুদ্রে, অথচ কোনে নদী নেই ! তাজ্জব !-- তাছাড়া গাছপালা যা আছে 
তা নেহাংই নাকি নামকাওয়ান্তে, বনজঙ্গল নেই-_“অথচ এর নাম কি না কেপ ভে 
_সবুজ অন্তরীপ। এ-রকম বেমানান নাম কখনও শুনেছেন ?:--পাহাড় যা আছে তাও 
তো নিছক বালির টিবি-সাউ তিয়াগুর আগ্নেয়গিরিটাকে সরেজমিন দেখে গিয়েছেন 
মঁসিয় দ্য ভিল--তার বর্ণনা থেকেও মনোরম কোনো তথ্য জানা যায়নি। এরকম একটা 
জনবিবর্জিত দ্বীপে দু-দুটো মাস মানুষ থাকে কী ক'রে-দু-মাসের মধ্যে তো আর দেশে 
ফেরার জাহাজ মিলবে না! 

বিড়বিড় ক'রে এমনি সাতকাহন পেড়ে বসলেন পাঞ্য়ল আর ক্রমশ কেমন যেন 
মনমরা হ'য়ে পড়তে লাগলেন। 

গোড়ায় বেচারি পাঞয়লকে তাতাচ্ছলেন সবাই, এমনকী মেজর ম্যাকন্যাব্স শুদ্ধু : 
নেমে গেলে ক্ষতিই বা কী। ভৌগোলিকদের তো আর পৃথিবীর আশ্চর্য-সব ভূদৃশ্য 
নিয়ে মাথা ঘামালেই চলে না-তাদের তো অতিসাধারণ দেশ-গাঁ দ্বীপ-মহাদ্বীপের বর্ণনা 
তৈরি করতে হয়। কিন্তু এ-সব কথায় চাঙ্গা হ'য়ে ওঠার বদলে পাঞ্য়ল ক্রমেই যেন 
মিইয়ে পড়তে লাগলেন। শেষটায় তার বেচারা-বেচারা মুখটা দেখে লর্ড গ্নেনারভনের 
একটু মায়া হ'লো, বললেন, “হ্যা, বুঝতে পারছি, এখানে আপনার হাত-পা গুটিয়ে 
মিথ্যেমিথ্যি দু-মাস ব'সে-থাকা ছাড়া আর-কিছুই করার থাকবে না। কিন্তু মসিয় পাঁঞয়ল, 
এরপর তো ডানকান গিয়ে সটান চিলেতে থামবে-একেবারে নতুন-এক মহাদেশে 
_অন্য-একটা গোলার্ধে। তা চলুন, আমাদের সঙ্গে না-হয় পাতাগোনিয়াতেই চলুন, 
সেখানকার ইগ্ডয়ানদের চাক্ষুষ দেখে আসবেন, চলুন। তাদের নিয়ে তো কতরকম 
গালগল্প ফেঁদেছে লোকে-কিন্তু সত্যি তারা কী-রকম সেটা একটু নিজের চোখে দেখে 


9০ 


নেয়া কি ঠিক হবে না?, 

কিন্তু আমার যে তিব্বতে যাবার কথা? আমায় তো ইয়ারো-জাংবো-চৌতে গিয়ে 
যেখানে কেউ যায়নি সেখানকার সব হালহদিশ জেনে আসতে হবে! 

“আপনার মনে হচ্ছে নদী নিয়েই কারবার। তিব্বতি নদী না-পান আমেরিকার নদী 
পেয়ে যাবেন। ইয়ারো-জাংবো-চৌ-এর বদলে না-হয় রিও কলোরাদোর উৎস আর 
মোহানাই দেখবেন না-হয়।: 

“তাহ'লে তো গোড়া থেকেই ভারতবর্ষের বদলে পাতাগোনিয়া যাবার পরিকল্পনা 
করলেই হ'তো। ভৌগোলিক সমিতিকে আগে থেকে বলে-ক'য়ে-জানিয়ে এলে 
অভিযানটা একটা সরকারি রূপ পেতো।" তা-না-না-না ক'রে নিমরাজি হবার ভঙ্গিতে 
বললেন ফরাশি ভৌগোলিক। 

লর্ড গ্রেনারভন একটা নামকাওয়াস্তে কৈফিয়ৎ জুগিয়ে দিলেন। “নিশ্চয়ই 
অনেকরকম পরিকল্পনাই ছিলো আপনাদের সমিতির ৷ সে-সব নিয়ে উদ্ধান্ত ছিলেন বলেই 
হয়তো তখন ঠিক খেয়াল হয়নি। তাছাড়া খুব কি আর ঝামেলা হবে ? ভারতবর্ষে গেলেও 
দেখতে পেতেন ইগ্ডিয়ান_এই পাতাগোনিয়াতেও দেখতে পাবেন ইগ্ডয়ান-_ শুধু এরা 
যে আমেরিগ্ডিয়ান সেটা মনে রাখলেই হলো! 

“মসিয় পাঞয়ল, এবার লেডি হেলেনা তাকে উসকে দিলেন, “আর মিথ্যে ভাবছেন 
কেন? এই বর্ষায় এখানে কোথাও যাঁবেনই বা কী ক'রে ? তার চেয়ে আমাদের সঙ্গেই 
চ'লে আসুন। আমরাও না-হয় আপনার ভৌগোলিক অভিযানের সঙ্গী হ'তে পেরে কৃতার্থ 
হবো। আর এ নিয়ে দ্বিরুক্তি করবেন না।” 

“না-না, দ্বিরুক্তি নয়, পাঞয়লের মুখ উদ্ভাসিত, চোখ ইজ জবলজুবলিং, 'ঠিক ওপর- 
পড়া হ'য়ে বলতে পারছিলুম না বলেই আপনাদের দিক থেকে আমন্ত্রণ আসার অপেক্ষা 
করছিলুম।' আর-কোনো ওজর-আপত্তির কথা না-তুলে সরাসরি মনের কথাটাই খুলে 
বললেন ভৌগোলিক : “আপনাদের জাহাজ, আপনারা যদি না-ডাকেন তো৷ সেই জাহাজে 
ক'রে যাই কী ক'রে? 

মেরি হাততালি দিয়ে বলে উঠলো : “বাঃ, এই-তো বেশ হ'লো। আমাদের 
অভিযানে আরো-একজন সঙ্গী বাড়লো।' 

আর রবার্ট তো সোজা গিয়ে তাকে একেবারে জড়িয়ে ধরলো। 

অমনি খুশি হ'য়ে পাঞয়ল ব'লে উঠলেন, রবার্টকে তিনি একেবারে দিগগজ 
ভৌগোলিক বানিয়ে তুলবেন। রবার্ট বেচারা নিজে কী হ'তে চায় সেটা জানবার চেষ্টা 
না-ক'রেই একেকজন তাকে একেকরকম মহদাশয় বানিয়ে দেবার ঘোষণা ক'রে ব'সে 
আছেন। পাঞ্য়ল তাকে ভুগোলবিশারদ বানিয়ে দেবার কথা বলার আগে কাণ্তেন 
ম্াঙ্গল্স বলেছেন, “রবার্ট গ্রাপ্ট হবে কাণ্তেন গ্রাপ্টেরই সুযোগ্য সম্তান_তাকে তিনি 


৪৯» 


বানিয়ে দেবেন ওস্তাদ নাবিক মেজর ম্যাকন্যাবস কোন-এক দুর্লভ মুহূর্তে মুখ ফুটে 
বলেছেন তাকে তিনি বানিয়ে দেবেন দুর্দান্ত ও দুঃসাহসী, অকুতোভয় যোদ্ধা। লর্ড 
গ্লেনারভন বলেছেন তাকে আদবকায়দা শিখিয়ে একেবারে পাক্কা “জেন্টলম্যান' বানিয়ে 
দেবেন। লেডি হেলেনা বলেছেন প্রাণে দয়া-মায়া না-থাকলে অমন মস্ত সর্ববিদ্যাবিশারদ 
হয়েও কোনো লাভ নেই, তিনি দেখবেন সে যাতে দয়াধর্ম শেখে । কেবল মেরি-যে 
আদ্দিন রবার্টের দেখাশুনো ক'রে এসেছে-সে-ই কিছু বলেনি, উলটে সবাই তাকে 
ছাত্রী হিশেবে পাকড়াবার চেষ্টা করেছিলো--ঠিক ববার্টের মতোই আরেকজন, যাকে 
যেমন-খুশি সবাই গ'ডে নিতে পারবে। 

কিন্তু রবার্টকে ভূগোলপপ্ডিত তৈরি করার জনো পাঞয়ল যে ডানকান ছেড়ে না- 
গিয়ে তাদের সঙ্গেই অভিযানে বেরুবেন ব'লে মনস্থির করেছেন, এতে জাহাজশুদ্ধ 
সববাই ভারি খুশি হ'য়ে উঠলো । পাঞয়ল ভারি মজার মানুষ--একে তার অমন ভূলো- 
মন, তায় ভীষণ আরামকাতুরে, তায় নানা বিষয়ে অদ্তুত-অদ্তুত ফোড়ন কাটেন। তিনি 
সঙ্গে থাকলে আর যা-ই হোক এ-অভিযান কখনোই একঘেয়ে বা বিরক্তিকর হ'য়ে উঠবে 
না_ সবসময়েই একটা-না-একটা রসালো প্রহসন সৃষ্টি হবে, কতরকম মজা হবে। 

চারদিন ধ'রে জাহাজে কয়লা বোঝাই হ'লো, রসদ তোলা হলো, শৃনা ভাড়ার ভরাট 
করা হ'লো। বৃষ্টি মাঝে-মাঝে ধ'রে আসে বটে, টিপটিপ, টিপটিপ, কিন্তু কখনোই পুরো 
থেমে থাকে না। এরই মধো মেজর ম্যাকন্যাবস একাই একদিন বর্ষাতি চাপিয়ে পোর্তু 
প্রাইয়ায় নেমে সরেজমিন তদন্ত ক'রে এসেছিলেন সব। জাক পাঞয়ল কিন্তু একবারও 
জাহাজ থেকে নামবারই চেষ্টা করেননি । তিনি বরং ডেকের ওপর পায়চারি করতে-করতে 
কিংবা ডেকচেয়ারে ব'সে আড্ডা দিতে-দিতেই তার ভূগোলবিদ্যার জ্ঞানের বহর জাহির 
করতেন। আর ঝষ্টির সময় তো কথাই নেই-তার এ বিখ্যাত ছ-নম্বর ক্যাবিন থেকে 
তিনি একপাও বেরুতেন না। 

ডানকান বখন তার কয়লা আর রসদ নিয়ে ফের তার অভিযানে রওনা হ'য়ে 
পড়লো, আর সেপ্টেম্বরের সাত তারিখে পেরিয়ে এলো বিষুবরেখা, সেদিন থেকে জাক 
পাঞয়ল তার ভৌগোলিক জ্ঞানের পরিধি প্রকাশ করবার জন্যে আরো-একটি নতুন বিষয় 
পেলেন। যখন-তখন খাবারটেবিলেই তিনি মস্ত-একটা মানচিত্র বিছিয়ে দিয়ে কাকে বলে 
নিরক্ষরেখা, কাকে বলে অমুক ডিগ্রি দেশান্তর আর তমুক ডিগ্রি অক্ষরেখা, কখন কার 
কত ডিগ্রি পেরুলে সময়ের তফাৎ হ'য়ে যায় চার মিনিট--এ-সব বিষয় সোৎসাহে হাত- 
পীঁ নেড়ে বোঝাতে লাগলেন। স্টুয়ার্ড অলবিনেট বেচারির হ'লো বিমম ঝামেলা-সে 
বাটি-রেকাবি-কাটা-চামচে-ন্যাপকিন-গেলাশ যে কোথায় সাজাবে তা বুঝতে না-পেরে, 
তার খাবারটেবিলটা এভাবে জবরদখল হ'য়ে যেতে দেখে, পণ্ডিতপ্রবরের সঙ্গে বেজায় 
খিটিমিটি লাগিয়ে দিতো । অনাদের কাছে কিন্তু জাক পাঞয়লের ভুগোলের ক্লাস মজাই 


৪৭ 


লাগতো। আর কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্সও খুশি ছিলেন যে এইসব প্রহসনের মধ্যে যদি মেরি 
মজা খুঁজে পায়, তাহ'লে অন্তত সেই সময়টুকু সে কাণ্তেন গ্রান্টের কথা ভুলে থাকবে। 
তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো কাণ্তেন গ্রান্টকে শিগগিরই খুঁজে-পাওয়া যাবে, তাদের এই 
অভিযান সফল হবে। শুধু মেজর ম্যাক্ন্যাব্স এই আরামকেদারার বাহাদুরি আর অবিশ্রাম 
বকর-বকর শুনতে চাইতেন না।--তিনি নিজে বৃষ্টির মধ্যে গিয়ে পোর্তু প্রাইয়া ঘুরে 
এসেছেন, কোনো পণ্ডিতি বক্তৃতা দেননি, আর ভূগোলবিশারদ কিনা সর্বক্ষণ মুখে খে 
ফুটিয়ে চলেছেন, অথচ কোনোকিছু গিয়ে স্বচক্ষে দেখে আসবার বেলায় তার যত-সব 
ওজর-আপত্তি শুরু হ'য়ে যায়। 

একটু বোধকরি বিরক্তই হ'য়ে উঠছিলেন মেজর ম্যাকন্যাবস, বিশেষত খাবার 
সময়ে ভূগোলের ক্লাসে তার প্রবল অনীহাই ছিলো, কিন্তু হঠাৎ একদিন অবস্থাটা বেশ- 
খানিকটা বদলেই গেলো। জাহাজের লাইব্রেরিঘরে জাক পাঞয়ল আবিষ্কার ক'রে বসলেন 
একবাক্স বই, এস্পানিওলে লেখা-_ নতুন মহাদেশে যাচ্ছেন, দক্ষিণ গোলার্ধে, সেখানে 
রাজিল বা ওলন্দাজ ইপ্ডিস বা ব্রিটিশ গিয়ানার মতো দু-চারটে জায়গা ছাড়া সর্বত্রই তো 
এস্পানিওলের চল--বিভিন্ন ইণ্ডিয়ান গোষ্ঠীর অবশ্য যার-যার নিজের ভাষা আছে । ভাষাটা 
জানলে চিলেতে নেমে ভারি কাজে লেগে যাবে। আদানুন খেয়ে পাঞয়ল ভাষাটাকে 
কক্জা করার জন্যে উঠে পড়ে লাগলেন। বই ঘেটে-ঘেটে নানারকম শব্দ বার করেন, 
ধাতুরূপ মুখস্থ করেন, ডেকের ওপর দাড়িয়ে হাওয়ার উদ্দেশে ছড়িয়ে দেন এস্পনিওল 
বাণী। এমনকী, অন্যদের সঙ্গে কথা বলবার সময় যখন-তখন ব্যবহার করেন এস্পানিওল, 
আর পরক্ষণেই বলেন, থুড়ি, ভুল হ'য়ে গেছে, তোমরা তো কথাটার মানে জানো না, 
কথাটা ফরাশিতে হ'লো এই, আর ইংরেজিতে হলো এ। আর এটা সবচেয়ে বেশি হ'তো 
যখন তিনি রবার্টকে পাকড়ে তাকে আমেরিকার কাহিনী শোনাতে লাগলেন। 

ক্রিস্তোফোরো কোলোম্বো, ক্রিস্তোবাল কোলোন বা ত্রিস্টফার কলম্বাস-যে-নামেই 
ডাকো না কেন, ক্রিস্তোবাল কোলোন মরবার আগে জেনেই যেতে পারলেন না ইওরোপ 
থেকে নতুন-একটা মহাদেশে যাবার রাস্তা তিনি আবিষ্কার করেছেন, ভারতবর্ষের ধারে- 
কাছেও ঘেসেননি। সেই প্রথম অভিযানে ১৪৯২তে গিয়েছিলেন কুবায়, আর শেষ 
অর্থাৎ চতুর্থ অভিযানে ১৫০৮ খ্িষ্টাব্দে গিয়েছিলেন বারবেডোসে- প্রত্যেকবারই বেচারি 
ভেবেছিলেন ভারতবর্ষে এসে পা দিয়েছেন, ফলে এখানকার লোকেরা হ'য়ে গেলো 
ইগ্ডিয়ান, বারবেডোস হ'য়ে গেলো পশ্চিম-ইনডিস-ইগ্ডিয়া কথাটার চল ষোড়শ শতাব্দীর 
আগে হয়নি-আর তাও ভাশ্কু ডা গামা ১৪৯৮তে কোড়িকোডে পা দেবার পর সেই | 
রাস্তায় যখন পোর্তুগিস আর ওলন্দাজ বোম্বেটেদের লুঠতরাজ দারুণ বেডে গেলো, তারই 
পর- পোর্তুণিস বোম্বেটেরা আবার আর্মাদ! থেকে বদলে গেলো হার্মাদ-এ, নৌসেনা থেকে 
জলদস্যুতে। ক্রিস্রেবাল কোলোন যে-গগুগোলটা পাকিয়ে গিয়েছিলেন সে শুধু ভূগোলটা 
ঠিকঠাক জানতেন না বলেই-;: 


৪৩ 


“আমেরিকা মহাদেশের কথা ইওরোপের কেউই জানতো না-তারা জানতো 
ভূমধ্যসাগর, তারপর আফ্রিকা-তাও মরোকো-টরোকো-ভারতবর্ষের রাস্তাও জানা ছিলো 
না তাদের, যদিও আরবদের মারফৎ পেতো মশলিন, মশলা, চিনি আর আরোনানারকম 
শৌখিন জিনিশ। তো ক্রিস্টফার কলম্বাসই বা কী ক'রে বুঝবেন জলের মধ্যে আস্ত একটা 
অজ্ঞাত মহাদেশই পস্ড়ে আছে, উত্তর-দক্ষিণ দুই গোলার্ধ জুড়ে ?' রবার্ট একবার 
কলম্বাসের ভূগোলবিদ্যায় অজ্ঞতার কারণটা বাৎলাবার চেষ্টা করেছিলো। 

“সে-কথাই তো বলছি, এই কখেোপকথনের মধ্যে অন্য শ্রোতারাও যথারীতি জুটে 
গিয়েছিলেন, তারা শুনতে পেলেন পাঞয়লের সারগর্ভ বয়ান : “ক্রিস্তোবাল কোলোন 
তো না-জেনেই মরলেন যে তিনি একটা নতুন মহাদেশে যাবার রাস্তা বার ক'রে 
ফেলেছেন। বেরিয়ে ছিলেন এশিয়া-বিশেষ ক'রে ভারতে যাবার সোজা রাস্তাটা খুঁজে 
বার করতে । ফলে মধ্যআমেরিকায় এসে ভেবেছিলেন এসে পৌছেছেন ক্যাথে অর্থাৎ 
চিনদেশে, কিংবা নিপ্লন দেশে, জাপোনে। শুধু ভূগোল না-জানবার ফল--কারণ ভূগোল 
তো আর কতগুলো নদীপাহাড় নয়, দেশ-বিদেশের মানুষজনেরও কাহিনী । চিন-জাপান 
সম্বন্ধে একফৌটা জ্ঞান থাকলে এ-গগুগোল তার হতো না। তার চেয়ে ঢের সড়গড় 
ছিলেন আমেরিগো ভেস্পুচ্চি-ফলে তার নাম থেকেই নতুন মহাদেশের নাম হ'য়ে 
গেলো আমেরিকা । ফেমন মাগেলানের নাম থেকে হ'লো মাগেলান প্রণালী, মাগেলান 
অন্তরীপ--ইত্যাদি। 

ডানকান তখন মাগেলান প্রণালীতে ঢুকেছিলো বলেই এ-নামটা করেছিলেন 
পাঞয়ল। এবং সদলবলে ডেকে দাড়িয়ে অন্তরীপের কাছে এসে তিনি চর্মচক্ষে 
পাতাগোনিয়ার ইগ্ডয়ানদের দেখবার চেষ্টা করলেন- কিন্তু, উহু, কাউকেই দেখা গেলো 
না। তার কৌতূহলের কারণ ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করলেন তিনি। “একেকজন অভিযাত্রী 
একেকরকম বর্ণনা দিয়েছেন ইগ্ডিয়ানদের। কেউ বলেছেন এরা সব এগারো ফুট ল্‌শ্বা 
দৈত্য, কেউ-বা বলেছেন, উহ-উহ-এরা সব তিন ফুট লম্বা হয়, সবাই বামন, কেউ- 
কেউ আবার বলেছেন, তা পাচ-ছ ফুট হবে ব'লেই মনে হ'লো। জনাথান সুইফট যে 
লিলিপুট বা ব্রবডিউনাওদের কথা বলেছেন, এরা তার কেউই নয়। তবে ডীন সুইফট 
বোধহয় এ-সব অভিযাত্রীদের গুলগল্প কিংবদন্তি শুনেই একটা দ্বীপে ফেলেছেন খুদে 
মানুষ লিলিপুশনদের আর অন্য দ্বীপে ফেদেছেন ব্রবডিঙনাঙি দৈত্যদের আস্তানা ।' 

“হ্যা, তা তো বুঝলুম, সরাসরি মোক্ষম জায়গাতেই প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করলেন লর্ড 
গ্লেনারভন, “কিন্তু আসল উচ্চতাটা তবে কী? 

“ব'সে থাকলে উচ্চতা একরকম, দাড়ালে আরেকরকম,' অমনি চ্যাটাং ক'রে এলো 
জবাব- ফোড়ন কাটার মতো--রবার্টের কাছ থেকে। 

“তা ঠিকই বলেছে, রবাট, পাঞয়ল বললেন, “ওদের ধড়টা লম্বা, পা জোড়া খাটো। 
তবে যারা এদের নিয়ে পণ্ডিতি কেতাব লিখেছেন তারা কিন্তু বলেননি মাপজোক নেবার 
সময় এরা বসে ছিলো, না দীড়িয়েছিলো।, 


8৪8 


সাত 
ডানকান-এর যাত্রীরা পদকব্রজে 


ক্লাইড ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর ঠিক বিয়াল্লিশ দিন যখন কেটে গিয়েছে ডানকান গিয়ে 
ঢুকলো তালকাউয়ানো উপসাগরে; এ নামেই নগর-বন্দর, চিলের দক্ষিণমধ্যে তার 
অবস্থান, কনসেপসিওনের উত্তর-পশ্চিমে। তালকা নামে যেহেতু চিলের ঠিক মাঝখানে 
স[ন্তিয়াগোর দক্ষিণে আরো-একটা নগর আছে, তাই এই তালকাকে আলাদা ক'রে 
বোঝাবার জন্যে নাম দেয়া হয়েছে তালকাউয়ানেো। বলাই বাহুল্য, জাক পাঞয়লের একটা 
ছোটোখাটো উচ্ছসিত বক্ীতার পবই এই সম্যক জ্ঞান লাভ হ'লো অন্যদের। আর তার 
বাঞ্সিতা এমনই চুলবুল-করানো ছিলো যে তক্ষুনি লর্ড গ্লেনারভনও জাক পাঞয়লের 
সঙ্গে সরাসরি ডাঙায় এসে নামলেন। বন্দরের রমরমার জন্যেই শহরটায় গিশগিশে ভিড়। 
পাঞয়ল ভেবেছিলেন, সদ্য-রপ্ত-করা এস্পানিওল ভাষার প্রয়োগনৈপুণ্যে তিনি চট 
ক'রেই লর্ড গ্লেনারভনকে তাজ্জব ক'রে দেবেন, তার প্রতিভা দেখে সবাই নিশ্চয়ই দারুণ 
চমকৃত হ'য়ে যাবেন। কিন্তু ফরাশি টানে এস্পানিওল বলার ফল অবশ্য তার ঠিক 
মনঃপৃত হ'লো না--কোনো হতভাগা চিলেনো তার কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারলে না। 
একের পর এক লোককে ডেকে তড়বড় ক'রে কথা বলছেন পাঞয়ল, তোড়ে ছুটিয়ে 
দিয়েছেন এস্পানিওল ভাষার তুবড়ি, আর তারা গোড়ায় ধন্দে প'ড়ে গিয়েছে, পরে 
হতভম্ব, এবং কারু-কারু কাছ থেকে জুটেছে কিঞ্চিৎ ভ্কুটিও। শেষটায় নিজেই পাঞয়ল 
ব্যাখ্যা করলেন তার কথা অন্যদের কাছে এমন দুর্বোধ্য-না, না, অবোধ্য-ঠেকার কারণ। 
“আসলে আমার জিভেরই আড় ভাঙেনি--নিশ্চয়ই উচ্চারণে গোল পাকিয়ে শিয়েছে। 

তার ভাষাশিক্ষার এহেন পরিণতি দেখে গ্লেনারভন একটু মুচকি হাসলেন শুধু। 
বললেন : 'চলুন। শুষ্ক দফতরের আপিশটায় গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাক। 

শুন্ধ দফতরের আপিশে গিয়ে অবশ্য তেমন লাভ হ'লো না, শুধু এ-তথাটা জানা 
গেলো যে ইংরেজ কনসাল থাকেন কনসেপসিওনে- অর্থাৎ চিলের দক্ষিণমধ্যের সেই 
তুলনায়-বড়ো শহরটায়। 

“এখান থেকে কদ্দুর ?' 

“তা, তেজি ঘোড়া পেলে ঘণ্টাখানেকে গৌছে যাবেনা 

ঘোড়া জোগাড় করা হ'লো প্রায় তক্ষুনি--কড়ি ফেললে কীই-বা না-মেলে, আর 
দুজনে ঘোড়ায় চেপে তন্ষুনি জোরকদমে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন। 

কিন্তু যতই প্রত্যাশা বা উত্তেজনা থাক, ইংরেজ কনসাল সব শুনে-টুনে তাদের 


৪৫ 


সব প্রত্যাশায় ঠাগ্ডাজল ঢেলে দিলেন। কাণ্তেন গ্রান্টের ব্রিটানিয়া জাহাজ, তার হালহদিশ, 
তার সলিলসমাধি--কিছুই তার জানা নেই। লর্ড গ্নেনারভনদের কাজে লাগতে পারলে 
তিনি ধন্য হতেন, কৃতার্থ হতেন, কিন্তু... 

অতএব, পুনরায়, তালকাউয়ানায় প্রত্যাবর্তন দুজনের। অথচ এখানে হাত গুটিয়ে 
ব'সে-থাকাও তো চলে না। সুতরাং চর পাঠানো হ'লো উপকূল ধ'রে দুরে-দূরে, রাহাখরচ 
বাদেও প্রলোভন রইলো কেউ কোনো খবর আন্মত পারলেই ইনাম মিলবে, কিস্তু কোনো 
খবরই মিললো না। 

এ-সব বরতে-করতেই প্রায় হপ্তা কাবার। ছ-দিন বাদেও ফোনো খবর নেই। 
এদিন মেরি আর রবার্ট আশায়-আশায় বুক বেধে ছিলো, এবার তারা হাল ছেড়ে দিয়ে 
একেবারে ভেঙে পড়লো। 

অভএধ এ রহুসাময় চিরকূটগুলো নিয়ে আবারও খুঁটিয়ে দেখতে বসে গেলেন 
ঘ্সিয় পাঞয়ল। শদগুলোর ঘর্মোঙ্ধার বয়তে কোনো ভূল হয়নি তো? এবং ভয়তন্ন 
বয়ে সবগুলো চিরকুট খতিয়ে দেখে তড়াক ক'রে প্রায় লাফ দিয়েই উঠলেন ভ্বাীক 
পাঞয়ল। 

£ছ্ছম | যা তেবেছি তা-ই! গোড়াভেই গলদ, তে। শেষরক্ষা হবে হী ক'রে? 

ভার ভাবভঙ্গি দেখে সবাই ধাছে ঘেসে এলেন। 

'ী ব্যাপায় ? গোড়ায় আবার গলদ কোথায়? 

“কয়েকটা শব্দের ভুল ম্লানে করা হয়েছে দেখছি! জাক পাঞয়লের টোখ ভ্লভল 
করছে, উদ্ভাসিত বদন বিগলিত । “বন্দী হবো-এমন-কোনো কথা তো লেখেননি কাণ্তেন 
গ্রান্ট-সম্ভবত লিখতে চেয়েছিলেন বন্দী হয়েছি। সাহায্য চেয়ে এই চিরকুট যখন 
লিখেছিলেন, তার আগেই নিশ্চয়ই ইণ্ডিয়ানদের হাতে ধরা পড়ে গিয়েছেন।' 

“তা কী ক'রে হয়?” লর্ড গ্লেনারভন তার যুক্তি উপস্থাপিত করলেন। 'বোতলটা 
তো জলে ফেলা হয়েছিলো-আর সে নিশ্চয়ই এ জাহাজডুবির সময়তেই। না-হ'লে 
বন্দীশিবির থেকে দিব্ব সকলের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে এসে সমুদ্রের জলে ফেলবেন 
কী ক'রে বোতলটা?, 

“হয়তো পথে কোনো নদী পড়েছিলো, তার জলেই ফেলেছেন। পরে ভেসে এসেছে 
সমুদ্রে। র 

“তা অবশ্য হ'তে পারে। এ-সম্ভাবনাটা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তা, না- 
হয় ধ'রেই নিলুম, ক্রিয়াপদের ভূত-ভবিষাৎ সমস্ত আমরা গুলিয়ে ফেলেছি । কিন্তু তাতে 
কী দাড়ালো? আমাদের আপনি কী করতে বলেন ?, 

“সীইত্রিশ ডিগ্রি সমান্তরাল রেখা যেখানে আমেরিকার উপকৃল ছুঁয়েছে, সেখান থেকে 
রওনা হ'য়ে & রেখা বরাবর সোজা আটলান্টিক অব্দি যাই, চলুন। আমরা যদি আন্ত 


৪৬ 


সমান্তরাল রেখাটার বুড়ি ছুয়ে-ছুয়ে যাই, তাহ'লে কোথাও-না-কোথাও জাহাজডুবির 
লোকজনদের কারু-না-কার হদিশ মিলে যাবে। 

মেজর ম্যাকন্যাবসের এ-সব বুনো-হাসের-পেছন-ছোটায় কোনো আস্থা নেই। তিনি 
শুধু ফোড়ন কাটলেন : 'অতীব-ক্ষীণ সম্ভাবনা-এবং অমূলক ।' 

“এটা ভুলে যাবেন না, মেজর, যে এটাই একমাত্র সন্তাবনা। আপনি নিশ্চয়ই চান 
ন| এক্ষুনি সবাই মিলে হাল ছেড়ে দিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাই শুড়গুড় ক'রে। 
রিও কলোরাদো কিংবা রিও নেগ্রো নদীর অগুনতি শাখা বেরিয়ে গেছে মহাদেশের 
ভেতরে-তার কোনোটার ধারে কোনো আমেরিকান ইত্ডিয়ানদের দল তাদের বন্দী 
বয়েছে। হদিশ পেলে, সুযোগ-সুবিধে কায়ে নিয়ে, আমন্নাই উদ্ধার করতে পারবো 
তাদের। তা ঘদি সম্ভব না-ছয়, ভবে পূর্ব-উপবূলে ডানকান জাছাডের ধাছে গোছে 
ফৌজোর লোকজন ডাকবো-.আর তখন আপনি স্বয়ং মেজর ম্যাকন্যাবস, আপনিই 
অভিমানের নেড়ত দিতে পারবেন" 

প্রকানটা মোটেই হাস্যকর নয়। আর অভিযানের নেতৃত্ব পাবার সম্ভাবনাটা দেখে 
মের ম্যাকনাবসও তার সামরিক গৌঁফে এববার তা দিয়ে মিলসেন। 

ক্বাপ্তেন ঘাজিলস তক্ষুনি টেবিলে মানচিত্র বিছিয়ে নিঙগেন। ডানকানকে কোথায় 
জপেক্ষা করতে ধলা হবে, সেটাও ঠিক ক'রে নেয়! ভাক্ারি। সব খুটিয়ে দেখে নিয়ে 
ভিনি প্রস্তাব ধারলেন : 'আমাদের জীঙাজ তাহ'লে কোরিয়েস্তেস তান্তরীপ আার সান 
আস্তোনিওর মাঝে নোঙর ফেলে অপেক্ষা করা । 

“তা-ই ভালো । 

এই নূতন মহাদেশের মাঝখান দিয়ে কে-কে যাবে কাণ্ডেন গ্রান্টের খোজে, 
অজ্ঞাতের সন্ধানে, অজানার উজানে, তা আলোচনা ক'রে ঠিক করা হ'লো। কাণ্তেন 
ম্যাঙ্গল্স-এর তো ডাঙার অভিযানে যাবার প্রশ্নই ওঠে না-তিনি যদি জাহাজে না-থাকেন, 
তবে ডানকান জাহাজকে সাগরপাড়ি দেবার সময় সামলাবে কে? আর লেডি হেলেনা 
বা মেরিরও গিয়ে কাজ নেই, পথে মেয়েদের নিয়ে বেরুলে এই বিদেশ-বিভুয়ে অনেক 
ঝামেলাঝক্কি দেখা দিতে পারে । ইচ্ছে ছিলো, রবার্টকেও বাচ্চা ব'লে অজুহাত দিয়ে ডাঙার 
অভিযান থেকে নিবৃত্ত করা হয়, কিন্তু সে নাছোড়বান্দা, কারু কোনো ওজর-আপত্তি 
শুনলে তো? শেষটায় ঠিক হলো জাহাজের তিনজন খালাশিকে নিয়ে স্থলপথে যাবেন 
নর্ড গ্রেনারভন, সঙ্গে থাকবেন মেজর ম্যাকন্যাব্স, জাক পাঞয়ল আর রবার্ট তো 
আগেভাগেই ডাঙায় গিয়ে নেমে একপায়ে খাড়া। 

অক্টোবরের চোদ্দ তারিখে এই সাতজনে বেরিয়ে পড়লো অভিযানে-সঙ্গে পথ 
দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে নিয়োগ করা হয়েছে তিনজন ডাকাবুকো হস্টাকটী শক্তপোক্ত 
লোক. আর তাদের সঙ্গেও আছে আরেকটি ছোটোছেলে। গাইডদের সর্দার কিন্তু সত্যি- 


৪৭ 


বলতে স্থানীয় লোক নয়, সে একজন ভাগ্যান্বেধী ইংরেজ, কবে কোনকালে--সে প্রায় 
বিশ বছর হ'লো-কোর্তেসদের মতো লাতিন আমেরিকায় পা দিয়েছিলো সোনারুপো 
হিরেজহরতের লোভে, কিন্তু লুঠতরাজ যা-যা করার আগেই তা সাঙ্গ ক'রে নিয়েছিলো 
কোন্কিস্তাদোরেরা, ফলে আখেরে তার তেমন সুবিধে হয়নি। স্থানীয় লোকদের সঙ্গে 
এতগুলো বছর একটানা কাটিয়ে দেবার পর সে ইংরেজি ভাষা প্রায় ভুলতেই বসেছে, 
এমনকী তার নামটা শুদ্ধ এখন এস্পানিওল হ'য়ে গিয়েছে, লোকে তাকে ডাকে কাতাপাস 
ব'লে। যে-শৈলশিরাকে এখানকার লোকে বলে কোদিইয়েরা, সেই গিরিসংকট পেরিয়ে 
আর্হেনতিনার সীমান্তে গিয়ে পাম্পার কোনো গাইডের হাতে পৌছে দেয়াই এখন তার 
জীবিকা। কতগুলো খচ্চরের পিঠে মালপত্রের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে রওনা হ*'লো সবাই। 
এই পাহাড়ি খচ্চরগুলো-গাধা আর ঘোড়ার মিশোল--দারুণ শক্ত, পাহাড়ি চড়াই-উৎরাই 
ভাঙতে তাদের মতো জীব আর দ্বিতীয় যেন নেই। বাহন হিশেবে তারা চমতকার, দিনে 
জল মোটে একবার খেলেই চলে, আটঘণ্টায় পেরিয়ে আসে মাইল তিরিশ এবড়োখেবড়ো 
উচুনিচু পাহাড়িপথ। 

এক সমুদ্রতীর থেকে আরেক সমুদ্রতীর যেতে হবে-এই বিস্তীর্ণ দুস্তর পথে 
কাতাপাস্-এর অভিজ্ঞতা জানিয়েছে সরাই-টরাই পথে খুব-একটা পড়বে না। খেতে হচ্ছে 
জারানো শুখামাংস, মকাই, অথবা ভাত । ক্লান্ত শরীরকে চাঙ্গা ক'রে নেবার জন্যে জলের 
সঙ্গে সবাই মিশিয়ে নিচ্ছে একটু ক'রে রাম- এখানকার আখের রস নিংড়ে তৈরি-করা। 

পাঁঞয়ল পণ ক'রে বসেছেন তিনি এস্পানিওল ছাড়ী আর-কোনো ভাষাতেই কথা 
বলবেন না-ফরাশিও না, ইংরেজিও না। কিন্তু তার চমক প্রদ উচ্চারণে এস্পানিওল ভাষার 
যে-সংস্করণ ফুটে বেরোয়, অন্য-কেউ তা খুব-একটা বোঝে না ব'লেই, প্রায় বাধ্য হ'য়ে, 
নিজের সঙ্গেই সারাক্ষণ একটা দ্বৈতালাপ চালিয়ে যেতে হচ্ছে; অর্থাৎ, নিজেই প্রশ্ন 
করছেন, এবং নিজেই মুখ থেকে খসিয়ে ফেলছেন উত্তর। তার ওপর কাতাপাস মানুষটা 
কথা কম বলে, কাজ করে বেশি। পাঞয়লের তুবড়ির মতো প্রশ্নগুলোর উত্তরে সে 
হ-হা ছাড়া কিছুই বলে না। খচ্চরগুলোর তদারকি করছে তার দুই অনুচর : বাহনদের 
তাড়া লাগাবার জন্যে কখনও তারা দুর্বোধ্য কিছু আওয়াজ করে, গলা ছেড়ে ট্যাচায়, 
কখনও হাতের পাচন দিয়ে খোঁচায়, কখনও-বা টিল ছোড়ে 

তিনদিন একটানা চলার পর দূরে নীলপাহাড় দেখা গেলো। রাস্তা ক্রমেই দুর্গম ও 
বন্ধুর হ'য়ে উঠছে, মাঝে-মাঝেই পথে পড়ছে পাহাড়ি জলধারা, নদী না-ব'লে 
অনেকগুলোকে পাহাড়ি সৌতা বলাই ভালো। এদের বেশির ভাগেরই নাম এ-যাবৎ 
কোনো মানচিত্রে ওঠেনি, ফলে জাক পাঞয়ল নতুন-নতুন নদী আবিষ্কার করার নেশায় 
মেতে উঠেছেন, টুকে নিচ্ছেন তার খাতায়, মানচিত্রের খশড়া তৈরি করছেন, লিখে 
রাখছেন পাশে মানচিত্রের এক ইঞ্চি সমান অত মাইল । যে-নদীগুলোর কথা তিনি আগেই 


৪৮ 


বইতে পড়েছেন, সেগুলো দেখে আর-কেউ বলার আগে, সোৎসাহে নিজেই চেচিয়ে 
ব'লে দিচ্ছেন নামগুলো। তাদের যাবার পথ কাটাকুটি ক'রে আড়াআঁড় গেছে মন্ত-একটা 
পথ, রীতিমতো রাস্তাই বানানো হয়েছে যেন, দেখেই তিনি উৎফুল্ল কণ্ঠে ব'লে উঠলেন : 
“আরে, এ-যে দেখছি লস আনহেলেসে যাবার রাস্তাটা । 

“সতা নাকি? কাতাপাসকে জিগেস ক'রে যাচাই ক'রে নিতে চেয়েছিলেন লর্ড 
গ্রেনারভন। 

“হ্যা” তার অভ্যাসমাফিক ছোট্ট উত্তরটা দিয়েই কাতাপাস্‌ কিন্ত্ত মুখে কুলুপ এটে 
ব'সে থাকেনি, বরং উলটে জাক পাঞয়লের দিকে ঘুরে জানতে চেয়েছে : 'এদিকটায় 
এর আগে কখনও এসেছিলেন বুঝি? 

“হ্যা, ভারিক্ধিচালে জবাব দিয়েছেন পাঞয়ল। 

“দলবল নিয়ে, খচ্চরের পিঠে চণ্ড়ে?, 

“না। একাই। চেয়ারে ব'সে থেকেই : 

কাতাপাস্‌ এমন উত্তর শুনে একটু তাজ্জব হয়েই পাঞয়লের মুখের পানে 
তাকিয়েছে, ফ্যালফ্যাল ক'রেই তাকিয়েছে। কথাটার মানে তার মাথায় ঢোকেনি। সে- 
বেচারি কী ক'রে বুঝবে যে কোনো পড়ার ঘরে ব'সে-ব'সে বইয়ের পাতা উলটে যাওয়াও 
যে কারু-কারু পক্ষে সত্যির চেয়েও বেশি, আরো-সত্যি, ভৌগোলিক অভিযান। 

অবশ্য কথাটা তলিয়ে বোঝবার জন্যে কাতাপাস্‌ খুব-একটা চেষ্টাও করেনি তখন। 
কেননা সত্যিকার দুর্গম পথের যাত্রা তো শুরু হ'লো এই এখন। চলাটা আর আগের 
মতো সহজ নেই, বেশ কষ্টকর। এ-সব পথে যাদের চলাফেরা ক'রে অভ্যাস নেই 
তাদের কাছে বীতিমতো কঠিনই ঠেকবে। আর তার নীট ফল হবে এই যে চলার গতি 
ক'মে যাবে অনেকটাই। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে চড়াই ভেঙে-ওঠা আদপেই সহজ কাজ 
নয়। প্রথম-প্রথম আবার পা ফসকে প"ড়ে যাবার সম্ভাবনাও থাকে-আর কত-যে হোঁচট 
খেতে হয় তার তো কোনো লেখাজোখা মেই। আন্দেয়াস-এর শিরিপথ পেরুবার জন্যে 
শেষ অব্দি অনেক ভেবে কাতাপাস্‌ ঠিক করেছে আন্তুকো গিরিসংকট দিয়েই যাবে 
-তার কারণ সেটা পড়েছে নাকবরাবর, আর কে না জানে যে কোনো সিধে সরলয়েখাই 
হলো হুস্বতম পথ, কিন্তু মুশকিল হচ্ছে একটাই-এবং সেটা বেশ বড়োগোছেরই 
মুশকিল। এই বিষম পথ ধ'রে খচ্চররা যায় না, আর এতটাই দুর্গম যে সিধে পথে শিয়ে 
সময় বাঁচাবার ফন্দিটাও হয়তো ভেস্তে যাবে। সেইজন্যেই গোড়ায় কাতাপাস্‌ এ-পথ? 
দিয়ে যেতে চায়নি। কিন্ত্ত পাঞয়লের ভৌগোলিক জ্ঞানে সবাই নেচে উঠেছে । এটাই 
যদি শর্টকার্ট হয়, যদি কম পথ পেরুতে হয়, তবে এই পথেই যেতে হবে। সকলের 
একগুয়েমি দেখে কাতাপাস্কে শেষটায় এ-পথ দিয়ে যাবার প্রস্তাবেই রাজি হ'তে 
হয়েছে। ভেবেছে, নিজেরা খচ্চরের পিঠের বোঝা ভাগাভাগি ক'রে নিয়ে একটু হালকা 


ইন সার্চ : ৪ দি 


ক'রে নিলে বুঝি এই সরু পথটা দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে চ'লে যেতে পারবে; অনেকটা সেভাবে 
চলেছেও তারা, কিন্তু শেষটায় এমন-একটা জায়গায় এসে পড়েছে যে খচ্চররা সে-রাস্ত 
পেরিয়ে যেতেই পারবে না, আর জীবজন্তুরা সহজেই টের পেয়ে যায়, কী ক'রে যেন 
তারা বুঝে ফেলেছে এ-পথ দিয়ে যেতে গেলেই তারা পাহাড়ের ঢাল দিয়ে গড়িয়ে নিচে 
প'ড়ে যাবে। তারাও জেদ ধরে দাড়িয়ে পড়েছে, একপাও যাবে না আর। একটা কারণও 
অবশ্য আছে : দক্ষিণ গোলার্ধের সবই তো উত্তর গোলার্ধের চাইতে একেবারেই উলটো। 
এখনই এখানে বসন্ত--পাহাড়ের গায়ের জমানো তুষার এখনই মাঝে-মাঝে গ'লে যেতে 
থাকে -আর পাহাড় থেকে ধস নামে । মাটি নরম হ'য়ে যায়, আলগা হয়ে যায়, খসে 
পড়ে। সেইজন্যেই কাতাপাস্‌ এতটা অনিচ্ছুক। এবার আর কাতাপাস্‌ কোনো অনুরোধ 
উপরোধ শোনেনি । তার খচ্চরগুলো আর স্যাঙাৎদের নিয়ে সেখান থেকেই সেলাম ঠুকে 
বিদায় নিয়েছে। যাবার আগে সে বলেছে, সবাই যদি তিনদিনের পথ পেছিয়ে যায়, 
তবে একটা ঘোরাপথ দিয়ে সে তাদের নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু লর্ড গ্রেনারভনরা রাজি 
হননি : এতটা এসে আর পেছিয়ে যাবার কোনো মানে হয় না। অগত্যা কাতাপাস তার 
সাগরেদদের নিয়ে বিদায় নিয়েছে, আর এরা নিজেরাই মালপত্র ভাগাভাগি ক'রে নিয়ে 
পাহাড় বেয়ে উঠেছেন-_ভাগ্যিশ, সঙ্গে ডানকান জাহাজের বিশ্বস্ত খালাশি তিনজন ছিলো। 

পথে অনেক জন্তরজানোয়ার তাদের চোখে পড়েছে। এ-সব জস্তুজানোয়ারের 
অনেকগুলোই তাদের অচেনা । তবে এমন-কোনো শুওর তারা চোখে দ্যাখেননি যাদের 
নাভিকুগুলি ছিলো তাদের পিঠে, কিংবা এমন পাখিও দ্যাখেননি যাদের পা নেই, অথবা 
মেয়ে-পাখিগুলো ডিম পেড়ে তা দিচ্ছে পুরুষপাখিগুলোর পিঠে, কিংবা এমন প্রাণীও 
দ্যাখেননি যাদের বৃদ্ধি আচমকা থেমে শিয়েছে আর তারা সব এর-ওর-তার কাছ থেকে 
শরীরের সব জিনিশ নিয়েছে-যেমন তাদের মুণ্ডু আর কানগুলো খচ্চরের মতো, 
শরীরগুলো উটের, পাগুলো হরিণীর, আর চিহি-চিহি ডাকটা ঘোড়ার। সারা রাস্তা বকবক 
করতে-করতে এসেছেন পাঞয়ল। বলেছেন ক্রিস্তোবাল কোলোনরা-পিগাফেত্তারা- 
কেবল গুল ঝেড়েছেন, আর নয়তো মেস্কাল খেয়ে নেশার ঝোকে আজব-সব জীবজন্তু 
দেখেছেন। এই দুর্গম পথে জীবজস্তুর দেখা পাওয়াই তো বিস্ময়কর-তার ওপর আবার 
এ-সব কিস্তৃত জীব, যা মানুষ শুধু চোখে দ্যাখে বল্পনায়- কল্পনার লাগামছেঁড়া উড়ালে। 
“জানেন, পাঞয়লের মুখে ছিলো একটাই বুলি, “এইসব আজগুবি জিনিশ লিখে এরা 
সবাই আমাদের-আধুনিক ভৌগোলিক দের-জীবনটাই দুর্বিষহ ক'রে তুলেছেন। এঁদের 
বিশ্বাস করঙ্গে তো নিজের ওপর থেকেই বিশ্বাস হাপিশ হ'য়ে যাবে 

যত ওপরে ওঠা যাচ্ছে হাওয়া লঘু হ'য়ে আসছে, হালকা, আর নিশ্বাস নিতে শিয়ে 
অস্থির-অস্থির লাগছে, বুকের খাঁচাটাই যেন ফেটে যাবে, মাটি ফেটে ধেরিয়ে এসেছে 
রক্ত, ঠোট ফেটে গিয়েছে। রবার্ট এমনি কাহিল হ'য়ে পড়েছে যে শেষটায় ডানকান- 


৫০ 


এর একজন খালাশিকে তাকে কাধে ক'রে বয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে । অবশেষে-ঠিক 
কখন, খেয়াল করার মতো অবস্থা তখন কারু নেই-তখন কেউ খাড়া হ'য়ে হাটতেও 
পারছে না আর, প্রায় হামাগুড়ি দিয়েই এগুতে হচ্ছে, এমনি অবস্থায়, অবশেষে-_দূরে 
ছোট্ট-একটা ফুটকির মতো দেখা গেলো কার একটা পোড়ামাটির বাড়ি, আদোবা বাড়ি 
বলে তাকে এখানকার স্থানীয় লোকেরা। 

আন্দেয়াসের চিরতুষারের মধ্যে প্রায় যেন চাপা পড়ে গিয়েছিলো এই আদোবা । 
কিন্তু ফৌজের লোকেদের নজরদারি খুব তীক্ষ হয় বলেই বোধহয় মেজর ম্যাক্ন্যাব্সের 
চোখেই পড়েছিলো কুড়েবাড়িটা। 

কোনোরকমে তুষার সাফ ক'রে টাই-চাই জমাট তুষার সারিয়ে সেখানেই রাতটা 
কাটাবার ব্যবস্থা করা হ'লো। ইগ্ডিয়ানরা ভালোই জানে পোড়ামাটি দিয়ে কেমন ক'রে 
দেয়াল বানালে শীত ঠেকানো যায়, তাই তুষারের মধ্যেও আদোবা বাড়িগুলো মোটামুটি 
স্বচ্ছন্দ একটা আস্তানা দেয়। 

তখন সূর্য ডুবে যাচ্ছিলো চূড়ার আড়ালে। এদিকে এখনও সুপ্ত-জাগ্রত কত 
আগ্নেয়গিরি আছে। দক্ষিণের আগ্নেয়গিরির মুখটার ওপর আগুনের হলকা।, লেলিহান 
লোল রক্তজিহ্বা, আর তারই প্রতিফলন ঝিকিয়ে উঠছে বরফের স্তপের ওপর, আর সেই 
সঙ্গে ঝলসাচ্ছে ডুবে-যেতে-থাকা সূর্যের শেষরশ্মিগুলো। ভয়ংকরের সম্ভাষণ যে এমন 
নয়নাভিরাম রূপ নিতে পারে, তা চোখে না-দেখলে হয়তো কেউই বিশ্বাস করতো না। 
কোনো আশঙ্কারও যে এমন সৌন্দর্য হয়, তা কে জানতো? 

ভীষণ শ্রান্ত লাগছিলো সকলের। ঠিক হয়েছিলো, তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া সেরে 
নিয়ে পূর্ণ বিশ্রাম নেবে সবাই। কিন্তু খেতে বসেই সবাই কি-রকম আতকে উঠলেন। 
বাইরে এঁ ধুপধাপ আওয়াজ কিসের ? এমন প্রচণ্ড আওয়াজ ? তুষার ধ'সে পড়ছে নাকি 
চূড়া থেকে? খাওয়া মাথায় উঠলো, সবাই ছুটে বাইরে বেরিয়ে এলেন। 

না, তুষারধস নয়--জন্তুর দল। তীব্রগতিতে ছুটে আসছে, পালে-পালে। দৃকপাতহীন 
তাদের ধাবমান পায়ের তলায় পড়লে আর দেখতে হবে না-সেখানেই ভবলীলা সাঙ্গ 
হবে। দেখেই সবাই মাটিতে মুখ গুজে শুয়ে পড়লো । মেজর ম্যাকন্যাব্স ঘর থেকে 
ছুটে বেরুবার সময় তার শয়ন-স্বপনের সঙ্গী বন্দুকটা সঙ্গে আনতে ভোলেননি। তিনি 
তার বন্দুকের ঘোড়া টিপলেন, জন্তদের পালের মধ্য থেকে একটি জন্তু মাটিতে 
আছড়ে পড়লো, বাকি সবাই দৃকপাতহীন ধুপধাপ ক'রে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে 
গেলো। 

তাদের আওয়াজ মিলিয়ে যেতেই ধড়মড় ক'রে উঠে বসেছিলেন পাঞয়ল। 
জন্তগুলোকে ছুটে আসতে দেখে তিনিই সর্বাগ্রে ছিটকে গিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন, চশমা 
খুলে পস্ড়ে গিয়েছিলো পাশে। হাড়ে চশমাটা খুঁজে নিয়ে নাকের ডগায় বসিয়ে দিয়ে 


৫১ 


মৃত জন্ত্রটাকে নিরীক্ষণ ক'রেই তিনি উৎফুল্ল কণ্ঠে চেচিয়ে উঠলেন : “আরে ! গুয়ানাকো ! 
বাঃ, তোফা! 

'গুয়ানাকো?' সে আবার কী? ততক্ষণে রবার্টও উঠে বসেছে। 

“গুয়ানাকো দক্ষিণ আমেরিকার লামাগোছের জীব। ওপরে এ নরম হালকা পা্টকিলে 
লোমগুলো দেখেছো ? খুব ভালোজাতের পশম হয় ওতে । গুয়ানাকোরা উটের বংশেরই 
কেউ হবে--তাদেরই জ্ঞাতিগুষ্টির কেউ, তবে কুজ নেই। কিন্তু এর মাংস খেতে ভারি 
ভালো-_খুবই সুস্থাদু 

“আপনি জানলেন কী ক'রে? আগে চেখে দেখেছেন বুঝি? 

“না, চেখে দেখিনি, তবে বইয়ে পড়েছি। চমৎকার হ'লো, জারানো শুখামাংসের 
বদলে গুয়ানাকোর মাংসই খাওয়া যাবে। আমিই রসুই পাকাবো কিন্তু। 

সঙ্গে-সঙ্গে মাংস কাটাকুটি ক'রে রান্নার তোড়জোড় শুরু হ'য়ে গেলো। একটু 
আগেই ক্লান্ত লাগছিলো সকলের, এখন এই উত্তেজনার পর টাটকা মাংস খাবার লোভে 
সবাই যেন হঠাৎ চাঙ্গা হ'য়ে উঠেছে। 

রান্না তো হ'লো, কিন্তু মুখে দিয়েই-থুঃ থুঃ ! শক্ত আশের তৈরি ছিবড়ে যেন, 
রসকষহীন, একেবারেই বিস্বাদ। 

পাঞয়ল তার কেতাবি বিদ্যার এমন সমূহ উৎখাত দেখে একটু যেন ভাবনাতেই 
পড়লেন। কিন্তু একটা কৈফিয়ৎ খাড়া ক'রে দিতে তার আবার বেশিক্ষণ লাগে নাকি? 
লাফিয়ে উঠে বললেন : 'ওহো, বুঝেছি ! আদ্দুর থেকে ছুটে এসেছিলো ব'লে মাংসটা 
এমন খারাপ লাগছে--শুধু শুকনো পেশী ব'লেই মনে হচ্ছে-গুয়ানাকোর মাংস খেতে 
তখনই ভালো লাগে যখন সে স্থির থাকে-' 

কিন্ত এতগুলো গুয়ানাকো দল বেঁধে এমনভাবে ছুটে আসছিলো কেন?' রবার্ট 
জিগেস করলে : তারা কি এমনি প্রাণের ভয়ে পড়িমরি ক'রে সবসময় ছোটে 
নাকি ? 

নিশ্চয়ই ছোটে না সবসময়। তবে এখন কেন দিশ্থিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটে 
আসছিলো, সেটা কেমন-একটা ধাধার মতোই ঠেকলো, কী-একটা অজানা রহস্য আছে 
যেন এর ভেতর। 

তখনই অবশ্য ধাধাটার কোনো সমাধান হ'লো না। রহস্যটা ভেদ করা গেলো অনেক 
রাত্রে। গুম গুম গুম... প্রচণ্ড গড়িয়ে-যেতে-থাকা গুম গুম শব্দে সকলের ঘুম ভেঙে 
গেলো। 

ভূমিকম্প না.কি? আদোবা বাড়িটা অমন দুলছে কেন? 

ঘুম ভেঙে আঁকে জেগে উঠে আতঙ্ক আর হতভম্ব দশার এক মিশ্র অনুভূতি 
তখন সকলের। দেখা গেলো দরজার পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে অন্ধকার! তার মানে? 


৫২ 


তার মানে ধস নেমেছে। 

আদোবা বাড়িটা সমেত পাহাড়ের একটা মস্ত অংশ প্রচণ্ড বেগে নেমে চলেছে 
নিচে। 

কতক্ষণ যে সবাই ভয়ে চোখ বন্ধ ক'রে ছিলো কেউ জানে না-মাঝে-মাঝে একটা 
থমথমে মুহূর্তকেও মনে হয় অনেকটা সময়। কিন্তু যতক্ষণই কেটে থাকুক না কেন, 
ংবিৎ ফিরলো আকাশবাতাসফাটানো একটা ভয়াবহ আওয়াজে । ঘরের মধ্যে কে 
কোনদিকে ছিটকে পড়লো ঠিক নেই। কারু মাথা ঠুকে গেলো দেয়ালে, কারু-বা হাত- 
পা পড়লো বেকায়দায়। আর... কী-যে হচ্ছে সেটা বোঝবার মতো সজাগ মনও কারু 
যেন ছিলো না। 

সকলের আগে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দীড়ালেন মেজর ম্যাকন্যাব্স-- সামরিক 
ঝড়ঝাপটা সইতে পারে। উঠে দাড়িয়ে তাকিয়ে দেখলেন মাটিতে-প'ড়ে-থাকা অন্যদের 
চিৎ-উপুড় শরীরগুলো। 

কে যেন 'নেই--? 

ভালো ক'রে তাকিয়ে দেখলেন ম্যাকন্যাব্স। না, সকলেই আছে, কিন্ত শুধু 
রবার্টকেই কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ূ 

কোথায় গেলো তবে রবার্ট ? ঘরশুদ্ধু সবাই ছিটকে, ঢাল বেয়ে, ধসের সঙ্গে নিচে 
নেমে এসেছে। রবার্ট কি তখন ঘরে ছিলো না? কোথায় গিয়েছিলো ঘর ছেড়ে-রাত- 
বিরেতে ? রবার্টকে সঙ্গে না-নিষে কাণ্তেন গ্রান্টের কাছে গিয়ে তারা মুখ দেখাবেন কী 
ক'রে? কে-একজন বললে, 'ধস নামার একটু আগেই রবার্টকে দেখা শিয়েছিলো 
ঘাসের চাপড়া সজোরে জাপটে থাকতে ! অর্থাৎ : বা দিকে অন্তত দু-তিন মাইল জমি 
খুঁজে দেখা দরকার। কিন্তু তারও আগে প্রশ্ন : এখন তারা এ-কোথায় ছিটকে এসে 
পড়েছেন? 

আন্দেয়াসের প্বদিকের ঢাল দিয়ে গড়িয়ে লর্ড গ্রেনারভনের দল চিলে থেকে 
সরাসরি চলে এসেছেন আরহেনতিনায়--আন্দেয়াসের শিখরের চিরতুষার থেকে 
একেবারে বিস্তীর্ণ সবুজে । তাজ্জব কাণ্ড! এমনই আশ্চর্য যে কয়েকদিনের পথ কেউ 
যেন আরব্য উপন্যাসের জাদুগালচেয় ক'রে উড়িয়ে নিয়ে এসে পার ক'রে দিয়েছে। 
অবশ্য জাদুগালচেয় ক'রে শনো পাড়ি দেবার মতো মসৃণ-নিরাপদ ছিলো না ব্যাপারটা, 
তবে ভূমিকম্পে যখন ধস নেমেছিলো তখন একটা মস্ত ধসই তাদের আদোবা বাড়িশুদ্ধু 
অমনভাবে অতটা পথ পার ক'রে নিচে নামিয়ে এনেছে- প্রায় আলগোছেই বলা যায়। 
ফটফটে শাদা বরফের বিস্তারের পর এখানে চারদিকে যেন সবুজের উৎসবের একটা 
ঢল নেমেছে--চোখ না-ধাঁধিয়ে দিয়ে চোখ যেন জুড়িয়েই দিচ্ছে সেই সবুজ । 


৫৩ 


কিন্তু প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে-করতে প্রকৃতির এই আশ্চর্য কীর্তি নিয়ে 
মাথা ঘামাবার সময় তাদের নেই এখন। প্রথম কাজ--এবং এইমুহূর্তে একমাত্র কাজ 
_যে-ক'রেই হোক রবার্টকে খুঁজে বার-করা। অথচ চারপাশে তন্রতন্ন ক'রে খুঁজেও 
রবার্টের কোনো সন্ধানই পাওয়া গেলো না। আস্ত, গোটা দিনটা কেটে গেলো- কিন্তু 
কোথাও তার কোনো হদিশ নেই, এমনকী এমন-কোনো সূত্র অব্দি কোথাও নেই যার 
সাহায্যে অন্তত একটা আন্দাজ করা যায় যে রবার্ট কোথায় আছে । বিষম বিমর্ষ হয়ে 
পড়লেন লর্ড গ্লেনারভন : দায়িত্বটা তারই, কী বলবেন গিয়ে তিনি মেরিকে? নিরুদ্িষট 
বাবাকে খুঁজতে এসে ছেলেও না-পাত্ঠ! ! তাছাড়া অপঘাত মৃত্যুরও একটা সম্ভাবনা আছে 
_কিন্তু ধস নেমে রবার্ট যদি ম'রেও গিয়ে থাকে, তবে তার মুতদেহটা কোথাও নিশ্চয়ই 
থাকবে। লর্ড গ্রেনারভন কিন্তু সারারাত ধ"রে খুঁজে চললেন, পাহাড়ের ঢালে, সমতলে, 
কখনও নাম ধ'রে চেঁচিয়ে ডাকেন, কখনও হতাশায় গুম হ'য়ে যান- কিন্তু তার 
ডাকাডাকিতে কারুই কোনো সাড়া আসে না। 

পরদিন সকাল কেটে গিয়ে এলো দুপুর--কিন্তু লর্ড গ্রেনারভন কিছুতেই এ-জায়গাট। 
ছেড়ে নড়তে চান না। যদি রবার্ট নিজে খোঁজ নিতে এদিকে আসে? বেচে আছে তো 
বেচারা ? 

কিন্তু এই জনশূন্য নিঝুম জায়গায় কতক্ষণই বা কাটাবেন তারা ? খাবারও ফুরিয়ে 
এসেছে--শুকনো জারানো মাংস যা ছিলো তা কোথায় ছিটকে পড়েছে। বিশ্বাদ ব'লে 
গুয়ানাকোর মাংসও তারা তখন রাখেননি । এই অবস্থায় অন্তত খাবারের খোঁজেও 
এখানকার পাট উঠিয়ে যেতে হয়-না-হ*লে সবাই যে অনাহারে মরবে! 

মেজর ম্যাকন্যাব্সও বিষম মুষড়ে পড়েছিলেন, কিন্তু রবার্ট ছাড়া এখানে তো অন্য- 
আরো অনেকে আছে । অভিযানের নেতা হিশেবে গ্নেনারভনের তো তাদের কথাও ভাবা 
উচিত। ম্যাকন্যাবস নিজের মনের ভাব চেপে একটু কড়া সুরেই বললেন : 'আর না৷ 
-এবার এখান থেকে চলো। 

“হ্যা, যাবো তো বটেই, তবে আর একটু? 

এমন সময়ে আকাশে এঁ কার বিশাল ছায়া? দ্রুত ধাবমান-এই দিকেই? 

ভালো ক'রে তাকিয়ে বোঝা গেলো : কগুর : লাতিন আমেরিকার আকাশের রাজা, 
বিশাল পাখি কগুর! 

পাঞয়ল তাকিয়েই ব'লে উঠলেন : “এ তো দক্ষিণ আমেরিকার গধিনী-কণগুর 
--বিশাল এই পাখির একটা পোশাকি কেতাবি নাম আছে অবশ্য ভ্রুলতুব গ্রাইফাস- 
এ তো থাকে আন্দেয়াসের ওপর, মাথা আর ঘাড়ে কোনো লোম বা পালল .শই। আর 
সারা গায়ের পালক কেমন নিরেস কালো. শুধু গলাটা শাদামতো, ডানায় এঝে-মাঝে 
শাদা ছোপ থাকে। ইনকারা তো কণগুরের পুজো করে প্রায়_তাদের পুরাণে-উপকথায় 


৫৪ 


এর কথা কত আছে! এমন শিকারি পাখি আইরির ঈগলও নয--হাজার-হাজার ফুট 
ওপর থেকেও দেখতে পায় নিচে কোথায় ছোট্ট শিকার ঘুরছে । ছো মেরে নিচে নেমেই 
আস্ত-সব ভেড়া, ছাগল, গুয়ানাকো উড়িয়ে নিয়ে যায় পাহাড়চুড়ায় নিজের 
আস্তানায় !'_ 

পাঞয়ল হয়তো তার পুথিপড়া বিদ্যে জাহির করেই চলতেন, কিন্তু অন্যরা তখন 
চোখ ছানাবড়া ক'রে দেখছেন কেমন ক'রে সেই বিশাল কগুর বৃত্তের মতো গোল হ'য়ে 
ঘুরে-ঘুরে নামছে নিচে, বা দিকে! তবে কি শিকারের জন্যেই তার এই বিদ্যুক্ষিগ্র ছো ? 
কে এই শিকার? রবার্ট ? 

ম্যাকন্যাবস তার বন্দুক বাগিয়ে টিপ করছিলেন, কিন্তু ঘোড়া টেপবার আগেই 
পাহাড়ের আড়ালে সেই কগ্ডর উধাও হ'য়ে গিয়েছে। সবাই ফ্যালফাল ক'রে তাকিয়ে 
রইলো সে যেদিকে গেছে, সেদিকে । একট্র পরেই তাকে দেখা গেলো আবার, সৌ ক'রে 
ওপরে উঠছে, তার থাবায় ঝুলছে কে-একজন, ছটফট করছে। প্রায় চোখের পলকেই 
সে দুশো-আড়াইশো ফুট উঠে গেছে ওপরে। 

লর্ড গ্নেনারভনও বন্দুক উচিয়ে ধরেছিলেন, গুলি ছুঁড়তে গিয়ে তার হাত কাপছে 
তখন, যদি এ দেহটা রবার্ট হয়, যদি তার গায়ে গিয়ে গুলি লাগে ! ম্যাকন্যাব্স ততক্ষণে 
ঘোড়ায় চাপ দিতে যাচ্ছেন, কিন্তু ঘোড়া টেপবার আগেই দূর থেকে বন্দুকের আওয়াজ 
ভেসে এলো। সোজা গিয়ে গুলি লোগছে কগুরের গায়ে। জখম, গুলি-বেঁধা কগুর থাবার 
বোঝা নিয়েই ঘুরে-ঘুরে আস্তে এসে নেমে পড়েছে নদীর ধারে। 

পড়িমরি ক'রে ছুটে গেলেন সবাই। কগুরের ঠিক মাথায় গিয়ে গুলি লেগেছে। 
বন্দুক যেই ছুঁড়ে থাকুক, তার লক্ষা ছিলো অবার্থ ! আর কগুরের ডানার পালকের মধ্যে 
নিঃঝুম অচেতন প*ড়ে আছে রবার্টের মাথা । কাপা হাতে রবার্টকে টেনে বার ক'রে নিয়ে 
এলেন লর্ড গ্রেনারভন। বুকে কান পেতে শুনতে পেলেন অস্ফুট ক্ষীণ ধুকপুক আওয়াজ। 
অমনি আবেগে চেচিয়ে উঠলেন, “বেচে আছে-- প্রাণের সাড়া আছে এখনও-_-বেচে 
আছে! 

ম্যাকন্যাবস গিয়ে চট ক'রে পাহাড়ি নদী থেকে জল এনে রবার্টের চোখেমুখে ছিটিয়ে 
দিলেন। 

আস্তে-আশ্তে চোখ মেলে তাকালে রবার্ট, কেমন ঘোর-লাগা দৃষ্টি, যেন কিছুই সে 
এখনও বুঝতে পারছে না। তাকে বুকে জড়িয়ে ধ'রে প্রায় কেদেই ফ্যালেন বুঝি 
গ্লেনারভন। তিনি জ্ঞান হারাননি বটে, কিন্তু তারও মাথার মধ্যেটা কেমন করছে, কিছুই 
বুঝতে পারছেন না যেন তিনি। 

গুলিটা তো তারা করেননি-তবে গুলিটা করলে কে? কার এমন অচঞ্চল হাত, 
অব্যর্থ লক্ষ্যভেদের ক্ষমতা? 


৫৫ 


তার উত্তর অবশ্য পাওয়া গেলো তক্ষুনি। হাত-পঁচিশ দূরেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা 
গেলো তাকে। যেন পাথরে-খোদাই-করা, পাহাড়ের গায়ে-বসানো কোনো কিংবদস্তির 
রাজা। 

ছ-ফিটের ওপর লম্বা খজু সটান দেহ, কেশরের মতো চুলের ঢাল ফিতে দিয়ে 
বাধা, কপালে শাদা রং লেপা, মুখে লাল রং, দু-চোখের পাশে কালো-রঙের ছোপ! 
গায়ে পশুলোমের কুর্তা, পায়ে মোটা চামড়ার বুটজুতো, হাঁটু অন্দি ফিতে দিয়ে বাধা। 

তার পায়ের কাছে পড়ে আছে বন্দুক। 

তাকাবামাত্র বোঝা যায় কী-প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব তার। চোখমুখ থেকে বুদ্ধির দীপ্তি ফুটে 
বেরুচ্ছে। 

চমকটা ভাঙতেই লর্ড গ্রেনারভন এগিয়ে গিয়ে তাকে কৃতজ্ঞতা জানালেন-: তার 
বিহ্‌ল দৃষ্টি, আর মুখের ভাবই কৃতজ্ঞতা এমনভাবে ফুটিয়ে রেখেছে কারুই সেটা বুঝতে 
দেরি হয় না। গিরি আন্দেয়াসের এই রাজারও তা বুঝতে দেরি হয়নি। 

পাঞয়লও তখন এগিয়ে এসে তড়বড় ক'রে এস্পানিওলে কত-কী ব'লে 
ফেলেছেন। কিন্তু সে-সব কথার কিছু যে এই রাজা বুঝতে পেরেছে এমন-কোনো ইঙ্গিত 
অবশ্য পাওয়া গেলো না। মেজর ম্যাকন্যাবস তার ভাঙা-ভাঙা এস্পানিওলে একটা কথা 
ব'লেই বুঝতে পেরেছিলেন এই বিশাল মানুষটা এস্পানিওল জানে । আর তাই পাঞয়ল 
যখন কথার তুবড়ি ছুটিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন সংলাপ হবে-_কথার জবাবে কথা, কিন্ত 
পাঞয়ল অনেক চেষ্টা ক'রেও তাকে তার কোনো কথা বোঝাতে পারলেন না। 

“কিছুই বুঝছে না কেন আপনার কথা? মেজর ম্যাকন্যাব্সের গলার সুরে এবার 
একটু ব্যঙ্গের সুর! “এখনও এস্পানিওল উচ্চারণ আপনার রপ্ত হয়নি? আপনি কি এখনও 
ফরাশিতে এস্পানিওল ব'লে যাচ্ছেন? 

পাঞয়ল এতক্ষণ কথার ফুলঝুরি ছেটাচ্ছিলেন, মেজরের কথা শুনে একটা বাক্যের 
মাঝখানেই থেমে পড়লেন। পকেট থেকে একটা দোমড়ানো বই বার ক'রে বললেন, 
“কেন-যে এত গণ্ডগোল হচ্ছে বুঝতে পারছি না তো? বই পড়ে কি আর উচ্চারণ শেখা 
যায় না? এত ভালো একখানা বই, ধুপদী- মহাকাব্ই-এই-যে এই দেখুন, উশ 
লিসিয়াদাস্‌--, | 

এবার একটু আতকেই উঠলেন লর্ড গ্লেনারভন। “এ আপনি করেছেন কী, মসিয় 
পীঞয়ল % এ-যে পোর্ভুগিজ মহাকাব্য-ভাশ্কু ডা গামার ভারতবর্ষের পথে বেরিয়ে- 
পড়ার কাহিনী আছে যে এতে--লুইস ভাজ দে কামোয়ে্স-এর লেখা-উনি তো ষোড়শ 
শতাব্দীর পোর্তৃগিজ কবি--; 

“আটা? আংকে উঠলেন স্বয়ং পাঞয়লও, সম্ভবত জীবনে এই প্রথমবার। 
“সে কী? আমি কি তাহ'লে এস্পানিওল মনে ক'রে এতদিন শুধু পুর্তৃগিশই ব'লে 


৫৬ 


শেছি? তাই তো বলি, আমি এত কথা ব'লে যাচ্ছি অথচ কেউ কিছু বুঝছে না কেন? 
মাক, তাতে আর কী হ'লো--এবার ব্রাজিলে গেলেই আমার এই ভাষা শেখা কাজে 
দেবে_" ব'লেই পাঞয়ল হেসেই কুটিপাটি। বইয়ের ভেতরটা টীকার সাহায্যে তন্রতন্ন 
ক'রে পড়েছেন-অথচ ককখনো খেয়াল ক'রেও দ্যাখেননি ভাশ্কু ডা গামা কোন দেশের 
লোক-অথবা বহু-ব্যবহারে-মলিন ও হলুদ-হ'য়ে-যাওয়া বইটা কোন ভাষায় লেখা। 

শেষটায় অবশ্য নির্ভর হ'লো মুকাভিনয়--আকারে-ইঙ্গিতে, কিঞ্িৎ কণ্ঠনিঃসৃত 
মাওয়াজ ইত্যাদি মারফত এই পাহাড়ি মানুষটার নাম জানা গেলো-ইনি না-থাকলে 
মাজই রবার্টের ভবলীলা সাঙ্গ হ'তো। তার নাম নাকি ভ্রোনিদো, অর্থাৎ ব্জশব্দ, সম্ভবত 
ইগ্িয়ানদের ভাষা থেকে তর্জমা ক'রেই এই ত্রোনিদো নাম দেয়া হয়েছে তাকে । পেশায় 
,স গাইড । আরহেন্তিনার বিশাল প্রেয়ারি, যার নাম তাদের ভাষায় পাম্পা, ত্রোনিদো 
নানন্দেই তাদের সঙ্গে গিয়ে পার ক'রে দিয়ে আসতে রাজি হ'লো। মার্কিন মুলুকে যাদের 
বাম কাউবয়, আর্হেনতিনার ভাষায় তারাই গাউচো; ত্রোনিদো গাঁউচোই ছিলো, বিশাল 
একটা র্যানচের ভার ছিলো তার ওপর । কিন্তু তার পায়ে বোধহয় কুট ক'রে কামড়েছিলো 
কোনো ঘুরঘুরে পোকা, একজায়গায়--তা সে যত বিশালই হোক--আটকে না-থেকে 
লারা পাম্পাস-এ ঘুরে-ঘুরে বেড়াবার জন্যেই সে গাইডের কাজ নিয়েছে । এখানকার বুনো 
ঝাপঝাড়ের পাতা ছেচে রবার্টের জখমে তার রস লেপে দিয়ে সে রবার্টকে কিছুক্ষণের 
বধ্যেই চাঙ্গা ক'রে তুললো । তারপর সবাই এত উত্তেজনার পর একটু বিশ্রাম ক'়ে 
[খন সুস্থ হ'য়ে উঠেছে, তখন সে তাদের সবাইকে নিয়ে গেলো মাইল-চারেক দূরের 
এক পুয়েবলোতে- ছোট্ট জনপদ. গ্রামই বলা যায়, ছোটো-ছোটো আদোবা বাড়ি, তাতে 
নাস চাষীদের, প্রধানত তুট্টাই ফলায় তারা-আর ঘোড়ায় চ'ড়ে পাম্পায় টহল দিয়ে 
বড়ায়। তাদের সঙ্গে দরাদরি ক'রে অভিযাত্রীদের সে কিনিয়ে দিলে সাতটা টগবগে 
ঘাড়া। নিজে সে অবশ্য কোনো ঘোড়া কিনলো না-তার দরকার নেই, নিজের ডেরায় 
চার আস্তাবল আছে, তবে বনে যখন শিকারে বেরোয় তখন সে কোনো ঘোড়া সঙ্গে 
নয় না। 

সেদিন সন্ধেবেলায় দেখা গেলো পুর্তৃগিশ ভাষার চর্চা আপাতত মুলতুবি রেখে জাক 
শাঞয়ল ত্রোনিদোর কাছে এস্পানিওল ভাষা শিখতে লেগে গিয়েছেন--কাস্তিইয়ের রাজা- 
নাজড়ার আভিজাত্যে ভরা আধো-আধো থ-থ ভরা এস্পানিওল নয়-লাতিন আমেরিকার 
কানকিস্তাদোরেরা এস্পানিওলকে সংস্কার ক'রে অনেকটাই নিজেদের মতো করে 
নয়েছে-পাঞয়ল এখন শিখতে শুরু করেছেন তাদেরই ভাষা । 


৫৭ 


সাত 


পাম্পার বিশালে 


পরদিনই ত্রোনিদোর নিদদেশমতো অভিযাত্রীরা আরো-পুবের দিকে রওনা হ'য়ে পড়লেন 

পথে বেরিয়েই বোঝা গেলো ঞোনিদো তার জন্যে কোনো ঘোড়া এখন চায়নি কেন 
জঙ্গলের কাছে এসে মুখ থেকে বার করলে লম্বা একটানা এক অদ্ভুত আওয়াজ, লক্ব 
একটানা শিস যেন-আর অমনি জঙ্গলের মধ্যে থেকে ছুটে বেরিয়ে এলো আর্হেনতিনার 
এক আশ্চর্যসুন্দর ঘোড়া, পেশল-মসূণ দেহ, যেন গতিকেই কেউ একটা চামড়ার খাপে 
পুরে দিয়েছে, সে যখন কদম-কদম হাঁটে, তখনই তার বলিষ্ঠ পেশীগুলো রোদ্দুরে হালকা 
ঢেউয়ের মতো নেচে-নেচে ওঠে। 

ঘোড়া ছিলো ব'লেই যতক্ষণ সূর্য মাথার ওপর রইলো, ততক্ষণ ঘোড়া ছুটিয়ে 
- জোরে নয়, মোটামুটি দূলকিচালে চ'লেই- পেরিয়েমআসা গেলো আটত্রিশ মাইল পথ। 
রাতের বেলায় এক নদীর ধারে ছাউনি ফেলে সবাই মিলে খাওয়াদাওয়া করা হ'লো, 
ঠিক হলো পরদিন ভোরেই ফের রওনা হওয়া হবে। 

পরদিন দুপুর অব্দি আগের দিনের মতোই তারা এগিয়েছে, কিন্তু হঠাৎ দেখা গেলো 
দূর থেকে ধোয়ার মতো কী-একটা তীব্র ঘূর্ণি তুলে এগিয়ে আসছে। শুকনো হাওয়ার 
ঝড়। তোড়ে ব'য়ে যায় এই হাওয়া পাম্পার ওপর দিয়ে। প্রায় লুর মতোই তপ্ত। অন্তত 
ব্যারোমিটারে পারদের চড়চড় ক'রে ওগ্ীরে-ওঠা দেখে পাঞয়লের তা-ই মনে হ'লো। 

পাঞয়লের মুখে তাই ব'লে কোনো শঙ্কার ছাপ নেই, বরং অন্যদেরও তিনি আশ্বাস 
দিলেন, বললেন, “ভয় নেই। পারা যদি নিঢের দিকে নামতো তবে বোঝা যেতো যে 
হারিকেন শুরু. হ'য়ে গেছে-সেই ঘূর্ণিঝড় তিনদিনের আগে থামতো কি না সন্দেহ। 
পথে যা-ই পেতো তাকেই উড়িয়ে নিয়ে দূরে আছড়ে ফেলতো । কিন্তু এ নেহাংই শুকনো 
হাওয়ার খেলা, একটুক্ষণ সব তোলপাড় করবে, তারপর যেমন আচমকা এসেছিলো 
তেমনি আচমকা চ'লে যাবে। ব্যারোমিটারে যখন পারা উঠছে, তখন বোঝা যাবে এই 
ঝড় থেমে যাবে শিগণিরই--কয়েক ঘন্টার মধ্যেই।, 

“আপনি জানলেন কী ক'রে? 

“ই-হু, তার জন্যে কেতাব পড়তে হয়। অভিযাত্রীদের রোমাঞ্চকর কাহিনী ।' 

“যা পড়েন সব মনে থাকে নাকি আপনার? আপনি কি নিজেই জ্যান্ত-একটা বই 
হ'য়ে উঠেছেন ?, 

পাঞয়লের মনে হলো এ-কথটা আসলে তার মস্ত প্রশংসা বই আর-কিছু নয়। 


৫৮ 


খুশি হ'য়ে মুচকি হেসে বললেন, “বেশ, যা বললুম তা মিলিয়ে নেবেন।, 

পূর্তৃগিশ ভাষাকে খেয়াল না-ক'রে এস্পানিওল ভেবে চর্চা ক'রে আসছিলেন 
আদ্দিন; গল্পের বইতে ঠিক যেমন কোনো অন্যমনস্ক অধ্যাপকের কথা পড়া যায়_এ 
সেই যিনি নাকের ডগায় চশমা থাকা সত্তেও নিজের চশমা খুঁজে বেড়ান তেমনি একটি 
ভূমিকায় আবারও অনিচ্ছুক ভমিকা গ্রহণ ক'রে একটু হয়তো-বা মুষড়েই পড়েছিলেন 
জাক পাঞয়ল। পরে অবশ্য ত্রোনিদোর কাছে এস্পানিওল শিখতে-শিখতে নিজেকে 
সান্ত্বনা দিয়েছেন এই ব'লে যে, “যাক, এই সুযোগে প্রায় মুফতেই পৃর্তৃগিশ ভাষাটাও 
শেখা হ'য়ে গেলো ॥ কিন্তু তবু যৎকিঞ্চিৎ মনমরাই ছিলেন বইকি পাঞয়ল। এখন এই 
শুকনো ধুলোর তৃফান সম্বন্ধে তার পুথিপড়া জ্বান ফলিয়ে মনে-মনে তিনি আত্মপ্রসাদ 
অনুভব করছিলেন খানিকটা-তবে একটা ভয় কি মনের মধো উকিঝুকি দিচ্ছিলো না? 
যদি তার কেতাবি বিদ্যেটা না-ফলে? কিন্তু এ-যে বলেছিলেন জীক দেখিয়ে, “বেশ, যা 
বললুম, মিলিয়ে দেখে নেবেন, সেটা কিন্তু শেষ অব্দি সতাই হয়ে গেলো । ঝড়টা 
অভিযাত্রীদের কাছে এলো সন্ধেবেলায়, আর মিলিয়ে গেলো কয়েক ঘণ্টা পরে, রাত 
একটায়, সবকিছুর ওপর পুরু সরের মতো ধুলোর একটা আস্তর বিছিয়ে রেখে। আর 
তারপর থেকে তাকে আর পায় কে? তার উৎসাহ তারপর থেকে টউগবগ ক'রে ফুটে 
উঠেছে! এই অজান৷ বিদেশ-বিভুয়ে পাড়ি দিতে-দিতে প্রায়-একটা জ্যান্ত বইয়ের মতোই 
তিনি গাছপালা পাহাড-পর্বতের নাম শুনিয়ে গেছেন। আর তা শুনে সবচেয়ে অবাক 
হয়েছে ত্রোনিদো, প্রায় বোমকেই গেছে সে, মুখে অবশ্য কিছু বলেনি-এদিক থেকে 
সে পাঞয়লের ঠিক উলটো, প্রায় সবসময়েই মুখে কুলুপ এটে থাকে, নেহাৎ দরকার 
না-হ'লে ট্রু শব্দটিও করে না আর তাও যখন পাঞয়লকে ভাষা শেখাতে হয়, শুধু তখনই। 
কিন্তু পরে একটা সময় এসেছে, যখন তাকেও বেশ স্পষ্ট ভাষায় মত দিয়ে একটা- 
কিছু বলতে হয়েছে। 

ব্যাপারটা ঘটেছে এইভাবে : সড়ক কারমেনের কাছে এসে যখন শুনেছে যে এ- 
রাস্তা পেরিয়ে আরো-পুবদিকে যেতে হবে তাদের, সে গন্তভীরভাবে ব'লে উঠেছে, “কিস্তৃ 
সেদিকে তো কিছু নেই।' 

কিছু না-থাকলেও যে তাদের যেতে হবে, একথা বুঝিয়ে বলবার ভার পড়েছে 
তখন পাঞয়লের ওপর। গোড়ায় কিঞ্চিৎ বাণীবিনিময় হয়েছে বটে, তবে তাতে তেমন 
সুবিধে হয়নি, পাঞয়লের ভৌগোলিক জ্ঞান যতই থাকুক এস্পানিওল ভাষার জ্ঞান ভাসাএ 
ভাসা, তাই শেষ অব্দি তাকে বালির ওপর ছবি একে বোঝাতে হয়েছে তাদের ইচ্ছেটা 
কী। একে দেখাতে হয়েছে রাস্তার এদিকটায় সূর্য ডুবে যাচ্ছে, আর ওাপকটায় সূর্য উঠছে, 
মুখ দিয়ে দু-চারটে আওয়াজও করতে হয়েছে। গোড়ায় কিছু না-বুঝে ফ্যালফ্যাল ক'রে 


৫৯ 


ছবি দুটোর দিকে তাকিয়ে থেকেছে ত্রোনিদো, তারপর গণ্ভীরভাবে একদৃষ্টে তাকিয়ে 
থেকেও ছবির ভাষার পাঠোদ্ধার করতে না-পেরে মাথা চুলকেছে কেবল । তখন পাঞয়ল 
যেদিকটায় সূর্য উঠছে একেছিলেন সেদিকটাতেই পাশে একে দেখিয়েছেন একটা গাছের 
গায়ে একজন লোক দড়ি দিয়ে আষ্টেপষ্ঠে বাধা! এবার আর ভ্রোনিদোর নিশ্চয়ই ছবির 
কথা বুঝতে অসুবিধে হয়নি। মুখ তুলে বলেছে : “বুঝেছি। পুবদিকে কেউ-একজন বন্দী 
হ'য়ে আছে। সেকি আপনাদের লোক? আপনারা তাকে খুঁজে বার করতে চাচ্ছেন ?, 

'হ্যা-হ্টা” রবার্টকে দেখিয়ে বলেছেন পাঞ্য়ল, “যাকে খুঁজতে যাচ্ছি তিনি এর 
বাবা।' 

ত্রোনিদোর ব্জ্রকঠোর মুখটা তখন সহানুভূতিতে কোমল হ'য়ে এসেছে। তবে মুখে 
সে কিছুই বলেনি। 

পাঞয়ল তখন জিগেস করেছেন : “এখানে কি ইগ্ডিয়ানরা কাউকে কয়েদ ক'রে 
রেখেছে বলে শুনেছো? 

হ্যা” আর অমনি সবাই চমকে উঠেছে ক্রোনিকোর কথা শুনে, “হ্যা-হ্যা, সিংহের 
মতো অকুতোভয় আর বিশালহৃদয় এক শ্বেতাঙ্গকে বন্দী ক'রে রেখেছে এখানকার 
ইগ্ডিয়ানদের একটা দল-_না, না, তারা কেচুয়াও নয়, আইমারাও নয়-__অন্য-একটা ছোটো 
উপজাতি । কিন্তু সে তো বছর দুই আগেকার ব্যাপার। সে যদিও বলেছে এর বেশি 
আর-কিছু তার জানা নেই, তবু তার মুখের ভাব দেখে সবাই আন্দাজ করেছে যে যে- 
কথাটা সে বলতে চায়নি, তা এই : আ্যাদ্দিন পরেও সে-বন্দী কি আর বেচে আছে? 

তাদের সব আশা এই অনুক্ত আশঙ্কায় বেশ-খানিকটা ধাক্কা খেয়েছে বটে, তবু 
অভিযাত্রীরা কেউ হাল ছেড়ে দেননি! বরং, সে যে জানে একজন-কেউ এখানে বন্দী 
হয়েছিলো, এই তথাটাই তাদের উৎসাহ আরো চাগিয়ে দিয়েছে। এতদিনে তারা একটি- 
বারও তো এমন-কোনো কথাও শোনেননি-এখন তে জানা গেছে যে অন্তত আশপাশে 
কোথাও ইগ্ডয়ানদের একটি উপজাতি একজন শ্বেতাঙ্গকে বন্দী ক'রে রেখেছে, আর 
তিনিই নিশ্চয়ই কাণ্তেন গ্রান্ট ! ফলে প্রচণ্ড তোড়জোড় ক'রে নবোদ্যমে এগিয়ে গেছেন 
সেতুটা পেরিয়ে। 

যে-কোনো যাত্রাতেই কখনও-কখনও এমন সময় এসে পড়ে, যখন তেমন-কিছুই 
ঘটে না। শুধু নিয়মমাফিক এগিয়ে যেতে হয়, কখনও পথের একঘেয়েমিতে নিরুৎসাহিত 
হ'তে হয় না। কয়েকদিন একটানা চ'লে তারা গিয়ে পৌঁছেছেন মন্ত একটা হ্রদের ধারে, 
বহুরকম খনিজ পদার্থ মেশানো তার জলে, ফলে স্-জেল মোটেই মিষ্টি নয়, বরং কেমন- 
একটা কটু অন্রকষায় স্বাদ তার জলের, সেইজন্যেই না কি এ-দেশের ভাষায় এই হ্রদের 
লাম : যে-জলাশয়ের জল তেতো । 


যদি ভাবা গিয়ে থাকে যে রবার্টের ফাড়া কেটে যাবার পর আর ত্রোনিদোর সঙ্গে 
ভাব হ'য়ে যাবার পর, অভিযানকারীদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে, তবে বিষম ভূল করা 
হবে। জাক পাঞয়লের কোড়ন সত্তেও পরের কয়েকদিন কিন্তু অভিযানকারীদের আর 
দুর্ভোগের সীমা ছিলো না। পাম্পা, অর্থাৎ লাতিন আমেরিকার-বিশেষত আরহেনতিনার 
_ প্রেয়ারি, সব জায়গায় কিন্তু একরকম নয়। কোথাও সে সবুজে সবুজ, তৃণভূমির বিশাল 
বিস্তার, কোথাও-বা গেরিধূসর, সবুজের একফৌোটাও কোনো চিহ্ত নেই, যেন কোনো 
মরুভুমিই আচমকা পথ ভূল ক'রে এই তৃণভূমিতে ঢুকে প'ড়ে আর বেরুতে চাইছে 
না। শুধু তা-ই নয়, সমভূমি যেমন আছে, মাইলের পর মাইল একইরকম, তেমনি আছে 
বন্ধুর রুক্ষ জমি, উবড়ো-খাবড়ো, অসমতল রূঢ-কর্কশ মাটি । যদি-বা ইওরোপ থেকে 
আসার পর এমন সবুজ দেখে গোড়ায় সকলের চোখ জুড়িয়ে গিয়েছিলো, মুখে আর 
লাতিন আমেরিকার ভূদৃশ্যের প্রশংসা ধরছিলো না, দু-দিন পরেই যখন রুক্ষধূসর 
গিরিভূমি নিস্তারহীন ছড়িয়ে গেলো সামনে, আর পানীয় জলের অভাবে শুধু কণ্ঠনালীই 
নয়, ধুলোমাখা শরীরগুলোও একুট ঠাগ্ডাজলের জন্যে ব্যাকুল হ'য়ে উঠলো, তখন পাম্পা 
সম্বন্ধে গোড়ার ধারণাটা বদলাতে বাধ্য হ'লো সবাই। গাউচো অর্থাৎ এখানকার কাউবয়রা 
যখন পন্চোয় শরীর ঢেকে ঘোড়ায় চ'্ড়ে মাইলের পর মাইল টহল দিয়ে বেড়ায়, তখন 
তারা তাদের চলার পথে গভীর-সব কৃপ খুঁড়ে জল বার ক'রে নেয় : তারা জমির ধরন 
দেখেই টের পেয়ে যায় কোনখানে মটি খুঁড়লে জল মিলবে। আর গাউচোরা এই ধরনের 
জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত ব'লেই প্রস্তুত ও সুসজ্জিত হ'য়ে আসে--কাণ্ডেন গ্রান্টের সন্ধানে 
বেরিয়ে-পড়া লর্ড গ্লেনারভনের দল কিন্তু পাম্পা সম্বন্ধে কিছুই না-জেনে, কোনোভাবেই 
তৈরি না-হ'য়ে, এখানে ঢুকে পড়েছেন। পরের জলাশয় অনেক দূরে, এখানে আশপাশে 
এমনকী তেতো জলেরও কোনো কৃপ নেই। 

শেষটা প্রায় যেন ধুঁকতে-ধুঁকতেই চলছিলো ক্লান্ত, অবসন্ন, অভিযাত্রীর দল। 
ঘোড়াগুলো অব্দি তৃষ্তায় কাতর হ'য়ে আছে। যাত্রার শুরুতে তাদের যে দুর্জয় গতি 
ছিলো, সেটা এখন প্রায় স্মৃতি মাত্র-অর্থাৎ এই দুর্গম অঞ্চলটা যে তাড়াতাড়ি পেরিয়ে 
যাবেন, তারও কোনো জো নেই। শুধু ভ্রোনিদো আর তার তেজিয়ান ঘোড়াটাই 
সুখেদুঃখেনির্বিকার ৬ঙ্গতে পথ দেখিয়ে-দেখিয়ে চলেছে। 

এরই মধ্যে একদিন হাওয়ায় ধোয়ার গন্ধ পাওয়া গেলো। আচমকা হা-হা ক'রে 
হেসে-ওঠা লেলিহান দাবানল নয়, মানুষের জ্বালানো অগ্নিকুণ্ড। অন্তত সেটাই ছিলো 
তাদের পথপ্রদর্শকের অভিমত : বেটে ঝোপগুলোয়, আগাছার বনে, প্রচুর পোকামাকড় 
থাকে--এ আগুন জ্বালিয়েছে গাউচোরা, পোকা মারবে বলে-তবে তা প্রায় সত্তর- 
পঁচাত্তর মাইল দূরে হবে। এখানে সমতল প্রান্তর ব'লে অনেক দূর থেকেই গন্ধ 
আসছে ।' শুধু পোকামাকড় নেই ঝোপে-ঝোপে, জায়গায়-জায়গায় আছে মশার ঝীক। 


৬৯ 


পোকামাকড়ের কথা শুনে পাঞয়ল তার বিদ্যে জাহির করতে গিয়েছিলেন, পুথিপড়া 
জ্ঞান ফলিয়ে ফিরিস্তি দিতে বসেছিলেন কত অসংখ্য ধরনের পোকামাকড় পাওয়া যায় 
এখানে । কিন্তু মশার কামড়ে তার বিদ্যেবাগিশ শরীরখানা যখন চাক-চাক হ'য়ে ফুলে 
গেলো, মেজর ম্যাকন্যাবস ফোড়ন কেটেছিলেন : “সে কী ! হাজার ধরনের পোকামাকড় 
তো নয়, নিছক একজাতের তুচ্ছ মশা, তার কামড়েই আপনি অমন নাজেহাল হ'য়ে 
পড়লেন !' পাঞয়ল শুধু চিচি ক'রে বলেছিলেন : “মশার কামড়ে ঘাবড়ে যাচ্ছি কি সাধে ! 
এখানকার মশারা পড়েছি ম্যালেরিয়া রোগ বয়ে নিয়ে বেড়ায়। আরেকদিন গাউচোদের 
একটা ছোটোদলের মুখোমুখি পড়েছিলেন তারা, বেশিরভাগই মেস্তিসো, দো-আশলা, 
শ্বেতাঙ্গ আর ইগ্ডিয়ানদের মিশোল। তারা দূর থেকে এই দলটাকে দেখে অন্যধার দিয়ে 
জোরে ঘোড়া ছুটিয়ে পিঠটান দিলে ; পাঞয়লের অনুমান, তারা নির্ঘাৎ এদের দস্যুদল 
ব'লে ভেবেছে । মেজর ম্যাকন্যাবসের মন অবিশ্যি এ-কথায় আদপেই সায় দিতে চায়নি। 
তিনি বরং খুনশুটি ক'রে নানারকম ফোড়ন কেটে পাঞয়লকে চটিয়ে দিতে চাইলেন। 
তাতে অন্তত পথের কষ্ট একটু লাঘব হবে। এ-সব কথাকাটাকাটিতেই সকলে অন্তত 
সারাক্ষণই ক্লান্তির কথা ভাববে না। পাঁঞয়ল প্রায় ফেটেই পড়েছিলেন তার ফকুড়িতে, 
মেজাজ হ'য়ে উঠেছিলো তিরিক্ষি--যেটা একটু আশ্চর্যই, কেননা মানুষটি এমনিতে ভারি 
দিলখোলা, সদাশয়, একটু মজারও আছেন যেদিও নিজে টের পান না তিনি কতটা মজার 
মানুষ)। 

আর হা-হা ক'রে বয়ে যায় রোদ্দুরে-তাতা উদ্দাম হাওয়া, ধুলোর ঝড় তোলে। 
তবু আশায় বুক বেঁধে সবাই চলেছে কখন পৌছুবে পরবর্তী জলাশয়ে-লেক সালিনার 
তীরে। 

কিন্তু পথশ্রমে আর তৃষ্জায় জেরবার হ'য়ে লেক সালিনায় এসে দেখা গেলো, শুকনো 
মরা খাত, একফৌটাও জল নেই, গরমে সব জল শুষে নিয়েছে কেউ যেন এক গণ্ডষে, 
খাতটার মাটি প'ড়ে আছে ফুটি ফাটা! এবার তাহ'লে খরা কী-রকম ভয়াল হয়েছিলো ? 
এককালে তো বড়োলোক কোনকিস্তাদোরেরা বুয়েনোস আইরেস থেকে এই জলাশয়ের 
জল নিয়ে যেতো, যেহেতু এই জলে খনিজ পদার্থ আছে, চিকিৎসকদের মতে তা নাকি 
প্রায় মৃতসঞ্ীবনী-এত স্বাস্থদায়ক, বলকারক। রোদ্দুরের আচে এখন কি না সেই 
জলাশয়ের জল শুষে গিয়েছে । শুধু কোথাও-কোথাও কাদামাখানো এক-আধফোটা জল 
চিকচিক করছে, শুধু যেন আয়নার মতো কতগুলো হতাশ মুখকে ফিরিয়ে দেখাবে 
বলেই, শুধু ব্ঙ্গ করার জন্যেই যেন এই ক-ফৌটা জল বয়ে গেছে-তলানি। 

জল পাবে প্রত্যাশা ক'রে এসেছিলেন বলেই জলাশয়ের তলদেশটাকে তাদের 
কাছে ঠেকলো খরামাটির অট্টরহাসির মতো। আর সেই সময়ে তাদের কাছে একটা নতুন 
উপায় বাংলালে তাদের পথপ্রদর্শক। সে বললে দলটাকে দু-ভাগে ভাগ হ'য়ে দু-দিকে 


৬ 


যেতে হবে। একদল যাবে ৩৭০ ডিগ্রি সমান্তর ধ'রে নাকবরাবর, সোজা সামনে-তিরিশ- 
বত্রিশ মাইল দূরে একটা ছোট্ট নদী আছে, গুয়ামিনি, তাকে লক্ষ্য ক'রে। সে-দলটায় 
লর্ড গ্লেনারভন আর রবাটের সঙ্গে রইলো পাম্পারই বজ্রনিনাদ--ত্রোনিদো। অন্যদলটা 
যাবে ঘোরাপথে, মাইল-পঁচাত্তর যেতে হবে তাদের, ঘোরাপথ হ'লেও দক্ষিণগামী এই 
পথটা সহজতর। অতটা পথ ঘুরে যাবে বলেই পথ বেকে গিয়ে দল দুটিকে মিলিয়ে 
দেবে একসময়। 

পরের দিন ভোরবেলায়, রোদ তেতে ওঠবার আগেই, বেরিয়ে পড়লো সবাই। 
ঘোড়ারা টের পায় কোথায় কোন দিকে জল আছে । হাওয়ায় যেন জলের সোদা গন্ধ 
পায় তারা। ভ্রোনিদোর ঘোড়াই শুকে-শুকে শেষটায় বেলা তিনটে নাগাদ তাদের নিয়ে 
এলো গুয়ামিনি নদীর ধারে- প্রায় মরীয়ার মতো চেষ্টা ক'রেই ঘোড়া ছুটিয়েছিলেন তারা, 
তাই বেলা প'ড়ে যাবার আগেই এসে পৌছেছেন নদীর ধারে। অবশেষে, তৃষ্তার শাস্তি : 
জলের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে জল খেয়ে বাচলো সবাই--ঘোড়া আর মানুষের মধ্যে জলপানের 
ধরনে কোনো তফাৎংই রইলো না। পাম্পা বোধহয় একসময় এইভাবেই আধুনিক মানুষকে 
আদিম মানুষে বদলে দেয়-উবু হ'য়ে বসে, বা শুয়েই বলা যায়, সেই দূর-অতীতের 
মানুষের মতোই জলপান করলেন লর্ড গ্লেনারভনরা। 

জল যেই অবসন্ন মানুষগুলোর সাড় ফিরিয়ে আনলে, অমনি মনে হ'লো এ-কদিন 
ঠকমতো খাওয়াদাওয়াও হয়নি-তৃষ্তার জল ছিলো না ব'লে তখন কারু নজরই ছিলো 
না ভোজ কী জুটলো। এবার মনে হ'লো অন্যদের জন্যে অপেক্ষা করতে-করতে যদি 
কোনো শিকার জোটে--তবে নিছক অপেক্ষা ক'রেই সময় কাটাতে হবে না তাদের, 
বরং অন্যদের জন্যে যদি কোনো ভূরিভোজের ব্যবস্থা করা যায় তবে সকলকেই তাক 
নাগিয়ে দেয়া যাবে-বিশেষত ত্রোনিদো যখন জানালে এখানে জল আছে ব'লেই 
মাশপাশে জীবজস্ত্রর দেখা মিলবে-এর আগে তো কেবল গেছে ধৃ-ধু শুকনো খরায়- 
ফাটা জমি। 

শিকারের নামে রবার্ট নেচে উঠেছিলো। তারই উৎসাহে শিকারের খোজে বেরিয়ে 
পড়লেন লর্ড গ্লেনারভন। কিছুদূর যাবার পরই দেখা গেলো পিপীলিকাভুকদের- 
মার্মাদিলো--বর্মের মতো কঠিন আশেভরা ছোটো-ছোটো জীব--ছোটো-ছোটো 
টাটপতঙ্গ খেয়েই তারা বাঁচে, প্রধান খাদ্য অবশ্য পিঁপড়েই, যেজনোে নাম পিপীলিকাভুক; 
5বে এদের শিকার করা ভারি কঠিন, একটু ভয় পেলেই তারা গুটিয়ে যায় একটা উলের 
[লের মতো, আর বর্মের মতো কঠিন আশ চারপাশে একটা ঢাকা তৈরি ক'রে তোলে। 
ত্রানিদো বলেছিলো, এই কঠিন আশের তলায় আছে সুস্বাদু নরম মাংস--লাতিন 
মামেরিকার এই জীব ভয় পেলেই তার বর্মের বলের মধ্যে ঢুকে পড়ে গড়িয়ে গিয়ে 
তে ঢোকে, বিদ্যুৎছেগে, অতএব দেখবামান্র গুলি করতে হবে। অনেকবার চেষ্টার পর 


৬৩ 


রবার্ট শেষকালে একটি আর্মাদিলো শিকার করতে পেরেছিলো। সেই মাংসে তাদের দিবি; 
ভোজ হ'য়ে গেলো, কিন্তু তবু অন্যদের কোনো দেখা নেই। এদিকে রাত হ'য়ে আসছে: 

ত্রোনিদো বলেছিলো জল যেহেতু আছে, অতএব থাকার কোনো আস্তানাও যা-হোক 
মিলে যাবে । আর মিলেও গেলো অবিশ্যি: একটা ভাঙাচোরা র্যানচের কোর্যালে- সেই: 
যেখানে র্যানচের জীবজন্তু রাখা হয়, খোঁয়াড়ই আর-কি একধরনের ' গাছের গুড়ি, ডাল, 
কাঠের ফালি--সব দিয়ে তৈরি করা, ওপরে একটা ছাউনি আছে, তিনদিক বন্ধ, 
আরেকদিকে আড়কাঠ দিয়ে আটকানো দরজা, আড়কাঠগুলো গেছে সমান্তরভাবে, 
সেগুলো তুলে নেয়া যায়, অমনি সামনেটা পুরো হাট ক'রে খোলা যায়। দক্ষিণ 
আমেরিকায় তারা একে বলে রামাদা। অর্থাৎ, একদিক দিয়ে, এখানে শোয়া মানে খোলা 
জায়গাতেই শোয়া, তবে একদিক থেকে নিশ্চিন্ত। পরিত্যক্ত, ভাঙা র্যান্চ, কেউ কোথাও 
নেই; তাছাড়া রামাদার মাথার ওপর তো ছাউনি আছে একখানা । শুতে যাবার আগে 
কিছু কাঠ জোগাড় ক'রে জড়ো ক'রে রাখলে তারা-কতক্ষণ থাকতে হবে কে জানে, 
পরে রান্নাবান্নার কাজে সুবিধে হবে। কিছু খড় অব্দি জুটে গেলো তাদের, খড়ের বিছানায় 
আয়েস ক'রে শোবামাত্র গাঢ় ঘুম, 'এই ক-দিনের অবিরাম পরিশ্রমের পর শরীর ভেঙে 
অবসাদ নেমেছিলো, তাই গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে মোটেই কোনো সময় লাগেনি। 

কিন্তু নিশুত রাতে, তখন মাঝরাত পেরিয়ে গেছে বোধহয়, কেমন-একটা অস্বস্তিতে 
ত্রোনিদোর ঘুমটা ভেঙে গেলো। অন্যরা ঘুমিয়ে প্রায় কাদা, চারপাশে অন্ধকার ; ত্রোনিদো 
ঠিক বুঝতে পারলে না অমনভাবে হঠাৎ তার ঘুমটা ভেঙে গেছে কেন। তার জীবনটা 
শিকারির, রাত-বিরেতে অজানা-অচেনা বনে-বাদাড়ে তাকে শুতে হয় দরকার হ'লে, 
ঘুমটা তার স্বভাবতই পাৎলা--যেন ঘুমের মধ্যেও তার যষ্টেন্দ্রিয় সারাক্ষণ সজাগ থাকে 
অনেকক্ষণ ধ'রে চুপটি ক'রে সে কোর্যালের খুঁটিগুলোর ফাক দিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারের 
দিকে তাকিয়ে রইলো। উহ, না, কিছুরই কোনো সাড়া নেই। কিন্তু তবু তার ঘুম এলো 
না। তার ইন্দ্িয়বোধ প্রথর, সজাগ--তারাই তাকে আগে থেকে হুশিয়ার ক'রে দেয়। 
তার অবচেতন মন ঘুমের মধ্যেও যেন কোনো বিপদের গন্ধ পেয়েছে। 

ঘোড়াগুলোর মধ্যে তারই ঘোড়াটি শুধু দাড়িয়ে-দাড়িয়ে ঘুমুচ্ছে-যেন ইশারা 
পেলেই ছুটবে ক্ষিপ্রগতিতে--তার চটকা ভেঙে যাবে। অন্য ঘোড়া দুটো মাটিতে নেতিয়ে 
শুয়ে আছে_-তাদের সম্ভবত এতটা ধকল সহা ক'রে অভ্যেস নেই। 

ত্রোনিদো উৎকর্ণ হ'য়ে শুয়ে রইলো, অনেকক্ষণ- বোধহয় একঘন্টা হবে-শুয়ে 
রইলো মানে, রইলো ঠিক আধশোয়া অবস্থায়, যে-কোনো মুহূর্তে সে তড়াক ক'রে 
লাফিয়ে উঠবে, প্রয়োজন বোধ করলে । এই ঘুম আর জাগরণের মধ্যে অস্পষ্টতার 
মাঝখানে হাজার ক্লাস্ত থাকলেও সে কিন্তু সুপ্রস্তুত। 

হঠাৎ, দূরে, আধার ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো ছোটো-ছোটো কতগুলো আলোর ফোটা। 


৬৪ 


এমন সময় ত্রোনিদোর ঘোড়াটাও কেমন অদ্ভুত ছটফট ক'রে উঠলো। বিপদের গন্ধ 
সেও পেয়েছে। 

অন্ধকারে, ঘাসের মধ্যে অস্ফুট সর-সর আওয়াজ--কারা যেন স'রে-স'রে যাচ্ছে। 
হঠাৎ যেন তারই মধ্যে একসঙ্গে গরর্গর্‌ ক'রে উঠলো বুনো খ্যাপা কুকুর আর নেকড়ে। 
এই অদ্ভুত গর্জন শুনেই ভ্রোনিদো তার বন্দুক তুলে অন্ধকার লক্ষ্য ক'রে একটা গুলি 
ছুড়লো-আর বন্দুকের শব্দ মিলিয়ে যাবার পরেই আবার সব আগের মতো নিঃঝুম 
হ'য়ে এলো। কিন্ত্ব ততক্ষণে, বন্দুকের আওয়াজ শুনে, ধড়মড় ক'রে উঠে বসেছেন 
লর্ড গ্লেনারভন, আর রবার্টও তখৈবচ। 

ত্রোনিদো শুধু অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, “জাগুয়ার ! 

অর্থাৎ ট্রপিক্যাল আমেরিকার সেই বৃহৎ বন্যবিড়াল, যে লেপার্ডের চাইতেই যে 
আকারে বড়ো ও পৃ্থুল তা-ই নয়, তার চাইতেও ধূর্ত ও শক্তিশালী, খয়রির সঙ্গে হলদে 
মেশানো পেশল গায়ে কালো-কালো ফুটফুট ছোপ। 

ত্রোনিদোর কথাটাকে যেন প্রমাণ ক'রে দিতেই আবার শুরু হ'য়ে গেছে রাগি গরগর 
আওয়াজ। যেন দল বেধে এসেছে কত জাগুয়ার, আর খিদেয় হন্যে হ'য়ে পরম্পরের 
সঙ্গে যুঝেই যে পায়ে সামনে এগিয়ে আসতে চাচ্ছে। 

একটু আশ্চর্যই। এরা এমনিতে আসে নিঃশব্দে, চুপি-চুপি ঝাপিয়ে পড়ে শিকারের 
ওপর, অব্যর্থ কৌশলী লাফে, ছিড়ে খায় শিকারকে, তারপর, যেমন নিঃশব্দে এসেছিলো 
তেমনি নিঃশব্দে মিলিয়ে যায়। 

এই রেযারেধি ক'রে গরগর ক'রে নিজেদের জানান দিয়ে কখন এসে চড়াও হয়েছে 
তখন বোঝাই যায় কতটা ক্ষধিত এরা, কতটা বৃভুক্ষু,। আর তাই, কতটা হিংশ্্র হয়ে 
উঠেছে এখন। 

কিন্তু এখন এ নিয়ে ভাবার কোনো ফুরসৎ নেই। এই নিশুত রাতের আতঙ্ককে 
যে-ক'রেই হোক ঠেকাতে হবে। প্রথমে যত কাঠকুটো ছিলো, সব জড়ো ক'রে র্যান্চের 
মুখে জ্বালিয়ে দেয়া হ'লো--এই আগুনের গণ্ডি পেরিয়ে আসতে এরা ভয় পাবে, তাছাড়া 
অন্ধকার দূর হ'য়ে যাবে ব'লে এই মরণদূতগুলোকে চর্মচক্ষে দেখাও যাবে। আর একটু 
বেশামাল দেখলেই, বেগতিক দেখলেই, অগত্যা চালাতে হ'লো বন্দুক। অনিচ্ছাসত্েও। 
কেননা গুলি বেশি নেই, ভয় পেয়ে সব একসঙ্গে মুহ্মু গুলি ছুঁড়ে খরচ করা চলবে 
না, গুনে-গুনে হিশেব ক'রে খরচ করতে হবে গুলি, সাবধানে--যাতে একটা গুর্লিও 
না-ফসকায়, যাকে তাগ ক'রে গুলি-করা হবে সরাসরি তার গায়ে যেন তা বেধে। 

কিন্তু গুলি এত কম ছিলো যে তাও একসময় শেষ হ'য়ে গেলো। আহত, ভ্ুদ্ধ, 
হন্যে, ক্ষধিত নেকড়েরা তখনও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, গুলিগোলার কোনো পরোয়া না- 
ক'রেই। ফলে গুলি ফুরিয়ে যেতে শুরু হ'য়ে গেলো বন্দুকের বাঁট আর দ্কুরি দিয়ে 


ইন সার্চ : ৫ রহ 


আত্মরক্ষার চেষ্টা। আর আগুনের কুগুও ক্রমে, জ্বালানির অভাবে, নিভু-নিভু হয়ে 
আসছে। জাগুয়ারের দল কিন্তু এবার র্যান্চের পেছন দিয়ে ঢোকবার চেষ্টা করছে। পারলে 
বুঝি খুটিগুলো উপড়েই ফ্যালে। 

এবার সটান উঠে দাঁড়ালে ত্রোনিদো, তার ঘোড়াটাও এতক্ষণ বেদম অস্থির হয়ে 
ছটফট করছিলো, নাক দিয়ে নিশ্বাসে ছড়াচ্ছিলো গরম হলকা, চোখ দুটোয় যেন আগুন 
জ্বলছিলো। লাগাম হাতে নিয়ে তার ঘোড়ার পিঠে যেই সে চাপতে যাবে, অমনি লর্ড 
গ্লেনারভন তার হাত চেপে ধরলেন। 

অস্থির-একটা মৃকাভিনয় মারফৎ ভ্রোনিদো বোঝাবার চেষ্টা করলে তাদের বিপদের 
মধ্যে ফেলে রেখেই নিজের প্রাণ বাচাবার জন্যে সে পালিয়ে যেতে চাচ্ছে না, বরং সে 
বেরিয়ে গেলে জাগুয়ারেরা ভাববে যে এতক্ষণে বাগে পাওয়া গেছে শিকারকে, তার 
পেছন-পেছন ছুট লাগাবে--কিন্তু ত্রোনিদোর ঘোড়া হাওয়ার চাইতেও বুঝি জোরে ছোটে, 
তাই জাগুয়ারগুলো তার পেছনে প্রাণপণে ছুটে এলেও তার নাগাল ধরতে পারবে না, 
সে জাগুয়ারগুলোকে প্রলোভন দেখিয়ে টেনে নিয়ে যাবে দূরে, আর তাতে লর্ড 
গ্লেনারভন আর রবার্ট আপাতত বেচে যাবেন। 

র্যান্চের মুখটার কাছে তখন জাগুয়ারেরা নেই। কিন্তু ভ্রোনিদো আর লর্ড গ্লেনারভন 
সন্তর্পণে গিয়ে যখন আস্তানার মুখটা দেখছেন, জাগুয়ারেরা কোথায়, সেই সময়ে দুরন্ত 
ঝড়ের গতিতে ত্রোনিদোর ঘোড়ায় চেপে তাদের পাশ দিয়ে অন্ধকারে ছুটে চ'লে গেলো 
রবার্ট, আর পেছন-পেছন অমনি ধেয়ে গেলো হন্যে ও ক্ষুধিত জাগুয়ারেরা। 

ত্রোনিদো আর লর্ড গ্রেনারভন শুধু হতভম্ব নন, আংকেও উঠেছেন। এ কী করলে 
রবার্ট ? 

এদিকে ভোর হ'তে তখনও ঘণ্টা দু-এক বাকি। কী-যে করবেন, কিছুই বুঝতে 
পারছিলেন না লর্ড গ্লেনারভন। শুধু ছটফট করা ছাড়া, অধীর হ'য়ে আলো ফোটবার 
অপেক্ষা করা ছাড়া, আর কোনোকিছু করণীয় নেই। আলো ফুটতেই আর কালক্ষেপ 
নয়-দুজনে ঘোড়ায় চেপে পশ্চিমদিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন। 

খানিকটা দূর গেছেন, হঠাৎ শুনতে পেলেন পর-পর কতগুলো বন্দুকের আওয়াজ। 
তাকিয়ে দ্যাখেন, পাঞয়লরা ছুটে আসছেন, আর তাদের সকলের পুরোভাগে স্বয়ং রবার্ট, 
তাকে দেখে অক্ষতই মনে হয়, গায়ে আচড়টুকুও লাগেনি। 

লর্ড গ্রেনারভন স্বস্তির শ্বাস ফেলে রবার্টকে জড়িয়ে ধরলেন। জিগেস করলেন, 
“তুমি অমনভাবে ঘোড়া ছুটিয়ে গিয়েছিলেন কেন, রবার্ট? 

অমনি, চটপট, সোজা জবাব এলো : “বা-রে, ত্রোনিদো এর আগে একবার আমায় 
বাঁচায়নি? আমায় তো তার একটা প্রতিদান দিতে হয়। তাছাড়া আপনাকেও নিরাপদ 
রাখা কর্তব্য আমার : কারণ আপনিই তো চলেছেন আমার বাবাকে উদ্ধার করতে । 


৬৬ 


এহেন যুক্তির কাছে আর কোনো কথাই চলে না, তবে লর্ড গ্রেনারভনের দায়িত্ববোধের 
মধ্যে রবার্টের এই দুর্দান্ত কাণ্ডটা কাটার মতো খচখচ ক'রে বিধছিলো। এই কিশোরের 
যদি কিছু হয়, তবে তার দায় তো তাকেই সামলাতে হবে। পরে কখনও রবার্টকে আলাদা 
ক'রে ডেকে নিয়ে আচ্ছা ক'রে ধমকে দেবেন ভেবে তখন আর এ নিয়ে তিনি কোনো 
উচ্চবাচ্যই করলেন না, কেননা এই সমুহ বিপদ থেকে এভাবে উদ্ধার পেয়ে সবাই তখন 
উচ্ছ্বাসে প্রায় যেন ভেসে যাচ্ছে-বলাই বাহুল্য, পাঞয়লের উচ্ছ্বাসটাই অন্যসকলের 
চাইতে যৎকিঞ্চিৎ বেশি। 

উচ্ছ্বাসের মধ্যে একটু রাশ টেনে ধরবার পরেই সবাই দল বেধে ফিরে এলেন 
র্যানচে। গত রাতের হুলুস্থুলু যুদ্ধে বেশ-কিছু জাগুয়ার অক্কা পেয়েছে- কিন্তু র্যানচের 
খুটিগুলোকে তারা খুব-একটা অক্ষত রাখেনি। হামলাটা যেমন প্রচণ্ড আর ভয়ংকর 
হয়েছিলো, তেমনি তাদের ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টাটাও হয়েছিলো প্রচণ্ড আর জীবনপণ। 
কত-যে জাগুয়ার এসেছিলো কে জানে, আর তাদের সঙ্গে লড়েছিলো কি না মাত্র 
তনজনে- যতই মরীয়! হ'য়ে লড়াই করুক, সংখ্যায় যে তারা নগণ্যই ছিলো, সে-কথাটা 
মন্বীকার করবে কে। 

অন্যদের জন্যে যৎকিঞ্চিৎ মাংস তুলে রেখেছিলো ত্রোনিদো। তাই দিয়েই হলো 
্লাতরাশ, বেশ আয়েশ ক'রেই খাওয়া গেলো, তারিয়ে-তারিয়ে, কিন্তু তাতে কি আর 
নকলের খিদে মেটে! অর্থাৎ উত্তেজনার ধকলটা একটু কমলে ফের তাদের খাদ্যসংগ্রহের 
্াজটায় মনোযোগ দিতে হবে। 
থকে। তারপর দিনের পর দিন কেটেছে, কিন্তু আর্হেনতিনার এই বিশাল তৃণভূমি যেন 
মার ফুরোয়ই না। প্রায় একটানাই পথ চলেছেন তারা। বন্য জন্ত্রর অতর্কিত উপদ্রবে 
মার হামলায় দু-একবার তাদের থমকে পড়তে হয়েছে বটে, কিন্তু সে নেহাৎই 
নাময়িকভাবে। তাছাড়া আর-কারু সঙ্গেই তাদের দেখা হয়নি। অথচ সেটাই বরং একটা 
প্রহেলিকা। পথের মাঝে-মাঝে ইগ্ডয়ানদের বসতি চোখে না-পড়ুক, দলছুট কোনো 
শিয়ানের সঙ্গেও তাদের দেখা হয়নি। অথচ এ-সব অঞ্চলে নাকি আর্হেন্তিনার 
গিয়ানদের দেখা পাওয়া যায় প্রায়ই। শুধু একবার তিন জন সশস্ত্র ঘোড়সোয়ারকে দেখা 
য়েছিলো দূর থেকে, আর তারা ছিলো ইগ্ডয়ান- কিন্তু & দূর থেকেই যা দেখা - 
কননা তাদের দেখেই অন্যদিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়ে তারা ঝড়ের বেগে চোখের আড়ালে 
"লে শিয়েছিলো। এরা কি তবে ইগ্ডিয়ান ছিলো না? ছিলো দো-আঁশলা, ক্রেয়োল বা 
মস্তিসো, আর গাউচো বা কাউবয় হিশেবেই যারা খেতখামার সামলায়? পাঞয়লের 
তে অবশ্য এরা মোটেই গাউচো নয়, বরং বান্দিতো, দসু-তার চোখে সবাইকেই 
বাধহয় ডাকাতের মতো দেখায়। 


৬৭ 


তেসরা নভেম্বর পাম্পার অন্য প্রান্তে এসে পৌছুবার পর ত্রোনিদো পরামর্শ দিলে, 
আরো যাট মাইল পথ পেরিয়ে ফোর্ট ইনডিপেনডেন্সে শিয়ে খোঁজ করা যাক, কাণ্ডে 
গ্রান্টকে যারা পাকডে কয়েদ ক'রে রেখেছে সেই ইগ্ডয়ানদের কোনো খোজ মেলে কি 
না। প্রস্তাবটা সকলেরই মনে ধরলো। এখানে র্যানচের মধ্যে খবরদারির চিহ্ন বেশ চোখে 
পড়লো। এই বিশাল তৃণভূমিতে পালে-পালে গোরুমোষভেড়া চ'রে বেড়াচ্ছে, প্রত্যেকটা 
জন্তুর গায়ে গরম লোহার ছ্যাকা দিয়ে মালিকের নাম মোহর ক'রে দাগানো, আর তাদেব 
আগলে আর সামলে নিয়ে বেড়াচ্ছে কুকুর। শিক্ষিত কুকুর এ-সব, ভারি ওস্তাদ, নিজের 
কাজ ভালোই জানে। কখনও-কখনও এমনও হয় যে দু-চারজন মাত্র গাউচো থাকে 
কোনো র্যানচে, তবে তাদের সঙ্গী থাকে দু্দীস্ত সব ঘোড়া আর অনেকগুলি ক'বে 
পোষমানানো শেখানোপড়ানো কুকুর। 

ফোর্ট ইনডিপেনডেনস বা আজাদগড় সমুদ্র থেকে হাজারফিট উঁচুতে ।। দেয়াল 
দিয়ে ঘেরা, যাতে শত্রুর আক্রমণ ঠেকানো যায়। এককালে যখন এটা তৈরি হয়েছিলো 
তখন লাতিন আমেরিকাব রাজনৈতিক ভূগোল অনবরত ভোল পালটাচ্ছে-তখন মুহুমু 
চলেছে যুদ্ধবিগ্রহ, আর যতবারই হাত পালটাক সবসময়েই ছিলো একটা সাজো-সাজো 
রব। 

অভিযাত্রীরা অবশ্য এখন আজাদগড়ে পৌছে একবারেই হতভম্ব হ'য়ে গেলেন। 

কেল্লার ভেতরে বেশ উৎসাহভরে এখন যারা কুচকাওয়াজ করছে তারা প্রায় সবাই 
ছেলেমানুষ। উনিশ-কুড়ি বছরের চাইতে বড়ো-কেউ নেই--কিস্তু দলে-দলে আছে ছোটো 
ছেলে, তাদের বয়স সাত-আট থেকে শুরু । ছোটোদের পরনে পন্চো, কোমরে বেলট 
দিয়ে বাঁধা। মন্ত লম্বা তলোয়ারগুলো কোনো-কোনো ছেলের নিজের দৈঘ্যের চাইতেও 
দীর্ঘ হবে, তাছাড়া আছে বন্দুক, আর সে-সব সমেতই তারা ফরাশি কফেতায় কুচকাওয়াজ 
ক'রে চলেছে। বয়েস যাব যে-রকমই হোক না কেন, সকলেই গড়ন আর মুখচোখ একই 
রকম, সম্ভবত একই বাড়ির ছেলে। আর এরা যদি সবাই ভাই-ভাই হয়, তবে তাদের 
কুচকাওয়াজ করাচ্ছে সবচেয়ে বড়োভাই--সেই-ই স্বভাবতই এই ইউনিটের সর্দার। এ- 
রকম ইউনিট নাকি অনেক আছে এখানে-পাঞয়লের পণ্িতি বয়ান-.কেননা এখানে 
একেকটা পরিবারে অনেক সন্তান জন্মায়, তবে পাঞয়লের পড়া বিদ্যের বুলি কি না, 
তাতে একচিলতে নূন ছিটিয়ে নিতে হয় সবসময়। 

ফোর্ট ইনডিপেন্ডেন্স বা আজাদগড়ের তত্বাবধানের দায় সার্জেন্ট মানুয়েলের 
ওপর । জশ্মেছিলেন ফ্রান্সে, কিন্তু এখন এখানকার মেয়ে বিয়ে ক'রে তিনি এখানকারই 
একজন হু'য়ে গেছেন--বন্মিন্কালেও আর ইওয়োপে ফেরবার মতলব নেই তার। 

সার্জেন্ট মানুয়েল মানুষটা খোলামেলা, দিলপরিয়া, হাসিখুশি 

উঁহু, না, কাণ্ডেন গ্রান্টের কোনো খোঁজ তিমি রাখেন না। তার নামই তিনি নাকি 


৬৮ 


পের জন্মে শোনেননি । তবে বেশ-কয়েক বছর আগে একজন ইতালীয় আর একজন 
'রাশিকে ধ'রে আনে ইগ্ডয়ানরা। ইতালীয়টির হম্বিতন্বি আর বদমায়েশি দেখে তাকে 
জা দেয়া হয় : প্রাণদণ্ড। তবে ফরাশি ভাগ্ানম্বেষী বা ফরঢুনহানটার বা সম্পদশিকারি 
লিয়ে যান। না-না, এদের কেউই ইংরেজ ছিলেন না-_ গ্রেটব্রিটেনের এরা কেউ নন ! 

এদিকটায় যে ইগ্ডিয়ানদের কেন দেখা যাচ্ছে না, সেই ধাধাটারও একটা সমাধান 
লে দিলেন সার্জেন্ট মানুয়েল। পারাগুয়াইয়ের সঙ্গে বুয়েনোস আইরেসের একটা 
|ড্ডাহাড্ডি লড়াই চলেছে-ইগ্ডিয়ানরা সবাই গেছে সেখানেই-কেউ লড়াই করতে, 
₹উ-বা লুঠপাট করার সুযোগ খুঁজতে। 

সার্জেন্ট মানুয়েলের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথাবার্তা ব'লে একটা ব্যাপারে অন্তত নিশ্চিন্ত 
ওয়৷ গেলো। কাণ্তেন গ্রান্ট এখানকার ইগ্ডিয়ানদের হাতে বন্দী হননি-অর্থাৎ এখান 
ধকে আআটলান্টিকের তীর অব্দি পুরো তন্লাটটাতেই তার দেখা আর পাওয়া যাবে না। 
ই মুলুকেই নেই তিনি। 

পাঞ্য়ল বললেন : “এ চিরকুটটা আরেকবার ভালো ক'রে দেখা দরকার । কাণ্তেন 
ন্ট আদপেই কোনোদিন এই নতুন মহাদেশের মাটিতে তার পা রেখেছেন কি না 
ন্দেহ! এই বিশাল পাম্পায় যখন নেই, তখন গোটা লাতিন আমেরিকাতেই নেই। অথচ 
কাথায় আছেন, তার হদিশ দেয়া আছে এই চিরকুটটাতেই। ধীধার মতো ঠেকছে বটে, 
বে সব ধাধারই তো সমাধান হয়। এর সমাধান যদি করতে না-পারি, তাহ'লে আমার 
ম আর জাক পাঞয়লই নয়! 

তার এমন লম্বাইচওড়াই আশ্বাস সর্তেও অবশ্য রবার্ট কী-রকম যেন মিইয়ে গেলো। 
ত-দূরে নূতন জগতে এসেও বাবার কোনো সন্ধান পাওয়া গেলো না! 


নয় 


খ্যাপাজল আর পাখির বাসা 


াজাদগড় থেকে টানা দেড়শো মাইল গেলেই- আটলান্টিক। 

এতটা পথ যখন পেরিয়ে আসা গেছে, তখন এঁ বাকি দেড়শো মাইল পেরুতেও 
হমন কী আর ঝামেলা হ'তে পারে? বিশেষত এখন যখন ধ'রেই নেয়া গেছে যে 
প্তেন গ্রান্ট আর যেখানেই থাকুন এই নৃতন জগতে যখন নেই, তখন নানা স্থানে- 
মস্থানে থেমে গিয়ে তার খোঁজ না-করলেও হয়তো চলবে ! ফলে এই দেড়শো মাইল 


৬৯ 


নিশ্চয়ই অনায়াসেই পেরিয়ে যাওয়া যাবে। 

তবে লোকে ভাবে এক, আর তাতে বাদ সাধেন প্রকৃতিঠাকরুন। এই দেড়শো 
মাইলের মধ্যেই যে এমন বিপদ তাদের জন্যে ওৎ পেতে বসেছিলো, তা কে জানতো । 
পথের মাঝখানে ছোটো-ছোটো সব খরগোশকে হুড়মুড় ক'রে লাফিয়ে-লাফিয়ে পালিয়ে 
যেতে দেখে কারু-কারু অবশ্য সন্দেহ হয়েছিলো যে কিছু-একটা ঘটতে চলেছে। এরা 
টের পায়, এই ছোটো জীবগুলো- কেমন ক'রে, কে জানে। তাছাড়া বিশাল পাম্পা যেন 
কেমন ভেজা-ভেজা স্টাৎসেঁতে ঠেকছিলো গোড়া থেকেই। মাঝে-মাঝে জল জ'মে 
আছে- জলাশয় নয়, অথচ মাটি একটু ঢালু হ'লেই কেমন যেন জল আটকে গেছে। 
আস্ত জায়গাটাই যেন একটা প্রকাণ্ড জলাভূমিতে পরিণত হ'য়ে গেছে । আর এ-সব হঠাং- 
গজানো জলাভূমি যে বেশ-বিপজ্জনক তার প্রমাণও পাওয়া গেলো এক জায়গায় : মাটির 
মধ্য থেকে গাছের গুড়ির মতো উঠে আছে রাশি-রাশি শিং : অর্থাৎ এই জলাভূমি আবাব 
কোথাও-কোথাও চোরাবালিতেও ভর্তি : নিশ্চয়ই একদঙ্গল ষাঁড় এখান দিয়ে যাবার সময় 
চোরাবালিতে ডুবে গিয়েছে : শুধু তাদের শিংগুলোই জানান দিচ্ছে কীভাবে এই অনিচ্ছুক 
বুনো ষাঁড়গুলোকে জীবন্ত সমাধি মেনে নিতে হয়েছে। না কি এর পেছনে অন্যকোনো 
কারণ আছে? 

এই শিংগুলো দেখবার পর থেকেই সবাই কেমন যেন ঘাবড়ে গিয়েছে । এমনকা 
ত্রোনিদো অব্দি গুম হ'য়ে আছে, যেন ভারি উদ্ধিগ্ন। মাঝে-মাঝে এদিক-ওদিক ডানদিকে 
বামদিকে ছুটে-ছুটে যাচ্ছে, ঘাড় উঁচিয়ে কী-সব লক্ষ করবার চেষ্টা করছে, কপালে ভাজ 
আর ভ্রুকুটি। শেষটায় সে একসময় পাঞয়লকেই খুলে বললে তার দুশ্চিন্তার কারণ' 
এ-তল্লাটে এ-সময়টায় সাধারণত অত ডোবা, পুকুর বা জলা থাকে না। এখন পর-পর 
শুধু এসব ছোটোখাটো জলাই বা চোখে পড়ছে কেন? 

রাত কাটাবার জন্যে সবাই মিলে আশ্রয় নয়েছিলো একটা ফাকা, পরিত্যক্ত 
র্যান্চে ! সারাদিন পথচলার ধকল গেছে। তার ওপর মাথার মধ্যে যদি সারাক্ষণ কোনে 
অজানা বিপদের আশঙ্কা হানা দিয়ে ঘুরে বেড়ায় তাহ'লেও খুব কাহিল লাগে। খেয়ে 
দেয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিলো । ঘুম ভাঙলো তুমুল বৃষ্টির জন্যে! মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে, 
যেন মহাপ্লাবনের আগের রাত। ঘোড়াগুলো কেমন যেন দাপাচ্ছিলো, অনবরত পা 
ঠকছিলো। অর্থাৎ কোনো কারণে তারা ভারি অস্থির হ'য়ে পড়েছে, এই ভোররাত্তিরে 
বৃষ্টি মাথায় ক'রেই বেরিয়ে পড়তে চাচ্ছে। এরাও নিশ্চয়ই আগে থেকেই বিপদের গন্ধ 
পায়- নইলে হঠাৎ এমনভাবে পা ঠকবে কেন অস্থির আর দামাল! 

ত্রোনিদো সব্বাইকে জানালে, এক্ষুনি বেরিয়ে পড়তে হবে-_লক্ষণ খুব-এব 
সুবিধের ঠেকছে না। 

এ ঝড়বৃষ্টির মধ্যেই দলটা বেরিয়ে পড়লো। পথে এর মধ্যেই জল জ'মে যে 


৭০0 


শুরু করেছে, ঘোড়ার খুর ডুবে যাচ্ছে জলে, কিন্তু তবু তারা নিজে থেকেই, কেউ চেতিয়ে 
না-দিলেও, তীব্রবেগে ছুটে চলেছে উত্তরে। 

আর তাদের এই তাড়ার কারণটা চোখে না-পড়লেও-কানে শোনা গেলো 
পরক্ষণেই। পেছন থেকে কানে ভেসে এলো গভীর গন্তীর গুমগুম শব্দ, যেন কোথাও 
বাজ গড়িয়ে যাচ্ছে। আর তারই সঙ্গে-সঙ্গে দলে-দলে ছুটে এলো কতরকম জীবজস্ত, 
জলে ছপছপ ক'রে ছুটে চলেছে তারা, খাদ্য-খাদকেও এখন কোনো ভেদাভেদ নেই, 
সবাই যেন কোনো-এক বিষম ভয়ে একসঙ্গে এখন ছুটে পালাচ্ছে নিরাপত্তার সন্ধানে । 
শুধু যে ডাঙার জীবজন্তু তা-ই নয়, মাথার ওপর দিয়ে আর্ত সুরে ডাকতে-ডাকতে উড়ে 
চলেছে কত-রকম পাখি। 

ঘোড়াগুলো তীব্রগতিতে ছুটেছে উত্তরদিকে-এ&ঁ জন্তুদের মতোই। এখন একটু 
ভাববারও ফুরসৎ নেই। যে-হারে পথে জল বাড়ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে এ-নিছকই 
বাদলার জল নয়, আরো-বেশিকিছু আছে সেইসঙ্গে। নিশ্চয়ই কল ছাপিয়ে ছুটে আসছে 
নদী-_বান ডেকেছে, ঝলকবান, চমকবান, হয়তো বাধও ভেঙেছে । হু-হু ক'রে জল বেড়ে 
যাচ্ছে। ঘোড়াগুলো এবার যেন সীৎরে পেরুচ্ছে, কদম-কদম ছুটতে পারছে না আর। 

প্রায় শো-খানেক গজ দূরে ছিলো মস্ত-একটা আখরোটগাছ, আর তার ওপর এসে 
যখন আছড়ে পড়লো বানের জল, প্রায় তার আদ্ধেকটা ডুবিয়ে দিয়েই, তখনই বোঝা 
গেলো এই অতর্কিত ও অপ্রত্যাশিত বিপদ কতটা ভয়াবহ। ঘোড়াগুলো ভেসেই গেলো, 
ছিটকে পড়লো আরোহীরা জলে : শুধু গ্রোনিদোব ওস্তাদ ঘোড়াটাই জলের সঙ্গে অনবরত 
বুঝ চলেছে, আর তার কেশর ধ'রে ভেসে চলেছে রবার্ট, রান পাঞ্য়লের জামার 
কলার ধ'রে সারে চলেছেন লর্ড গ্রেনারভন। পাঞ্য়ল কিছু-একটা বলবার জন্যে মুখ 
খুলেছিলেন, সম্ভবত বলতে চাচ্ছিলেন, “ভয কী- খাবডাবেন না- আম তো 'আছি সঙ্গে, 
কিন্ত মুখে একরাশ খ্যাপাজল ঢুকে যাওয়ায় আশ্বাস দেবার বদলে শুধু খাবিই খেলেন, 
আরেকটু হ'লেই হয়তো বেকায়দায় জল ঢুকে যেতো গলায়। 

আখরোট গাছটার কাছে এসে ত্রোনিদো এক-এক ক'রে সবাইকে গাছের ডালে তুলে 
দিলে। নিচে, ফেনিয়ে, চর্কি দিয়ে জল ছুটছে, আর ভ্রোনিদোর ঘোড়া এইবার সেই জলের 
তোড়ে কাবু হ'য়ে ভেসে গেলো উত্তবে। তা-ই দেখে আর একমুহূর্তও সবুর করেনি 
ভ্রোনিদো, সোজা ফের গাছের ডাল ছেড়ে দিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে এ খ্যাপাজলে, প্রাণপণে 
পরক্ষণেই ঘূর্ণিতোলা খ্যাপাজল ঘোড়া আর মানুষ দুজনকেই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে দূরে, 
উত্তরে। 

সেই মেঘলা ভোরবেলায় সবাই ফ্যালফ্যাল ক'রে তাকিয়ে-তাকিয়ে শুধু দেখলেন 
ত্রোনিদোর ভেসে-যাওয়া। এখন তাদের কোনো বাহন নেই, পথপ্রদর্শক নেই, তল্লিতক্লা 


৭১ 


নেই, ঠাণ্ডাও লাগছে একটু, এই অচেনা বিদেশ-বিজনে এসেই কি তবে শেষকালে 
এমনভাবে তাদের অভিযান শেষ হ'য়ে গেলো? কাণ্তেন গ্রান্টের কোনো সন্ধান তো 
পাওয়াই গেলো না, এখন উলটে তারা নিজেরা এসে পড়েছেন বিষম বিপদের মাঝখানে, 
এই তালদ্যাঙা গাছটার মগডালের কাছে, আর নিচে খ্যাপাজল থে-থৈ করছে, ফেনিয়ে 
চর্কি দিয়ে ছুটছে। 

ভাগ্যিশ গাছটা প্রায় একশোফিট উচু, আর তার গুডিটাও প্রকাণ্ড-আর 
ডালপালাগুলো প্রায় ছাতার মতো ছড়িয়ে আছে- অনেকখানি জায়গা জুড়ে, শূন্যে । তার 
জটিল ঝুরি আর শেকড় মাটির তলায় অনেকটা ছড়িয়ে জড়িয়ে-মডিয়ে আছে বলেই 
বাচোয়া, নইলে এ-গাছটাও কখন বানের ধাক্কায় ভেঙে পড়তো! এখনও যে উপড়ে 
পড়েনি, তা হয়তো এইজনোই যে গাছটা অনেককালের পুরোনো আর প্রকাণ্ড - হয়তো 
এককালে কোনাকিস্তাদোররা এখানে যে-তাগুব চালিয়েছিলো তারও সে সাক্ষী। 

নিচে খ্যাপাজল যেভাবে থে-থে করছে, তাতে মনেই হ'তে পারতো, এ বুঝি বানের 
জল নয়, সমুদ্রেরই কোনো খাঁড়ি। এত-বড়ো গাছটা পর্যন্ত জলের ধাক্কায় থরথর ক'রে 
কাপছে। নিচে, জলে ভেসে যাচ্ছে র্যানচের ছাদ, ওপড়ানো গাছপালা, মরা জীবজন্ত। 
ভেলার মতো ভেসে যাচ্ছিলো একটা গাছ--তার ওপর আশ্রয় নিয়েছে কত-যে জাগুয়ার, 
এখন আর তাদের গরগর আওয়াজে হিংস্র আক্রোশ নেই, বরং সে-আওয়াজ এখন কেমন 
যেন কাহিল, ক্ষীণ, আর্ত । 

লর্ড গ্লেনারভন বেশ-কিছুক্ষণ লক্ষ ক'রে এই সিদ্ধান্তে এলেন, জল এখানে বেশ 
গভীর বটে, আর তোড়ও ভয়ংকর, তবে জল আর বাড়ছে না- অর্থাৎ বন্যার প্রথম 
ধাক্কায় যা হবার হ'য়ে গিয়েছে, এরপর আর যদি বৃষ্টি না-পড়ে তবে এ-জল বাড়বার 
আর সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এ-জায়গাটা একটা ডেকচির মতো ঢালু--দু-পাশে উচু জমি, 
মাঝখানে এই ঢাল, সেইজন্যেই জপ এখানে অত গভীর, তাছাড়া জল যদি আর নাও 
বাড়ে, এই জল সরতে অনেক সময় লেগে যাবে। অর্থাৎ এই গাছকে আশ্রয় করে 
তাদের যে কতটা সময় কাটাতে হবে কে জানে ! 

হিশেব ক'রে লর্ড গ্লেনারভন. যতটা বুঝতে পেরেছেন, তাতে মনে হচ্ছে 
আযাটলাস্টিক এখান থেকে আর মাত্র চল্লিশ মাইল দূরে। মাত্র চল্লিশ মাইল দূরে ডানকান 
তাদের অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছে। কিন্ত্ত শুধু-যে এই চল্লিশ মাইল পথ অতিক্রম করা 
এখন একেবারেই অসম্ভব তা-ই নয়, ডানকানেও কোনো খবর পাঠাবার কোনো উপায় 
নেই। 

তার ওপর এখন, এক্ষনি, আরো-একটা সমস্যার সমাধান করা জরুরি। সেটা হচ্ছে 
খাবার। 

মেজর ম্যাকন্যাব্স জলে জবজবে-ভেজা ব্যাগ তুলে দেখালেন। তাতে যা খাবার 


৭২ 


আছে, তাতে হয়তো দিন-দুই চ'লে যাবে। কিন্তু তারপর? এ-জল যে কবে নামবে, 
কে জানে। দু-দিন পরে তাদের খাদ্যের সমস্যা মিটবে কী ক'রে? 

লর্ড গ্রেনারভন বললেন, “গাছে তো বেশ ক-টা পাখির বাসা আছে দেখছি বড়ো 
পাখিগুলো পালিয়েছে বটে, তবে তাদের ছানাপোনাগুলো আছে, ডিমও আছে। তাতেও 
নশ্চয়ই কয়েকটা দিন চলে যাবে।, 

“তাহ'লেও গোড়া থেকেই আমাদের সাবধান হ'য়ে খাবার খরচ করতে হবে- র্যাশন 
ক'রে দেয়া ছাড়া উপায় নেই, মেজর ম্যাকন্যাবস বললেন।“তবে ভ্রোনিদো জলে ঝাপিয়ে 
পড়ার আগে একটা মস্ত উপকার ক'রে গেছে। তাতে হয়তো একটু সুরাহা হবে-_' 

“কী? সবিম্ময়ে প্রশ্ন করলেন লর্ড গ্নেনারভন। 

“এই-যে, শুলিভর্তি এই ম্যাগাজিনট! সে আমার হাতে গুজে দিয়ে গেছে-আর 
এটা জলে ভেজেনি। 

“চমৎকার । তাছাড়া আমাদের দুজনের কাছেই তো রিভলভার আছে? 

“হ্যা। এবার জলটা নামলেই হয়।” 

পাঞয়ল একবার নাক সিটকোলেন। “খাবার যা আছে, তা তো কাচা। রান্া না- 
চরে খেলেই তো দফাবফা হবে-অসুখবিশুখ বাধিয়ে বসবো সবাই। 

“কাচা খাবার খাবেন কেন? ঝলসে নিলেই হবে? 

“ঝলসে যে নেবেন, আগুন জ্বালবেন কী ক'রে? 

“ধের্য ধ'রে একটু অপেক্ষা করুন, এক্ষুনি নিজের চোখেই রন্ধনপ্রক্রিয়া দেখতে 
শাবেন।, 

মগডাল থেকে বেছে-বেছে অপেক্ষাকৃত শুকনো পাতা জড়ো করা হ'লো নিচের 
গালে। বৃষ্টিধোয়া ফটফটে আকাশে ততক্ষণে সূর্য উঠেছে-বৃষ্টি ধরতেই মেঘও সরে 
গছে। এখন দেখে কে বলবে যে কাল রাতে এই আকাশই অমন-একটা দুর্যোগ তৈরি 
টিরেছিলে। দুরবিনের পরকলার মধ্যে ধরা হ'লো রোদ্দুর, সূর্যের রশ্মি, পরক্ষণেই নিচের 
গালের শুকনো পাতায় আগুন ধ'রে গেলো। 

প্রথম কাজ তো কোনোরকমে এই আগুনের আঁচে ভেজা জামাকাপড় শুকিয়ে 
নয়া। তারপর খাবারগুলো ঝলসে নিয়ে বেশ হিশেব ক'রেই খেয়ে নিলে সবাই। আর 
ঠরানল প্রশমিত হ'তেই পাঞ্য়ল দুরবিনটা হাতে ক'রে উঠে পড়লেন মগডালে, সেটা 
কি তার অবজারভেটরি, মানমন্দির, সেখান থেকে তিনি এখন দিগন্ত পর্যবেক্ষণ 
'রবেন। 

কাণ্তেন গ্রান্টের কোনো হদিশই তো এই নৃতন জগতে পাওয়া গেলো না-এখন 
টাহ*লে তারা তার খোঁজে আর-কোথায় যাবেন? 

নিচের ডালে বসে এই নিয়েই বলাবলি করছিলেন তারা। 


৭৩ 


মেজর ম্যাকন্যাবসের সুচিন্তিত অভিমত : “সাইত্রিশ ডিগ্রি সমান্তর ধ'রেই না-হ্য 
বরাবর যাওয়া যাক-তবে পথে কী পড়বে সেটাও জানা দরকার- 

“তাহ'লে মসিয় পাঞয়লকে জিগেস করা যাক-_: 

মসিয় পাঞয়ল তখন মগডালে বসে দুরবিনে চোখ এটে আছেন। সেখান থেকেই 
তিনি হেকে বললেন--“সাইত্রিশ ডিগ্রি সমান্তরে কী আছে? সেটা বলবার জন্যে নিচে 
নামবার কোনোই দরকার নেই। সাইত্রিশ ডিগ্রি সমান্তর আমেরিকা থেকে বেরিয়ে 
আ্যাটলান্টিকের ওপর দিয়ে ত্রিস্তান ডা কুনিয়া ছ্বীপটা পেরিয়ে উত্তমাশা অন্তরীপের দ. 
ডিগ্রি দক্ষিণ দিয়ে ভারত মহাসাগরে আমস্টারডাম দ্বীপ আর সেন্ট পলস দ্বীপের পাশ 
পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টরিয়া রাজ্যের মাথার ওপর দিয়ে__ 

আস্ত ভূুগোলবই আওড়াতে গিয়ে মাঝপথেই থেমে গেলেন পাঞয়ল। 

আআ? কী ব্যাপার? ভৌগোলিক কি তবে জ্ঞান হারিয়ে বাক্যহারা? 

না তো। কেননা পরক্ষণেই শোনা গেছে বিষম-একটা বিদঘুটে টীৎকার। তারপরেই 
দুমদাম আওয়াজ ক'রে কী যেন আছাড় খেয়ে পড়তে লাগলো এঁ মগডাল থেকে। 

সাড়ে-সর্বনাশ! এ আবার কী? হাত ফসকে পড়ে যাচ্ছেন নাকি জাক পাঞ্য়ল? 
মেজর ম্যাকন্যাবস যদি হাত বাড়িয়ে ধ'রে না-ফেলতেন তবে সত্যিই জলে পড়ে যেতেন 
পাঞয়ল : তিনি তখন ডিগবাজি খেতে-খেতে মগড়াল থেকে নিচে আছড়ে পড়ছিলেন। 

“কী ব্যাপার, বলুন তো? ফের বুঝি ভুলে গিয়েছিলেন কোথায় আছেন? 

“ঠিক তাই। ভুলবো না? নিজের আহাম্মুকিতে আমি যে নিজেই জ্ঞানগম্যি হারিয়ে 
ফেলেছিলুম !' 

পাঞয়ল সত্যি আহাম্মক কি না, সে নিয়ে একটা তর্ক তোলাই যায়। তবে অকস্মাৎ 
তার এই আত্মজ্ঞান লাভের কারণ কী ? 

“ভাবুন একবার ! কাণ্তেন গ্রান্চকে আমরা কি না এমন জায়গায় টুড়ে বেড়াচ্ছি 
যেখানে তিনি নেই-আদপেই তিনি এ-তল্লাটে আসেননি । কম্মিনকালেও না! 

পাঞয়ল কি তবে এত বিপদ-আপদে সত্যি সব জ্ঞানগম্যি হারিয়ে ফেলেছেন ? 
মাথাটাই বিলকুল গেছে নাকি ? এ আবার কেমনতর কথা? 

কিন্তু পাঞয়লের মাথার পোকা নতুন ক'রে আর তাকে কামড়ায়নি-তিনি যেমন 
ছিলেন, তেমনি আছেন। সোজাসুজি স্পষ্ট গলায় তিনি ঘোষণা করলেন : “মুশকিল 
আসানের এ তিন তলবটা আমরা সবাই তিন-তিনবার ভুল পড়েছি। 4%5/751 একটা 
গোটা শব্দ নয়--4%577411 শব্দটার ভগ্নাংশ-জলে এ / আর ॥ মুছে গিয়েছে_” 

গ্রেনারভন আপত্তি তুললেন। “ভুল পড়বো কেন ? অস্টেলিয়া তো আসলে একটা! 
দ্বীপই-_, 

“আপনারা কী বলেন, তাতে কিছু এসে-যায় না। ভৌগোলিক মাত্রেই বলবে 


৭৪ 


অস্ট্রেলিয়া আন্ত-একটা মহাদেশ।” 

“তাই বুঝি ?' পাঞয়লের বন্তৃতাটা সবে শুরু হ'তে যাচ্ছিলো, গ্রেনারভন সেটা 
চট ক'রে থামিয়ে দিলেন। “বেশ, তাহ'লে এবার অস্ট্রেলিয়াতেই যাওয়া যাক।” ব্বাস, 
একটি মোক্ষম কথাতেই সব আলোচনা খতম । 

আলোচনা খতম বটে, কিন্তু বলবামাত্রই কি আর যাওয়া যায? ডানকান এখন 
কোথায় ? আরো চল্লিশ মাইল পথ যেতে হবে যে-আর তাও যাওয়া যাবে না, যতক্ষণ 
এখানে জল থৈ-থে করবে। 

তখন বেলা প'ড়ে এসেছে । চারটে বাজে । 

রবার্ট এতক্ষণ মনমরা হ'য়ে বসেছিলো, কাণ্তেন গ্রান্টের কোনো হদিশ না-পেয়ে 
বেচারার মুখ দিয়ে একটাও কথা সরছিলো না। এবার যেই পাঞয়লের মুখ থেকে 
অস্ট্রেলিয়ার কথা বেরুলো, অমনি আবার নতুন উৎসাহের সঞ্তারে সে একেবারে ডগমগ 
হ'য়ে উঠলো। সব আশা তাহ'লে এখনও শেষ হ'য়ে যায়নি। চাঙ্গা হ'য়ে সে লাফিয়ে 
উঠে পড়লো- এই একটা-গাছ-দিয়েই-তৈরি জঙ্গলটায় এবার সে শিকারে গেলো- মেরে 
নিয়ে এলো গোটা-কয় ছোটো পাখি। সেইসঙ্গে পাখির বাসা থেকে হাতসাফাই ক'রে 
আনলে বেশ-কিছু ডিম। ছুচ আর সুতো দিয়ে বড়শি বানিয়ে কিছু মাছও ধরা হলো 
জল থেকে। 

রসুইখানার ভার এবার জাক পাঞয়ল নিজের কাধেই তুলে নিলেন। কে না জানে 
ফরাশিরা রান্নায় ওস্তাদ। আর তিনি তো আপাদমস্তক ফরাশি একজন--না, কি? রান্নার 
বাসনকোশন নানাবিধ ফোডনের মশলা এ-সব বিনাই সেদিন সন্দ্ধয় তিনি মা-একখানা 
উপাদেয় ভোজ রাধলেন - অথবা, বলা যায়, পাতায় মুড়ে ঝলসালেন-আর তার এমনই 
তার যে তা যেন সকলেরই মুখে লেগে রইলো। 

জল না-কম৷ অব্দি এই গাছের মধ্যেই কাটাতে হবে তাদের । ভ্যাপসা গরম পড়েছে, 
দারুণ গুমোট, আকাশে ঝুলে আছে থমথমে ভারি মেঘ, এত নিচু যেন এই গাছের 
ডগাটাই ছোয়। হাসফাস করতে-করতে তারই মধ্যে চলেছে আড্ডা, গল্পগুজব, 
পাঞয়লের দুর্দান্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তৃতা । যে-কোনো বিষয় পেলেই হ'লো : প্রায় সবজাস্তার 
ভঙ্গিতেই পাঞয়ল সেই বিষয় নিয়ে সাতকাহন শুনিয়ে দিতে পারেন। 

সন্ধের সময় কিন্তু এ নিচু ভারি মেঘ সরে গেলো, আর আড়াল থেকে বেরিয়ে 
এলো ফুটফুটে আকাশ, যেখানে অগুনতি তারা ঝকমক করছে। সেইসঙ্গে গুমোটের' 
ভাবটা কেটে গিয়ে ফুরফুরে একটু হাওয়াও দিচ্ছে। গাছের ডালের বাসায় জীকিয়ে ব'সে 
রবার্টকে এবার পাঞয়ল তারাদের নিয়েই মন্তএকটা বক্তৃতা ফেদে শোনালেন। 
পাতাগোনিয়ার কবিদের কল্পনায় অরিয়ন নক্ষত্র রূপ নিয়েছে তিনটে বোলাস আর একটা 
ল্যাসোর। কেড যেন তাদের মহাশূন্যে ছুড়ে দিয়েছে গোটা-কয় তারাকে পাকড়াবার 


৭৫ 


জন্যে। অর্থাৎ মাটির শিকার সরাসরি কবিকল্পনায় উঠে গিয়েছে আকাশে । 

পাঞয়লের বক্তৃতা যখন জ'মে উঠেছে-রসিকতা, টাকা-টিপ্লনীসমেত-এমন 
সময় হঠাৎ পুবদিকে দিগন্তের কাছে কালো একটা ফুটকির মতো কী দেখা গেলো, সেটা 
একটি বাদেই বড়ো হ'য়ে যেন মাটির একটা ঢেলা হযে উঠেছে। একটু-একটু ক'রে 
এশিয়ে এসে সে ঝিকমিক-ঝিকমিক তারাদের ঢেকে দিতে গেলো। আর তারই সঙ্গে 
তাল রেখেই যেন এ ফুরফুরে হাওয়াটাও ম'রে গেলো । আবার কী-রকম থমথমে গুমোটে 
সবকিছু হাসফাস করতে লাগলো। নিচে বানের জল থম মেরে আছে। যেন একটা 
গেরিমাটির আয়নার উপরিতল। 

কেউ কোনো মন্তব্য করার আগেই, নক্ষত্রতত্রের প্রসঙ্গে পালটে ফেলে, পাঞয়ল 
বলে উঠলেন : "লক্ষণ মোটেই ভালো না। সাংঘাতিক একটা বজবিদ্যুতে ভরা ঝড় 
আসছে। প্রচণ্ড-সব বাজ পড়বে পর-পর। আর আমাদের দশাও তাতে সঙিন হয়ে 
উঠবে- কেননা এদিকটায় তো গাছ বলতে আমাদের এটাই-আর সব গাছকেই তো 
বন্যার জল উপড়ে ফেলেছে। এ-গাছটার ওপর বাজ না-পড়লেই হয় !, 

পাঞয়ল যেন কোনো গানের আসরের কনডাকটার। তার কথাই যেন ছিলো ইঙ্গিত। 
তার কথা শেষ হ'তে-না-হ'তেই শুরু হ'য়ে গেলো গুমগ্ডম আওয়াজ, আর সেইসঙ্গে 
জলের ওপর হঠাৎ দেখা দিলে অগুনতি আলোর ফোটা । ফসফর নাকি? 

পাঞ্য়ল ঝুকে ফস ক'রে হাত বাড়িয়ে জল থেকে টপ ক'রে একটা আলোর ফৌটা 
ধ'রে ফেললেন। 'এ-যে দেখছি তুকো-তুকো!, 

“তুকো-তুকো মানে ? জে রা 

“হ্যা, জোনাকিও বলতে পারো-তবে এদের ভাষায় এই ফসফর-পোকা হ'লো 
জ্যন্তহিরে। এই দ্যাখো, লম্বায় প্রায় ইঞ্চিটাক। এখানকার মেয়েরা এদের ধ'রে-ধ'রে মাসা 
গাথে, গলায় পরে, খোপায় গৌজে ।' 

ফসফরের আলোয় পাঞয়লের হাতের ঘড়িতে দেখা গেলো রাত বাজে দশটা। 

যেন দিনক্ষণ দেখেই তক্ষুনি ঝড়টা ফেটে পড়লো। আকাশ চিরে ঝল্সে উঠছে 
বিদ্যুৎ, ঘন-ঘন, যেন আগুনের ল্যাসো ছুঁড়ে-ছুঁড়ে কেউ আস্ত আকাশটাকেই পাকড়াবার 
চেষ্টা করছে । আর তারই সঙ্গে তাল রেখেই গুমগুমগ্ম ক'রে গড়িয়ে যাচ্ছে বাজ। 
আর সেইসঙ্গে নামলো মুষলধারে বৃষ্টি। সে কী বৃষ্টি--কী বড়ো-বড়ো ফৌটা, যেন গায়ে 
এসে বেধে। কুকড়িমুকড়ি হ'য়ে পাতার আড়ালে গা ঢাকা দেবার চেষ্টা করলেন সবাই, 
কিন্তু তাতেও কি আর এই মুষলধারে বর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়? 

সবে সবাই পাতার ঘন বুনোনের আড়ালে গুটিশুটি হ'য়ে বসেছে, এমন সময় 
আকাশের আগুন নেমে এলো গাছটাতেই। প্রথমে যেন বিদ্যুতের একটা গোলা ছোটাছুটি 
করলে ডাল থেকে ডালে, আর ভেজা পাতায় আগুন লেগে উঠলো কালোধোঁয়ার কৃগুলি। 


৭৬ 


তারপর বার-কয়েক চর্কিপাক খেয়ে সেই বিদ্যুতের গোলাটা প্রচণ্ড আওয়াজ ক'রে ফেটে 
গেলো-আওয়াজটা এত-জোরে আর এত-কাছে হ'লো৷ যে মনে হলো গোলাটা ঠিক 
যেন মাথার মধ্যে ফেটেছে। বো ক'রে ঘুরে-ওগঠা মাথার হকচকানো দশা ক'মে যাবার 
আগেই দেখা গেলো, পাঞয়ল যে-ভয় করেছিলেন, তা-ই হয়েছে : গাছে আগুন ধ'রে 
গিয়েছে। আগুন যেন লাফিয়ে-লাফিয়ে নামছে ডাল থেকে ডালে, পুড়ে যাচ্ছে শুকনো 
পাতা, ডালপালা, পাখির বাসা-সবকিছু। 

ভয় পেয়ে সবাই স'রে এলেন আগুনের কাছ থেকে, পুবদিকে। 

এবার আর কারু রেহাই নেই। 

নিচে বানের জলে ঘুর্ণি লেগেছে, ওপরে আগুন জ্বলছে লেলিহান। 

উইলিয়ামের গায়ে আগুনের হলকা ছ্যাকা দিতেই সে লাফিয়ে নেমে পড়েছিলো 
জলে। কিন্তু পরক্ষণেই সবকিছু ছাপিয়ে ভেমে এলো তার কানফাটানো চীৎকার : 
“'আলিগেটর! আলিগেটর!! 

কুমিরের ভয়াল দোসর এই আলিগেটরদের এ-দেশে কে না ভয় পায়? গাছের 
তলায় বেশ কয়েকটা-দশ-বারোটা হবে বোধহয়--আযলিগেটর জলের মধো গা ভাসিয়ে 
আছে-ওৎ পেতেই আছে--কখন তাদের খাদ্য টুপ ক'রে খ'সে পড়ে গাছ থেকে, সেই 
অপেক্ষাতেই আছে। 

হঠাৎ দক্ষিণদিক থেকে এলো পাহাড়প্রমাণ একটা মস্ত ঢেউ, আর এত ধকল 
সামলাবার পর, এতক্ষণে এই-এতবড়ো গাছটা মড়মড় ক'রে উপড়ে গেলো। জলে 
পড়তেই আগুন মিভে গেলো, আলিগেটরগুলোও ছিটকে গেলো একপাশে, শুধু একটা 
একটু তেড়িবেড়ি ক'রে ধেয়ে এসেছিলো, শেষে ভুলস্ত ডালটা তুলে একজন নাবিক 
তার গায়ে গায়ের জোরে হাকাতেই আযলিগেটরটা ছিটকে পড়লো জলে, আর তার 
ল্যাজের আছড়ানিতে যেন জলে হুলুস্ুল বেধে গেলো-যদি অবশ্য হুলুন্থুলের তখনও 
কিছু বাকি থেকে থাকে। 

এই এতবড়ো গাছটাই এখন তাদের ভেলা। হাওয়ার দাপটে এই মন্ত বিশাল 
বেনোজলের ওপর দিয়ে ভেসে চললো গাছটা--কতক্ষণ কে জানে--অন্তত ঝলসে মরার 
ভয় নেই--এখন কোনোক্রমে শুকনো ডাঙায় গিয়ে পৌছুতে পারলে হয়। 

তারপর একসময় বৃষ্টিও ধ'রে এলো, সেই মুষলধারের বদলে এখন মিহি ফিনফিনে * 
বৃষ্টির একটা পর্দা ঝাপসা ক'রে রেখেছে সব। আখর়োটগাছের ভেলা ভেসেই চলেছে। 

শেষরাতের দিকে, তখন সম্ভবত তিনটে বাজে, ভেলাটা যেন মাটির গায়ে ধাক্কা 
খেলে। তারপরেই ঘষটে-ঘষটে চললো কিছুক্ষণ, প্রায় কুড়িপচিশ মিনিট বাদে ঝাকুনি 
দিয়ে থেমে গেলো এই অদ্ভুত ভেলাটা। 

ফুর্তিটা সবচেয়ে বেশি পাঞয়লেরই। “মাটি! মাটি 


৭৭ 


দুড়দাড় ক'রে সবাই লাফিয়ে নামলে মাটিতে । আর নেমেই-এ কী তাজ্জব দৃশ্য! 

সামনেই দাড়িয়ে ভ্রোনিদো, আর তার পাশে দাঁড়িয়ে তার ঘোড়া ক্ষুর ঠকছে। 

ত্রোনিদো পাঞয়লের ঠিক উলটো--সাত চড়েও রা কাড়তে চায় না। তবু দু-চার 
কথায় সে যা বললে তার সারাংশ হ'লো, বেনোজলের তোড়ে সবাই একসময়-না- 
একসময় যে এদিকটাতেই ভেসে আসবে, তা সে আন্দাজ করেছিলো। তাই একটা 
পরিত্যক্ত র্যানচে সে সকলের জন্যে খাবার ব্যবস্থা ক'রে রেখে এসেছে। 

সেখানেই বাকি রাতটা কাটিয়ে দিলে সবাই। সকাল হ*লেই ফের রওনা হ'তে হবে 
আযটলান্টিকের পানে। 

আযাটলান্টিকের তারে এসে পরদিন যখন পৌছুনো গেলো, তখন রাত ক'রে 
এসেছে, জোর হাওয়া দিচ্ছে, হয়তো আরো-একখানা ঝড়েরই পর্বাভাস। তীরে ডানকান 
নেই। সে ভাসছে ডাঙা থেকে দূরে, জলের ওপর। তীরে যে নেই, তার কারণ ঝড়ের 
প্রকোপে ডাঙায় ঘা ঘেয়ে ডানকান বেদম জখম হ*য়ে যেতে পারে, তাই সাবধানের 
মার নেই ভেবে তাকে বারদরিয়ার কাছে নিয়ে-যাওয়া হয়েছে। 

অর্থাৎ আজ রাতটা তীরেই তাদের কাটিয়ে দিতে হবে, এ চড়ায়। 

আযাটলান্টিকে পৌছে গেছে, এ-যে দূরে ছায়ার মতো ডানকানকে দেখা যাচ্ছে, 
এ-কথা ভেবে অন্যদের মনে যতই স্বস্তির ভাব দেখা দিক, লর্ড গ্লেনারভনের মনে কিন্তু 
একফোটাও স্বস্তি নেই-তিনি সারারাত ছটফট ক'রেই কাটালেন। দক্ষিণ আমেরিকায় 
পা দেবার পর থেকেই পর-পর যত অপ্রত্যাশিত ঘটনার আবর্তে তারা পাক খেয়েছেন, 
তাতে ডানকানে পা না-দেয়া অব্দি তিনি মোটেই স্বস্তি পাবেন না। আবার অতর্কিতে 
কোনদিক থেকে কী বিপদ আসে কে জানে ! 

ভোরের আলো ফুটতেই কিন্তু স্পষ্ট দেখা গেলো ডানকানকে। আর দেখেই আকাশ 
পক্ষ্য ক'রে পর-পর তিনবার বন্দুক ছুঁড়লো ভ্রোনিদো-সংকেত। আর তারপরেই 
ডানকানের ডেক থেকে তোপের আওয়াজ এলো--কামান দেগে সংকেতের উত্তর দিচ্ছে। 
পরক্ষণেই ডানকান থেকে ভাসিয়ে দেয়া হ'লো একটা নৌকো। 

ত্রোনিদো কিছুতেই তার স্বদেশ ছেড়ে যাবে না সে এই আরহেনতিনাতেই থাকবে। 
ভ্রোনিদো ছাড়া আর-সবাই উঠে পড়লেন ডানকানের নৌকোয়। শুধু রবার্ট নৌকোয় গিয়ে 
ওঠবার আগে ত্রোনিদো একবার তার হাত চেপে ধরলো। অস্ফুট স্বরে বললে, “আর 
তুমি কিশোর নও এখন, বড়ো হায়ে গেছো! 

নৌকো যতক্ষণ-না অভিযাত্রীদের নিয়ে গিয়ে ডানকানে ভিড়লো, ভ্রোনিদো 
পাষাণমূর্তির মতো দীড়িয়েছিলো তীরে। সবাই একে-একে ডানকানে উঠে যেতেই, সে 
তার তেজি ঘোড়াটার পিঠে লাফিয়ে উঠলো, তারপর ডানকানের দিক থেকে ঘোড়ার 
মুখ ঘুরিয়ে সবেগে সে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলে হয়তো পাম্পারই উদ্দেশে। 


৭৮ 


দ্বিতীয় 


এক 


5118 আানে কি 14745177110 ? 


রো রাস্তাটা যে সবাই মিলে হন্যে হ'য়ে, সব বিপদ-আপদ মাথায় ক'রে, ছুটে 
বড়িয়েছেন, সবটাই কি না মিথ্যেমিথ্যি, শুধু-একটা বুনোহাসের পেছনে ছোটাই যেন 
নার হ'লো! 

কোথায় দক্ষিণ আমেরিকা, আর কোনখানেই বা মহাদেশ অস্ট্রেলিয়া ! কোথায় যেতে 
যে কোনখানে । আর সব কি না গুগুলিপিটা ভুল প'ড়ে ! শুধু বর্ণপরিচয় থাকলেই 
তা হয় না, সব সংকেতের গোপন অর্থটা বার করবার মতো বুদ্ধি বা এলেমও থাকা 
ই! এমনিতেই তো যে-কোনো হেয়ালির জট খুলতে চাওয়ার ব্যাপারটাই কঠিন--তার 
পর মুশকিল আসানের এই-যে তিন-তিনটে তলব নানা ভাষায় পাওয়া গেছে তার 
[নেক হরফই তো জলে ধুয়ে-মুছে উধাও হয়ে গেছে ! প্রথমত অসম্পূর্ণ শব্দগুলো 
-( অসম্পূর্ণ তো ছিলো না, জলই তাদের খেয়ে গেছে )-ঠিকঠাক পূরণ করতে হবে, 
[-হ'লে আর ধরা যাবে কী ক'রে, কাণ্তেন গ্রাণ্ট সত্যি-সত্যি কোন্‌ হদিশ দিয়ে সাহায্য 
যয়েছিলেন! 

মসিয় পাঞয়ল অপ্রতিরোধ্য : এত-সহজে যদি দ'মে যাবার পাত্র হ'তৈন তাহ'লে 
ই ত্রমবর্ধমান জগৎটির হাল-হকিকৎ সম্বন্ধে এত-বড়ো একজন বিশারদ তিনি হ"য়ে 
এতেন কী ক'রে? অতএব, আবারও তিনি নতুন ক'রে আদ্যোপাস্ত লিখে ফেলেছেন 
ই ক্রিপ্টোগ্রামের অর্থ, তবে ক্রিপ্টোগ্রামটি হয়তো কোনোকালেই ক্রিপ্টোগ্রাম হ'তে 
য়নি, এই বোতলে-ভাসানো চিঠি তো আসলে ছিলো সাহায্য পাবার, উদ্ধার হবার ব্যাকুল 
নুরোধ, শুধু জল এসে কিছু কথা মুছে দিয়েছে বলেই এখন হয়তো তাকে মনে 
চ্ছে ক্রিপ্টোগ্রাম বা গগুলিপি, প্রতিবার নতুন ক'রে অভিনিবেশ দেবার পর মসিয় 
ঞয়ল প্রতিবারই যার নতুন অর্থ খুঁজে পাচ্ছেন, এ যেন সেই ব্যাসকুট যা বারে-বারেই 
ব-নব তাতপর্যে ভ'রে ঘায়। অতএব, এখন নতুন ক'রে এই ব্যাসকৃটের মর্মোদ্ধার 
রার পর তার হতাশ কিন্তু উৎসুক শ্রোতাদের তিনি, নাটকীয় ভঙ্গিতে পুরো জবানটাই 
'অভ্তত তিনি যা ধরতে পেরেছেন-পণড়ে শোনালেন : 


৭৯ 


১৮৬২ সালের ৭ জুন গ্রাসগোর ত্রিমীস্তুল রণতরী ব্রিটানিয়া অস্ট্রেলিয়ার উপকৃছে 
সলিল সমাধি লাভ করেছে। দুজন নাবিক আর কাণ্তেন গ্রান্ট কোনোক্রমে মহাদেশে 
ডাগায় গিয়ে উঠেছেন, এবং উঠে প*ড়েই বর্বর ও নিষ্ঠুর আদিবাসীদের পান্রা 
পড়েছেন-এখন তারা তাদের হাতেই বন্দী। এই কাগজটা তারা...দ্রাঘিমা এব 
৩৭০১১ অক্ষাংশে বোতলে ক”রে ভাসিয়ে দিয়েছেন। সেখানে জাহাজডুৰি হয়েছে 
সেখানে সাহায্য পাঠান। 


মেজর ম্যাকন্যাব্স কাজের লোক, অল্পকথার মানুষ। তার জীবনের সারকথা : ক€ 
কম কাজ বেশি। কিন্ত্র এবার তারও মনে হ'লো যৎকিঞ্চিৎ উচ্চবাচ্য না-করলে আবার, 
হয়তো আলেয়ার পেছনে ছুটতে হবে। তিনি ব'লে উঠলেন, “সবুর ! সবুর ! একমিনিট 
দুম ক'রে একেবারে অস্ট্রেলিয়া যাবার আগে আমাদের বোধহয় আরো-একটু সবকি' 
তলিয়ে ভেবে দেখা উচিত। আমরা তো আগের বারে চিরকুটটার ভুল অর্থ করেছিল 
-এবার যে আবার একটা ডাহা-ভুল করছি না তা-ই বাকে জানে! এবার বরং আরে 
হুশিয়ার হ'য়ে অঁটঘাট বেঁধে আমাদের ঠিক ক'রে নিতে হবে-' 

মেজর ম্যাকন্যাব্স তার কথাটা শেষ করতে পারলে তো? তার পাগ্ডিত্যের ওপ' 
কারু কটাক্ষ সহ্য করার পাত্র অস্তত মসিয় পাঞয়ল নন। তিনি প্রায় ভিড়িংবিড়িং ক'ত 
জলে উঠে তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন : 'কবুল করি, আগের বার আমা 
ভূল হয়েছিলো। কিন্তু ভুল তো মানুষমাত্রেই করে--আর সে-ভুল আবার শুধরেও নে 
মানুষই। শুধু যারা হাঁদার হন্দ, তারাই পুরোনো ভূলটাকে আকড়ে ধ'রে থাকে।' 

'উহ-উঁহু, আমি মোটেই অত চ'টে যাবার কথা বলিনি।' কথা বলবেন ব'লে যখ, 
স্থির করেছেন মেজর ম্যাকন্যাবস তখন তিনি কথাই বলবেন। 'অতটা মাথাগরম করা৷ 
মতো কিছুই আমি বলিনি। ৩৭০১১ অক্ষরেখা ঠিক-ঠিক কোন-কোন দেশের ওপ, 
দিয়ে গেছে, আগে বরং সেটাই খতিয়ে দেখা যাক। আমার কথার বিনীত মর্মার্থ ছিলে 
এটাই। 

“এই সীইত্রিশ ডিন্রি এগারো মিনিট অক্ষরেখা যেখান দিয়ে গেছে, সেখানে 
বেশিরভাগ জায়গাতেই আছে জল | জানেনই তো, পৃথিবীতে ডাঙার চাইতে জলের ভাগ! 
অনেক-বেশি। এই-যে, এই দেখুন, দক্ষিণ আমেরিকার পরেই পড়ছে ত্রিস্তান ডা ফুনিয় 
দ্বীপটা--কিস্তু ধদ্ধে-ফেলা চিরকুটটায় এই দ্বীপের কোনো নামশম্ধও নেই। ফলে তাবে 
আপাতত বাদ দেয়া যেতেই পারে। তারপর আসছে ভারত মহাসাগরে ওলন্দাজদে; 
ঘাঁটি--আমস্টারডাম আইল্যাগডস_.তারও কোনো নামগন্ধ নেই এই চিরকৃটে। তারপঃ 
আময়া পৌছে যাচ্ছি সরাসরি অস্ট্রেলিয়াতে ইংরেজিতে লেখা চিরকুটায় আছে ৪0 আর? 


৮০ 


ফরাশিতে লেখা চিরকুটটায় আছে ৫45/21- এ-দুটোই 4%57517 র কথা বলছে সেটা 
বুঝতে মগজে ধূসর পদার্থ বেশি লাগে না।' 

“ততঃকিম্‌?, 

“অস্ট্রেলিয়ার পর, এই-যে, এই দেখুন নিউ-জিলাশু--সে মোটেই কোনো মহাদেশ 
নয়_ সাউথ আইল্যাণ্ড আর নর্থ আইল্যাণ্ড এই দুইকে মিলিয়েই এই নবসিক্ুসৈকত গড়ে 
উঠেছে। কিন্তু তারও তো কোনো উল্লেখই নেই কোনো চিরকুটে। 

“ঠিক আছে। না-হয় নিউ-জিলাগুকেও বাদ দেয়া গেলো।! 

“তবেই দেখুন- দক্ষিণ আমেরিকা আর নিউ-জিলাগডের মাঝখানে এই অথৈ সমুদ্রের 
মাঝখানে এ সাইত্রিশ ডিগ্রি এগারো মিনিট অক্ষরেখায় পড়ছে কেবল আরেকটা প্রায় 
খা-থা মরুভূমির মতো দ্বীপ- মারিয়া তেরেসা। কিন্তু এই মারিয়া তেরেসার নামের 
উল্লেখও তো চিরকুটে কোথাও পাচ্ছি না। তাহ'লে নিজেরাই ঠিক ক'রে বলুন, কোথায় 
যাবেন, কোথায় যাওয়া সমীচীন হবে।, 

হুম, তাহ'লে তো দেখা যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া যাবার তোড়জোড় করাই ভালো। 

অমনি এককথায় সবাই রাজি । “বেশ, চলো তবে অস্ট্রেলিয়ায়। 

“হ্যা, অস্ট্রেলিয়া যাওয়াই উচিত, তবে পথে আমস্টারডাম আইল্যাগ্ুস আর ত্রিস্তান 
ডা কুনিয়া দ্বীপে জাহাজ ভিড়িয়ে এই খোঁজটা অন্তত নেয়া দরকার ব্রিটানিয়া সে-সব 
দ্বীপে কখনও থেমেছিলো কি না, মেজর ম্যাকন্যাব্সের মাথা কিন্তু সকলের এত উৎসাহ 
ও উত্তেজনার মধ্যেও দিব্ব ঠাণ্ডা আছে--সত্যি-সত্যি কী করা উচিত, সে-কথাটা এই 
ভবি সহজে ভোলেন না। 

“সে আর বেশি কথা কী, লর্ভ গ্লেনারভন বললেন, 'এঁ দ্বীপগুলো তো পথেই 
পড়বে-- সেখানে জাহাজ ভিড়িয়ে খোজখবর নেবার জন্যে আমাদের তো একেবারে অন্য 
রাস্তায় গিয়ে পড়তে হবে না।' 

এবং এই সিদ্ধান্তটাই মনঃপৃত হ'লো সকলের। এবং ডানকান ছুটলো পুরোদমে, 
গন্তব্য অস্ট্রেলিয়া হ'লেও অন্য দ্বীপগুলোর বুড়ি ছুঁয়ে-ছুঁয়ে যেতে হবে তাকে । আর কারুই 
যেহেতু আর একফোটাও তর সইছিলো না, প্রায় একটা নজিরই গ'ড়ে দিলে ডানকান, 
দশদিনেই পেরিয়ে এলো ২১০০ মাইল--দূর থেকে, দিগন্তে মেঘের মধ্যে ঝাপসা ভেসে 
উঠলো সমুদ্রতল থেকে সাতহাজার ফিট উঁচু ত্রিস্তান ডা' কুনিয়ার গিরিচূড়া। 

্রিস্তান ডা কুনিয়া দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের কতগুলো দ্বীপ নিয়ে গ'ড়ে 
উঠেছে, ব্রিটিশ উপনিবেশ সেন্ট হেলেনার সে অংশ, আর সেই সেন্ট হেলেনার রাজধানী 
হ'লো জেমসটাউন। তিস্তান ডা কুনিয়া নাম থেকেই মালুম হয় এটা এককালে ছিলো 
পূর্তৃগালের উপনিবেশ-কিন্তু সাম্রাজ্য নিয়ে ইওরোপের বিভিন্ন শক্তির মধ্যে যখন 
খেয়োখেয়ি লেগে গিয়েছিলো, তখন অস্ট্রেলিয়া দখল করার কাছাকাছি সময়েই ইংরেজরা 


ইন সার্চ : ৬ টি 


এই দ্বীপগুলো পূর্তৃগিশদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়। হোক-না ছোটো-ছোটো ছ্বীপ- 
দ্বীপ না-ব'লে বলা ভালো হয়তো সমুদ্রের জল থেকে অগ্যুতৎপাতের ফলে সেই-কনে 
মাথা তুলে দীড়ানো পাহাড়ের চুড়ো, কিন্তু সাম্রাজ্য বানাবার রাক্ষুসে খিদে এই আগ্নেয়গিরির 
চুড়োগুলোকেই বা খামকা আর-কারু কাছে ছেড়ে দেবে কেন? 

এই ছোট্ট গিরিপাহাড়দ্বীপে সটরাচর যেহেতু নেহাৎ বেকায়দায় না-পড়লে কোনো 
জাহাজই ভেড়ে না, তাই ভানকান স্বেচ্ছায়, তার পরিকল্পনামাফিক এখানে এসে 
তত্ততালাশি নেবে বলেই থেমেছে শুনে, এখানকার গবর্নর প্রায় যেন গদগদ হয়েই 
খাতির করলেন লঙ গ্রেনারভনকে। এই ছোট্ট নামকাওয়াস্তে দ্বীপটার এ-মাথা থেকে 
ও-মাথা অব্দি সবকিছু ঘুরিয়ে দেখালেন তাদের-নৌকোয় ক'রে দ্বীপের চারপাশও ঘুরে- 
আসা হ'লো, কিন্তু না, মসিয় পাঞয়লের আন্দাজই সম্ভবত ঠিক, কাণ্ডেন গ্রান্ট বা 
ব্িটানিয়ার কোনো খোঁজই পাওয়া গেলো না এখানে । 

যখন বোঝা গেলো এখানে ব্রিটানিয়ার খোজ পাবার কোনো সম্ভাবনাই নেই, তখন 
সে-রাত্তিরেই দ্বীপ থেকে নোঙর তুললো ডানকান, এবং আবার ভাসলো অথৈ জলে, 
অকৃলপাথারে, পরবর্তী থামবার জায়গা আমস্টারডাম দ্বাপ। 

মাঝখানে একবার কয়লা নেবার জন্যে থামতে হয়েছিলো ডানকানকে, কিন্তু সে 
শুধু কয়লা নেবার জন্যেই অন্যকোনো কাজ ছিলো না তার, কোনো শুলুকসন্ধান নেবার 
কথাও ওঠেনি। আমস্টারডাম দ্বীপগুলোয় পৌছুবার আগে অব্দি কোথাও কোনো খবর 
নেবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। অবশ্য এই তথাকথিত আমস্টারডামেও কাউকে কিছু 
জিগেস করার কোনো মানে নেই। এই ২৯০০ মাইল পাড়ি দেবার পর এই বাহারে 
নামের ছ্বীপটায় পৌছে দেখা গেলো. এই একরত্তি ডাঙাকে দ্বীপ না-ব'লে দ্বীপের কোনো 
লিলিপুশন সংস্করণ বলাই চলে। কিংবা হয়তো দূর থেকে দেখে কারু ভ্রম হ'তে পারে 
যে এ বুঝি কোনো তিমিঙ্গিলের গিঠ-জলে গা ভাসিয়ে দিয়ে বুঝি রোদ পোহাচ্ছে। 
শুধু একটুক্ষণের জন্যেই সেখানে নোঙর ফেলেছিলো ডানকান। কেননা খেঁজাখবর নিতে 
কোনো সময়ই বোধকরি লাগলো না-যেন ঘড়ির কাটার মধ্য থেকে কয়েকটা মুহূর্তকে 
বগলদাবা ক'রে বার ক'রে নিয়ে গিয়েই জিজ্ঞাসাবাদ সারা হ'লো-- যেন ঘড়ির কাটা তাতে 
ঘোরেইনি। কেননা দ্বীপের বাসিন্দা বলতে কুললে তিনজন লোক, একজন ফরাশি, আর 
দুজন দোআঁশলা, মুলাটো, কালাআদমি। তিনজনেই এককথায় জানিয়ে দিলে, উঁহু, কই, 
ব্রিটানিয়া তো কস্মিন্কালেও এখানে থামেনি--কিংবা এ জাহাজের কেউই দ্বীপে কখনও 
পা দেয়নি। 

উচিত ছিলো, এ-কথা শোনবামাত্র তক্ষুনি ফের নোঙর গোটানো, কিন্তু এবার 
যেহেতু শেষ-ভরসা অঙ্ট্রেলিয়াতেই পাড়ি জমাতে হবে, সেইন্যেই বোধহয় সব্বাই এখানে 
একটু থেমে নিয়ে বুকের মধ্যে সাহস আর আশা সঞ্চয় ক'রে নিতে 


৮ 


তাছাড়! ছিলো-তো, অফুরন্ত আমোদেব খনি. জাক পাঞয়লের শ্রামুখনিঃসৃত 
অনর্গল বুকনি। মাঝে-মাঝে তথা আর কল্পনায় সবকিছু ভালগোল পাকিয়ে না-ফেললে 
জাক পাঞ্য়লকে হয়তা বলাই যেতো জীবন্ত একখানা বিশ্বকোষ, মে-বকম বিশ্বকোষ 
প্রণয়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন ভোলতেয়াররা। সেই খবে থেকে ইয়ন হাট আর জেরাও 
মের্কাটোর নামে দুই ওলন্দাজ চমৎকার বাধাই ক'রে মানচিত্রে একটি সংগ্রহ বার 
করেছিলেন (মসিয় পাঞয়লের এমনকী সালতারিখও দিবি মনে থাকে- সেটা নাকি 
ছিলো ১৬৩৬ সাল ), তারপর থেকে কতই মে কার্টোগ্রাফার অথাৎ মানচিত্রআকিয়েরা 
আসর জাকিয়ে বসতে শুরু করেছিদলন। সেই প্রথম সংগ্রহটার মুখপত্রে ছিলো 
বিশালদেহী আযাটলাসের ছবি, গ্রিকপূরাণের সেই দেবতা, থে কাধে ক'রে বয়ে রেখেছিলো 
আস্ত পৃথথিবাটাই। সেই থেকেই নাকি মানচিত্রেব বইয়ের নাম হ'য়ে গেলো আটলাস। 
তো, এই আযাটলাস সেই সন্তদশ শতাব্দীর মধাভাগ থেকে পরের পর বেরিয়েই চললো ; 
যত-যত লোক ভৌগোলিক অভিযানে বেরিযেছিলো তাদের আকা নকশা দেখে-দেখে 
কা্টোগ্রাফাররা নিজেদের কেরামতি দেখিয়েই চললেন-“কাথায় পাহাড়, কোথায় নদী, 
কোথায় সাগর, কোথায় ডাঙা, কোথায় আগ্নেয়গিরি আর কোনখানেই-ব! মরুভূমি, 
কোথায় দুর্ম নিবিড বনান। আর কোথায়ই-বা জনপদ--সব আস্তে-মআস্তে যেন লোকেব 
চোখের সামনে খুলে যেতে লাগলো । ান্ত পথিবাটাই বেন ব্রমে বড়ে। হয়ে যেতে 
লাগলো, বেড়ে যেতে লাগলো--আবিষ্কৃত হ'লো এমনকী আস্ত নতুন মহাদেশও। 

মসিয় পাঞয়ল যখন কথার ফুলঝুরি ছুটিয়ে এসব কথা বলতে শুরু করেন, 
সবাই তখন তাকে ঘিরে বসে হা ক'রে তার কথা শোনে, আর তার জ্রানের পরিধি 
দেখে তাজ্জব হয়ে যায়। গত ক-দিন ধ'রে তিনি অস্ট্রেলিয়াকে নিয়েই পড়েছিলেন। 
কারা-কারা অস্ট্রেলিয়া গিয়েছেন, কোথায়-কোথায় পড়েছিলো তাদের পদধূলি, কী তারা 
দেখেছেন আউটবাতে-কেননা অস্ট্রেলিয়ায় জনবসতি নাকি শুধুই সমুদ্রের তীর ঘেসে, 
তারপর ভেতরে মাইলের পর মাইল গেছে বিশাল জমি, পাহাড় পর্বত গাছপালা জীবজন্তু 
সবই নাকি অন্যরকম-আর সেই বিশাল ভিতরদেশকেই-মজার না?-তারা বলে 
আউটব্যাক--“বাইরে, পেছনে" । এমন কোনো নাম যার মগজ থেকে বেরিয়েছিলো, তার 
কল্পনার বাহাদুরি ছিলো মানতেই হয়। মঁসিয় পাঞ্য়ল যখন একে-একে অভিযানকারীদের 
নাম বলতে লাগলেন, নির্ভুল সালতারিখ গুদ্ধু, তখন এ ছিটগ্রস্ত পণ্ডিতের ওপর বেশ 
সন্ত্রমই বোধ হ'তে থাকে সকলের। অস্ট্রেলিয়ার কিছুই নয় ইওরোপের মতো-“কিছুই 
নয়” মানে তার গাছপালা জীবজন্তু সবই অন্যরকম, এমনকী দক্ষিণ গোলার্ধে ব'লে তার 
আকাশটা অন্যরকম, উলটোরকম, তারাগুলো আকাশের পটে যেন ঠিক উলটে দিয়েছে 
কেউ, এমনকী উলটে দিয়েছে খতুগুলোকেও। ইওরোপে যখন হি-হি হিম শীত, সেখানে 
তখন বিকট দমবন্ধকরা গরম। ফলে বড়োদিনে যখন ইওরোপ গান গায় হোয়াইট 


৮৩ 


ক্রিসমাসের, বরফেটঢাকা প্রান্তরের ওপর দিয়ে শ্লেজে ক'রে আসছে সান্তা ব্লুস, বা সন্তু 
নিকলাউস, তখন গরমে এখানকার লোকের প্রাণ আইটাই যাই-যাই, বেঢারা সান্তা ব্লুস 
তার গরম জামাকাপড় খুলে হাসকাস করতে-করতে যেন দরদর ক'রে ঘামে। 

সান্তা ক্রুসের দুদিশাটা এমন মজার ভাবে বর্ণনা করেন জাক পাঞ্য়ল যে রবার্ট 
আর মেরি তো হেসেই কুটিপাটি, অন্যরাও মুচকি-মুচকি হাসেন বটে, আর এতে একদিক 
থেকে ভালোই হয়-ছেলেমেয়েরা অন্তত সাময়িকভাবে ভুলে যায় কেন তারা এই 
অভিযানে বেরিয়েছে, কাণ্তেন গ্রান্টের কথাটা তখন যেন মনের কোনো চিলতে খুপরিতে 
অন্ধকারে হারিয়ে যায়। 

কিন্তু এত-সবের মধ্যেও চিরকুটটাকে নিয়ে প্রায়ই মাথা খাটায় সবাই মিলে । সত্যি 
কি মর্মোদ্ধার করা গেছে এই আর্তোদ্ধারের আহানের-চিরকুটগুলো নিয়ে যত বসা যায় 
ততই মনে হয় সেগুলো যেন গভীর, গভীরতর রহস্যে ভ'রে যাচ্ছে, ধাধাটা যেন এমন 
জটপাকানো যে তার ভেতর বুঝি সহজে কোনো আলো ফেলাই যাবে না। যেমন, এই- 
যে খটকাটা জেগেছে, তার উত্তরটা কী? পেরুর উপকূল ছেড়ে বেরুবার পর এক- 
সপ্তাহের মধ্যেই জুনমাসের সাত তারিখে কি রিটানিয়া ভারত মহাসাগরে গিয়ে গৌছুতে 
*রে? 

খোদ পাঞয়লও সবজান্তা হ'য়েও কেমন-একটা ধাধার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন 
একদিন তাই সরাসরি কাণ্তেন জন ম্যাঙ্গল্সকেই তিনি জিগেস ক'রে বসলেন, 'আমরা 
যে-সমুদ্রপথ দিয়ে যাচ্ছি সেই সমুদ্র দিয়ে কি কোনো জাহাজ একমাসেই গিয়ে অস্ট্রেলিযায় 
পৌছুতে পারে ?' 

“দেখতে হবে জাহাজের এনজিনের জোর কতটা--কত অশ্বশক্তি আছে,” বুঝি প্রায় 
না-ভেবেই উত্তর দিয়েছেন কাণ্তেন, “দিনরাত একটানা যদি চলে, চবিবশ ঘন্টায় যদি 
দশমাইল পথ পেরুতে পারে, তবে এক মাসেই অস্ট্রেলিয়৷ পৌঁছে যেতে পারে বৈ কি।' 

“তাহ'লে চিরকুটগুলোয় নিশ্চয়ই ? তারিখের আগে | অথবা 2 ছিলো-জল লেগে 
মুছে গিয়েছে । তার মানে, আমি বলতে চাচ্ছি, কাণ্তেন গ্রাণ্ট সম্ভবত 17 অথবা 27 
তারিখ গিয়ে পৌছেছিলেন ভারত মহাসাগরে । 

হুম, এটা হ'লেও হ'তে পারে। এই সন্তাবনাটার কথা মোটেই উড়িয়ে দেয়া যায় 
না” কমকথার মানুষ মেজর ম্যাকন্যাব্স-এর মুখ থেকে আজকাল যে নানারকম 
সদুক্তিকণর্মিত বেরোয়, এই মন্তব্যটা তারই আরেকটা নজির। 

জাক পাঞয়ল অমনি সবজীস্তার ভূমিকায় পুনর্বার অবতীর্ণ হলেন। মাঝখানে যে 
একটা প্রশ্ন ক'রে তিনি এমন দৃষ্টাঙ্জ রখে শিয়েছেন যে এমনকী তারও সবকিছু জানা 
নেই, সম্ভবত সেই ঘটিভিটা পৃষিয়ে নেবার জন্যেই বোধকরি । এমন-সব সারগর্ভ উক্তি 
ক'রে চললেন পর-পর, তাতে তার জ্ঞানের বহর দেখে সব্বাই প্রায় কুপোকাৎ। কেমন- 


৮৪ 


যেন একটা হীনম্মন্যতারই বোধ জেগে ওঠে, যদি দেখা যায় আরেকজন-কেউ-- মানুষই 
তো বটে-একটা স্বয়ংচল স্বয়ংক্রিয় বিশ্বকোষই হ*য়ে উঠেছে। 

শেষটায় মেজর ম্যাকন্যাবস আর তুবড়ির মতো ছোটা জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা সহা করতে 
না-পেরে হেসেই যদিও কথাটা বললেন বটে, তবু তার মধ্যে দিয়ে একটু জাতিবিদ্বেষ 
ফুটে বেরুলো বৈকি । ফরাশি সেনাদের ধরাচুড়ো পরার পর অনেকটা ব্যাঙের মতো 
দেখায়, সেইজন্যেই কি তাদের ফ্রগস বা ব্যাঙ বলে ? নাকি ব্যাঙের ঠ্যাঙ তাদের একটা 
মুখরোচক খাদ্য বলেই তাদের ফ্রগস বলে? তার উত্তর অবিশ্যি মেজর মাকন্যাবস 
নিজেই জানেন না। কিন্তু একবার যখন পাঞয়লের কথার তোড় একটু ক'মে এসেছে, 
তিনি ফাক বুঝে, তাকে খানিকটা তাতিয়ে দেবার জন্যেই হয়তো, জিগেস ক'রে বসলেন, 
“আচ্ছা, মসিয় পাঞ্য়ল, এটা কি আপনি বলতে পারবেন অস্ট্রেলিয়ায় কেন ফরাশিদেব 
এত রমরমা? ইংরেজরা কেন ফরাশিদের হাতেই দখলদারি ছেড়ে দিয়ে এখান থেকে 
পাততাড়ি গুটিয়ে সটকে পড়েছে ?, 

পাঞয়ল বুঝি আচমকা এমন প্রশ্ন শুনে একটু অপ্রস্তুতই বোধ করেছেন। থতমত 
খেয়ে বলেছেন : কেন ?, 

'অস্টরলিয়ার ব্যাঙের ডাক শুনে ভয়ে আতকে উঠে ইংরেজ কাণ্ডেনরা জাহাজ নিয়ে 
চম্পট দিয়েছিলেন ব'লে-আর-ককখনও অনেকদিন ওমুখো হয়নি। সেই-ফাকে এ 
ব্যাঙের লোভেই ফরাশিরা, তাদের স্বজাতির খোজে এসে, এখানে বেশ জম্পেশ ক'রে 
জমিয়ে বসেছে।' 

হেসে ফেলেছেন জাক পাঞয়ল, তবে একটু আপত্তি জানাতেও ছাড়েননি। 
“ইংরেজরা না-হয় চারপাশে সাম্রাজ্য ছড়িয়ে বসে অন্যসব লোকদের সম্বন্ধেই নাক 
শিটকোয়, তাদের আর মানুষ বলেই মনে করে না। কিন্তু আপনি তো স্কট, হাইল্যাণ্ডের 
লোক, তাদের দেখাদেখি আপনি কেন আমাদের ফ্রগ বলবেন- আমরা ফরাশিরাও কিন্তু 
খুব-একটা কুয়োর ব্যাঙ নই-আমরাও পৃথিবীর নানান মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছি। 

জ্ঞান বিতরণের ফাকে-ফাকেই, মওকা পেলেই, মেজর ম্াকন্যাবস তাকে একটু 
তাতিয়ে না-দিয়ে উসকে না-তুলে ছাড়তেন না। একঘেয়ে সমুদ্রযাত্রায় এ-সব আড্ডায় 
বরং একঘেয়ে জল দেখে-দেখে বিকল চিত্ত অন্যকোনো বিষয়ে কথাকাটাকাটি শুরু ক'রে 
দিতে পারে। তাছাড়া মেরি আর রবার্ট যেভাবে মনমর! হ'য়ে আছে, তাতে তাদেরও « 
এতে কথঞ্চিৎ দুর্ভাবনা বা হতাশা থেকে মুক্তি দেয়া যায়। যতদিন তারা জানতো যে 
কাপণ্ডেন গ্রান্ট-এর কোনো হদিশ নেই, মারাই পড়েছেন বুঝি-বা, তারা একরকম ক'রে 
এই দুর্ভাগ্যের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছিলো । এখন, যখন আবার কাণ্তেন গ্রান্ট- 
এর হদিশ পাবার একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তিনি যে বেচে আছেন এমন-একটা 
সম্ভাবনা যে আর নিছকই কল্পনার স্তরেই সীমাবদ্ধ হ'য়ে নেই, অথচ তবু তিনি যে কোথায় 


৮৫ 


আছেন সত্যি-সতা, এবং কীভাবে আছেন, তার কিছুই জানা যাচ্ছে না, তখনই বরং 
আশা-নিরাশার দোলায় তাদের মন অনবরত পেগুলামের মতে! দোল খেয়ে যাচ্ছে। 

তারপরেই, বিশে ডিসেম্গর, কেপ বার্নউইলিতে গিয়ে পৌছুলো ডানকান। এতদিন 
কেটে গিয়েছে, দৃ-দুটো বছর তো বটেই, এর মধ্যে ব্রিটানিয়া জাহাজের ধবংসাবশেষ 
নিশ্চয়ই এখন আর এখানে পড়ে নেই। সব লুগপাট হয়েই গেছে নিশ্য়ই। কিন্তু তবু 
তো খোজখবর কিছু নিতেই হয় । এতদিন নিরুদ্দিষ্টের সন্ধানে তারা কত-কত জায়গায় 
ট্রড়ে বেরিয়েছেন, কোনে! খবরই পাননি- এখানে ভাঙাচোরা ব্িটানিয়াকে পাওয়া যাক 
বা না-যাক, হয়তো লোকমুখে কিছু-একট। খবর পাওয়া যাবে । আর শেষ অব্দি এখানেও 
যদি কোনো খোজ না-মলে, তাহলে না-হয় ফের ইওরোপেই ফিরে যাবে ডানকান। 
কেননা বিটাণিয়া এখানবার দরিয়ায় না-ড়ুবে যদি অস্ট্রেলিয়ার পর্ব উপকলে কোথাও 
সলিলসমাধি লাভ করে থাকে_মসিয় জাক পাঞ্য়লের সুচিন্তিত অভিমত--তাহ'লে 
কাণ্তেন গ্রান্ট নিশ্চযই অনেক আগেই ইওরোপে ফিরে যেতেন। পর্ব অস্ট্রেলিয়ায় 
ইংরেজদের উপনিবেশ বেশ জাকিয়েই বসেছে, সেখান থেকে হইওরোপ ফিরে-যাবার 
জাহাভী ও মাতায়াত করে হরদম, কলে কাপ্তেন গ্র্যান্টের পক্ষে কোনো-একটা জাহাজে 
উঠে-পড়া খুবই সম্তব। বরং যখন ডানকান যেখানে এসে পৌছেছে, পশ্চিম অস্ট্রেলিযায়, 
সেখানে এখনও কোনো বড়ে। বসতি গড়ে ওঠেনি, আউটবাক শুরু হয়েছে প্রায় 
সমদ্রতীর থেকে একট্-ভিতরে গিয়েই, আর এই আউটব্যাকে খা-খা করছে রুক্ষ উর 
তপ্তবালিব মরুভমি। 

অনেক ঝক্ষিঝামেল৷ পুইয়ে ডাঙায় নেমেই দেখা গেলো দূরে একটা উইশুমিলের 
চাকা হাওয়ায় অনবরত পাক খেয়ে যাচ্ছে । উইগুমিল আছে-অর্থাৎ এখানে লোকজনও 
আছে আশপাশে কোথাও, নিশ্চয়ই ছোটোখাটো হ'লেও চাষ-আবাদের কোনো-একটা 
বাবস্থা আছে। আর, সভ্য ত1-১, একট এশুতেহ পেথা গেলে খানবয়েক বাড়ি একটা 
জায়গায় যেন জটলা পাকাচ্ছে, সামনেই সবুজ মাঠ, সেখানে গোরু-ভেড়া চরছে, ঘোড়াও 
আছে. কাছেই যে খেতখামারের ব্যবস্থ! আছে, তারই চিহ্ন হিশেবে আছে একটা 
গোলাবাড়িও । 

এদের এগুতে দেখে, সবচেয়ে বড়োবাড়িটা থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এলেন একজন 
প্রৌঢ়, বিশাল দশাসই চেরা-এত বমষেস হওয়া সত্তেও কোথাও বয়সের কোনো ছাপ 
পড়েনি। তার পেছনে ঘেউ-ঘঘেউ করতে-করতে ছুটে এসেছে চারটে তাগড়াই কুকুর। 
প্রোটের সঙ্গে-সঙ্গে আরো বেরিয়ে এসেছে চারজন বলিগ্ঠ তরুণ, লাল চলের ঢল নেমেছে 
তাদের মাথায়, যেন আগুনের শিখা জলে উঠেছে এ ঝাকড়াচুলে। নিশ্চয়ই 
আয়ারলান্ডের মান্ষ, ইংরেজদের অত্যাচারে দেশে তিষ্ঠোতে না-পেরে অজানায় ঝাপ 
খেয়ে ভাসতে-ভাসতে শেষকালে এরা সবাই এই পশ্চিম অস্ট্রেলিয়াতিই এসে পৌছেছে। 


ঢ৮৬ 


ত্র সরাসরি তাদের সামনে এসে এগিয়ে এলেন। বললেন : "শ্বাগতম। 
ওয়েলকাম--প্যাডি ওস*মুরের বাডিতে আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাই ।" 

“আপনি--? 

“হ্যা, আমি আয়ারল্যাণ্ডেরই লোক । যা অবস্থা, তাতে দেশে থাকলে কবেই না-খেতে 
পেয়ে মারা যেতৃম, এখানে এসে চাষ-আবাদ ক'রে মোটামুটি স্বাচ্ছন্দ্েই আছি । আসুন. 
ভেতরে আসুন সবাই-তারপর ভালো ক'রে আলাপ করা যাবে। কতকাল যে এখানে 
বাইরের লোকের পা পড়েনি-মাঝে-মাঝে একেবারে হীপ ধ'রে যায়? 

শ্লোট তাদের নিয়ে গেলেন মন্ত-একটা ঘরে, যার মাঝখানে রয়েছে বিশাল-একটা 
টেবিল, বাসনকোশন খাবারদাবার দেখে মালুম হলো এটাই এই খামারের ডাইনিং হল। 
বোঝাই গেলো, সবাইকে নিয়ে শ্রোট খেতে বসছিলেন, এবার অভাগতদেরও তাদের 
সঙ্গেই বসিয়ে দিলেন খাবারটেবিলে। তারপর মুদু হেসে বললেন, “আপনাদের 
অপেক্ষাতেই ছিলুম), 

“আমাদের অপেক্ষায় ? বিস্ময়ে লর্ড গ্রেনারভনের বুঝি বাকম্ফুতিই হ'তে চাচ্ছিলো 
না। 

',বাজই অতিথিদের অপেক্ষা করি কিনা-_যদি কেউ দৈবাৎ পথভুল ক'রে এখানে 
এসে পড়ে। আমার দরজা সারাবছর এ অনাগত অতিথিদের জনো খোলা থাকে। 
মবশেষে এখন, যা-হোক, আপনারা এসে পৌছেছেন।, 

নিজনবাসের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই লর্ড গ্লেনারভনের। কিন্তু এ-কথা থেকে 
এটকুই শুধু বুঝতে পারলেন যে. সারাদিন না-হয় খেটেখুটে কাজে-কর্ণে কাটিয়ে দেয়া যাষ, 
বিন্ত অবসর সমরে দুটো কথা কইতে না-পারলে পেট ফেপে যায়, বুঝি দম আটকেই 
যায়, গলার কাছে এত কথা জ'মে থাকে: ড্যানিয়েল ডি-ফো রবিনসন ফুসে-র গল্পটা বোধহয় 
ফেঁদেছিলেন জাহাজডোবা নাবিক আলেকজা গর সেলকার্ককে নিয়ে- কিন্তু ফ্রাইডে যদি 
না-আসতো তাহ'লে একদিন একা থাকতে-থাকতে ভ্রুসোর দশা যে কী হ'তো, সেটা 
ভাবতেই বুক শুকিয়ে যায়। 

প্যাডি ও”মুর- সেটাই তো এই দিলদরিয়া প্লোুর নাম, তা-ই না?-__আ্যাদ্দিন বাদে 
অচেনা-কারু সঙ্গে কথা বলতে পেরে অনর্গল কথা ব'লে যাচ্ছেন, কথার যেন ফুলঝুরি 
সুটছে। খেতে-খেতেই নিজের কাহন শোনালেন সাত-সতেরো। তারপর একসময় 
শুনলেন গ্রেনারভনদের সাগরপাঁড়ির পেছনকার কাহিনীটা । সারা আমেরিকা ঢুড়ে 
বেরিয়েও এখনও তারা কাপ্তেন গ্রান্টের কোনো সন্ধান পাননি-যেন মরীচিকার পেছনে 
ছুটেছেন-এবারে এই অস্ট্রেলিয়াতেও ব্রিটানিয়ার কোনো হদিশ না-পেলে, বাধ্য হ'য়ে, 
শেষটায় এই বেচারা ছেলেমেয়ে দুটিকে নিয়ে ঘরের ছেলেকে ঘরেই ফিরে যেতে হবে। 

লর্ড গ্রেনারভন যেমনভাবে কাণপ্তেন গ্রান্টের কাহনীটা ফেঁদেছিলেন, তাতে তা 


৮৭ 


সকলেরই মর্মম্পর্শ করেছিলো । শুনতে-শুনতে কখন যে সবাই কাটাচামচে নাড়ানো 
বন্ধ ক'রে স্তব্ধ হ'য়ে এই করুণ কাহিনীতে মগ্ন হ'য়ে পড়েছিলো, তা কেউই খেয়াল 
করেনি । হঠাৎ চমক ভাঙলো কার কথায়, স্তর্ূতার জন্যেই সম্ভবত অতর্কিত কথাগুলোকে 
ঠিক দৈববাণীর মতো শোনালো : 

“কাণ্তেন গ্রান্ট যদি এখনও বেচে থাকেন, তবে অস্ট্রেলিয়াতেই আছেন!” 


দুই 
আকাশবাণী এবং আয়ারটন 


যেন বিদ্যুৎ স্পর্শ করেছে, এমনিভাবে ঝাকুনি খেয়ে লাফিয়ে উঠলেন লর্ড এডওয়ার্ড । 

“কে? কে এ-কথা বললে? 

“আমি, টেবিলের ওপাশ থেকে শান্ত ধীরগলায় জবাব দিলে প্যাডি ও"মুর-এরই 
এক সাগরেদ। 

আর তার দিকে তাকিয়ে এবার তাজ্জব হওয়ার পালা খোদ প্যাডি ও"মুব-এরই। 
“তুমি? আয়ারটন ?, 

হ্যা। এদের মতো আমিও হাইল্যাগডার-স্কটল্যাণ্ডেরই মানুষ। ব্রিটানিয়া জাহাজে 
আমিও ছিলুম।' 

এটা যেন দ্বিতীয়-আরেকটা বজ্রাঘাত। 

কী বলছে এই লোকটা, এই-যাকে আয়ারটন ব'লে সম্বোধন করেছেন প্যাডি 
ওসমুর? ব্রিটানিয়া-য় ছিলো এ? কাণ্তেন গ্রান্টের সঙ্গে? 

মেরি প্রায় যেন মুছাই যাবে ! 

জন ম্যাঙ্গল্স, জাক পাঞয়ল, রবার্ট গ্র্যান্ট--সবাই ততক্ষণে যে-যার চেয়ার ছেড়ে 
লাফিয়ে উঠে এসে ঘিরে ধরেছেন আয়ারটনকে। 

রুক্ষ, হ্রাকট্রা চোহারা আয়ারটনের, অনেকদিন সমুদ্রে ঘুরে বেড়াবার জন্যেই বোধ- 
করি লোনা হাওয়ায় রোদে-জলে গায়ের রঙ প্রায়-তামাটে। ঘন জোড়াভুরু, ঝোপের 
মতো ঢেকে রেখেছে তার তীব্র দুটি চোখকে । দড়ির মতো পাকানো- কিন্তু কঠিন জোয়ান 
নাবিকশরীরে পেশী ছাড়া যেন আর-কিছুই নেই--মেদবজিত বাহুল্যবর্জিত খজু শরীর। 
লম্বা তেমন নয়, কিন্ত্ব প্রকাণ্ড চওড়া কাধ, বলিষ্ঠ, ক্ষিপ্র, তেজিয়ান। মুখের মধ্যে একটা 
বেপরোয়া দুঃসাহসী তেজের ছাপ। 


৮৮ 


“তুমি ছিলে ব্রিটানিয়ায়?” লর্ড এডওয়ার্ডের গলার স্বরে একইসঙ্গে যেন বিস্ময়, 
অবিশ্বাস, আর হঠাৎ-মাথা-চাড়া-দেয়া একটা আশার ভাব। 

“আমি ছিলাম কোয়ার্টারমাস্টার-_ আমার ওপরই ভার ছিলো হালের, সিগন্যালের, 
সারেঙের-_, 

“জাহাজডুবির পর তুমিও কি কাণ্তেন গ্রান্টের সঙ্গে গিয়ে ভাঙায় উঠেছিলে ?, 

“না, আমি হঠাৎ এক প্রচণ্ড ধাক্কায় ডেক থেকে ছিটকে পড়ে যাই জলে-- 

“আমরা যে-চিরকুট পেয়েছি তাতে দুজন নাবিকের কথা লেখা আছে। তুমি তাহ'লে 
সে-দুজনের কেউ নও? 

“না। কিন্তু কোন-চিরকুটের কথা বলছেন ? আমি তো কোনো চিরকুটের কথা জানি 
না। আমি ভেবেছিলাম, আর-সকলের সাথে কাণ্তেন গ্রান্টেরও বুঝি সলিলসমাধি হয়েছে, 
শুধু আমি একাই কোনোমতে প্রাণে বাঁচতে পেরেছি-” 

কিন্তু তুমি তো নিজেই এইমাত্র বললে যে কাণ্তেন গ্রান্ট বেচে আছেন_' 

“তা তো বলিনি! বলেছি, কান্তেন গ্রান্ট যদি এখনও বেচে থাকেন-' 

“বলেছো, তবে তিনি অস্ট্রেলিয়াতেই আছেন !' 

'হ্যা। বেচে গিয়ে থাকলে এখানেই কোথাও তিনি আছেন।' 

এতক্ষণে, ফাক পেয়ে, মেজর ম্যাকন্যাবস আসল প্রশ্রটা করলেন। “ব্রিটানিয়া ঠিক 
কোনখানে ডুবেছিলো ? 

আসলে প্রথম প্রশ্নটা এইটেই হওয়া উচিত ছিলো। উত্তেজনায় সব তালগোল 
পাকিয়ে গিয়েছিলো লর্ড এডওযার্ডের, তাই এতক্ষণ তিনি উলটোপালটা নানান প্রশ্ন 
ক'রে যাচ্ছিলেন-তিনি এখনও ঠিক বিশ্বাস ক'রে উঠতে পারেননি যে কাণ্তেন গ্রান্টের 
সঙ্গে ব্রিটানিয়া জাহাজের সেই কপালমন্দ-পাড়িতে ছিলো, এমন-কারু সঙ্গে সত্যি তাদের 
দেখা হয়েছে। 

“অস্ট্রেলিয়ার কাছেই, প্রায় তীরে এসে। প্রকাণ্ড একটা ঢেউয়ের ধাক্কায় জাহাজ 
থেকে আমি ছিটকে পশ্ড়ে ষাই। জাহাজ নিশ্চয়ই তারপরেই ডুবেছে। 

এবার জন ম্যাঙ্গল্সের আরো-একখানা মোক্ষম প্রশ্ন, এ যদি সত্যি ব্রিটানিয়ার 
কোয়ার্টারমাস্টার হ'য়ে থাকে তবে এ-প্রশ্নের উত্তর তার জানা উচিত। “কত 


“না, পূর্ব উপকৃলে। 
যেমন দুমদাম ক'রে প্রশ্ন আসছে, তেমনি দূমদাম ক'রে আয়ারটন উত্তর দিচ্ছে। 
উত্তর দিতে একমুহূর্তও দেরি হচ্ছে না তার, একটুও দ্বিধা বা দোনোমনার ভাবও নেই। 


৮৯ 


“সেটা কত তারিখ ছিলো ?' 

“১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দের সাতুই জুন--রাতের বেলায়, সেইজন্যেই জলে ছিটকে পড়ার 
পর গোড়ায় আমি অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাইনি--তা ছাড়া সমদ্রেও খ্যাপা তাগুব 
চলছিলো, বড়ো-বড়ো সব ঢেউ, ঢেউয়ের সঙ্গে যুঝতে গিয়ে একেবারে জেরবার হ'য়ে 


কিন্তু তার স্মৃতিচারণ থামিয়ে দিয়ে ততক্ষণে লর্ড এডওয়ার্ড ব'লে উঠেছেন, “তারিখ 
তো মিলে যাচ্ছে!" এতক্ষণে তার গলায় হর্ষের একটু আভাস এসেছে। 

জেরা চললো, তারপরেও, অনেকক্ষণ। কত-ে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেলো 
আয়ারটন, গলার সুরে দ্বিধা নেই, চোখের পাতা কাপেনি, ককখনও একট থতমতও 
খায়নি। 

আর যতক্ষণ ধ'রে জিজ্ঞাসাবাদ চলেছে, সারাক্ষণ প্রায়-পলকহান চোখে তারই 
দিকে তাকিয়ে থেকেছে মেরি। এতদিনে বুঝি একটু আশার আলো দেখা যাচ্ছে_বুঝি 
অবশেষে বাবার সঙ্গে আবার তার দেখা হবে--প্রায় মৃত্যুর মধ্য থেকে ল্যাজারাসের মতো 
অন্ধকার ফুঁড়ে এবার উঠে আসবেন কাণ্তেন গ্রান্ট। ব্িটানিয়ার একজনের খোঁজ যখন 
পাওয়া গেছে, তখন অন্যদেরও দেখা মিলতে আর কি বেশি দেরি হ'তে পারে? 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গলস আর মেজর ম্যাকন্যাবস কিন্তু এত-সহজে কোনো অভাবিত 
উটকো দাবি মেনে নিতে রাজি নন। বিশেষত, সমুদ্রে-যারা-থুরে-বেড়ায় তারাই জানে 
অনেক ভাগ্যাম্বেষী ফেরেব্বাজ চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কানাঘুষোয় তারা শুনতে পায় 
কোথায় কোন জাহাজড়বি হয়েছে, তারপর জাহাজের মালিক বা জাহাজের কাণ্তেনের 
বাড়ির লোকদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে সাতকাহন ফেদে এ-ধরনের 
লোক তাদের নিংড়ে টাকাকড়ি বার ক'রে নেবার চেষ্টা ক'বে থাকে । বিশ্বাসপ্রবণ লোকদের 
ঠকাবার জন্যে কত লোকই যে ৬ শেতে খাকে-এ যেন ঝোপে-ঝোপে সব নেকড়ে, 
উৎপাত বাধাবার জন্যে সবসময়েই প্রস্তুত। ফলে কাণ্তেন আর মেজর আরো-নানা কথা 
জিগেস ক'রে জেনে নিতে চাচ্ছিলেন, এই আয়ারটন যা-যা বলছে, সে-সব কথা ঠিক 
কি না। না-যাচাই ক'রে, না-বাজিয়ে নিয়ে চোখবুজে অনায়াসে সবকিছু বিশ্বাস ক'রে 
নেয়া চলে না। বিশেষত তারা দুজনেই এইদলের মধ্যে সবচেয়ে সন্দেহপ্রবণ, সবচেয়ে 
পোড়খাওয়া লোক। এটা অন্তত তাদের জানতে বাকি নেই যে সমুদ্রের ধারে বাতাসে 
যে-সব কথা ভেসে বেড়ায় তাতে সালতারিখ মিলিয়ে কাউকে ধাপ্লা দেয়া খুবই সহজ 
কাজ । 

কিন্তু আয়ারটন যখন ব্রিটানিয়ার এই এতবড়ো সাগরপাড়ি দেবার আগেকার ঘটনা 
নির্ভুলভাবে সব ব'লে গেলো, তাদের সন্দেহও আন্তে-আস্তে মিলিয়ে যেতে লাগলো। 
তার কথা থেকে এও বোঝা গেলো যে মেরি আর রবাটকেও সে চেনে এইটুকু বয়েস 


9০ 


থেকেই। 

একবার-_ রবার্টের বয়েস তখন মাত্র দশ হবে-শেরিককে নিয়ে একট। 
আপায়নসভার আয়োজন হয়েছিলো জাহাজেব ডেকে, ধুমধাম ক'রে ভোজসভা 
ণসেছিলো, এমন সময়ে হঠাৎ রব উঠেছিলো রবাটকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না- তারপর 

নেক খুজে দেখা গেলো সে মাস্তুল বেয়ে ওপরে উঠে গিয়েছে, পাল আকড়ে ধারে 

ল্যাগব্যাগ ক'রে দোল খাচ্ছে শন্যে। 

অমনি রবার্ট সায় দিয়ে উঠলো, “হ্া-হ্যা, গিক এমনটাই হয়েছিলো । কিন্তু সে-তো 
কবেকার কথা । তখন আমি ভাবি দুষ্ট আর দুরন্ত ছিলুম!' এমন ভঙ্গি ক'রে কথাট। সে 
বললে যেন এখন আর সে অমনতর ডানপিটেটি আর নেই। 

এ-রকম একটা নয়, পর-পর অনেকগুলো ছোটোখাটে। পল্সঈহ বলে গেলো 
আয়ারটন। মেরি চোখ গোল-গোল ক'রে হা ক'রে সব কথা শুনছে, আর মতই বাবার 
কা শুনছে ততই যেন চোখের কোল ভিজে উঠছে তার। সে প্রায় ধর।গলাতেই জিগেস 
বরলে তার বাবার কথা। 

আয়ারটন বললে কাণ্তেন গ্রান্টের নাকি পরিকল্পনা ছিলো পাপুয়-নিউগিনির পশ্চিম 
উপকূলে একটা নয়া উপনিবেশের পণুনি করবেন, তার নম দেবেন নিউ ক্ষটল্যাণু, 
৫লন্দাজরা যেমন কতগুলো দ্বীপের নাম দিয়েছিলো নিউ-আমস্টারডাম। সেবার কাইয়াও 
পেরিয়ে ভারত মহাসাগরের ওপর দিতে তিনি ইওরোপ ফিরছিলেন-_এমন সময় হঠাৎ 
আকাশ কালো ক'রে জমলো ঘন মেঘ, মার তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুরস্ত ঘৃর্ণিহাওয়া। 
ঝড়টা যেমন প্রচণ্ড ছিলো, তেমন এসেছিলো আচন্গিতে, অতর্কিতে। এমন দুর্যোগ 
হার এত বছরের নাবিক জীবনে& আয়ারটন মাগে আর-কখনও দ্াখেনি। ঝোডো 
হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বুট্টিও নেমেছিলো মষলধারে-কেউ যেন আকাশ থেকে 
অবিশ্রাম পিপে-পিগে জল ঢেলে দিচ্ছিলো । দেখতে-না-দেখতে জাহাজের খোলে পর্যন্ত 
'গয়ে জল ঢুকলো, এতটাই যে জাহাজটা কাৎ হয়ে প্রায় বুঝি ডুবেই যায়। এরই মধ্যে 
প্রা-ডুবুডুবু জাহাজ নিয়েই যেন ধুঁকতে-ধুকতে এগুচ্ছিলো ব্রিটানিয়া, আর বাইশে জুন 
সেই দুর্যোগের মধ্যেই দূর থেকে আবছা দেখ গিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার উপকূল। যখন সঝাই 
৬।বছে এবার বুঝি কোনোরকমে জাহাজটাকে নিরাপদে নিয়ে গিয়ে তারে ভেড়ানো যাবে, 

একটা চোরা ড্ুবোপাহাডে ঘা লেগে থরথর ক'রে কেপে উঠেই থমকে দাড়িয়ে 
পড়েছিলো বিটানিয়া। সেই-তখনই এ অতর্কিত ঝাকুনিতে আর ঢেউয়ের ঝাপটায় 
মায়ারটন ছিটকে পড়েছিলো জাহাজ থেকে । তারপর থেকে কাণ্ডেন গ্রান্ট বা রিটানিয়ার 
আর-কোনো খবরই পানি সে। ধ'রে নিয়েছিলো, সেখানেই অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব-উপকূলের 
কাছেই ব্রিটানিয়া ডুবে গিয়েছে-সেই দুর্যোগের মধো আর-কেউই আত্মরক্ষা করতে 
পারেনি। কিন্তু এখন খাবারটেবিলের কথাবার্তা থেকে সে বুঝতে পেরেছে যে, কাণ্তেন 


৯৯ 


গ্র্যান্ট দুজন সঙ্গীসমেত বেচে গিয়েছেন, কিন্তু তার অবস্থা এখন মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর 
_কেননা তাদের পাকড়েছে বুনো আদিবাসীরা, জংলিরা-কথা শুনে সে বুঝতে পেরেছে 
যে কোনোরকমে একটা বোতলে নিজেদের দুরবস্থার কথা চিরকুটে লিখে কাণ্তেন গ্রাণ্‌ 
বোতলটা জলে ভাসিয়ে দিয়েছেন। 

আয়ারটন নিজেও তীরে ভেসে এসে জংলিদের হাতে ধরা পড়েছিলো । তারা তাবে 
পাকড়ে গভীর দুর্ভেদ্য জঙ্গলের মধ্যে আটকে রেখেছিলো--তার ওপরে নাকি তারা অকথ 
অত্যাচার করেছে, সে-সব নির্যাতনের চিহ্ন এখনও আছে তার শরীরে । সেখানে দু-বছর 
বিস্তর দুর্ভোণ পোহাবার পর সে কোনোরকমে প্রাণ হাতে ক'রে পালায়-কেমন কে 
সে প্রাণে বেচেছে, হাজারো বিপদ উপেক্ষা ক'রে এতদূর পথ পাড়ি দিয়েছে সে-ও 
প্রায়-এক অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চকর কাহিনী। মাত্র দু-মাস হলো, এখানে প্যাডি ওসমুরের 
খামারে কাজ পেয়ে সে হাপ ছেড়ে বেচেছে-এখন অন্তত প্রাণের কোনো আশঙ্কা নেই 
খাটবে আর খেয়ে-প'রে বাঁচবে-_ খাটতে সে ডরায় না, কিন্তু এত-সব দুর্ভোগের পর 
এখন একটু নিশ্চিন্ত জীবন চাই তার। 

এতক্ষণ সবাই প্রায় রুদ্ধশ্বাসেই তার এই রগরগে আখ্যান শুনছিলো। কিন্তু তাবে 
দম ফেলবার কোনো ফুরসৎ না-দিয়েই মেজর ম্যাকন্যাব্স হঠাৎ জিগেস ক'রে বসলেন 
'ব্রিটানিয়ার কোয়ার্টারমাস্টার ছিলে তুমি? পেটি-অফিসার ?, 

আয়ারটন ঘাড় নেড়ে বললে, “হ্যা।' বলেই বুঝতে পারলো যে এখনও তাদের 
সন্দেহ ঘোচেনি। তাই সে আরো জুড়ে দিলে : “এত দুর্বিপাকের মধ্যেও আমি কিছু 
কিছু কাগজপত্র বাচাতে পেরেছি-আর সে-সব আমার সঙ্গেই আছে। দাড়ান, 
দেখাচ্ছি।' 

শাবুদ এসে হাজির করলে সে প্রায় মিনিটখানেকের মধ্যেই : কাণ্তেন গ্রান্টের 
স্বাক্ষর-সংবলিত চিলতে একটুকরো কাগজ, তাতে এই মর্মে একটা বয়ান যে অমুক 
মিস্টার আয়ারটন... ব্রিটানিয়া জাহাজের কোয়ার্টারমাস্টারের পদে নিযুক্ত হয়েছে। 
কাগজটা সে তুলে দিলে মেজর ম্যাকন্যাব্স-এরই হাতে, কেননা তার হাবভাবেই বোঝা 
কোনোকিছু এককথাতেই বিশ্বাস ক'রে ফেলার পান্তর তিনি নন। কিন্তু যখন এই 
জিজ্ঞাসাবাদ ও সাক্ষ্য প্রমাণ দাখিল করার প্রক্রিয়াটা চলেছে, তখনই প্যাডি ও"মুর একটু 
মিনমিন ক'রে বলেছিলেন : “আয়ারটনকে আপনি বিশ্বাস করতে পারেন, মেজর। গত 
দু-মাস ধ'রে তো একে আমি দেখছি--খুব চটপটে কাজের লোক। জাহাজডুবির কথা 
সে আগেই আমাকে বলেছিলো-তবে অবশ্য এতটা খুঁটিনাটি সমেত বিশদ ক'রে 
বলেনি। 

মেজর ম্যাকন্যাবস কাগজের ওপর একবার চোখ বুলিয়েই সেটা চালান ক'রে 


৪ 


দিয়েছিলেন লর্ড এডওয়ার্ডের হাতে। গ্লেনারভনও সেটা আগাপাশতলা খুঁটিয়ে দেখে 
নিলেন। তারপর সকলের উদ্দেশেই বললেন : “এখন তাহ”লে কী করা উচিত আমাদের ? 
সাচ্ছা, আয়ারটন, তুমিই বলো--এ-অবস্থায় কী কর! যায়? 

আয়ারটন প্রথমটায় খানিকক্ষণ চুপ ক'রে থেকে কী যেন ভাবলে । তারপর বললে : 
'আমাকে যে আপনাদের বিশ্বাস হয়েছে, সেজন্যে আপনাদের কৃতজ্ঞতা জানাই। আমার 
নিজের একটা কথা মনে হচ্ছিলো। আমি যে-রকমভাবে তীরে সাৎরে উঠে এসে বুনোদের 
খপ্পরে পড়ে গিয়েছিলাম, আমার মনে হয় কাণ্তেন গ্রান্টরাও যদি ওরই কাছাকাছি কোথাও 
ডাঙায় উঠে থাকেন, তাহ'লে নিঘাৎ জংলিদেরই কবলে পড়েছেন। ওদের খোজ করতে 
হ'লে আমাদের গোড়ায় অকুস্থলে যেতে হবে-ঠিক যেখানটায় জাহাজড়বি হয়েছিলো, 
'সখানে। প্রথম খোঁজখবর সেখান থেকেই শুরু করা উচিত।' 

এবার কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স বললেন : “কিন্তু সেটা তো এক্ষুনি করা যাবে না। জাহাজ 
মেরামত করতে হবে- তাতে খানিকটা সময় লাগবে। বিশেষত এখানে যেহেতু কোনো 
জাহাজসারাইয়ের উপযুক্ত বন্দর বা কারখানা নেই, আমাদের তাই একটু অসুবিধের মধ্যেই 
কাজ করতে হবে। 

এতক্ষণ জাক পাঞয়ল যে কী ক'রে চুপচাপ ব'সে-ব'সে অন্যদের কথাবার্তা 
বিনাবাক্যব্যয়ে শুনছিলেন, সেটাই আশ্চর্য। তার নিশ্চয়ই কথা বলার জন্যে সারা মুখটাই 
চুলবুল করছিলো। এতক্ষণ তিনি কেবল উশখুশই করেছেন, কিন্তু লাগসই কোনো কথা 
ভেবে বার করতে পারেননি। এবার সুযোগ পেয়েই তিনি সরাসরি একটা সিদ্ধান্তই ঘোষণা 
ক'রে বসলেন--তার একার নেয়া সিদ্ধান্ত : “তাহ'লে আমরা সীইত্রিশ ডিগ্রি সমাস্তর বরাবর 
ডাঙার ওপর দিয়েই যাবো-তাতে এ-অঞ্চলটা সরেজমিন জরিপ ক'রে দেখাও হবে।' 

“কিন্ত্র ডানকান ?” জাহাজের নামটার ওপর একটু জোর দিয়েই জিগেস করলে 
ময়ারটন। 

“কাণ্তেন ম্যাঙ্গলস যদি সঙ্গে থাকেন, তাহ'লে আমরা সোজা ভিষ্রিয়া চ'লে যাবো 
-না, না, মেলবোর্নেই যাবো-ডানকান যেখানে ঠিকভাবে কারখানায় সারাই হবে, 
সেখানে । আর মেলবোর্নে তাদের না-পাওয়া গেলে, ডানকান আমাদের তুলে নিয়ে যাবে 
টফোল্ডে। এছাড়া মনে রাখতে হবে, আমাদের সঙ্গে মহিলারাও থাকবেন ।” পাঞয়ল 
এ-কথাটা বললেন মেরি আর লেডি হেলেনার দিকে একটি প্রসন্ন দৃষ্টি নিক্ষেপ ক'রে। 

“আপনি কি ঠাট্টা করছেন নাকি, মসিয় পাঞয়ল ?' লর্ড এডওয়ার্ড একটু বুঝি 
অবিশ্বাসের ভঙ্গিতেই বললেন। 

“ঠাট্টা? উঁহ, মোটেই না। কতটাই বা যেতে হবে, ভাবুন তো ? মাত্র তো সাড়ে- 
তিনশো মাইল পথ। সীইত্রিশ ডিগ্রি সমান্তর বরাবর কোথাও যে বুনোরা আছে, এমন 
কথা আমি কোনো বৃত্তান্তেই পড়িনি। তেমন-কোনো গভীর জঙ্গলই নেই তো জংলিদের 


৯৩ 


দেখা পাবেন কোথায় ? কোনো হিংশ্র জণ্তুজানোয়ারও নেই-যদিও এখানে এমন-অনেক 
জীবজন্তু আছে য! পথিবার অন্য-কোথাও নেই । অনেকটা রাস্তায় রেললাইন আছে, সু 
শ্বেতা্গরা আছে ( এখানে সৃসভ্য কথাটায় বেশ জোরই দিলেন পা ঞয়ল, সম্ভবত বৃনে 
বর্ধরদের সঙ্গে তাদের বাবধানটা কথাটায় চাপ দিয়েই তিনি বোঝাতে চাচ্ছিলেন ), 
গাড়িঘোড়া আছে, বাড়িঘর আছে, বসতি আছে, একটা শাসনযস্ত্র অর্থাৎ সরকাবি 
দফতরও আছে। একটা গাড়িতে করেই, রোজ যদি বারো মাইল পথও চলি, তবে খুব- 
বেশি ধকল পোহাতে হবে না- একমাসের মধোই আমরা পৌছে' যাবে৷ অস্ট্রেলিয়ার ও. 
মাথায়_ আপনারা যেন এডিনবরা থেকে লগুন যান, এ অনেকটা তারই মতো হবে 
আর-কি !, 

এমন-একটা ভঙ্গি ক'রে পাঞ্ঃয়ল কথাটা বল্লেন যেন অস্ট্রেলিয়ায় এতটা পথ 
পাড়ি দেয়া মোটেই কোনো সমস্যাই নয়। 

তার জ্ঞানের বহরকে আস্থা জ্ঞাপন ক'রেই লর্ড এডওযার্ড এবার লেডি হেলেনাকে 
জিগেস করলেন--“কী ? মাবে নাকি ?, 

লেডি হেলেনা মুদূুহেসে বললেন : 'ঞক্ষনি। এতে তো একটা দেশও দেখা হ'য়ে 
যাবে। স্কটল্যাণ্ডে কতজন ফিরে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার গল্প শোনায় আমাদের ? যত স্কট 
এখানে আসে, তারা তো সবাই এখানে থেকেই যায়! আমরা বরং ফিরে গিয়ে সবাইকে 
মেলবোর্নের গল্প শোনাতে পারবো । 

এবার আয়ারটনের দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে লর্ড এডওয়ার্ড জিগেস করলেন : 
'আর, আয়ারটন ? তুমি ?, 

আয়ারটন কিন্তু তক্ষুনি হ্যা বা না কিছুই বললে না। কী খানিক ভাবলে একট। 
তারপর জিগেস করলে : “কিন্তু আপনারা কোথায় গিয়ে উঠবেন ডানকানে ?, 

'অস্ট্রেলিয়ার এ-মাথা থেকে ও-মাথা ঢুড়ে ফেলবাব আগেই যদি কাণ্তডেন গ্রান্টের 
পাত্তা পাওয়া যায়, তবে মেলবোর্নেই গিয়ে আমরা জাহাজে চাপবো। আর, তা না-হ'লে, 
একেবারে পূর্ব-উপকৃলে । 

“আর কাণ্তেন ? 

“তিনি জাহাজ নিযে মেলবোর্নে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবেন। 

“ঠিক আছে। প্যাডি ওসমুর যদি আমায় ছেড়ে দিতে রাজি থাকেন, তবে আপনাদের 
সঙ্গে যেতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কাণ্তেন গ্রান্টকে খুঁজে পেলে তাকে গিয়ে 
বলবো- আই, আই, কাণগ্ডেন, বান্দা আবার কাজে যোগ দিতে এসেছে? 

তার এ-কথা শুনে সবাই এতক্ষণ গভীর-গণ্ভীর আলোচনার পর একটু যেন স্বস্তির 
দেখা পেলেন। কথাটা আয়ারটন এমনভাবে বলেছে যে কাণ্তেন গ্রান্টের সঙ্গে যেন 
অচিরেই সকলের দেখা হ'য়ে যাবে। 


নী৪ 


আয়ারটনকে ছেড়ে দেবার কথায় প্যাডি ও*মুর তক্ষুনি রাজি হ*য়ে গেলেন। 
আয়ারটন চৌকশ, চটপটে, কাজের লোক বটে, তবে এদের দরকার আরো-বেশি, আরো- 


জাহাজ থেকে ছুতোর নিয়ে এলো তার সব সাজসরপ্জাম-লর্ড এডওয়ার্ড তক্ষুনি 
তাকে গাড়ি তৈরির কাজে লাগিয়ে দিলেন। এ-সব ব্যাপারে অকারণে ধানাইপানাই ক'রে 
সময় নষ্ট করা তার ধাতে নেই--সিদ্ধান্ত একবার নিয়ে ফেললে তক্ষনি সে-কাজটায় 
লেগে না-পড়লে তিনি যেন স্বস্তি পান না। সমস্ত কাজটা তদারক করার দায়িত্ব নিলে 
মায়ারটন_সেও তক্ষুনি কাজে লেগে পড়তে চায়। ছ-জোড়া বলদে-টানা কুড়ি ফিট 
লম্বা চারচাকার গাড়ি হবে-তাতে যাবেন মহিলাবা । পুরুষরা সবাই খোড়ার পিঠে । গাড়ির 
মধ্যেই রসুই পাকাবার ব্যবস্থা থাকবে, রসদ থাকবে। 

কাজকর্মের প্রাথমিক প্রস্তুতিটা সার! হ'তেই আয়ারটনকে ডানকানে নিয়ে এলেন 
লর্ড এডওয়ার্ড। ডানকান মুলত প্রমোদতরী--বিলাসব্যবস্থার কোনো খা্টতি নেই 
তাতে- কিন্তু বিলাসের এতসব উপকরণের দিকে আয়ারটনের কোনো জুক্ষেপই নেই। 
সে সরাসরি এসে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখলো এনজিনঘর, জাহাজের গড়ন, খোল, মান্থুল, 
বয়লার্‌। ঘন্টা সতেরো নট যেতে পারে ডানকান- এ-কথা শুনে এতটাই অবাক হ'লো 
যে তার চোখদুটো যেন চকচক ক'রে উঠলো । তাহলে তো সবচেয়ে-তেজি সবচেয়ে- 
ক্ষিপ্র যুদ্ধজাহাজও পাল্লা দিতে পারবে না এই জাহাজের সঙ্গে। 

“তা তো পারবেই না, একটু গর্বের সুরেই বললেন লর্ড এডওয়ার্ড, 'ডানকানকে 
তৈরিই করা হয়েছে দৌড়ের বাজিতে জেতবার জন্যে । 

“ওজন কত জাহাজের ? 

“দুশো দশ টন।, 

ঘুরে-ঘুরে সারা জাহাজটাকেই খুটিয়ে-খুটিয়ে দেখে নিলে আয়ারটন। তার 
কৌতৃহলের যেন শেষ নেই কোনো। দেখে নিলে কোথায় কী হাতিয়ার, কোথায় কী 
অস্ত্রশস্ত্র আছে। একেবারে-ঝকঝকে একটি অত্যাধুনিক কলকক্জায় তৈরি জাহাজ, 
এনজিনের শক্তি কত শুনে সে গোড়ায় যেন কথা বলবার শক্তিই হারিয়ে ফেললো। 
আজকাল যে এ-রকম শক্তিশালী সব জাহাজ তৈরি হচ্ছে এটা জেনে সে বললে, “আমরা 
যখন ব্রিটানিয়াকে ঝড়ের হাত থেকে বাচাবার জন্যে প্রাণপণে চেষ্টা ক'রেও ব্যর্থ হচ্ছি, 
তখন ইওরোপ কিনা এমন-সব জাহাজ বানাচ্ছে যা সবচেয়ে দুরন্ত ঝড়কেও আর ভয় 
পায় না। ঈশ, যদি এ-রকম একটা জাহাজ থাকতো আমাদের, তাহ'লে অমনভাবে 
ঝড়ে-খেপে-যাওয়া সমুদ্রে আমাদের জাহাজডুবিও হ'তো না-অমন দুর্ভোগও পোহাতে 
হতোনা। 

“তখন না-হোক, এখন তো এ-জাহাজে তুমি কাজ করতে পারো» তার অমন খুশি 

৯৫ 


দেখে বললেন লর্ড এডওয়ার্ড, “হয়তো একদিন তুমিও এ-রকম কোনো জাহাজের কাণ্তেন 
হ'য়ে বসতে পারো।' 

“যদি হ'তে পারি, এমন ভাবে আয়ারটন কথাটা বললে তাতে মনে হলো, এ- 
রকম কোনো জাহাজ হাতে পেলে সে বুঝি স্বর্গসুখও প্রত্যাখ্যান করতে রাজি আছে। 

আয়ারটনকে বেশ ভালো লেগে গিয়েছিলো লর্ড এডওয়ার্ডের। আয়ারটন জাহাজ 
থেকে নেমে গেলে লর্ড এডওয়ার্ড মন্তব্য করলেন, “লোকটা সত্যি খুবই সপ্রতিভ আর 
বুদ্ধিমান-কাণ্তেন গ্রান্ট সম্ভবত লোক চিনতে পারতেন-_' 

“তা জানতেন কিনা, কে জানে, বললেন মেজর ম্যাকন্যাব্স, “তবে লোকটা বোধহয় 
অতিরিক্ত-বুদ্ধিমান। এত-বুদ্ধি সইলে হয় !” তার বিচ্ছিরিভাবে মুখবেকানো দেখে বোঝা 
গেলো আয়ারটনকে তার আদপেই পছন্দ হয়নি। খাবারটেবিলেও তিনিই আয়ারটনকে 
সবচেয়ে-বেশি কৃট প্রশ্ন করছিলেন। 

গাড়িটা তৈরি হ'য়ে যেতেই, আর যেন তর সইলো না কারু। ২৩শে ডিসেম্বর 
১৮৬৪ সালের সকালবেলায় শুরু হ'লো দক্ষিণ গোলার্ধের এই অন্যমহাদেশটায় তাদের 
হ'লো আয়ারটনই--এদিককার পথঘাট অন্যদের তুলনায় তারই বেশি চেনা। পেছনে 
চললো সশস্ত্র সাতজন অশ্বারোহী--লর্ড গ্লেনারভন, মেজর ম্যাকন্যাবস, জাক পাঞয়ল, 
রবার্ট গ্রান্ট, কাণ্ডতেন ম্যাঙ্গল্স- আর ডানকানেরই দুজন বাছাই-করা নাবিক। 

আয়ারটন শুধু একবার বলেছিলো এখানকার পথঘাটে নিরাপত্তার জন্যেই সঙ্গে 
আরো লোক থাকা দরকার। আরো-কয়েকজন নাবিক সঙ্গে থাকলে তার মতে আরো- 
নাকি বেশি-নিশ্চিন্ত হওয়া যেতো । কিন্তু লর্ড এডওয়ার্ড আর কাণ্েন ম্যাঙ্গলস আলোচনা 
ক'রে এই সিদ্ধান্ত পৌছুলেন যে, মেলবোর্নে গিয়ে জাহাজ মেরামতের কাজটা তাড়াতাড়ি 
সারবার জন্যে *বেশি নাবিক থাকা দরকার জাহাজটাতেই। তাছাড়া প্রত্যেকের সঙ্গেই 
যেহেতু যথেষ্ট অস্ত্রশস্ত্র আছে, তাতে এই সাত অশ্বারোহীই পথে কোনো গণশুগোল হ'লে 
সব সামলাতে পারবে। 

আগেই আলোচনা ক'রে স্থির হয়েছিলো এই দলটা যখন ডাঙায় কাণ্তেন গ্রান্টের 
খোঁজ নিতে-নিতে মেলবোর্নের দিকে যাবে, তখন টম অস্টিনই জাহাজ নিয়ে যাবে 
মেলবোর্নের জাহাজসারাইয়ের ঘাঁটিতে । টম অস্টিন কাজের লোক, দায়িত্ব সম্বন্ধে সে 
পুরোপুরি সচেতন, আর ভালো নাবিক হবার যেটা সবচেয়ে বড়োগুণ সেটাও তার আছে 
--গভীর সংকটের সময়ও সে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারে। 


৯৬ 


তিন 
ছুড়ে মারলেও যা হাতে ফিরে আসে, ফের 


অস্ট্রেলিয়া একটি বিশাল মহাদেশ, কিন্তু এর বেশিরভাগ অংশই জনমানবহীন, কোথাও 
দুর্গম অরণ্য, কোথাও-বা দুরারোহ পর্বত, এই যদি উপত্যকার মস্ত অংশ জুড়ে থাকে 
ঝোপঝাড় গাছপালা-পরক্ষণেই বিশাল বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে 
তৃষ্তায় জিভ চাটে রুক্ষ, উর, ধূ-ধু ধুলোর মরুভূমি । লোকালয় যা আছে, সবই সমুদ্রের 
তীর ঘেসে গ'ড়ে-ওঠা উপনিবেশে ; সমুদ্রতীর থেকে যত-দূরে কেউ যাবে, যত দেশটার 
ভেতরে ঢুকবে, ততই দেখতে পাবে আস্তে-আস্তে বিরল হ'য়ে আসছে বসতি, ভ্রুমে 
চোখে পড়বে যে কোথাও কোনো মানুষজন নেই- এমনকী দেশটার আদি বাসিন্দারা 
অব্দি খুব-একটা অভ্যন্তরে যায় না। আর এই ভিতরদেশকেই বলে আউটব্যাক। 

এখানে আকাশটা অব্দি অন্যরকম, ভিন্নরকম। যে-তারা ইওরোপের লোক দ্যাথখে 
আকাশের পুবে, এখানে সেটা ওঠে পশ্চিমে-যেটা দেখা যায় ইওরোপের গ্রীম্মেবসম্তে, 
সেটা এখানেও দেখা যায় শ্রীষম্মেবসস্তে-_কিন্তু এখানে যে খতুৃগুলোই উলটে গিয়েছে। 
তারা রওনা হয়েছেন ডিসেম্বরের শেষে, আর দু-দিন পরেই বড়োদিন, অথচ এখানে 
তাপমানযন্ত্র দেখায় গরম এমনকী ১১০ ডিগ্রি ফারেনহাইটকেও ছাপিয়ে গিয়েছে, 
যেখানে-যেখানে পথে গাছপালা পড়ে তার পাতাটুকু অব্দি নড়ছে না, হলকায় যেন ঝিম 
ধ'রে আছে সব, প্রায় যেন থমথমে, নিশ্চল। আর এই ধরনের আবহাওয়ায় অনভ্যস্ত 
এই অভিযাত্রীরা গরমে যেন ধুঁকতে শুরু ক'রে দিয়েছেন, যেটা হ'লো হাসফাস করারও 
পরের অবস্থা । 

দেশটা গড়ে উঠেছে-আদিবাসিন্দাদের যথাসম্ভব পরিকল্পনামাফিক খতম ক'বে 
দেবার পর অথবা আউটব্যাকে রে-রে ক'রে তাড়িয়ে নিয়ে যাবার পর- ফর্চুনহাশ্টাসর্দের 
দ্বারা, যে-সব ডাকাবুকো গাটাগোট্টা লোকেরা নিজেদের নাম বলে ভাগ্াম্বেষী, কেউ হ'য়ে 
যায় বৃশম্যান, ঝোপ-ঝঞ্লড়ের দস্যু, অতর্কিত চড়াও হয় জনপদে, আর ছিনিয়ে নিয়ে 
যায় সবকিছু--এইসব বাপেতাড়ানো মায়েখেদানো দুর্দীস্ত গুপ্ডার দল। এরা নিজেদের 
দেশে হয়তো খেতে পেতো না, জমিদারের অত্যাচারে জেরবার হয়ে যেতো, সংগঠিতঃ 
প্রতিবাদ করবারও সাহস হ'তো না কখনও, কাজেই দু-একটা হাতিয়ার আর নিজের 
প্রাণটা সম্বল ক'রে এরা এই দূর-দেশে, অন্য-একটা গোলার্ধেই, আরেকটা হেমিস্বিয়ারেই, 
পাড়ি জমিয়েছে। অন্য-যারা আছে তারা অধিকাংশই কয়েদি_কেননা ইংরেজ সরকার 
এই উপনিবেশটা গড়ে তুলেছে পিনাল কলোনি হিশেবে- ইংলগ্ের মতো ছোট্ট দ্বীপ 


ইন সার্চ: ৭ ৯৭ 


থেকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে-নির্বাসনই, কেননা আন্ত-একটা মহাদেশকে তো আর 
দ্বীপান্তর বল। যায় না--যতরাজ্যের দুক্কৃতকারীদের ; সেইসঙ্গে রাজনৈতিক কারণে খারা 
সরকারের চক্ষুশূল, তারাও বাদ যায়নি-আর অনেকে পালিয়ে এসেছে স্বেচ্ছায়, যখন 
শুনেছে সরকারের চরদের নেকনজর পড়েছে তাদের ওপর। আর এইসব কয়েদিদের 
দিয়ে বিনামজুরিতে খাটিয়ে নেবার কাজটা করাবার জন্যে আছে নির্মম নিষ্ঠুর যত ওয়ার্ডেন 
আর ওয়ার্ডারের দল--ইওরোপ থেকে প্রায়-একটা আস্ত কঠোরনির্মম শাসনব্যবস্থাই 
পরিকল্পনামাফিক তুলে এনে বসিয়ে দিয়েছে ইংরেজরা, যাদের রাজত্ব এখন এতই বিশাল, 
আর এতই ছড়ানো যে সে-রাজত্বে নাকি ককখনো সূর্যও ডোবে না, মনুষ্যত্ব যদি 
সাগরজলে সমাধি পায় তে! সে অন্যকথা। গশুধু-যে অচেনা প্রকৃতিই এখানে বিরূপ 
তা-ই নয়, মানুষজনগুলোও বুঝি তারই সঙ্গে নানিয়ে হ'য়ে উঠেছে রুক্ষ, কর্কশ, আর 
সারাক্ষণ তারা নিজেরাই খাটে অথবা তাদের দিয়ে উদয়ান্ত খাটিয়ে নেয়া হয় ব'লে, পিঠ 
বাঁকিয়ে সারাক্ষণ নুয়ে ঝুকে কাজ করতে হয় ব'লে তীব্রতীক্ষ রোদ্দুরে যাদের ঘাড় 
চিংড়িমাছের মতো টকটকে-লাল হ'য়ে গেছে, আর সেইজন্যই যাদের নাম হয়েছে 
রেডনেক, আর রেডনেক বললেই বুঝতে হবে যে ঘরে ব'সে পুথিপন্তর পড়ে দর্শন 
আলোচনা করার কপাল ক'রে তারা জম্মায়নি। শাসনযধ্তর, স্বাভাবিকভাবেই, এর সঙ্গে 
মানানসই। রাজপুরুষরা আছে, আর আছে সেপাইশান্তরী, উদ্দি, সমরবাহিনী, কাড়ানাকাড়া, 
বিউগল, আর তারই সঙ্গে জড়ানো যাবতীয় আনুষঙ্গিক লেজুড়। পৃথিবীটাকে এখানে 
উলটে দিয়ে ঘেন অন্য-গোলার্ধের যাবতীয় বিষয়বন্তুও এখানে এনে পুঁতে দেয়া হয়েছে। 
তবে প্রকৃতি তো শূন্যতার স্বভাববিরোধী-সে এই মানুষগুলোকে দিয়েই গান গাওয়ায়, 
ব্যালাড বা গাথা, অভিযাত্রীদের কাহিনী, বীরদের কাহিনী, দস্যুদের কাহিনী, সেই-যে এক 
দস ছিলো যার নাকি পায়ের আঙুল ছিলে সাতটা--না, তার গোড়ালি অবশ্য ওলটানো৷ 
ছিলো না। 

তাই এই অভিমাত্রীরা বেরুবার আগে আয়ারটন ভয়ে-ভয়েই বলেছিলো, সঙ্গে 
আরো-কয়েকজন সশস্ত্র নাবিক নিয়ে গেলে হ'তো না- আত্মরক্ষার সুবিধে হ'তো যদি 
অতর্কিতে কোনো ঝোপঝপ্লড় থেকে বিপদ এসে খাপিয়ে পড়তো লর্ড গ্লেনারভনের 
এই বহরটার ওপর। কেননা লোকালয়গুলো৷ এতই দূরে-দূরে যে হঠাৎ আক্রান্ত হ'লে 
সাহায্য আসার সম্ভাবনা তো সুদূরপরাহত। কিন্তু লর্ড গ্রেনারভনের হিশেবটা ছিলো 
অন্যরকম। সীইত্রিশ ডিগ্রি অক্ষরেখা বরাবর অঞ্চলটা তেমন জনমানবহান নয়- সমুদ্র 
দূরে নেই বলেই এখানে একটু পরে-পরেই উপনিবেশের লোকেরা বসতি বসিয়েছে 

অতর্কিতে কোনো হামলা হ'লে তাকে সামলাবার জন্যে সবাইকেই সবসময় সজাগ 
থাকতে হবে, অলিখিত নিদেশটা দেয়া ছিলো এ-রকমই। কিন্তু যে-হামলাটা শুধু আচম্বিত 
নয়-হয়তো অপ্রত্যাশিতও ছিলো--শুধু হামলাব বহর আর বাহারটাই নিশ্চয়ই জানা 


৯১৮ 


ছিলো না-সেই হামলাটা যখন এলো তখন তাকে ঠেকাবার ক্ষমতা দেখা গেলো কারুই 
প্রায় নেই। হামলাটা এলো খুদে-খুদে সব পোকামাকড়ের কাছ থেকে, মশার কাছ থেকে, 
কামড়ে ফুলিয়ে ঢোল ক'রে দেয় এমন-জাতের মাছির কাছ থেকে। বীলজেবাবকে যে 
পবিত্র ধর্মগ্রন্থে অর্থাৎ বাইবেল-এ পতঙ্গদেব বলেছে, লর্ড অভ দ্য ফ্লাইস্‌ বলেছে, তা 
কি এইজন্যেই? কেননা সেই সকাল থেকে একটানা চ'লে যখন আউটব্যাকের মধ্যে 
অর্থাৎ গাছপালাবিহীন বিশাল একটা প্রান্তরে এসে পৌছুলো বহর, তখনই প্রথম দেখা 
হলো পতঙ্গদেবের এইসব অনুচরদের সঙ্গে, এবং প্রথম সাক্ষাতেই তাদের বিকট 
মাখামাখিতে পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্ব'লে গেলো, যেন সর্বাঙ্গে কতগুলো কাকড়াবিছে 
কামড়েছে। 

তাদের এই নাছোড় আদরে সবাই যখন কাংরাচ্ছে তখন আয়ারটনের পরামর্শে 
গায়ে আমোনিয়া ঘ'সে কোনোরকমে জ্বলুনি একটু কমলো। একে অসহ্য গরম, তারপর 
এই মশামাছির উৎপাত : সোনার ওপর যেন সোহাগা। ঠা-ঠা রোদ্দুরে একটুও ছায়া 
নেই কোথাও । গাছপালা থাকলে তো ছায়া থাকবে। সন্ধের দিকে অবশ্য তাপমানযন্ত্ 
একটু দয়া করলো, আর এবার ছোটোখাটো ঝোপঝাড়ও দেখা দিতে লাগলো- অর্থাৎ 
অস্ট্রেলিয়ার সেই বিখ্যাত বৃশ--যার আড়ালে নাকি লুকিয়ে থাকে ডাকাতরা, এখানকার 
লোকে যার নাম দিয়েছে বুশ-রেন্জার, ঝোপবঝপ্লড়বাজ। 

শুধু কাণ্তেন গ্রান্টের কোনো খোঁজ পাবার তাড়াতেই যেন এই জনমানবহীন প্রান্তর 
পেরিয়ে এলো বহর, দু-দিন প্রায়-একটানা চ'লে পেরুলো ষাট মাইল । এই খাঁ-খাঁ প্রান্তরে, 
ধৃ-ধু মাঠে কোথায় কার কাছে জিগেস ক'রেই বা জানা যাবে কাণ্তেন গ্রান্টের হদিশ 
কেউ জানে কি না! যতক্ষণ-না কোনো লোকালয় আসে, ততক্ষণ এভাবেই হুড়মুড় ক'রে 
চলতে হবে তাদের। সবাই ভেবেছিলো মেরি আর রবার্ট বুঝি পথের এই ধকলে একেবারে 
কাহিল হ'য়ে পড়বে। কিন্তু একবার যখন আয়ারটন তাদের জানিয়েছে এই অস্ট্রেলিয়ার 
কাছে এসেই ডুবেছে ব্রিটানিয়া আর কাণ্তেন গ্রান্ট যদি সলিলসমাধি থেকে বেচে থাকেন, 
তবে এই অস্ট্রেলিয়াতেই নিশ্চয়ই কোথাও আছেন, তারপর থেকেই যেন স্ায়ুর উত্তেজনা 
তাদের টানটান ক'রে রেখেছে, পথের কোনো কষ্টই তারা গায়ে মাখথছে না। 

যদি-বা এখনও কাণ্তেন গ্রান্টের কোনো সন্ধান না-পেয়ে তারা মুষড়ে পড়ে থাকে, 
তবে অন্যদের মতো তাদেরও আমোদ নো কি প্রমোদ) £জাগাবার জন্যে তো আছেনই 
জাক পাঞয়ল, আরামকেদারার ভূগোলতাত্তিক, পুথির পাতায় যা-যা পড়েছেন, তাতেই 
যেন অস্ট্রেলিয়া তার একেবারে নখদর্পণে এসে গিয়েছে । এই মহাদেশ সম্বন্ধে যা-সব 
তাজ্জব কাহিনী তিনি শোনালেন, তার কতটাই যে সত্যি আর কতটাই যে মনগড়া, তা- 
ই বাবিচার করবে কে? 

সে-রাতে যখন ক্রাউন ইন নামে একটা সরাইখানায় বড়োদিনের ভোজের আসর 


৯৪) 


জমেছিলো, সেদিনই গোটা ভোজসভাটাই মাত ক'রে দিয়েছিলেন পাঞ্য়ল, এই মহাদে* 
সম্বন্ধে বিটিত্র-সব তথ্য শুনিয়ে। এখানকার নাকি সবকিছুই অদ্তুত--একবার তো তিনি 
স্বীকারই ক'রে ফেললেন যে এখানকার জল-মাটি-আকাশ এতই বিস্ময়কর যে 
প্রকৃতিবিজ্ঞানীরা নাকি এখনও এই মহাদেশের ভূসংস্থানের রহস্যটাই ভেদ করতে 
পারেননি । যেন একটা চ্যাপটা বাটির মতো এই মহাদেশটা, কিনারটা উচু, মাঝখানট 
নিচু হ'য়ে এসেছে। মাটি খুড়লে এখনও নাকি পাওয়া যায় সামুদ্রিক জীবের কঙ্কাল, 
জীবাশ্ম--হয়তো বহুকাল আগে কোনো প্রকাণ্ড অগ্নুৎপাতের ফলেই সাগরতল থেকে 
উঠে এসেছিলো এই দেশ, আর মাটির তলায় এখনও এমন-সব অদ্ভুত চিহ্ন রয়ে গেছে 
যা থেকে বুঝতে অসুবিধে হয় না যে আস্ত এই মহাদেশটাই একদিন-সে-যে কতকাল 
আগে কেউ জানে না-ছিলো সমুদ্রের তলায়। এখন এর নদীগুলো অব্দি শুকিয়ে যাচ্ছে, 
কত জায়গায় যে মরা নদীর সোতা দেখা যায় তার ইয়ন্তা নেই। ক্রমশই বিকট হা করে 
এগুচ্ছে এর মরুভূমিগুলো, আর জলমাটি আকাশবাতাস থেকে শুষে নিচ্ছে সব আর্দ্রতা 
অথচ এখানে এমন-অনেক গাছ আছে যারা প্রতিবছর তাদের পাতা ঝরায় না, শুধু 
গাছের বাকলগুলো খসে পড়ে-যেন সাপের মতো তারা খোলশ পালটাচ্ছে। অন্যসব 
দেশে পাতাগুলো সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে, এখানে যেন রোদ্দুর এড়াবার জন্যে তারা 
একটু পাশ ফিরে থাকে-_ফলে যেখানে গাছপালা আছে সেখানেও তারা ছায়া দেয় না 
এখানকার ঝোপঝাড়গুলো বেঁটে-বেঁটে, শুধু ঘাসগুলো মাথা ছাড়িয়ে ওঠে, এমনই 
রাক্ষুমে তাদের বাড়। 

আর তারপর যখন জীবজস্ত্রর কথা পাড়লেন জাক পাঞ্য়ল, তখন বড়োদিনের 
ভোজসভা হ'য়ে উঠলো যেন জীববিদ্যারই ক্লাস। তার ধারণা, অস্ট্রেলিয়ায় যেন চিরকাল 
ধ'রে একটা গো আজ ইউ লাইক অর্থাৎ ভোল পালটে সকলের সামনে অন্যবেশে 
আবির্ভূত হবার একটা প্রতিযোগিতা চলেছে। 

রবার্ট মাঝখানে ফোড়ন কেটেছিলো : “তার মানে এখানকার জীবজস্তুরা কি 
সবসময়েই অন্য জীবজস্তুর চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ? তাহ'লে তো তারা অন্য জীবজন্তই 
-যতক্ষণ-না আমরা তাদের সত্যিকার চেহার! কী, সেটা জানতে পারছি--' 

"না, তা বলছি না। তবে আমরা যে-সব জীবজন্তব দেখে অভ্যস্ত, সে-রকম জীবজস্তুর 
চাইতে অন্যরকম জীবজস্তুরাই বেশি এখানে । 

“তাহ'লে তাদের অন্য নাম দিন পগ্ডিতরা-কেন তারা বলবেন যে অমুক জীব 
তমুক জীবের ভোলটা নিয়ে গিয়ে অন্যভাবে সেজেছে । 

এবার মেজর ম্যাকন্যাবস একটা সুচিস্তিত টিপ্লনী কাটলেন । “লোকে যেখানেই যায়, 
সঙ্গে ক'রে নিয়ে যায় নিজের দেশ, নিজের ভাষা, নিজের সংস্কৃতি। অর্থাৎ অচেনা 
জায়গায় তারা সঙ্গে ক'রে বয়ে নিয়ে যায় নিজেদের আদ্দিনকার চেনা টৌহঙ্দিটাই 


১০০ 


তুমি যেখানেই যাও, নিজেকে এড়িয়ে তুমি যাবে কোথায় ? 

জাক পাঞ্য়ল এবার তাতে সায় দিয়েছেন। 'হ্যা, এ-কথাটা ঠিক। কোনো চতুষ্পদ 
জন্তু যদি মুখটা শান দেয়া ছুরির ফলার মতো ছুঁচলো ক'রে পাখির মতো চঞ্ু নিয়ে 
ঘুরে বেড়ায়_ 

“তাহ'লে সারস আর শেয়ালের নেমন্তন্ন খাবার যে-গল্প ঈশপ এককালে 
ফেদেছিলেন, সে-গল্প এখানে মোটেই খাপ খাবে না।, 

বিখ্যাত পর্যটকরা কত সময়েই কত-কিছু যে নিজের চোখে দেখেছেন বলে দাবি 
করেছেন, তার আর-কোনো ইয়ত্তা নেই। কেউ দাবি করেছেন তিনি দেখেছেন এমন 
বিরাট সরীসৃপ যে নাকি অনবরত মুখ দিয়ে আগুনের হলকা বার ক'রে দিচ্ছে । একজন 
হলফ ক'রে বলেছেন তিনি নাকি এমন শুওর দেখেছেন যাদের নাভিকুগুলি ছিলো তাদের 
পিঠে-পেটে নয়! একজন তো এমনও বলেছেন তিনি এমন-সব বেটেখাটো জীব 
দেখেছেন যাদের মুণ্ড আর কানগুলো খচ্চরের মতো, শরীরটা উটের, পাগুলো হরিণের, 
আর তারা নাকি ঘোড়ার মতোই চিহি-চিহি ডাকে। কেউ যদি দিক্বি গেলে বলেন তিনি 
দেখেছেন গ্রিফিন, কিংবা ফিনিক্স পাখি, যদি বলেন জ্বলন্ত আগুনের কৃণ্ড থেকেই তিনি 
একটা পাখিকে উঠে আসতে দেখেছেন, যে তার ডানা ছড়িয়ে আকাশে উডে চ'লে 
গেলো, তবে হয় আমরা তার কথা বিশ্বাস করবো, আর নয়তো বলবো গাঁজাখুরি, উত্তুট, 
কিস্তৃত--' লর্ড এডওয়ার্ড হয়তো আরো-সব তাজ্জব নমুনা হাজির করতেন নামজাদা- 
সব পর্যটকদের ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে, কিন্তু জাক পাঞ্য়ল তাকে কথা শেষ করতে না- 
দিয়েই থামিয়ে দিয়েছিলেন। কোনো আসরের মধ্যে তিনি হাজির থাকতে আর-কেউ 
যে মধ্যমণির মুখা ভূমিকাটা কুক্ষিগত করবে, এটা যেন আদপেই তার মনঃপুত নয়। 

প্রকৃতি অন্তত কখনও উদ্ভুট-কিছু বানিয়ে কোনো এক্সপেরিমেন্ট করে না। সে 
জীবজন্তু তৈরি করে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়েই। ফলে সে যদি এমন জীব তৈরি করে 
যে তার ছানাগুলোর বাসা নিজের শরীরের সঙ্গেই বয়ে নিয়ে যাবে, তবে নিশ্চয়ই বুঝতে 
হবে যে মায়ের দেহের সঙ্গে এটে না-থাকলে পরিবেশ &ঁ ছানাগুলোকে বাচতেই দেবে 
না। ক্যাঙার মদি তার ছানা রু-দের পেটের মধ্যে থলে বানিয়ে তাতে পুরে রাখে, 
আর ছানাগুলো যদি এ পেটের থলে থেকে মাঝে-মাঝে চোখ ছানাবড়া ক'রে চারদিকে 
তাকিয়ে-তাকিয়ে দ্যাখে, তবে প্রথম দেখে অপ্রস্তুত-কেউ ব্যাপারটা না-জেনেই ভেবে 
বসতে পারে যে সে এমন-কোনো জীব দেখেছে যার দু-জোড়া চোখ আছে- একজোড়া 
কপালে, একজোড়া পেটে । কিংবা কেউ যদি দ্যাখে মরালের মতো কোনো পাখি জলে 
ভেসে বেড়াচ্ছে অথচ যে-কিনা কুচকুচে কালে। তবে সে হয়তো ভাববে কবিরা এতকাল 
যে কালো মরালের কথা বলে এসেছিলো, সে বুঝি তা-ই দেখেছে । স্থানীয় লোকে যে 
তার অন্য কোনো নাম দিতে পারে এটা তার মাথাতেই আসবে না। 


৯০৯ 


“সুতরাং ?' রবার্ট মোক্ষম প্রশ্নটা ক'রে বসেছে তখন। 

“সুতরাং, এটা ধ'রে নিতেই হবে যে, গোড়ায় লোকে চেনা জীবজন্তুর সঙ্গেই তার 
আদল খুঁজে বার ক'রে চেনা নামেই ডেকেছে তাদের, বলেছে এটা রাজহাঁস বটে, তবে 
ধবধবে-শাদা নয়, বরং কালো মরালই এটা । অন্তত এটা তো মানতেই হবে যে অস্ট্রেলিয়া 
অন্যরকম--তার জীবজন্তু অন্যরকম হবে। এই-তো, আজ বড়োদিন, কিন্ত কোথায় সেই 
হোয়াইট ক্রিসমাস- ঠাণ্ডা কোথায়, বরফ কোথায়, সান্তাক্রসের শ্রেজগাড়ি কোথায় । আমরা 
তো এখন লু-বওয়া তপু হাওয়ায় ধুঁকছি! এমন সুষ্টিছাড়া বড়োদিনে কেউ কি ক্যারল 
গাইবে এখন যে হোয়াইট নাইট সাইলেন্ট নাইট যখন রাতচরা পাখিগুলো কেউ ঠকঠক, 
কেউ সাই-সীই, কেউ কর্কশ ধাতব স্বরে ডেকে উঠছে-রাত মোটেই চুপচাপও নয়, 
শাদাও নয়। 

এমন অকাট্য প্রমাণের পর অবশ্য সবাই একবাক্যে তখন স্বীকার ক'রে নিয়েছেন 
যে অস্ট্রেলিয়ার সবকিছুই সৃষ্টিছাড়া বেয়াড়া, উদ্ভট । 

ক্রাউন ইন-এ বড়োদিন কাটাবার পর থেকে সমানে এগিয়ে চলেছে বহর_-কখনও 
বিশাল তরুলতাউদ্টিদবিহীন প্রান্তর, কখনও-বা সেই বেঁটে ঝোপঝাড়, অথবা উঁচু-উঁচ 
ঘাসবন। আর এ-রকমই একটা ঘাসবনের কাছে এসে একদিন দেখা গেছে মস্ত আরেকটা 
বহর চলেছে ঘাসবনের মধ্যে দিয়ে- ঘাস খেতে-খেতে। মানুষের সঙ্গে কুকুর আর ঘোড়া 
নিয়ে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে অজস্র গোরুমোষ, কয়েক হাজার ভেড়া, এমনকী 
সওয়ারবিহীন বেশকিছু ঘোড়াসমেত। এই বিরাট শোভাযাত্রা পাশ দিয়ে চ'লে যেতে 
অনেকক্ষণ লাগিয়ে দিয়েছে। আয়ারটন জানিয়েছে এদের নাকি শস্তায় কেনা হয়েছে 
নীলগিরিতে-_-অর্থাঁৎ ব্লুমাউন্টেনে- হাঁড়জিরজিরে রোগাপটকা সব জীব, উপযুক্ত খাদা 
নাকি সেদিকটায় নেই, এবারকার খরায় সেদিকে সব জ্'লে-পুড়ে গিয়েছে । এখন 
ঘাসবনের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যেতে-যেতে এদের খাইয়ে-দাইয়ে নধর করা হচ্ছে, তারশর 
মাঠে চরিয়ে তাকৎ ফিরিয়ে এনে বিক্রি করবে চড়া দামে-যাদের খেতখামার আছে 
তারা এ-সব বেশিদাম দিয়েই কিনে নেবে। 

তারপর সামনে পড়লো-এই-প্রথম- এমন-একটা সৌতা, যাতে সত্যি-সত্যি কুল 
কুল ক'রে জল বয়ে যাচ্ছে-মরানদী নয়, জলজ্যন্ত নদী-একটা। তার নাম উইমেরা 
নদী। 

আদান পথে পড়েছে মরানদীর খাত, কিংবা সরু সুতোর মতো এইটুকু জলের 
ধারা। ঘোড়া ছুটিয়ে তাকে পেরিয়ে যেতে কোনো মুশকিলই হয়নি, বলদে-টানা গাড়িটা 
অনায়াসেই পেরিয়ে গেছে সেইসব শোতোধারা। এবার কিন্তু বলদে-টানা গাড়িটা নদী 
পার করতে গিয়ে বিস্তর বেগ পেতে হ'লো, শুধু আয়ারটনের বুদ্ধিমত্তা আর 
প্রত্যুৎপন্নমতিত্বেই কোনো অপঘাত দুর্ঘটনা থেকে বেচে গেলো বহর। জায়গাটা নাকি 


৯০%, 


সে যখন টহল দিয়ে বেড়িয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়, এ-মোড় থেকে ও মোড়, তখনই চিনে 
নিয়েছে । ফলে সে জানে উইমেরা নদীর কোনখানে জলের ঢল বেশি, কো'গাস্ন সেখানে 
শুধু হাঁটুজল থাকে। 

মেজর ম্যাকন্যাবস অবিশ্যি মাথা নেড়েছেন দু-একবার। আয়ারটন যদির্িটানিয়া 
জাহাজ থেকে ছিটকে পঞ্ড়ে থাকে জলে, আর তারপর কাজের ধান্ধায় জীবিকার খোঁজে 
পরো অঞ্চলটা চ'ষে ফেলেও থাকে একবার, তবু এখানকার সবকিছু সে তার নিজের 
হাতের চেট্টার মতো এমনই ভালোভাবে চেনে যে মনেই হয় না মাত্র একবারই সে 
এ-সব অঞ্চলে এসেছিলো। 

নদী পেরুবার পর অন্যপারে এসেই আয়ারটন একটু ছুটি চাইলে । এই নদী পেরুতে 
গিয়ে বলদগুলো বেকায়দায় টান দিয়েছিলো ব'লে গাড়িটা কয়েক জায়গায় জখম হয়েছে, 
নড়বোড় করছে, আরেকটু ধকল গেলেই জোড়গুলো হয়তো খুলে আসবে। তাছাড়া 
কারু-কারু ঘোড়ার নালও খুলে গিয়েছে, সেগুলো লাগাতে হবে। “এখান থেকে মাইল- 
বিশেক দূরে ব্র্যাকপয়েনট নামে একটা রেলস্টেশন আছে, আয়ারটন জানিয়েছে, “সেখানে 
ছোটোখাটো একটা লোকালয় গড়ে উঠেছে । আর সেখানে মিস্ত্রি আছে, ছুঁতোর, কামার, 
তাতি থেকে হাতুড়ে ডাক্তার অব্দি। গাড়িটা মেরামত করতে হবে, ঘোড়ার নালও লাগাতে 
হবে-আমি শুধু যাবো, আর মিস্ত্রি নিয়ে ফিরে আসবো। সব ঠিকঠাক হ'লে মাত্র চোদ্দ- 
পনেরো ঘন্টা লাগবে আমার । 

“ঠিক আছে, আয়ারটন। লর্ড এডওয়ার্ড বলেছেন, “তুমি ফিরে না-আসা অব্দি 
আমরা সবাই তাবু খাটিয়েই বসে থাকবো। তাছাড়া এ-কদিনের রাস্তার ধকলে সবাই 
বেশ ক্লান্তও হ'য়ে পড়েছে, এই উপলক্ষে একট বিশ্রাম ক'রে নিযে ফের বেশ টাটকা 
হ'য়ে নেয়া যাবে! তাছাড়া সন্ধেও হ'য়ে এসেছে-এমনিতেই আমাদের এখন না-হোক 
একটু পরেই তাবু খাটাতে হতো) 

আয়ারটন যখন বলছিলো যে তাকে ব্লাকপয়েন্ট স্টেশনে গিয়ে মিস্ত্রি ডেকে আনতে 
হবে, তখন মেজর ম্যাকন্যাবস পাশে দাড়িয়েই সব কথাবার্তা শুনছিলেন। এভাবে তার 
একা-একা, সঙ্গীসাথী বিনাই, তাবু ছেড়ে চ'লে যাবার প্রস্তাবটা ম্যাকন্যাবসের মোটেই 
মনে ধরেনি। কী-একটা বলতে গিয়েও কথাগুলো তিনি যেন গিলে ফেললেন। মিথ্যেমিথ্যি 
তার সন্দেহের ্রথাটা উঠিয়ে লাভ কী? তাছাড়া, সত্যি-তো, এ-সন্দেহের পেছনে « 
সতাকার-কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ তো তার নেই, শুধু-একটা অনুভূতি, মনের ভেতরে 
কোথায় যেন অস্পষ্ট-একটা কোণে খচখচ ক'রে কী-একটা কাটা বিধছে-আর এ-ধরনের 
অনুভূতিকে পাত্তা দেয়াটা তার ধাতে নেই, যুদ্ধক্ষেত্রে কেউ নিছক অনুভূতির ওপর নির্ভর 
ক'রে কোনো রণকৌশল তৈরি করে না, সবসময়েই সেখানে চাই হাতেনাতে কোনো 
প্রমাণ। 


১০৩ 


উদ্বেগটা মেজর ম্যাকন্যাবসের যে একারই ছিলো তা নয়, স্বয়ং লর্ড এডওয়ার্ডও 
কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ করছিলেন। কিন্তু তার অস্বস্তির প্রকৃতিটা ছিলো সম্পূর্ণই 
অন্যরকম। আয়ারটন যদি কোনো মিস্ত্রি না-পায়, তাহ'লে ভাঙা গাড়ি সারিয়ে নিতে বেশ- 
কিছুদিন সময় নষ্ট হবে। অথচ তিনি চাচ্ছিলেন পারলে এক্ষুনি তার অভিযানটায় বেরিয়ে 
পড়তে। 

দিন ফুটতে-না-ফুটতেই কিন্তু অস্বস্তিটা কেটে গেলো। মিস্ত্রি নিয়ে ফিরে এলো 
আয়ারটন, ধূলিধূসর ও ক্লান্ত- সারারাত সে একটুও বিশ্রাম করেনি, সোজা গেছে সে 
ব্ল্যাকপয়েন্টে, তারপর খোঁজখবর ক'রেই মিস্ত্রিকে নিয়ে ফের ফিরতিরান্তা ধরেছে। 

তবে যে-মিস্ত্রিকে সে সঙ্গে ক'রে নিয়ে এসেছে, তাকে দেখতে ঠিক যেন কোনো 
ডাকাতের মতো। প্রকাণ্ড, দড়িপাকানে৷ চেহারা, সারা শরীরে মেদ বলতে কিছু নেই 
_-শুধু পেশী যেন নেচে বেড়াচ্ছে । লোকটা কথা কম বলে, পারলে হয়তো মুখে কুলুপ 
এটেই থাকতো সারাক্ষণ, কিন্তু কাজ জানে। 

কোনো লোককে প্রথম দেখবামাত্র কেন ডাকাত-ডাকাত ব'লে মনে হয়, এটারও 
কোনো সদুত্তর জানা নেই লর্ড এডওয়ার্ডের। সম্ভবত সেদিন যখন জাক পাঞয়ল 
অস্ট্রেলিয়ায় কারা-কারা ভাগ্যের সন্ধানে এসেছে, এ-সন্বন্ধে জ্ঞান দিচ্ছিলেন, তখনই 
মনের মধ্যে অবিশ্বাসের একটা বীজ বুনে দেয়া হয়েছে। ইওরোপ থেকে এত-দুরে যারা 
এসেছে তারা হয় কয়েদি-নয়তো আইনের হাত থেকে পালাবে ব'লেই এখানে এসেছে, 
ডাকাবুকো সব লোক, সম্ভবত স্বয়ং লুসিফারকেও ভয় পায় না। 

লোকটা যে সত্যি-সত্যিই মিস্ত্রি একজন, তা তার কাজ করবার ধরন দেখেই বোঝা 
গেছে। আড়াই ঘন্টাও লাগেনি, সে পাকাহাতে ওস্তাদের মতো গাড়ি মেরামত ক'রে 
দিয়েছে। 

মেজর ম্যাকন্যাব্স কিন্তু সবসময়েই সঙ্গে-সঙ্গে ছিলেন, সজাগ চোখে সব খেয়াল 
ক'রে যাচ্ছিলেন। আর এতটা সজাগভাবে খুঁটিয়ে লক্ষ করেছেন বলেই একসময়ে তার 
চোখে পড়েছে লোকটার কব্জিটা-- সেখানে কোনো-একটা আটো বালার মতো একটা 
কালচে দাগ ফুটে আছে । কীসের দাগ এটা ? লোকটা যখন ঘোড়ার নাল পরাচ্ছে, তখন 
হঠাৎ নজরে এলো, নালগুলোর তলা থেকে তেকোণা খানিকটা অংশ যেন কেটে নেয়া 
হয়েছে। অবাক হ'য়ে গিয়ে মেজর ম্যাকন্যাবস তার কারণটা জানতে চাইলেন-আয়ারটন 
বললে, “এখানকার সব ঘোড়ার মালিকরাই তাদের ঘোড়ার নালে বিশেষ-বিশেষ চিহ্ন 
ব্যবহার করে-যাতে ঘোড়া হারিয়ে গেলে বা চুরি হ'য়ে গেলে, সেই বিশেষ নালের ছাপ 
দেখে তাকে খুঁজে বার করা যায়--বা অনেক ঘোড়ার মধ্য থেকে তাকে শনাক্ত করা 
যায়। এটা ব্ল্যাকপয়েন্টের চিহ। 

ঘোড়াগুলোর নাল পরাতে আধঘস্টার বেশি লাগলো না তার। কাজ শেষ হবামাত্র 
মজুরি আর দরাজ বখশিশ নিয়ে লোকটা সেলাম ঠুকে চ*লে গেলো। 


১০৪ 


সে চ'লে যেতেই, তোড়জোড় ক'রে ফের শুরু হ'লো অভিযান--কাপ্তেন গ্র্যান্টের 
সন্ধানে । কিছুক্ষণ যাবার পরই দূর থেকে ভেসে এলো রেলের এনজিনের বাশি--তীক্ষ 
প্রলম্বিত ধাতব কু-উ-উ আওয়াজ। তারপরেই দেখা গেলো রাস্তাটা যেখানে গিয়ে 
রেলপথের গায়ে পড়েছে, সেখানে ভূশ-ভূশ ক'রে কালোধোয়া ছাড়তে-ছাড়তে আর 
তীক্ষ সুরে বাশি বাজাতে-বাজাতে একটা এনজিন কোথেকে যেন এসে সেখানে দাড়িয়ে 
পড়লো। ঘোড়াটায় ছপটি মেরে লর্ড এডওয়ার্ড কাছে এগিয়ে গেলেন--হঠাৎ এভাবে 
মাঝপথেই ট্রেনের এনজিন থেমে পড়লো কেন? 

কিন্তু কাছে গিয়েই আতকে উঠলেন লর্ড গ্লেনারভন। ভাঙা সেতুর তলায়, নদীর 
পাড়ে আর জলের মধ্যে কতগুলো বগি ভাঙাচোরা প*ড়ে আছে। শুধু মাল রাখবার জন্যে 
যে-লাগেজভ্যানটা ছিলো, সেটা সম্ভবত পেছনে ছিলো ব'লেই দুর্ঘটনার হাত থেকে বেচে 
গিয়েছে। 

এরই মধ্যে দলে-দলে লোক ছুটে আসছে অকুস্থলে, দুর্ঘটনার দৃশ্য দেখতে । এই- 
যে এনজিনটা বাশি বাজাতে-বাজাতে এখানে এসে থেমেছে, তাতে ক'রে স্বয়ং সার্ভেয়ার 
জেনারেল এসেছেন ব্যাপারটা সরেজমিন তদন্ত ক'রে দেখতে । লর্ড গ্রেনারভন নিজেই 
এগিয়ে গেলেন তার সঙ্গে আলাপ করতে । পরম্পরের পরিচয় আদানপ্রদানের কাজটা 
শেষ হয়েছে কি হয়নি, হঠাৎ একটা বিষম কোলাহল উঠলো। তারপরেই লোকজন 
ধরাধরি ক'রে নিয়ে এলো গার্ডের মুতদেহ--লাশটার বুকে বিধে রয়েছে একটা ছোরা, 
প্রায় বাটশুদ্ধুই যেন ঢোকানো। 

“ঠিক এই ভয়টাই করছিলুম,' সার্ভেয়ার জেনারেল জানালেন। “পুলিশ জানিয়েছে 
যে ব্রিজটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ভাঙেনি, কারা যেন বোমা দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে । 

“অর্থাৎ ? 

“অর্থাৎ ট্রেনটা যাতে এখানে এসে অতর্কিতে উলটে পড়ে, তারই ব্যবস্থা ক'রে 
রেখেছে কেউ বা কারা । ট্রেনদস্যুরা ইচ্ছে ক'রেই মৎলব এটেছিলো সামনের কামরাগুলো 
যাতে নদীতে প'ড়ে যায়-তারপর তারা পরমানন্দে পেছনের লাগেজভ্যানের মালপত্র 
লুঠ করতে পারে।' 

“এ-রকম হয় নাকি এখানে? 

“হবে না-ই ব! কেন ? গোটা অন্ট্রেলিয়াই তো সবচেয়ে কুখ্যাত অপরাধীদের আস্তানা । 
তাছাড়া অনেক কয়েদিকেও তো সাজার মেয়াদ শেষ হবার পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। 
তারা এখানে যা-খুশি ক'রে বেড়ায়। এখন দেখবেন, লর্ড এডওয়ার্ড, এই ডাকাতির জের 
কতদূর গড়ায়, 

'দুর্ঘটনাটা ঘটলোই বা কখন? 

“কাল নিশুতরাতে। সোয়া-তিনটে নাগাদ। 


১৯০৫ 


লর্ড গ্লেনারভন বেশ-চিস্তিতভাবেই ফিরে এলেন তার বহরের কাছে । এই ব্যাপারটা 
তাকে শুধু-যে ভাবাচ্ছে তা-ই নয়, তাকে কী-রকম যেন সশঙ্ক ক'রে তুলেছে । এই 
ডাকাতদের প্রাণে মায়াদয়া বলে কিছু নেই। কিছু মালপত্র লুঠ করতে পারবে ব'লে 
যারা একটা যাত্রীবাহী ট্রেন ও-রকমভাবে উলটে দিতে পারে, অনেক নিরীহ নির্বিরোধ! 
লোককে বিনাবাক্যব্যয়ে খতম ক'রে দিতে পারে, তাদের নজর একবার যদি এই বহরের 
ওপর পড়ে, তাহলেই সর্বনাশ! আয়ারটন বোধহয় ঠিক কথাই বলেছিলো । আরো- 
কয়েকজন সশস্ত্র নাবিক সঙ্গে নিষে এলে ডাকাতদের আচম্বিত হামলা ঠেকাতে সুবিধে 
হ'তো। এখন অবিশ্যি দিনরাত কড়া পাহারার বাবস্থা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই! 

সেদিন বহর যখন একটা কবরখানার পাশ দিয়ে যাচ্ছে-_না, কোনো গির্জে নেই 
আশপাশে, কবরখানা ধলতে একজায়গায় কতগুলো ভ্রুশকাঠ বসানো, এইটুকুই শুধু 
_তখন দেখা গেলো সেখানে এ ভ্রুশকাঠগুলোর মধ্যেই পড়ে-প'ড়ে ঘুমুচ্ছে একটা 
বাচ্চা ছেলে । কত আর বয়েস হবে ? আট কি নয়, গায়ের রং কালো। নিশ্চয়ই অস্ট্রেলিয়ার 
আদিবাসিন্দাদেরই কেউ । ছেলেটার মুখচোখে ঝকঝকে বুদ্ধির ছাপ। তার গলায় ঝুলছে 
একটা টিকিট--তাতে লেখা : অমুক জায়গায় নিয়ে গিয়ে তমুকের হাতে তুলে দেবার 
জন্যে এই টোলিন নামের ছেলেটিকে অমুক কুলির সঙ্গে ট্রেনে ক'রে পাঠানো হচ্ছে। 
কিন্তু ছেলেটি একাই শুয়ে আছে এখানে-আশপাশে আর-কেউ নেই। তার মানে এ 
ট্রেনদুর্ঘটনায় কুলিটি নিশ্চয়ই মারা গেছে, আর এই ছেলেটি কেমন ক'রে যেন প্রাণে 
বেঁচে গিয়েছে । অকুস্থল থেকে সে পালিয়ে এসেছিলো চটপট -এতারপর ক্লান্ত হ'য়ে 
এখানে প'ড়ে টানা একটা ঘুম লাগাচ্ছে। 

ছেলেটিকে দেখেই তার বলদে-টানা গাড়ি থেকে নেমে এসেছিলেন লেডি হেলেনা। 
তাকে এইরকম গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন দেখে, আর পুরো ব্যাপারটা তলিয়ে বুঝে শিয়ে, 
লেডি হেলেনার কেমন যেন মায়া প'ড়ে গেলো ছেলেটির প্রতি । তিনি যখন ঝুকে পড়ে 
ছেলেটির গলায় বাধা টিকিটটা পড়ছেন, অমনি ছেলেটির ঘুম ভেঙে গেলো। চোখ 
রগড়াতে-রগড়াতে সে ধড়মড় ক'রে উঠে বসলো। যখন সে তার ডাগর চোখদুটি মেলে 
আশপাশে তাকালে, তখন তার দৃষ্টিতে একই সঙ্গে ফুটে উঠেছে ভয়, বিস্ময় আর 
কৌতূহলের ছাপ। 

লেডি হেলেনা তাকে জিগেস করতেই সে নিজের পরিচয় দিলে-স্পষ্ট, পরিষ্কার 
ইংরেজি উচ্চারণ তার। মিশনারি স্কুলে থেকে সে ইংরেজ মিশনারিদের কাছে পড়াশুনো 
করে। পরীক্ষা শেষ হয়ে গিয়ে ফল বেরিয়েছে, এখন বেশ-কিছুদিন ছুটি-বড়োদিন 
আর নববর্ষের। ছুটি কাটাতেই সে বাড়ি যাচ্ছিলো ম!-বাবার কাছে। পরীক্ষায় ভালোভাবেই 
উৎরেছে সে, কিন্তু সবচেয়ে ভালো করেছে সে জিওগ্রাফিতে, ভূগোলে সে প্রথম পুরস্কার 
পেয়েছে। 


১০৩৬ 


এতক্ষণ লেডি হেলেনাই কথা বলছিলেন ব'লে জাক পাঞ্য়ল মাঝে পড়ে কোনো 
মন্তব্য করতে চাননি। কিন্তু যেই শুনলেন ছেলেটি ভূগোলে প্রথম পুরক্কার পেয়েছে, 
অমনি তার মাথায় কুট ক'রে যেন একটা পোকা কামড়ালো'। কেমনতর ভূগোলের জ্ঞান 
ছেলেটির? তিনি নিজে কি তার পরীক্ষা নিয়ে যাচাই ক'রে দেখবেন একবার ? কিন্তু 
দু-একটা প্রশ্ন ক'রেই যা উত্তর শুনলেন তাতে তার চোখ কপালে উঠলো। তাজ্জব- 
সব জিনিশ শিখিয়েছে তাকে ইংরেজ মিশনারিরা। উপনিবেশের শিক্ষাব্যবস্থা যে এমনতর 
উদ্ভুট-সব তথ্যে ভরা তা তার জানা ছিলো না। না, শুধু তারই নয়, অনারাও ছেলেটির 
কথা না-শুনলে কিছুতেই তা আন্দাজ করতে পারতেন না। 

ইংরেজ মিশনারির ছেলেটিকে শিখিয়েছে, এই ধরাধামের একচ্ছত্র অধীশ্বর 
ইংরেজরাই-স্বর্গটা প্রভু জিশুর, পৃথিবাটা ইংরেজদের । তার প্রমাণই হ'লো যে ইংরেজ 
রাজত্বে সূর্য কখনও অস্ত যায় না। এ-দেশে যখন রাত, অনাদেশে তখন দিন। এমনকী 
গোটা ইওরোপটাও ইংরেজদের পদানত-ফ্রানস শুদ্ধ। 

এই ফ্রান্স শুদ্ধু কথাটা শুনেই ফ্রানসের তুগোলপপ্ডিত জাক পাঞয়লের চোখ 
আরো-ছানাবড়া হ'য়ে গেছে। কী-একটা বলতে গিয়ে চেপে গেলেন- তারপরেই হা-হা 
ক'রে অক্টহাসি হেসে উঠলেন। 

তারপর হাসি থামিয়ে যা বললেন তার সারাংশ হ'লো এই : ইংরেজরা ঝুড়ি-ঝুঁড়ি 
মিথ্যেকথা বলে, এটা কেই বা না-জানে। কিন্তু বাচ্চা ছেলেদেরও ধ'রে-ধ'রে এমন 
আজগুবি আর উদ্ভট কথাবার্তা শেখালে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ তো অন্ধকার! অতএব--তিনি 
মনস্থির ক'রে ফেলেছেন_ অতএব এই ছেলেটির ভূগোলের জ্ঞান শুধরে দেবার দায়টা 
তিনি স্বয়ং এই-মুহূর্ত থেকে নিজেদের কাধে তৃলে নিলেন। ভারতবর্ষ বলতে যে গোটা 
এশিয়া বোঝায না, আর কলকাতা যে সমগ্র এশিয়ার রাজধানী নয়-এ-সব তথ্য যদি 
এক্ষুনি শুধরে না-দেন, তাহ'লে তো ছেলেটির যাবতীয় লেখাপড়া শেখাই মাটি হবে। 

এবং যেমন কথা, তেমনি কাজ। তক্ষনি। লর্ড গ্রেনারভনের ঘে-ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার 
ছিলো এ বলদে-টানা গাড়িটায়, সেখান থেকে তন্ষুনি পাঞ্য়ল রিচার্ডসনের লেখা 
ভূগোলবইটা নিয়ে এনে দিলেন ছেলেটিকে, বললেন মন দিয়ে যেন এ-বইটা সে দেখে 
নেয়, পরে তিনি তার পরীক্ষা নেবেন। 

কিন্তু পরের দিন ভোরবেলায়-_হায়-রে কপাল !-কোথায় গেলো জাক পাঞয়লের , 
নতুন রংরুট-করা ছাত্র । গোটা তাবুতে শুধু নয়, আশপাশে কোথাও সে নেই। রিচার্ডসনের 
ভূগোলবইটা রয়েছে পাঞ্য়লের কোটের পকেটে, আর লেডি হেলেনার বুকের ওপর 
রয়েছে একগুচ্ছ ফুল--এই শুখা মরশুমে অস্ট্রেলিয়ায় এমন টাটকা ফুল দুর্লভ বৈ-কি ! 
টোলিন কেন চ'লে গিয়েছে, কে জানে! সে পথ চিনে-চিনে যেতে পারবে তো তার 
মা-বাবার কাছে ? কিংবা যদি বুদ্ধি ক'রে চার্চের স্কুলেও ফিরে যায় তাহ'লেও বাচোয়া 


১০৭ 


-নইলে এমন লোকালয়হীন খা-খা প্রান্তরে সে যাবে কোথায় ? 

রাস্তা এখান থেকে শুধু রুক্ষ বা উষরই নয়, উবড়োখাবড়ো, বন্ধুর। বহরের গতি 
স্বভাবতই টিমে হ'য়ে এলো, বিশেষ ক'রে এই অসমতল পথ দিয়ে বলদে-টানা গাড়ির 
যেতে অসুবিধে হচ্ছিলো খুবই-- এমনভাবে গাড়ির ভেতরটা দুলছে একাং-ওকাৎ হচ্ছে 
যেন ঝড়ের সমুদ্রে পড়েছে কোনো নৌকো। এত ঝাকুনি লাগে যে হাড়গোড় বোধহয় 
চুর-চুর হ'য়ে যাচ্ছে । আর এইভাবেই যেতে-যেতে অবশেষে দূর থেকে দেখা গেলো 
একটা পাহাড় । আয়ারটন জীনালে এই পাহাড়ের নাম নাকি আলেকজাগ্ডার-- এখানে নাকি 
প্রসপেক্টুররা মাটি খুঁড়ে সোনা পেয়েছে। 

সেদিন বছরের শেষদিন, ৩১শে ডিসেম্বর, অসহা গরম, যেন লু বইছে, আর তারই 
মধ্যে বহর এসে পৌছুলো মাউন্ট আলেকজাগ্ারে। সোনা এমন-একটা ধাতু যার নাম 
শুনলেই কেমন যেন চোখ চকচক ক'রে ওঠে সকলের, আর সেটা নিশ্চয়ই নিছক 
সৌন্দর্যতিষায় নয়--কেননা প্রায় সবধাতুরই নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, কিন্তু সোনার মতো 
আর-কিছু এমন ক'রে মানুষকে আকৃষ্ট করেনি। মাউণ্ট আলেকজাগ্ারের কথা শোনবামাত্র 
সকলেরই ইচ্ছে হ'লো একবার গিয়ে স্বচক্ষে দেখে আসেন সোনার খনি। এমনিতে, 
অনেক সময়েই বড়ো-বড়ো সোনার ডেলার বদলে সুতোর মতো সোনার একটা রেখা 
চ*লে যায় পাথরের মধ্যে, অথবা মিশে থাকে মাটির ঢেলায়। কখনও-বা মিশে থাকে 
বালিতেও। তাকে ঝাঝরির মধ্য দিয়ে সাফ ক'রে নিতে হয়; পাথর ভেঙে বার ক'রে 
নিতে হয় সোনার সুতো; মাটির ঢেলা থেকে সোনা আলাদা ক'রে নেবার জন্যে অনেক 
সময় এমনকী জল ও মাটিকে গুলে নেয়া হয়, তারপর সেই জল পরিস্রুত ক'রে নেয়া 
হয়, ঘোলাজল নিয়ে যায় মাটি, প'ড়ে থাকে সোনার গুড়ো। কীভাবে সোনা খুঁড়ে তোলা 
হয় সেটা যেমন দেখে এলেন সবাই, তেমনি দেখে এলেন সোনা তোলবার পর দুর্গের 
মতো দুর্ভেদ্য যে-বাড়িটার কোষাগারে সে-সব জমা দেয়া হয়। সেখান থেকে প্রত্যেক 
প্রসপেক্টরকেই রসিদ দেয়া হয়, কে-কত আউন্স সোনা তৃলেছে, তারপর সেগুলো চালান 
দেবার বাবস্থাও করা হয়, কড়া পাহারা থাকে সবসময়, বন্দুকের ঘোড়ায় থাকে তাদের 
হাত, আর সে-হাত প্রায়-সবসময়েই চুলবুল ক'রে ওঠে, একটু-কিছু সন্দেহজনক 
দেখলেই গুলিগোলা চলে হরদম। বিশেষত ডাকাতের উৎপাত বেড়ে যাবার পর থেকে 
কড়াকড়ি বেড়েছে প্রচুর। এখানকার ডাকাতরা যেমন প্রাণের ভয় করে না, এখানকার 
সেপাইশান্ত্রীরাও প্রায় সে-রকম । যারা সেপাই হয়েছে, তারাও যেমন অবস্থাবিপাকে 
ডাকাত হ'য়ে যেতে পারতো, ডাকাতরাও অনেকে ঠিকমতো সুযোগ পেলে সেপাইশান্্রী 
হ'য়ে উঠতে পারতো । সেপাই বা ডাকাত দুয়েবই স্বভাবপ্রকৃতি বা মনের ধাতের মধ্যে 
তফাৎ যা আছে, তা সামান্যই। এখানে তো উদ্দি দেখেও বোঝবার জো নেই কে যে 
কী। তার ওপর এই মাউন্ট আলেকজাগ্ারে আবার সোনা খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে পড়েছে 


১০৮ 


নানারকম দামিপাথর, সেগুলো আবার থরে-থরে সাজানো আছে কোষাগারের 
সংগ্রহশালায়। কতরকম রঙবেরঙ্র পাথর, পাথর না-ব'লে তাদের হয়তো রত্ব বলাই 
উচিত। এত-সব খুরে ঘুরে দেখতে-দেখতে পণ্ডিতপ্রবর জাক পাঞ্য়লের চোখের মণিও 
কেমন জ্বলজ্বল ক'রে উঠেছিলো। তার ইচ্ছে হচ্ছিলো যদি একটা সোনার ঢেলা সঙ্গে 
করে নেয়া যেতো। 

তার হাবভাব দেখে মেজর ম্যাকন্যাব্স একবার শুধু চিবিয়ে-চিবিয়ে বলেছিলেন : 
“খামকা আর ছোট্ট-একটা সোনার ঢেলা নিয়ে গিয়ে কী করবেন, মঁসিয় পাঞয়ল? তার 
চেয়ে-এঁ দেখুন দামিপাথর আছে এখানে-খুঁজলে হয়তো পরশপাথরই পেয়ে যাবেন 
একটা। জগতের দার্শনিকরা তো তাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন চিরকাল--তা-ই না? 
আপনিও খুঁজে দেখুন না-পরশপাথর খুঁজে পেয়ে গেলে ফ্রানসে ফিরে যা-ই ছোবেন, 
তা-ই তো সোনা হ'য়ে যাবে। এখান থেকে অত ওজন বয়ে নিয়ে যেতে আর হবে 
না তাহ'লে।' 

তার এই অপবূপ তাত্তিক ইয়ার্কিটি শোনবার পর সেখানে যে নিছক হাসির হররাই 
উঠলো তা নয়, মসিয় পাঞয়লের ভুতুড়ে আবেশটাও একনিমেষে কেটে গেলো। 

নতুন বছরের প্রথম দিনটাও কাটলো সেই স্বর্ণ-উপত্যকা পেরিয়ে আবার 
অপেক্ষাকৃত সমতলভূমিতে নেমে আসতে । তারপর জানুয়ারির দুই তারিখে বহর এসে 
পৌঁছুলো সারি-সারি ইউক্যালিপটাস গাছের দুরতিত্রম্য এক জঙ্গলে। এত-নিবিড়ভাবে 
গাছগুলো সার দিয়ে দাড়িয়ে আছে ষে ফাকফোকর দিয়ে গ'লে বলদে-টানা গাড়িটা 
নিয়ে-যাওয়াই দায়। তার ওপর আবার এই ঢ্যাঙা-ঢ্যাঙা গাছগুলোর রূপোলি ঢালে রোদ্দুর 
প'ড়ে ঝলসে ওঠে- চোখ ধাধিয়ে যায়। আর কেমন-একটা ঝিমধরা গন্ধ, সুগন্ধই বলা 
যায়, কিন্তু এতগুলো গাছ থেকে এই গন্ধ বেরুচ্ছে যে হাওয়া যেন তাতে কেমন ভারি 
হ'য়ে আছে। পাঞয়ল সুযোগ পাবামাত্রই জ্ঞান দেখিয়ে ব'লে উঠেছেন : 'এই 
ইউক্যালিপটাস নামটা এসেছে গ্রিককালুণ্তোস থেকে, সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে লাতিন 
ইউ । কালুপ্তোস মানে ঢেকে ফেলা, কারণ এর ফলগুলো পাপড়ি মেলবার আগে টুপির 
মতো কিছু দিয়ে ঢাকা থাকে, যাতে রোদ্দুর থেকে বাচে।' 

রবার্ট কৌতুহলী হ'য়ে জিগেস করলে, “আর এই গন্ধ ? সে কি এ মুদিত কুসুমকলি 
থেকেই আসে ?' পাঞয়লের সঙ্গে কথা বলবার সময় রবার্ট ফাজলেমি ক'রে 
মাঝে-মাঝে সাধুভাষা ব্যবহার করতে শুরু করেছে! “না কি গাছের এ রূপোলি বাকল * 
থেকে? 

“না, না, গাছটার গুড়ি বা কাণ্ড কাঠ হিশেবে ব্যবহার করা হয়--গন্ধ মূলত আসছে 
এর বাহারে, সতেজ আর সবুজ পাতাগুলি থেকে, এঁ পাতাগুলো নিংড়েই বার ক'রে 
নেয়া হয় ইউক্যালিপটাসের তেল--আর সে-সব লোকে আ্যান্টিসেপটিক হিশেবে ব্যবহার 


১০৯ 


করে? 

"কিন্তু এ-গাছ তো কই আমি আমাদের দেশে দেখিনি, 

'গাছটা প্রধানত হয় অস্ট্রেলেশিয়ায়-_ সেখানে রীতিমতো চাষ করা হয় এর। এই 
বনটাকে দেখে মনে হচ্ছে এটাও কারু আবাদ হবে নিশ্চয়ই, কিন্তু এর মজা হচ্ছে একবার 
লাগালেই হ'লো, কোনো তদারক আর করতে হয় না বিশেষ। মাটি থেকে রস শুষে 
নেয়। এ যাকে বলেছো মুদিত কুসুমকলি, শুখা সময়ের জন্যে তার ভেতরেই গাছ তার 
প্রাণরস জমিয়ে রাখে। কিন্তু কালুস্তোস মানে তো ঢেকে দেয়া-ছেয়ে দেয়া, যেন সবকিছু 
ছেয়ে আছে- সোজা সরলরেখায় উঠে যায় এই গাছ, কখনও-কখনও দুশো ফিট অব্দি 
লম্বা হয়। এ ওপর থেকেই বোধহয় নজর রাখে সবকিছুর ওপর, ঢেকে রাখে তলার 
জমি।, 

বক্তৃতার একটা মনোমতো বিষয় পেলে জাক পাঞয়ল আর-কিছু চান না-_তুবড়ির 
মতো জ্ঞানগর্ভ বাকা বেরিয়ে আসতে থাকে মুখ থেকে। ছুটলে কথা থামায় কে? অন্তত 
কোনো ফরাশির মুখ বন্ধ করবে কে-কথার জাহাজ একেকজনে- মেজর ম্যাকন্যাব্সের 

পরের দিন সূর্য ডোববার সময় জঙ্গলের পাশেই দেখা গেলো ছোট্ট একটা লোকালয় 
_শহর ঠিক নয়, বরং ছোটো-একটা গ্রাম। নাম সীমূর। কিন্তু অজ পাড়াগা হ'লে কী 
হবে, এখানে একটা সরাইখানা আছে। সেই সরাইখানাতে আশ্রয় নেবার পর রবার্টকে 
সঙ্গে ক'রে পাঞয়ল গোটা গ্রামটায় একটা টহল দিয়ে এলেন। এবং সারাক্ষণই চললেন 
নানা বিষয়ে জ্ঞান বিলোতে-বিলোতে। রবার্ট সেদিক দিয়ে খুব-ভালো শ্রোতা--মাঝে- 
মাঝে ফোড়ন কাটে, উসকে দেয়, আব পাঞ্য়লের শ্রীমুখ থেকে নিঃসৃত হ'তে থাকে 
কথার ফুলঝুরি। আর তাই, নিজের বক্তৃতায় এতটাই মশগুল ছিলেন পাঞয়ল, যে 
খেয়ালও করেননি গোটা গ্রামটায় এত উত্তেজনা আর চাঞ্চল্য কেন। 

এ দুর্ধর্ষ ট্রেনডাকাতির পর থেকেই গোটা ভিন্রিয়া রাজ্যই অত্যন্ত হশিয়ার হ'য়ে 
উঠেছে। রাতে তারা বারে-বারে এসে লক্ষ ক'রে যায় দরজা-জানলা ঠিকঠাক বন্ধ ক'রে 
রেখেছে কি না। লর্ড গ্লেনারভনের বহরও এই ক-দিন অত্যন্ত সাবধান হ'য়ে পথ চলেছে, 
কড়ানজর রেখেছে চারপাশে, সারাক্ষণই থেকেছে সজাগ। সেইজন্যে এই সীমূরের 
লোকদের চাঞ্চল্যটা পাঞয়লের একটু খেয়াল ক'রে দেখা উচিত ছিলো। কিন্তু নিজের 
কথা শুনতে তার এতই ভালো লাগে যে চারপাশে যে একটা চাপা ফিশফিশ গুজুর- 
গুজুর উত্তেজনা চলেছে সেটা তিনি আদপেই লক্ষ করেননি। 

কিন্তু সরাইখানার মালিকের সঙ্গে দু-চারমিনিট এটা-সেটা-নিয়ে কথা বলেই 
উত্তেজনার মূল কারণটা জেনে ফেলেছিলেন মেজর ম্যাকন্যাব্স। জেনেও, তিনি রাটি 
কাড়েননি। চুপচাপ বসেছিলেন খাবারটেবিলে, ছুরি-কাটা-সৃপের বাটিতেই মনোনিবেশ 


৯১০ 


ক'রে বসেছিলেন। পরে যখন লেডি হেলেনা ও মেরির সঙ্গে রবার্টও শুতে চ'লে গেলো, 
এখনই মেজর মাকন্যাবস কথাটা পাডলেন ঠাণ্ডা চাপাগলায়। 

" আস্দ্রেলিয়ান আও নিউ-জিলা।গ গেজেটে খবর বেরিয়েছে-ডাকাতদলের নাকি 
খোজ পাওয়া গেছে।” 

সঙ্গে-সঙ্গে, কেমন-একটু চঞ্চল স্বরেই বুঝি, আয়ারটন জিগেস করলে, “ধরা 
পড়েছে? 

গত কয়েকদিন ধ'রে ডাকাতদের ভয়ে যেভাবে রাতের ঘুম মাথায় উঠে গিয়েছিলো, 
ভাতে এই খবরটা শুনে একটু চাঞ্চল্য তো হবেই। যাক, এবার তবে হাফ ছেড়ে বাচা 
যাবে। 

মেজর খুবই ছোট্ট উত্তর দিলেন। কাটা-কাটা গলায় বললেন, "না । 

লর্ড এডওয়ার্ড জিগেস করলেন : খোঁজ পাওয়া গেছে মানে? এরা কারা-সে- 
খবর কি জানা গেছে? 

কথাটি ন!-ব'লে মেজর ম্যাকন্যাবস লর্ড এডওয়ার্ডের দিকে খবরকাগজটা এগিয়ে 
দ্লেন। চক্ষের নিমেষে খবরটার ওপর চোখ বুলিয়ে নিলেন গ্রেনারভন। যেন গোগ্রাসে 
গিললেন খবরটাকে। 

আয়ারল্যাণ্ড থেকে দ্বীপান্তরে পাঠাবার সময় বেপরোয়া উনত্রিশজন ডাকাত ছ-মাস 
আগে পুলিশপাহারার নজর এডিিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলো। এদের পাণ্টির নাম বেন 
জয়েস--যেমন নিষ্ঠুর, তেমনি দুঃসাহসী ; কিন্ত শুধু প্রচণ্ড দুঃসাহসই তার নেই, মাথায় 
প্রচণ্ড বুদ্ধি। এতই ধূর্ত যে পুলিশ এর আগে এই নরাধমের কোনো নাগালই পায়নি, 
তো পাকড়াবে কী ক'রে? কী ক'রে সে যে এখন অস্ট্রেলিয়ায় এসে হাজির হয়েছে, 
সেটাও একটা দুর্ভেদ্য প্রহেলিকা। স্যাগুহাস্ট রেলপথে ট্রেনটা উলটে দিয়ে দুর্ঘটনাটা 
ঘটিয়েছে এরাই--যাতে অনায়াসেই লুঠের কাজ চালাতে পারে। 

প*্ড়েই লর্ড এডওয়ার্ডের চোখ কপালে উঠে গেলো। তাহ'লে কি স্থলপথে যাবার 
পরিকল্পনাটা খারিজ করতে হবে ? তবে কি মেলবোর্নে গিয়েই উঠে পড়বেনডানকানে ? 

তার প্রশ্নটা শুনে মেজর ম্যাকন্যাবস সরাসরি আয়ারটনকেই জিগেস ক'রে 
বসলেন : 'আয়ারটন, তুমি কী বলো ? আমাদের পক্ষে এখন কী করলে ঠিক হবে? 
মনে রেখো, এই মকেেলের নাম বেন জয়েস-পুলিশের কর্তারা অব্দি তাকে ডরান।, 

আয়ারটন কী যেন একটু ভেবে বললে, 'আমরা এখনও মেলবোর্ন থেকে দুশো 
মাইল দূরে রয়েছি। এতটা পথ পেরিয়ে সেখানে পৌছুতে আমাদের অনেকটাই 
সময় লেগে যাবে। এ-রাস্তার কোনখানে কোন বিপদ ওৎ পেতে লুকিয়ে আছে, তা কে 
বলবে?' 

লর্ড এডওয়ার্ড জিগেস করলেন, 'তাহ'লে কী করবো? 


গা 


১১৯৯ 


«দেখুন, আয়ারটন বিশদ ক'রে বললে, “বিপদের ভয় যদি করেন, তবে এটা 
মানতেই হয় যে বিপদ যে-কোনোদিক থেকেই আসতে পারে। আমরা মেলবোর্নের পথই 
ধরি, কিংবা সোজা নাকবরাবর এগুই- কোথাও আমরা খুব-একটা নিরাপদ নই। বেন 
জয়েসের দল কোথায় আছে, কেউ জানে না-সে যদি আমাদের ওপর হামলা করতে 
চায় তবে যেদিকেই যা-ই না কেন, সেদিকেই সে এসে আমাদের ওপর ঝাপিয়ে পড়তে 
পারে। আমরা আটজন লোক যদি সজাগ থাকি আর দৃঢ়তার সঙ্গে তাদের ঠেকিয়ে রাখতে 
চাই, তাহ'লে আমার মনে হয় আমরা আটজনেই উনত্রিশজন ডাকাতকে ঠেকিয়ে রাখতে 
পারবো। আমাদের শুধু খেয়াল রাখতে হবে, বিপদের সময় আমরা যাতে ঘাবড়ে গিষে 
কোনো গগুগোল না-ক'রে বসি-যেন সবসময় মাথা ঠাণ্ডা রাখি। আমরা যদি খুব-বিচলিত 
বোধ না-করি, তাহ'লে বলবো আমরা যেদিকে চলেছি, সেদিকেই বরং ব্রমাগত এগিয়ে 
যাই। 

“হ্যা, আমাদের ছকটা হঠাৎ দুম ক'রে পালটে ফেলার কোনোই মানে হয় না, 
পাঞয়ল সায় দিয়ে বললেন, “তাছাড়া কাণ্তেন গ্রান্টের কোনো খোঁজ তো আ্যাদ্দিনেও 
পাওয়া যায়নি-সেটা পাওয়া যেতে পারে শুধু সামনের দিকে এগিয়ে গেলেই? 

“তবে, আয়ারটন বললে, “সাবধানের মার নেই। আমরা যদি খোলাখুলি ডানকান 
জাহাজে খবর পাঠিয়ে দিই, তবে তারাও অহেতুক আমাদের নিয়ে ভাববে না।' 

জাহাজের কথাটা উঠতেই কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্সের মনে হ'লো, এবার আলোচনাটায় 
তারও অংশ নেয়া উচিত। 'খামকা ওদের খবর পাঠিয়ে লাভ কী হবে ? এখনও নিশ্চয়ই 
মেরামতের কাজ শেষ হয়নি। আমরা যদি হঠাৎ দুম ক'রে আমাদের বাদ দিয়েই 
ডানকানকে চ'লে যেতে বলি, তাহ'লে পরে আমাদেরই মুশকিলে পড়তে হ'তে পারে। 
আমাদের মনে রাখতে হবে হঠাৎ কাণ্তেন গ্রান্টের কোনো খবর এলে আমাদের হয়তো 
জলপথেই বেরিয়ে পড়তে হ'তে পাঁরে। জাহাজ যদি আগেই ছেড়ে যায় তবে হয়তো 
দরকারের সময় আমরা গিয়ে মেলবোর্নে জাহাজ ধরতে পারবো না। 

“হা, আগেকার প্ল্যানমাফিক ডানকানের যেখানে থাকবার কথা, সে না-হয় সেখানেই 
থাকুক--তাদের অযথা খবর পাঠিয়ে বিব্রত ক'রে কোনো লাভ নেই, এই মন্তব্যটা খোদ 
লর্ড এডওয়ার্ডের। আর তা শুনে আয়ারটন আর সে নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করলে না। 
বরং বললে, “ঠিক আছে। তা-ই না-হয় হোঁক। তাহ'লে কাল ভোরেই আমরা এখান 
থেকে রওনা হ'য়ে পড়বো ।, 

জানুয়ারি মাসের পাঁচতারিখ সন্ধেবেলায় বহর যেখানে এসে পৌছুলো, সেট 
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের রাজ্য। এ-অঞ্চল সংরক্ষিত, রিজার্ভড। অর্থাৎ শাদাআদমির 
এখানে যেখানে-খুশি যেতে পারবে, এবং যা-খুশি তা-ই করতে পারবে, কিন্তু এই কালে 
আদিবাসীরা এর চৌহদ্দি পেরিয়ে কোথাও যেতে পারবে না। এমনিতেই শাদারা কালোদে? 


১৯২ 


নির্বিচারে হত্যা করেছে আযাদ্দিন, কিন্তু পাচবছর আগেও যে-সব আদিবাসী এখানে ছিলো, 
যে যার নিজেদের দেশে-এটা তো তাদেরই দেশ, না কী ?-_তারা ইচ্ছেমতো চলাফেরা 
ক'রে বেড়াতে পারতো--তাদের অনেক স্বাধীনতা ছিলো। কিন্তু তাদের বাচিয়ে রাখার 
বাহানা ক'রে-এটা একটা ছ্ুতো বই আর-কিছু না, কারু স্বাধীনতা কেড়ে নেবার একটা 
অছিলাই তো শুধু--তাদের এই জঙ্গলে এনে ট্যাড়া কেটে গণ্ডি একে ব'লে দেয়া হয়েছে, 
'তোমরা আর-কখনও এই গণ্ডির বাইরে যেতে পারবে না। 

পাঞয়ল বলছিলেন : “কিছুদিন আগেও, এই এতটা-রান্তা পেরুবার সময় 
অস্ট্রেলিয়ায় যারা আগে থেকেই থাকতো, তাদের অনেককেই আমরা হয়তো দেখতে 
পেতুম। এবং আর-কিছুদিন পরে হম্রকতা কোথাও কোনোখানেই তাদের একজনকেও 
দেখতে পাবো না। অস্ট্রেলিয়া হ'য়ে উঠবে শাদাদেরই দেশ--যেন কেউ জাদুগালচেয় 
ক'রে ইওরোপটাকেই এখানে এনে বসিয়ে দেবে-তবে বেশির ভাগ লোকই যে ব্রিটেনের 
হবে, তাতে কোনো সন্দেহই নেই। এমনকী তারা এ-দেশটার বিভিন্ন অঞ্চলের নামও 
দেবে নিজেদের দেশের মাতব্বরদের নামে । ভাষাতাত্ত্বকেরা জানতেও পাবেন না 
এখানকার লোকে জায়গাগুলোর নাম কী দিয়েছিলো। এই-যেমন, মেলবোর্ন রাজ্যের 
রাজধানীর নাম দেয়া হয়েছে ভিক্টরিয়া। এটা নিশ্চয়ই অস্ট্রেলিয়ার আদিমানুষদের ভাষার 
কোনো শব্দ নয়।” 

কিন্তু এ-কথাটা আর নতুন কী? শাদারা যেখানেই গেছে, সুযোগ পেলেই খুন 
করেছে, বা হঠিয়ে দিয়েছে সে-দেশের আগেকার অধিবাসীদের। মার্কিন মুলুকের কথাই 
ধরুন না কেন? ইয়াঙ্কিরা ইগ্ডিয়ানদের কটা উপজাতিকে বাচিয়ে রেখেছে, বলুন ?' এ- 
কথাটা মেজর ম্যাকন্যাব্স-এর। 

পাঞয়ল একটু ক্ষুব্ধ শ্বরেই বলেছিলেন : “আমার এক-এক সময়ে সন্দেহ হয় 
এ-সব সংরক্ষিত এলাকা তৈরি করার গোপন মানেটাই হ'লো আদিবাসীদের সব্বাইকে 
একটা ছোটো জায়গায় ঠুশে ঢুকিয়ে দাও--তাদের বাকি-সব জমিজমা কেড়ে নাও-- 
তারপর দরকার হ'লে গোটা জাতিকে জাতি লোপাট ক'রে দিতে হ'লে আর ভাবনা 
কী-সব্বাইকেই তো একজায়গায় পেয়ে যাচ্ছো! 

এই কথাগুলো ঠিক কারুই পছন্দ হচ্ছিলো না, এমনকী পাঞয়লের নিজেরও না। 
বেন জয়েসের লুঠপাটের সঙ্গে সরকারের আইনমাফিক ডাকাতির তফাৎটা কেবল মাত্রায় 
-সরকার যেটা বিরাট তোড়জোড় ক'রে আইনমাফিক করতে পারে, বেন জয়েস সেটা 
পারে না--তাছাড়া সে-যে নরাধম তার প্রমাণই তো হ'লো এই তথা যে সে শাদাদের 
হত্যা ক'রে শাদাদের জিনিশপত্র লুঠ ক'রে নেয়। 

সংরক্ষিত এলাকার পাশেই তাবু খাটানো হয়েছিলো । সন্ধের অন্ধকার নেমে এসেছে 
তখন। আর তারই মধ্যে হঠাৎ দেখা গেলো আবছামতো কী-একটা জীব ইউক্যালিপটাস 


ইন সার্চ : ৮ তি 


গাছগুলোর ডাল থেকে ডালে ঝাপিয়ে পড়ে দূরে মিলিয়ে গেলো। 

কোন জীব এটা? 

সন্দেহ ভঞ্জন করেছিলেন পাঞয়লই। “নিশ্চয়ই এ আদিবাসীদেরই একজন হবে 
-আমাদের ওপর নজর রাখছিলো- এখন অন্যদের খবর দিতে চ'লে গেলো? 

পরের দিন ভোরবেলায় গ্লেনারভনের বহর যখন সরাসরি সংরক্ষিত এলাকায় ঢুকে 
পড়লো-শাদাদের তো এখানে যেতে কোনো বারণ নেই-_- তখন খানিকটা এগিয়ে যাবাব 
পরই তুলনায়-খোলামেলা একটা জায়গায় দেখা গেলো আদিবাসীদের ছাউনিগুলো-ডজন 
খানেক তাবুর মতো ঝুপড়ি, আর তার আড়াল থেকেই উকি দিচ্ছে ত্রস্ত ও চঞ্চল সব 
আদিবাসীদের মুখ। ইওরোপের পণ্ডিতদের কথাই আলাদা । কোন-একজন নৃতাত্ত্বিক নাকি 
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের দেখে বলেছেন, বাদর থেকে মানুষ হ'য়ে যাবার যে-স্তর- 
পরম্পরা আছে তার মধ্যে একটার কোনো খোজ পাওয়া যায়নি; এতকাল তাকেই বলতো 
হারানো যোগসৃত্র-মিসিংলিহ্ক। এই পণ্ডিতের দৃঢ়বিশ্বাস জম্মেছিলো অস্ট্রেলিয়ার 
আদিবাসীরাই নাকি সেই হারানো যোগসূত্র । 

তা এই মিসিংলিকদেরও নিজেদের ভাষা আছে, তারা তাদের সেই ভাষাতেই 
নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ ক'রে, খবরের আদানপ্রদান ক'রে, নিজেদের পূর্বপুরুষের 
গল্প শোনায় ছোটোদের, এই ভাষাতেই তারা গান করে, স্বপ্ন দ্যাখে, আর এতকাল ভবিষ্যৎ 
সম্বন্ধে অনেকরকম জল্পনাও করতো-তবে আজকাল তারা জেনে গেছে যে তাদের 
ভবিষ্যৎ ব'লে আর-কিছু নেই, ফলে এখন আর হয়তো পরেরদিন কী হবে তা নিয়ে 
তারা আর মাথাই ঘামায় না। 

আয়ারটন বললে যে সে নাকি এদের ভাষা জানে-_জাহাজডুবির পর সে নাকি 
এ-রকমই ছোটো-একদল আদিবাসীদের সঙ্গে দু-দুটো বছর কাটিয়েছে-সে বলতে 
চাচ্ছিলো গোলামি ক'রে কাটিয়েছে, কিন্তু তাকে দিয়ে যে-সব কাজ করানো হ'তো, 
আদিবাসীরা নিজেরাও উদয়াস্ত সেই কাজই করতো, আর তাকে দেখবামাত্র তাকে তারা 
নির্যাতনও করেনি--অথবা মেরে ফেলবার কথাও ভাবেনি । তবে কাজের বড়ো অংশটাই 
এখানে করতে হয় মেয়েদের, ছেলেরা শিকার করে, রক্ষণাবেক্ষণ করে, এখন আবার 
সবসময় হুঁশিয়ার হ'য়ে থাকে-কখন শাদারা এসে হাজির হয়। 

আয়ারটন বললে, “কাণ্তেন গ্রান্ট যদি সতা-সত্যি বেচে থাকেন, তাহ'লে নিশ্চয়ই 
এইরকমই কোনো আদিবাসীদের দলের মধ্যে আছেন-আর আমাকে যেমন হাড়ভাঙা 
খাটুনি খাটতে হ'তো, তাকেও নিশ্চয়ই সেইরকম ভাবেই এদের জন্যে মাথার ঘাম পায়ে 
ফেলতে হচ্ছে। 

“কিন্ত্ত তুমি তো এদের চোখে ধুলো দিয়ে সটকে আসতে পেরেছো, মেজর 
ম্যাকন্যাব্স বললেন : “এরা কি বন্দীদের ওপর কড়া পাহারা রাখে না? 


৯১৪ 


'পালিয়ে-যাওয়া খুব-একটা কঠিন নয় হয়তো, কিন্তু আসল কষ্ট শুরু হয় এদের 
হাত থেকে পালিয়ে আসার পরেই। দেখছেনই তো এই সংরক্ষিত এলাকার আশপাশে 
শাদাদের কোনো লোকালয় নেই। তাছাড়া অজানা অচেনা জায়গায়--কোথায় কী আছে 
আপনি জানেন না। পালিয়ে আসার মানে তো আপনি ঝাপ খাবেন সরাসরি অজ্ঞাতের 
মধ্যে 

এ-সব কথা যখন চলছে তখন আদিবাসীদের মধ্যে একটা কলরব উঠলো হঠাৎ। 
এমু পাখিদের একটা ঝাক নাকি দেখা গেছে। পাখি বটে, কিন্তু ওড়ে না, ছোটে--আর 
এত-জোরে ছোটে যে পলক-না-ফেলতেই তারা চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে যায়। 
এদের মাংস খুব সুস্বাদু বলেই তাদের আত্মরক্ষার জন্যে পা দুটোকে এমন তীব্রগতিতে 
ব্যবহার করতে হয়। ডানাগুলো কেমন বেঢপ, আর কেমন যেন মাংসের টিবির মতো । 
তাই উড়তে পারে না বটে, তবে সবচেয়ে-দ্রুত ঘোড়ার চেয়েও জোরে ছোটে। তাই 
এদের কুপোকাৎ করতে হয় বিস্তর বুদ্ধি খাটিয়ে। একজন আদিবাসী এমুর একটা খোলশ 
প'রে, এমু সেজে, এমুদের মতো আওয়াজ করতে-করতে এমুর ঝাকটার কাছে গিয়ে 
আচমকা বেধড়ক লাঠি চালিয়ে পাঁচ-পাঁচটা এমুকে ঘায়েল ক'রে ফেললে । 

কিন্তু তারপরেই শিকার করবার আরো-একটা অদ্ভুত উপায় দেখতে পেলেন 
গ্লেনারভনরা। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে এসেছিলো কাকাতুয়ার মতো নীলরঙের অচেনা 
পাখির একটা ঝাক। চুপি-চুপি, কোনো শব্দ না. ক'রে একজন আদিবাসী গাছের আড়ালে 
স'রে গিয়ে গাঢাকা দিয়ে দীড়ালে। তার হাতে কঠিন একটা বাঁকানো কাঠ--প্রায় চাদের 
ফালির মতো বাকা । কেউ কিছু বুঝে ওঠবার আগেই সা ক'রে কোমরের কাছ থেকে 
এঁ বাকা ফালিকাঠটা হাতের একটা ঝটকায় বিদ্যুৎবেগে ছুঁড়ে দিলে, আর হঠাৎ প্রায় 
চল্লিশ হাত পথ কোমরসমান উঁচু দিয়ে উঠে গিয়েই আচমকা সেটা সটান একলাফে 
উঠে গেলো অনেক ওপরে, তারপর সেই নীলপাখিদের ডজনখানেককে একসঙ্গে ঘায়েল 
ক'রে ফের বিদ্যুৎবেগে ছুটে এসে সোজা সেই আদিবাসীর কাছে ফিরে এলো, ধুপ ক'রে 
পড়লো তার পায়ের কাছে। 

পাঞয়ল যেন এই অচেনা অস্ত্রটার মধ্যেই চেনা-কিছুকে খুঁজে পেলেন। বিস্ময়ে 
চীৎকার ক'রে উঠলেন : “আ্া! ব্যমেরাং। নেহাৎ ছোট্ট একটা কাঠের ফালি--কিস্ত 
ছোড়বার কায়দটাই আসল আর সেটা জানে অস্ট্রেলিয়ার এই আবওরিজিনিরাই শুধু 1 

“সবদেশের আদিবাসিন্দারাই মাথা খাটিয়ে শিকারের সব বিচিত্র উপায় উত্তাবন করে 
নিয়েছে, লেডি হেলেনা মুদ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখছিলেন দৃশ্যটা। “আমেরিকায় তারা বার 
করেছে ল্যাসো, এমন কায়দায় দড়ির ফাস ছোড়ে যে বুনোমোষকেও কজা ক'রে ফেলতে 
পারে। এরা বানিয়েছে ব্যুমেরাং ! মাথায় যদি প্রথর বুদ্ধি না-থাকে তাহ'লে এমন-কোনো 
হাতিয়ারের কথা কেউ ভাবতেই পারতো না। অস্ত্রটা নষ্ট হয় না আরদৌ-যেন একটা 


১১৫ 


অস্ত্রেই আস্ত একটা অস্ত্রাগার-কেননা যেটাকে ছুঁড়ে মারা হ'লো, সেটাই আবার কাজ 
হাসিল ক'রে ফিরে এলো! সত্যি, মানৃষ যে কত কী-ই না মাথা খাটিয়ে বার করতে 
পারে !' 

“হুম! মেজর ম্যাকন্যাবস বললেন, “এরা আবার মানুষ নাকি ? শোনেননি মসিয় 
পাঞয়লের কাছে? কোন-একজন মস্ত পণ্ডিত নাকি বলেছেন এরা বাদরও নয়_ মানুষও 
নয়--তারই মাঝামাঝি-কিছু-মাথা খাটিয়ে এই পণ্ডিত এর একটা নামও দিয়েছেন- 
মিসিংলিঙ্ক । আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। মানুষ যে কত কী-ই বার করতে পারে মাথা 
খাটিয়ে! 


চার 
ডানকান গেলো কোথায় ? 


রাস্তিরে খাওয়াদাওয়ার পর শিবিরে যখন আড্ডা জমেছে, হঠাৎ-_আশ্চর্য কাণ্ড !_ 
অস্ট্রেলিয়ায় ইওরোপ থেকে অনেকদূরে, জঙ্গলের মধ্যে ভেসে এলো মোংসার্টের 
অপেরার সুর : কারা যেন ডন জোভান্নি গাইছে। 

এখানে ? বনের মধ্যে? ডন জোভামি ? 

পাঞয়ল সবে কী-একটা প্রসঙ্গে তার পাণ্ডতিত্য জাহির করতে যাচ্ছিলেন, এমন 
সময় কারা গাইছে দা পোস্তের ইতালিয় ভাষায় লেখা ডন হুয়ানের কাহিনী-ভোল্ফগাঙ 
আমাডেউস মোৎসার্ট যার সুর দিয়েছিলেন, যে-অপেরা প্রথম প্রযোজিত হয়েছিলো 
বোহিমিয়ার প্রাহায়, ১৭৮৭ সালে-সেখানে ডন হুয়ানকে পাতালে টেনে নিয়ে 
গিয়েছিলো পাথরের অতিথি! 

স্তব্ধতার মধ্যে খানিকক্ষণ শুধু দূর থেকে ভেসে-আসা মোৎসার্টের সুর ছাড়া আর- 
কিছুই নেই। তারপর, খানিকক্ষণ বাদে তাও মিলিয়ে গেলো রাতের হাওয়ায়। 

একটুক্ষণ চুপ ক'রে থেকে মেজর ম্যাক্ন্যাব্স জিগেস করলেন : “ডন জোভান 
না? 

“হ্যা, ডন জোভারিই। যথারীতি পাঞয়লেরই সবজাস্তা গলা বিশদ তথা জানাবার 
জন্যে চুলবুল ক'রে উঠেছে। “অপেরাটার আসল নাম অবশ্য ছিলো ইল্‌ দিসোলুতো 
পুনিতো, ও সিয়া ইল্‌ ডন জোভামি অর্থাৎ লম্পটের শান্তি অথবা ডন জোভামি। আর 
সে-বার বোহিমিয়ায় প্রথম প্রযোজনার সময়ই দারুণ হুলুস্থুল হয়েছিলো এটাকে 


১৯৬ 


নিয়ে-_ 

হ্যা। তা না-হয় বোঝা গেলো, কিন্তু এত-রাতে এখানে সেই অপেন। গাইছে 
কারা? লর্ড এডওয়ার্ড গান শুনে বেশ হতভম্বই হ'য়ে পড়েছিলেন। 

কারা যে গাইছিলো, সে অবশ্য পরদিন সকালেই জানা গেলো, যখন দেখা গেলো 
দুটি যুবক চলেছে ঘোড়ায় চ'ড়ে, সঙ্গে একপাল শিকারি কুকুর। 

এঁদের শিবির দেখে যুবকরাই নিজে থেকে কৌতুহলী হ'য়ে ঘোড়া থামিয়েছিলো। 

আলাপ হবার পর যুবক দুটিকে ভালোই লেগে গেলো সকলের | কথায়. কথায় 
জানা গেলো তাদের বাবা লগ্ডনের এক ধনকুবের, ব্যাঙ্কার। ছেলেদের ঝোক কেবল 
গানবাজনায়--এটা ব্যাঙ্কব্যবসায়ীর খুব-একটা পছন্দ হয়নি। অনেকবার নাকি চেষ্টা 
করেছেন ব্যাঙ্কের ব্যাবসায় এদের ভিডিয়ে দিতে, কিন্তু এইসব পাউগু-শিলিং-পেন্স জমা- 
খরচ সুদ-মূলধন--এইসবে কিছুতেই তাদের মন ওঠেনি। তারা বরং কোথায় কোন 
গানবাজনার আসর বসেছে, তার খবর রাখতেই বেশি-উৎসাহ বোধ করেছে । শেষটায় 
একদিন তাদের বাবা তাদের ডেকে বলেছিলেন, “বুঝতে পারছি যতদিন আমার এখানে 
থাকবে, ততদিন ভাববে পায়ের উপর পা তুলে কাটালেই চলবে। কীভাবে যে সংসার 
চলে সে-সম্বন্ধে কোনো ধারণাই তোমাদের হবে না। তার চাইতে তোমাদের টাকা দিচ্ছি, 
লগুন ছেড়ে বেরিয়ে পড়ো- যেখানে খুশি যাও, ভালো হয় ইওরোপ ছেড়ে গেলেই। 
গিয়ে, নিজের পায়ে দীড়াবার চেষ্টা করো। নটা-পাঁচটা আপিশ যদি ভালো না-লাগে, তো 
অনাকিছু করো--কিন্তু অন্য-কোথাও, এখানে নয়। যদি নিজের পায়ে দাড়াতে পারো তে৷ 
ভালো, না-হ'লে বুঝবো দুটো অকম্মার ধাডি এককাড়ি টাকা জলে ফেলেছে ' আমি না- 
হয় ধ'রে নেবো যে তবু তো নিজের পায়ে দাড়াবার চেষ্টা করতে গিয়ে এরা টাকাগুলো 
খুইয়েছে। কিন্তু এভাবে আর চলবে না-' 

বাবার কথা বলার ভঙ্গি দেখে এরা বুঝেছিলো, সত্যিই, এভাবে আর চলবে না। 
শেষটায় অনেক ভেবে তারা এসে হাজির হয়েছে পৃথিবীর একেবারে অন্যপ্রান্তে- এই 
অস্ট্রেলিয়ায়। এখানে এসে তারা ক্যাটলফার্ম খুলে বসেছে, গোরু-ভেড়ার ব্যাবসা, আর 
তাদের র্যান্চটা হয়েছে এখানকার অন্য র্যানচগলোর চাইতে একেবারেই অন্যরকম। 
অজন্র গোরু-ভেড়া সামলাচ্ছে বটে, কিন্তু সেটা সামলাতে গিয়ে এখানে তারা তাদের 
র্যান্চকে কেন্দ্র ক'রে আস্ত-একটা জনপদই গ*ড়ে তুলেছে। শুধু তাদের নিজেদের জন্যে 
যে মস্ত একটা প্রাসাদই বানিয়েছে তা নয়--তার আশপাশে তাদের কাছে যারা কাজ 
করে তারাও নিজেদের ঘরবাড়ি বানিয়েছে । জেনারেটর বসিয়েছে- সেখানে তড়িংকোষ 
থেকে বিজলি উৎপাদিত হ'য়ে যে শুধু আলোই জোগায় তা-ই নয়, তারা বসিয়েছে 
টেলিগ্রাফভবন, যাতে বড়ো শহরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে সবসময়, চেষ্টা করেছে 
এই দূর জঙ্গলেও জীবনযাত্রার মান যাতে আদিম অতীতে ফিরে না-যায়, বরং বিজ্ঞানকে 


এ ১১৭ 


কাজে খাটিয়ে আজ মানুষ জীবনযাত্রাটা যতটা সহজ ক'রে তুলেছে, এখানেও যেন সেই 
সহজ স্বাচ্ছন্দ্যের ছাপ পড়ে। 

এখানে তারা খুব-ভালো আছে। সারাদিন সকলের সঙ্গে খাটে, র্যান্চের তদারকি 
করে, এক কোর্যাল থেকে আরেকটা কোর্যালের সংযোগ রাখে, রাত্তিরে শুতে যাবার 
আগে মাঝে-মাঝে তাদের মনে প'ড়ে যায় বেটোফেন বা মোৎসার্টকে, আর কাল রাত্তিরে 
তারা তাদের সেই গানই শুনেছেন। 

সাধারণত যারা র্যান্চ চালায় তাদের ধরন-ধারণ হয় রুক্ষ, কর্কশ, একটু হয়তো- 
বা অমার্জিতও। এরা কিন্তু মোটেই সে-রকম নয়। খানিকক্ষণ কথাবার্তার পর তারা 
অভিযাত্রীদের আমন্ত্রণই জানিয়ে বসলো, “আসুন না, আমাদের খামারটা দেখে যাবেন 
একবার ।' 

এদের সঙ্গে আলাপ ক'রে অভিযাত্রীরা বেশ খুশিই হয়েছিলেন। তাছাড়া, এ-কদিন 
একটানা পথের ধকলে বেশ-একটু ক্লান্তিও লাগছিলো । একটা দিন না-হয় একটু অন্যরকম 
ভাবে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-পথ্শ্রম ছাড়াই কাটানো গেলো। 

সারাটা দিন কাটলো এই ক্যাটলফার্ম ঘুরে বেড়িয়ে। এই যুবক দুটি কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার 
বিশাল বনের পাশে ইওরোপকে এনে বসিয়ে দেয়নি। বরং অস্ট্রেলিয়ার ভূদৃশ্যের সঙ্গে 
ংগতি রেখেই, মানানসইভাবেই, সবকিছু গ*ড়ে তুলেছে। তাদের এই ছোট্ট গ্রামটা গণ্ডে 
তুলতে গিয়ে তাদের অনেক গাছপালা কাটতে হয়েছে, এটা সত্যি--কিন্তু তার! নির্বিচারে 
গাছ কেটে বনকে বন সাফ ক'রে দেয়নি, বরং র্যান্চটা গ*ড়ে তুলেছে এক বিস্তীর্ণ 
তৃণভূমির পাশে, যাতে গোরু-ভেড়া চ'রে বেড়াতে পারে, পরের পর গাছপালা কেটে 
তারা এই চারণভূমি গড়ে তোলেনি। কেননা এটা তারা জানে যে এমনিতেই অস্ট্রেলিয়ার 
মরুভূমি আউটব্যাকে এমনভাবে হা ক'রে থাকে যে যত গাছপালা কাটবে, ততই মরুভূমি 
এগিয়ে আসবে, বৃষ্টি পড়বে না _ ঘাস গলাবে না, এমনকী সব জীবজস্ত্রও এখান থেকে 
উধাও হ*য়ে যাবে। তারা চেয়েছে যাতে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশটাকে কাজে খাটিয়েই 
তাদের খামার গড়ে তোলা যায়। 

অর্থাৎ তৃণভূমিটাকে ঘিরেই জটিলবঝুরি মস্ত গাছপালা নিয়ে মোটামুটি অক্ষতই থেকে 
গেছে এই নিবিড় বনানী-আর তার জীবজন্তুরাও আশ্রয় খুইয়ে এখান থেকে পালিয়ে 
যায়নি। 

ণচলুন-না, আজ একটু বনের ভেতরে গিয়ে শোভা! দেখে আসা যাক। 

খাওয়াদাওয়ার পর তারা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো। 

বনের শোভা অবশ্য এই দিনগুলোয় যথেষ্টই দেখেছেন সবাই, কিন্তু এখানকার বনে 
নাকি এমন-সব জীবজন্তু আছে, খা আর কোথাও সহজে দেখা যাবে না। 

এ-কথা শুনে সকলের আগে উৎসাহে লাফিয়ে উঠেছিলো রবার্টই। আর তাব 


১৯৮ 


উৎসাহ দেখে অন্যরাও আর-কোনো আপত্তি তোলেননি। কিন্তু তাতে অবশ্য একটা 
বিপত্তিই ঘটতে বসেছিলো। তাদের সঙ্গে দেখা হ'য়ে গিয়েছিলো কাঙারুদের একটা 
ঝাকের- অনেক ছানা-রুর সঙ্গে মা-কাঙারু। আর ক্যাঙারুর স্বভাবই এমন যে যদি 
তারা ভাবে আচমকা কোনো বিপদ এসে হাজির হয়েছে, তখন তারা গোড়ায় চেষ্টা করে 
লাফিয়ে-লাফিয়ে পালিয়েই যেতে-ক্যাঙারুর লাফিয়ে-লাফিয়ে ছুটে-চলার দৃশ্য ভারি 
অদ্ভুত, কেমন হাসিও পায-_ কিন্তু বাপারটা খুব-একটা হাসির থাকে না, যদি তারা মনে 
কবে যে সহজে পালিয়ে যেতে পাববে না। তখন উলটে তারা লাফিয়ে এসে হামলাই 
চালায়-তখন তারা লাথি কষায়, আর সেই চাট খেয়ে বড়ো-বড়ো জন্তুও একেবারে 
ঘায়েল হয়ে যায়। 

ক্যাঙারুরা নিরামিষাশী_উত্ভিদভোজী। শুধু অস্ট্রেলিয়া আর নিউগিনিতেই তাদের 
দেখা যায়। লম্বা লাজ, আর শরীরের পেছন দিকটা এমন সবল-সুগঠিত যে তাতেই 
হাবা একেক লাফে বড়ো-বড়ো দূরত্ব অতিক্রম ক'রে যেতে পারে। আর প্রকৃতি যেমন 
তাদের আত্মরক্ষা করার জন্যে শক্তিশালী পশ্চাদ্দেশ আর সুগঠিত পা দিয়েছে, তেমনি 

ই ব্যবস্থাও করেছে বিপদের সময়, কোনঠাশা হ'য়ে গেলে, যাতে তারা & পায়ের 
লাথি কষাতে পারে। 

রবার্ট ঠিক টের পায়নি, বরং আগ্রহের বশে বড্ড-কাছে গিয়ে পড়েছিলো এক 
ছানা-রুর, যে-তখন মার বুকের থলে থেকে বেরিয়ে নিজেই চ'রে বেড়াচ্ছিলো। কিন্তু 
মা-ক্যাঙারুর ছিলো সজাগ কড়ানজর ; স রবাটকে কাছে আসতে দেখেই একলাফে 
তার কাছে এসে পড়ে প্রায় লাথি কষাতেই গিয়েছিলো । কাণ্তডেন ম্যাঙ্গলস হুশিয়ার না- 
থাকলে রবার্টকে আর দেখতে হ'তো না-কিস্থু কাণ্তেন ম্যাঙ্গলস গায়ের জোরে ধেয়ে- 
আসা ক্যাঙারুর বুকে তার ছোরাটা বসিয়ে দেয়াতেই রবার্ট সে-যাত্রায় বেচে গেলো। 

এই বিপত্তির পর সবাই বেশ-একট্রু মনখারাপ ক'রেই ফিরে এসেছিলো । মিথোমিথ্যি 
কোনো ক্যাঙারুকে মারাব ইচ্ছে বোধহয় কাকই ছিলো না। 

“ক্যাঙারু নিরামিষাশী হ'লে কী হয়_ আমদের কিন্ছু বিপদে ফ্যালে প্রায়ই, একটু 
সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতেই ভাইদের একজন বললে, “শুধু লতাপাতা উত্তিদ খায় ব'লেই 
এদের খাই-খাই থেকে শসাবাচানো একটা বিষম মুশকিলের ব্যাপার । ক্যাঙারুর ঝাক 
আসতে দেখলে আমরা নিজেরাও প্রায়ই উলটে ওদের মারতে বাধা হই।, 

হ্যা, একেই বলে জঙ্গলের নিয়ম। তুমি যদি নিজের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা না-করো, 
তবে তোমার দেখাশুনো করবার জন্যে এই বিজনবিভয়ে আর কেই-বা থাকবে? 
অন্যভাই সায় দিয়ে বলেছিলো। 

বিশ্রামটা যদিও 'অবিমিশ্র নিশ্চিন্ত হয়নি, তবু বোধহয় এই একটা দিন জিরিয়ে নেয়া 
ভালোই হয়েছিলো । কারণ পরদিন ভোরেই লর্ড গ্রেনারভনের বহর অস্ট্রেলিয়ার এমন 


১১৯ 


অঞ্চলে পৌছে গেলো যেখানটা অত্যন্ত দুর্গম বলেই এখনও মানুষের অজ্ঞাত থেকে 
গেছে। 

বহর এখন যেখানে এসে পৌছেছে মাউন্ট কশ্চিউস্কোর কাছে, যে-পর্বতশ্রেণী 
দক্ষিণপূর্ব নিউসাউথ ওয়েল্স-এর পাশ দিয়ে উঠে গেছে ৭৩১৬ ফিট উঁচু, অস্ট্রেলিয়ার 
সবচেয়ে-উঁচু পর্বতশ্রেণী-গ্রেট ডিভাইডিং রেন্জের মধ্যেও সবচেয়ে-উচু। ইওরোপ 
থেকে মানুষ গিয়ে তাকে একটা ইওরোপিয় নামই দিতে চেয়েছে, তাকে বলেছে 
অস্ট্রেলিয়ার আলপস --একদিকে পূর্ব-ভিন্টরিয়া, আর দক্ষিণদিকে নিউসাউথ ওয়েলস 
--বিশাল ভূখণ্ড জুড়ে চলে গিয়েছে পর্বতশ্রেণী। অস্ট্রেলিয়ার এই আলপ্সের সবখানে 
এখনও কোনো অভিযাত্রীদলই যেতে পারেনি, ফলে প্রায়ই নতুন-নতুন তথ্য জড়ো হ'তে 
থাকে এই মাউন্ট কশ্‌্চিউস্কো সম্বন্ধে। এদের বহর অবশ্য এটা অতিক্রম ক'রে যাবে 
না, শুধু-যে দুর্গম তা নয়, এটা দুরারোহও--তাছাড়া কোথায় যে কী আছে, তাও জানা 
নেই-ফলে আগে থেকেই ঠিক ছিলো এর পাদদেশ ঘিরেই, এর পাশ কাটিয়ে, যাবে 
বহর। 

কিন্তু তাহলেও ঠিক কোনখান দিয়ে গেলে যে এর পাশ কাটিয়ে যাওয়া যাবে, 
সেটা জানা নেই--কোনো মানচিত্রেও এ-সন্বন্ধে কোনো হদিশ দেয়া নেই। এখানকার 
কার কাছে জিগেস ক'রে পথঘাট সম্বন্ধে জেনে নিতে পারলেই ভালো হ'তো। 
সেইজন্যেই পথে যখন একটা সরাইখানা পড়লো, সেখানে গিয়ে জিগেস ক'রে সব 
ঘাতঘোৎ জেনে নেয়া ভালো বলেই ঠিক হ'লো। 

সরাইওলা বোধহয় সত্যিকার একজন রেডনেক, খুবই রুক্ষ আর রূঢ় তার চেহারা, 
কথাবার্তাও কাটা-কাটা, কেমন যেন রাশি-রাগি। আয়ারটনের প্রশ্নের উত্তরে সে অবশিা 
একটা অপেক্ষাকৃত সহজ পথের কথা বাৎলে দিলে, সেখান দিয়ে গেলে পাহাড়ের 
ল্যাজের দিকটা ডিঙোনো যাবে- কিন্তু এই হদিশট্রক দেবার কোনো ইচ্ছে বোধহয় তার 
ছিলো না-ভাবটা এমন, যেন সে তার সিন্দুক থেকে মহামূল্যবান কোনো সম্পত্তি বার 
ক'রে দিচ্ছে। 

সরাই থেকে বেরিয়ে আসার সময়েই ইশ্তেহারটা চোখে পড়লো লর্ড এডওয়ার্ডের। 
বেন জয়েসকে ধরিয়ে দেবার কোনো খবর দিতে পারলে একশো পাউণ্ু পুরস্কার দেবে 
পুলিশ। 

মেজর ম্যাক্ন্যাব্স হুলিয়াটা দেখে মন্তব্য করলেন : “এই বেন জয়েসের 
কুকীর্তিগুলো সম্বন্ধে যত খবর পাচ্ছি, ততই মনে হচ্ছে একে হয়তো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড 
না-দিয়ে ফাসিতে লটকানোই উচিত ছিলো।”" 

“লোকে যতটা বলে যদি সত্যিই সে এতটাই কুখ্যাত হয়, তাহ'লে মাত্র একশো 
পাউণ্ড দাম হবে কেন তার মাথার ?' আয়ারটন একটা টিপ্লনী কাটলে “আমার মনে 


৬২০ 


হয়, এ-সব রটনার মধ্যে অনেকটাই বাড়াবাড়ি আছে-_' 

“যতই অতিরঞ্জন থাক না কেন, লর্ড এডওয়ার্ডের মন্তব্য, 'বেন জয়েস যে খুব- 
একটা সুবিধের লোক নয়, এটা ঠিক। না-হ'লে পুলিশ এমন হন্যে হ'য়ে তাকে খুঁজতো 
না। কিংবা যে-সব জায়গায় খুব-বেশি লোকজন নেই, সেইসব দূর-দূর জায়গায় এসে 
এমনভাবে হুলিয়া টাঙিয়ে দিতো না।' 

“অর্থাৎ, মেজর ম্যাক্ন্যাব্স বললেন, “সে-যে কখন কোথায় থাকে, পুলিশ সে- 
সম্বন্ধে কোনো খবরই রাখে না। তারা শুধু আন্দাজে ভর ক'রে অন্ধকারে টিল 
ছুড়ছে_। 

এত-সব কথাবার্তার মধ্যে পাঞ্য়ল যে কোনো মন্তব্য করবেন না, তা তো আর 
হয় না। তিনি ব'লে উঠলেন, “এইভাবেই কিংবদন্তির জন্ম হয়। যার সম্বন্ধে প্রায় কিছুই 
জানা নেই, তার সম্বন্ধেই সব উলটোপালটা উদ্ভুট আজগুবি খবর বেরিয়ে যায়--আর 
লোকে ভাবে সে বুঝি সাধারণ মানুষের চাইতে একেবারেই অন্যরকম ।' 

বেন জয়েসকে জড়িয়ে কত-কী গল্প রটেছে, সে-সম্বন্ধে আলোচনাটা অবশ্য 
আপাতত মুলতুবি রইলো। এখন এই মাউন্ট কশ্চিউক্কোর ল্যাজটা ডিঙিয়ে অস্ট্রেলিয়ার 
আল্পস-এর পাল্লা থেকে বেরিয়ে-যাওয়াই জরুরি আর অব্যবহিত কাজ। 

এবং কাজটা যে সহজ নয়, ক্রমাগতই তার প্রমাণ পাওয়া যেতে লাগলো। 

স্কটল্যাণ্ড যতই পাহাড়ি জায়গা হোক. হাইল্যাণ্ডের উচ্চভূমি যতই উবড়োখাবড়ো 
বা রুক্ষবন্ধুর হোক, এবং স্কটল্যাগুর পাহাড় সম্বন্ধে তাদের যতই অভিজ্ঞতা থাক, এই 
পাহাড় টপকাতে তা মোটেই কাজে লাগবে না, এই মাউন্ট কশ্চিউস্কোর যে-দিকটা 
অপেক্ষাকৃত নিচু, সেদিক দিয়েও পাহাড় টপকানো নেহাৎ সহজ কর্ম ছিলো না-বিশেষত 
এত-সব ঘোড়। আর বলদ নিয়ে! মেজর ম্যাক্ন্যাবস প্রায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পুরো 
ব্যাপারটার তন্তাবধান করছিলেন। বিশেষত যখন একবার বলদে-টানা গাড়িটার একটা 
চাকা হঠাৎ-একবার দুম ক'রে খুলে এলো, আর তারপর রহস্যময়ভাবে মুখ থুবড়ে 
পড়লো কয়েকটি বলদ আর একটা ঘোড়া । কেন-যে ওভাবে দুম ক'রে তারা পপাত 
ধরণীতলে এবং মমার চ, সেটা প্রায়-যেন একটা দুর্বোধ্য হেয়ালিই র'য়ে গেলো। ক্লান্ত, 
অবসন্ন, রুক্ষ পাহাড়ি পথের বন্ধুর পাথরে হোচট খেয়েছে-এত-সব কথা ভেবেও বোঝা 
গেলো না তারা মাটিতে পড়বামাত্র মরলো কেন। 

তারপর যখন বিশেষ-সাবধানে ধীরমন্থ্‌র গতিতে পাহাড়ের শীর্ষদেশটা ডিঙিয়ে তারা 
ওপাশটায় পৌছেছেন, তখন চলতে-চলতে হঠাৎ জাক পাঞয়লের ঘোড়াটাও কেমন 
বিচ্ছিরিভাবে পাগুলো দুমড়ে-মুচকে প্রায় হুমড়ি খেয়েই পড়লো এবং আর উঠলো না, 
তখন প্রায় চোখ ছানাবড়া হবার অবস্থা সকলের। কী কারণ থাকতে পারে এই বলদগুলো 
আর ঘোড়াগুলোর এমনভাবে চিৎপাত হ'য়ে ঠ্যাং ছড়িয়ে পড়ে যাওয়ার? পাঞয়লকে 
নিয়েই যখন তার ঘোড়াটা হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলো, তখন তার মুখচোখের ভাব যদি 


১৯২৯ 


ছবি এঁকে ফুটিয়ে তোলা যেতো! তার মুখ দিয়ে বাক্য প্রায় সরছিলোই না, শুধু 
কোনোমতে অস্ফুট স্বরে বলতে পেরেছিলেন : “অদ্ভুত ! 

অদ্তুত তো বটেই! এখন যে বাকি রইলো মাত্র পাঁচটা ঘোড়া আর চারটে বলদ; 
এগুলোর যদি কিছু হয়, তাহ'লে বহর একেবারে অকেজো হয়ে যাবে, জনমানবহীন 
রুক্ষ পার্তত্যঅঞ্চলে বিষম বিপদের মধ্যে পড়বে। লর্ড এডওয়ার্ড এতটাই বোমকে 
গিয়েছিলেন, মাথামুণ্ড কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। শুধু মেজর ম্যাকন্যাবস জাক 
পাঞয়লের অস্ফুট আর্তনাদ, অদ্ভুত ! -এর উত্তরে চাপাগলায় দাত চেপে বলেছিলেন : 
“খুবই অদ্ভুত! 

কিন্তু বিপদ আর প্রহেলিকা বোধহয় একা আসে না। সেই রাতেই মারা গেলো আরো- 
একটা ঘোড়া, আর বলদ। আর কেন-যে এরা হঠাৎ এভাবে পর-পর মারা যাচ্ছে, সেই 
হিংটিংছট প্রশ্নটার কোনোই সমাধান হ'লো না। মেজর ম্যাকন্যাবস যতই আপংকালীন 
সতর্কতা নিয়ে চোখকানখুলে পুরো ব্যাপারটা আচ করবার চেষ্টা করুন না কেন, কেবল 
তার মুখটা গন্তীর হ'য়ে-যাওয়া ছাড়া আর-কিছুই হলো না_ এবং তার ললাটদেশে কেবল 
কতগুলো বাড়তি কুঞ্চনরেখা পড়লো। 

আর আয়ারটন কেমন যেন হতভম্ব হয়ে আছে। সে ঘোড়া আর বলদগুলোর 
বিশেষ তোয়াজ করছে, পরিচর্যা করছে, কিন্তু কিছুতেই তার মাথায় ঢুকছে না হঠাৎ 
এতটা পথ পেরিয়ে এসে এই পাহাড়েই এমন তাজ্জব কাণুটা হচ্ছে কেন! 

আপদের সেখানেই শেষ নয়। সাবধানে বাকি পথটা চলতে-চলতেও যখন পরের 
দিন জানুয়ারির তেরো তারিখে স্নোয়িনদীর আধমাইলের মধ্যে এসে গাড়ির চাকা ডেবে 
গেলো কাদায়, তখন সকলের একেবার মাথায় হাত। কোনোরকমে ঠেলেগুলে গাড়িটাকে 
কাদার মধ্য থেকে তোলা হ'লো বটে, কিন্তু ঠিক হ'লো এখানেই আপাতত ছাউনি ফেলে 
রাতটা কাটিয়ে দেয়া হবে। তাতে এই জন্তগুলো অন্তত বিশ্রাম করবার একটা সুযোগ 
পাবে_হয়তো পথের ধকল কাটিয়ে উঠতে পাববে। 

সবাই যখন গুছিয়ে সে এইসব আকম্মিক উৎপাত সম্বন্ধে আলোচনা করছেন, 
তখন আয়ারটন আবার নতুন ক'রে তার প্রস্তাবটা দিলে। 

“সামনেই একটা মোটামুটি সুগম রাস্তা আছে- নাম লক্ষৌ রোড--' 

তাকে কথাটা শেষ করতে না-দিয়েই জাক পাঞয়ল বললেন, “কী মুশকিল ! 
লোকেরা কি আর নতুন নাম পায় না কোথাও! পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় যদি একই 
নাম দিতে থাকে, তাহ'লে আমরা যারা ভুগোল নিয়ে চর্চা করি-আমরা কোথায় যাই? 
এই পর্বতশ্রেণীর নাম গ্রেট ডিভাইড রেনজ-- মার্কিন মুলুকেও এমনি-একটি গ্রেট ডিভাইড 
আছে । কোথায় জানতুম ভারতবর্ষে লক্ষৌ নামে একটা জায়গা আছে, সিপাহিবিদ্রোহের 
সময় সেখানে একটা প্রচণ্ড লড়াই হয়েছিলো । এখন, এইখানে কি না একটা লক্ষৌ রোড 
এসে হাজির। এই রাস্তা ধ'রেই কি আমরা সাতসাগর ডিছিয়ে সোজা ভারতবর্ষে গিয়ে 


৯ 


লক্ষ্ৌ পৌছুবো নাকি ?, 

ভৌগোলিকের এই বিমর্ষ সমস্যায় সবাই কোথায় সহানুভূতি দেখাবেন--না, সবাই 
হো-হো ক'রে হেসে উঠলেন। আবহাওয়া গত ক-দিন ধ'রেই কেমন ভারি হ'য়ে ছিলো, 
তার কথা শোনবার পর হঠাৎ যেন সব মেঘ কেটে গেলো, পরিবেশটা বেশ হালকা 
হ'য়ে গেলো। : 

হাসিটা একটু থামতেই আয়ারটন ফের নাছোড়ের মতো কথাটা পাড়লে । “আমাদের 
তো একের পর এক বিপদ লেগেই আছে । কবে যে সবাই মিলে আমরা পুরে রাস্তাটা 
পেকতে পারবো কে জানে । তার চাইতে, কাছেই যখন লক্ষৌ রোড আছে, তখন আমায় 
ববং মেলবোর্নেই পাঠিয়ে দিন-_ ডানকানের খোৌঁজে। যাতে ডানকান সোজা পুব উপকূলে 
চ'লে যায়, সেই-মর্মে বরং একটা চিঠি লিখে দিন, যাতে আমাদের কাজ খানিকটা এগিয়ে 
থাকে 

আর-কেউ কিছু বলবার আগেই মেজর ম্যাকন্যাবস বাধা দিলেন! ব্রিটানিয়া যে ঠিক 
কোথায় ডুবেছে, তা জানা আছে একমাত্র আয়ারটনেরই। তাকে কী ক'রে এখন সবাইকে 
ছেড়েছুড়ে একা চ'লে যেতে দেয়া যায়? 

সঙ্গে-সঙ্গেই মেজর ম্যাকন্যাবসের কথায় সায় দিলেন কাণ্ডেন ম্যাঙ্গলস। তাবগও 
মত : ডানকান ফার্টমেট টম অস্টিনের তত্তাবধানে যা করছে করুক- কিন্তু কাণ্তেন 
গ্রান্টের কোনো হদিশ না-পাওয়া অব্দি আয়ারটনের মূল বহর ছেড়ে যাওয়া চলবে না। 

আয়ারটন যখন বললে যে "আমি শুধু আমাদের কাজটা খানিকটা এগিয়ে রাখতে 
চেয়েছিলাম, তখন তার মুখে যে হাড়িপানা ভাব ফুটে উঠেছিলো, সেটা আর-কেউ 
খেয়াল করুক বা না-করুক, মেজর ম্যাকন্যাবস বেশ লক্ষ করেছিলেন। এ-কথায় তার 
অতটা নিরাশ হ'য়ে পড়ার কী আছে ? আয়ারটনের হাবভাবের মধ্যে কী-একটা যেন 
আছে, যেটা মেজর ম্যাকন্যাবসের আদপেই ভালো লাগছে না। অথচ স্পষ্ট ক'রে তিনি 
মিজেই জানেন না--সেটা কী? তাই এ নিয়ে তিনি আর-কোনো উচ্চবাচ্য করলেন না। 
মনে-মনে ঠিক ক'রে নিলেন, আয়ারটনের ওপর এখন থেকে কড়ানজর রেখে চলতে 
হবে। 

সম্ভবত মনের মধো কোথাও-একটা অস্বস্তি খচখচ করছিলো বলেই সে-রাতে 
একট! নাগাদ ঘুম ভেঙে গেলো মেজর ম্যাকন্যাব্সের। গোড়ায় তিনি বুঝতেই পারেননি 
হঠাৎ এত-তাড়াতাড়ি তার ঘুম ভেঙে গেলো কেন। আর তারপরেই চোখ কচলে ধড়মড় 
ক'রে তিনি উঠে বসলেন। 

তারা যেখানে ছাউনি ফেলেছিলেন, সেখানে প্রায় আধমাইল জায়গা ফসফর- 
ফার্নের হালকা-নীল আলোয় আলো হ'য়ে আছে- কিন্তু সেটাই তার ধড়মড় ক'রে উঠে- 
বসার কারণ নয়। একটু-দূরে কয়েকটা কালো-কালো ছায়া, অথবা আরো-ভালো ক'রে 


রী ১২৩ 


বলা যায় ছায়ার মতো মানুষ, ঝুঁকে প'ড়ে ছায়মূর্তিগুলো যে মাটির ওপর কী-সব চিহ 
খুঁটিয়ে দেখছে। 

তড়াক ক"রে লাফিয়ে উঠে প্রায় ছুটেই যেতে চেয়েছিলেন মেজর, কিন্তু শেষটায় 
লম্বা-লম্বা ঘাসের মধ্যে দিয়ে প্রায় গুড়ি মেরে এগুলেন তিনি। কী ব্যাপার ? এরা কারা? 

মেজর ম্যাকন্যাব্স ছাউনি ছেড়ে ওভাবে ঘাসবনের মধ্যে মিলিয়ে যাবার খানিকক্ষণ 
বাদেই বৃষ্টি নামলো। বড়ো-বড়ো ফোটা, যেন পিপে-পিপে জল ঢেলে দিচ্ছে কেউ আকাশ 
থেকে। ঝলকবান হবে নাকি? পাঞযল আধোঘুমের মধ্যে খানিকটা ভিজে গিয়েই 
বললেন, “এমন মুষলধারে বৃষ্টি পড়লেই এদিকটায় ঝলকবান ডাকে-_ ফ্ল্যাশফ্লাড-_বন্যার 
মতো জল গড়িয়ে যায় পাহাড় থেকে, সামনে যাকে পায় সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়।” আর 
কথা কটা জড়ানো সুরে বলতে-বলতেই সর্বাঙ্গ ভিজে গিয়ে পুরোপুরি ঘুম ভেঙে গেলো 
তার। “নাঃ, এই তুমুল বৃষ্টি এই তাবুর মধ্যে আর থাকতে দেবে না দেখছি !, 

বৃষ্টির বমঝম শব্দেই শুধু নয়, বৃষ্টির ঝাপটায় ভিজে গিয়ে একটু আগেই ঘুম ভেঙে 
গিয়েছিলো লর্ড এডওয়ার্ডের। এবার বুঝলেন পাঞয়ল ঠিকই বলেছেন-এমন বাষ্টিতে 
এই তাবুর মধ্যে আর টেঁকা যাবে না। সবাইকে সাথে নিয়ে তক্ষুনি তিনি গিয়ে আশ্রয় 
নিলেন সেই বলদে-টানা গাড়িটায়, মেরিকে নিয়ে লেডি হেলেনা যেখানে এই প্রচণ্ড 
বৃষ্টিতেও খানিকটা সুরক্ষিত আছেন। 

ভালো ক'রে কারুই ঘৃম হয়নি, তার ওপর বৃষ্টিতে ভিজে-ভিজেই গাড়িতে এসে 
আশ্রয় নিতে হয়েছে, আর পাঞয়লের ঝলকবানের কথা শুনে সবাই একটু আতকেও 
উঠেছিলো--উত্তেজনায় সকলেই যেন একসাথে কথা কইছিলেন। সকলেই-_কিন্ত্র মেজর 
ম্যাক্ন্যাব্‌স নন। এ-সব তালেগোলে কেউ খেয়ালও করেননি মাঝখানে কিছুক্ষণ তিনি 
কোথায় যেন উধাও হ"য়ে গিয়েছিলেন। 

ঝলকঢলের আশঙ্কাটা মোটেই উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছিলো না। আর-কিছু না-হোক, 
এ-ভয়টা তো আছেই এই তুমুল বর্ষায় স্্োয়ি নদীর জল ফুলে-ফেপে উঠতে পারে। 
তাই বৃষ্টির মধ্যে কেউ-না-কেউ মাঝে-মাঝে বেরিয়ে গিয়ে খোঁজ ক'রে এলেন জল 
বাড়ছে কি না। 

বৃষ্টির কাণ্ডটা অদ্তুতই বলতে হবে। যেই ভোর হ'লো, অমনি বৃষ্টিও থেমে গেলো। 
আকাশ দেখে কে বলবে যে একটু আগেই সে তুলকালাম ঢল নামিয়ে দিয়েছিলো। বৃষ্টি 
থেমে গিয়েছে বটে, কিন্তু আকাশের মুখ হাঁড়িপানা, ঘন কালো মেঘ ঢেকে দিয়েছে 
সূর্যকে। কিন্তু কাদায়-আটকে-যাওয়া গাড়িটাকে এখনই টেনে-তোলা দরকার, না-হ'লে 
আরো-ফ্যাসাদে পড়তে হবে। শুধু বলদগুলোকে তাড়া লাগিয়ে কোনো লাঙ হবে না, 
এই বৃষ্টির পর নরম কাদামাটিতে গাড়িট। যেভাবে এঁটে বসেছে তাতে একে টেনে-তোলা 
শুধু এই কটা বলদের কাজ নয়, বলদ ঘোড়া মানুষ সকলের সম্মিলিত শক্তি দরকার। 


৯২৪ 


কিন্তু বনের মধ্যে যেখানে বলদ আর ঘোড়াগুলো রেখে আসা হয়েছিলো, সেখানে 
গিয়ে দেখা গেলো সব ভো-ভা--জন্তৃগুলোর একটাও সেখানে নেই ! 

কাণ্ড দেখে, সকলেরই চোখ কপালে উঠে গেলো, হতভম্ব ভাবটা তো আছেই, 
কিন্তু বিপদের গুরুত্বটা উপলব্ধি করতে কারু একমুহূর্তও দেরি হয়নি। এমনিতেই তো 
গত ক-দিনে বেশ-কিছু ঘোড়া আর বলদ টেশে গিয়েছে-তাতেই যা অসুবিধে হচ্ছিলো, 
তা আর কহতব্য নয়। এখন এ-জন্তগুলোর একটাকেও জায়গামতো না-দেখে সকলেরই 
মাথায় হাত। কী হবে এখন? 

ঘণ্টাখানেক প্রায় আশপাশের বনজঙ্গল তোলপাড় ক'রে খোঁজা হ'লো জন্তগুলোকে 
_কিন্তু যতই হাকডাক চীৎকার-চ্যাচামেচি করুন না কেন, এই জন্তুগুলোর কোনো সাড়াই 
পাওয়া গেলো না। এরা যেন কোন্‌ ফুশমস্তরে হাওয়ায় উবে গিয়েছে। 

হাল ছেড়ে দিয়ে বিমর্ষভাবে যখন কাদায়-ডেবে-বসা গাড়িটার দিকে ফিরছে সবাই, 
তখন আচমকা ক্ষীণ চিহি-চিহি ডাক শোনা গেলো। হস্তদস্ত হয়ে-ছুটে গেলেন সবাই। 
সেই নিবিড় লম্বা ঘাসের বনে হাতের ঝটকায় পথ ক'রে নিয়ে একটু এগিয়ে যেতেই 
দেখা গেলো-সেই বড়ো-বড়ো ঘাসগুলোর মধ্যে ঠ্যাং তুলে ম'রে পড়ে রয়েছে তিনটি 
ঘোড়া আর দুটি বলদ। চিল-শকুনরা পাক খাচ্ছে মাথার ওপর, কাকেদের ওড়াউড়ি, 
গাছের ডালে-ডালে বসে আছে গৃধিনীরা। আজ তাদেরই ফুর্তি সবচেয়ে-বেশি- 
এতবড়ো-একটা ভোজের ব্যবস্থা হওয়া মান তো তাদের মহোৎসব। 

লর্ড এডওয়ার্ড স্তম্ভিত হ'য়ে গেলেন-আক্ষরিকভাবেই যেন কোনো স্তন্ত হঃয়ে 
গেলেন, স্ট্যাচু! একটু পরে যখন কথা বলবার ক্ষমতা ফিরে এলো, সে-কথা এতই ক্ষীণ 
শোনালো যে মনে হ'লো তার গলা দিয়ে যেন কোনো আওয়াজ বেরুতে চাচ্ছে না। 
আয়ারটন, কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে তিনি বললেন-_যেন কোনো ভূতুড়ে দুঃস্বপ্ন 
কে এখনও তিনি আবেশ কাটিয়ে জেগে উঠতে পারেননি, “বাকি ঘোড়া আর বলদটাকে 
নয়ে যাও। 

প্রায় টলতে-টলতেই যেন গাড়ির কাছে ফিরে এলেন সবাই, মোহামান, এইটুকু 
পথ আসতে বুঝি আধঘন্টাই লেগে গেলো তাদের। 

এতক্ষণ মেজর ম্যাকন্যাব্স ট্র-শব্দটি করেননি। নীরবে সবকিছু দেখে যাচ্ছিলেন। 
এবার লর্ড গ্রেনারভনের দশা দেখে আর চুপ ক'রে থাকতে পারলেন না তিনি। 'এর 
মাগের বার নদী পেরুবার সময় সব কটা ঘোড়ার পায়ে নাল লাগানো হ'লে এমন অবস্থা 
কছুতেই হ'তো না। 

“এ-কথা কেন বলছেন?” একটু হতভম্ব হ'য়েই জিগেস করলে আয়ারটন। 

“যে-ঘোড়াটার পায়ে নাল লাগানো হয়েছিলো, শুধু সেইটেই বেচে গেছে 
বলে) 


১২৫ 


“আরে ! তা-ই তো! কাণ্তেন ম্যাঙ্গলস সবিম্ময়ে বলে উঠলেন। “এ-যে দেখছি 
তাজ্জব ব্যাপার ! 

মেজর ম্যাকন্যাবসের দিকে তাকিয়ে আয়ারটন বললে, “হ্যা, ব্যাপারটা আপনি ঠিকই 
ধরেছেন।' 

মেজর ততক্ষণে ফের তার মুখে যেন কুলুপ এটে দিয়েছেন-আর একটা কথাও 
বললেন না। গ্রেনারভনের ভারি-/কীতুহল হচ্ছিলো-এখনও তিনি ঠিক ধ'রে উঠতে 
পারেননি ঘোড়ার পায়ে নাল লাগাবার সঙ্গে এই অপঘাত মৃত্যুগুলোর কী সম্পর্ক। মেজর 
কিন্তু তখন অপলকে তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখছেন অন্যান্য নাবিকদের নিয়ে আয়ারটম 
কীভাবে কাদার মধ্য থেকে গাড়িটাকে টেনে তোলবার ব্যবস্থা করছে । মেজরের মুখ থেকে 
হেয়ালিটার কোনো ব্যাখ্যা না-পেয়ে শেষটায় কাণ্তেনকেই জিগেস করলেন গ্নেনারভন, 
“আচ্ছা, ম্যাঙ্গল্স, ম্যাকন্যাব্স তখন কী বলতে চাচ্ছিলো?" 

“বুঝতে পারছি না।' কাণ্তেন ম্যাঙ্গলসের গলায় চিস্তার ছাপ। “তবে মেজর 
ম্যাকন্যাব্স সাধারণত উটকো-কোনো মন্তব্য করেন না-কারণ থাকলেই কিছু বলেন? 

এবার খুব নিচুগলায় লেডি হেলেনা জানালেন : “আমার মনে হয় মেজর কোনো 
কারণে আয়ারটনকে বিশ্বাস ক'রে উঠতে পারছেন না-এ-সবকিছুর জন্যে তাকেই 
সন্দেহ করছেন--' 

“কিন্ত কেন? পাঞয়লও এবার একটু চমকে গেছেন। 'আয়ারটন আবার কী 
করেছে? 

'ম্যাকন্যাবস যদি ভেবে থাকে, আয়ারটনই এই জন্তরগুলোর মৃত্যুর জন্যে দায়ী, 
তাহ'লে সে একটা মস্ত ভুল কবেছে। একটু ভেবে নিয়ে বললেন গ্রেনারভন। “কিন্তু 
কাউকে সন্দেহ করার আগে তাব উদ্দেশাটা নিয়ে ভাবতে হবে তো? খামকা আয়ারটন 
এমন কাজ করতে যাবে কেন? এতে তার কী লাভ হবে?, 

“এটা ঠিক যে জন্তগুলো মারার পেছনে আয়ারটনের কী মংলব আছে আমর সেটা 
জানি না, কাণ্তেন ম্যাঙ্গলস বললেন, “কিন্তু মেজর এ-সম্বন্ধে সত্যি-সত্যি কী বলতে 
চান, সেইটেই আগে জানা দরকার ।' 

পাঞয়ল এতক্ষণে একটু ঘাবড়ে যাবার ভঙ্গিতেই বলেছেন : “এ পালিয়ে-যাওয়া 
কয়েদিগুলোর সঙ্গে মিলে কোনো ঘোট পাকায়নি তো?, 

কাণ্ডেন ম্যাঙ্গল্সকে নিয়ে এবার লর্ড গ্লেনারভন পাঁকে-পড়া গাড়িটার দিকে এগিয়ে 
গেলেন। গাড়িটাকে টেনে তুলতে গিয়ে এতজন দশাসই জোয়ান বলদ আর ঘোড়াকে 
কাজে লাশিয়েও কিছু করতে পারেনি। গাড়িট।র চাকাগুলো যেন সেখানে খুঁটি গেঙে 
রয়েছে। আর-বেশি জোরাজুরি করতে গেলে এবার না গাড়িটাই ভেঙে যায়! তার 
অবস্থাও তো ভালো নয়। এরই মধ্যে একবার তাকে মেরামত ক'রে নিতে হয়েছে। 


১২৬ 


হাল ছেড়ে দিয়ে, লর্ড গ্লেনারভন মেজাজ খারাপ ক'রে সবাইকে ডেকে ফের ফিরে 
এলেন তাবুতে। একটা জরুরি পরামর্শসভা বসানো ছাড়া এখন আর-কোনো উপায় নেই। 
তারা এখন যেখানে আছেন সেখান থেকে মেলবোর্ন প্রায় শো-দুয়েক মাইল দূরে, আর 
টুফোল্ড উপসাগর সে-তুলনায় অনেকটাই কাছে-সত্তর-পঁচান্তর মাইল দূরে হবে। এখন 
যখন মোটঘাট নিয়ে পায়দলেই যেতে হবে, তখন কোনদিকে যে যাওয়া উচিত, সে- 
সন্বন্ধে দ্বিতীয় কোনো মতই ছিলো না। পায়ে হেটে যেতে হবে যখন, তখন টুফোল্ড 
উপসাগরের দিকেই যাওয়া উচিত। 

লেডি হেলেনা বললেন : “আমি আর মেরি রোজ কম ক'রেও মাইল-পীচেক হাটতে 
পারবো। আমাদের কোনো অসুবিধে হবে না।' 

পাঞয়ল বললেন, “একটা-কোনো বড়ো জনপদে গিয়ে একবার পৌছুতে পারলেই 
মেলবোর্নে আমরা খবর পাঠাতে পারবো। চাই-কি, নতুন-কোনো গাড়ি-ঘোড়াও জোগাড় 
ক'রে নেয়া যাবে। সেদিক থেকে ইডেনে যাওয়াই ভালো। তাহ'লে টুফোম্ড উপসাগর 
অব্দি আর যেতে হয় না।, 
খবব পাঠিয়ে সোজা টুফোম্ড উপসাগরে গিয়েই জাহাজে উঠলে ভালো হয় না 
কি? 

কাপ্ডেন ম্যাঙ্গলসের দিকে তাকিয়ে লর্ড এডওয়ার্ড বললেন, 'জন, তুমি কী 
বলো?, 

“টুফোল্ড উপসাগর বেশ-দূরে। অদ্দুর যাবার আর দরকার কী? তার চাইতে 
ইডেনেই না-হয় যাওয়া যাক-_কিছুটা তাড়াহুড়ো করলে চার-পাঁচদিনেই পৌছে যাবো ।, 

“যতই তাড়া করুন না কেন, পনেরো-বিশদিনের আগে ওখানে পৌছুনো যাবে না» 
আয়ারটন জানালে। 

'্রটুকু রাস্তা যেতে আ্দিন লাগবে?” লর্ড এডওয়ার্ডের গলার বিস্ময় চাপা থাকেনি। 

“তার চাইতেও বেশিদিন লাগতে পারে» আয়ারটন সকলের সব আশায় ঠাগ্ডাজল 
ঢেলে দিতে চাচ্ছে, “ভিক্টরিয়ার সবচেয়ে দুর্গম জায়গা দিয়ে যেতে হবে-_ এখানটায় 
লোকজন সাধারণত আসে না-ফলে কোনো রাস্তা তৈরি হয়নি। মনে রাখবেন, আমাদের 
জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পথ ক'রে যেতে হবে। চার-পাঁচদিনে যাওয়া মোটেই সম্ভব হবে 
না।' 

'বেশ-তো, ম্যাঙ্গলস যেন খুব-একটা পাত্তাই দিলেন না, “বেশ, তাহ'লে না-হয় 
পনেরো-বিশদিন পরেই ডানকানেটম অস্টিনকে খবর পাঠানো যাবে। আমরা যদি আদ্দিন 
দেরি করতে পারি, তবে এ-কদিনে তেমন-একটা তফাৎ আর কী হবে?, 

“কিন্তু আমি তো সবচেয়ে-বড়ো মুশকিলটার কথা এখনও বলিনি, আয়ারটন আবার 


১২৭ 


একখানা বিপত্তির কথা তুলেছে, “যতদিন-না সব জল নেমে যাচ্ছে, আমাদের তো তদ্দিন 
এখানে নদীর ধারেই বসে থাকবে হবে। 

“ব'সে থাকতে হবে কেন ?' ম্যাঙ্গল্স একটু অবাকই হলেন।“নদী কি কাছে কোথাও 
একটা সরু হ'য়ে যায়নি যে হেটে পেরুনো যায় ? 

“মনে হয় না। সকালে আমি তারও খোঁজ করছিলাম--কিন্তু রাতের বৃষ্টির ঢল নেমে 
জল ফুলে-ফেপে উঠেছে- এতটাই বান ডেকেছে যে জলে কেউ নামলেই কোথায় যে 
ভেসে যাবে, কেউ জানে না। 

লেডি হেলেনা সরাসরি জিগেস করলেন, “কিন্তু কত চওড়া এ-নদী ?, 

“মাইলখানেক তো হবেই--এই তীর থেকে ওই তীর খুব স্পষ্ট দেখা যায় না। তার 
ওপর এমন সাংঘাতিক শ্রোত যে-_; 

“কিন্তু ভেলা বা ক্যানু তো যাবে, রবার্ট বললে, “এখানে তো আর গাছপালার অভাব 
নেই। 

এতক্ষণে একটা কাজের কথা হ'লো। শুনেই কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্‌স উৎসাহে লাফিয়ে 
উঠেছেন। “রবার্ট ঠিকই বলেছে। হাত-পা গুটিয়ে বসে না-থেকে অন্তত কিছু-একটা 
তো করা যাবে। 
কী বলো, আয়ারটন? সেটা করাই তো ঠিক হবে, তা-ই না? 

“কিন্ত যা-ই করুন না কেন, এখানে আমাদের অনেকদিন ব'সে থাকতে হবে- 
অন্তত যদ্দিন-না বাইরে থেকে কোনো সাহায্য আসে-' 

আয়ারটনের কথা শেষ করতে না-দিয়ে একটু উত্যক্ত ভঙ্গিতেই ব'লে উঠেছেন 
কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স, “সবসময় বাইরের সাহায্যের জন্যে বসে থেকে কী হবে? তোমার 
মাথায় যদি অন্যকোনো প্ল্যান থাকে তো সেটাই বলো।' 

“সেটাই এতক্ষণ ধ'রে বলবার চেষ্টা করছি। আমরা যতক্ষণ এখানে অপেক্ষা করবো, 
ডানকান ততক্ষণে টুফোল্ড উপসাগরে এগিয়ে এলে অনেকটা সময় বাচে-আর সবকিছুর 
একটা হিল্লে হয়ে যায়।, 

“সেই থেকে দেখছি তুমি বারে-বারেডানকানের কথাই তুলছো। কিন্তু তাতে 
ফায়দাটা কী হবে? সাহায্টা আসবে কোথেকে ? তাছাড়া ডানকানকেই বা আমরা খবর 
পাঠাবো কী ক'রে? 

এমন সোজাসুজি কথাটা বলা হ'লো যে আয়ারটন একটু থতমত খেয়ে গেলো। 
কতটা বাড়াবাড়ি ক'রে ফেলেছে, সেটা সে এতক্ষণে বুঝতে পারলে । একটু দোনোমনা 
ক'রে কথাটা ঘুরিয়ে দিয়ে বললে, 'কী করলে একটু তাড়াতাড়ি ঝামেলাটা মেটে, এতক্ষণ 
আমি শুধু সে-কথাটাই বলতে চাচ্ছিলাম। আমি গায়ে পঞ্ড়ে কোনো পরামর্শ দিতে 


১২ট 


চাইনি, সেই স্পর্ধাও আমার নেই। আপনারা আলোচনা ক'রে যা ঠিক করবেন, তা-ই 
হবে।? 

এবার একটু অসহিষ্ণু হ'য়েই গ্রেনারভন বললেন, “কিন্তু সেটা কোনো উত্তর হ'লো 
না। আমরা তো আলোচনাই করছিলুম। তোমার কী মত, সেটাই বলো। কী করলে আমরা 
আপাতত এই সমস্যাটা থেকে উদ্ধার পাই, সেটাই তো ভাবতে হবে-' 

“আমরা এখানেই ব'সে থেকে বিশ্রাম করি। ততক্ষণেডানকান টুফোন্ডে এসে 
আমাদের সাহায্য পাঠাবার ব্যবস্থা করুক। এখান থেকে কেউ-একজন গিয়ে টম অস্টিনকে 
খবর দিক। ততক্ষণে আর বৃষ্টি না-হ'লে নদীর জল্‌ও ক'মে যাবে। তখন না-হয় 
দেখা যাবে কোনখানে নদী পেরুনো যায়। দরকার হলে তখনই কানু বানিয়ে নেয়া 
যাবে।, 

“এটা অবশ্য মন্দ বলোনি। দেরি তো এমনিতেই হচ্ছে-তবে মাঝখান থেকে 
অনেকগুলো ঝামেলার হাত থেকে বাচা যাবে। আমাদের ঘোড়া আর বলদগুলো না- 
থাকায় সতাই তো এইভাবে এতটা পথ হেটে-হেঁটে যাবার চেষ্টা করা খুব বিপজ্জনক 
সন্দেহ নেই।' 

এতক্ষণ মেজর ঘ্যাকন্যাবস একটাও কথা বলেননি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে-দাড়িয়ে এই 
কথা-কাটাকাটি শুনছিলেন। এবার সকলকে অবাক ক'রে দিয়ে ম্যাকন্যাবস বললেন, 
'হ্া, এই প্রস্তাবটাই সবচেয়ে-ভালো। আয়ারটন যা বলেছে, আমিও এতক্ষণ তা-ই 
ভাবছিলুম। 

এবার যেন হতভম্ব হওয়ার পালা আয়ারটনের। সে একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে মেজরের 
মুখের দিকে তাকালে। এতদিন যখনই সে ডানকানের কথা তুলেছে, তখনই মেজর 
ম্াকন্মাবস কোনো-না-কোনো আপত্তি তুলেছেন। অথচ এখন কেমন যেন তড়িঘড়ি 
বড্ড চট্ট ক'রেই তার কথায় রাজি হ'য়ে যাচ্ছেন ! 

অন্যরও বেশ অবাক হয়েছিলো। কিন্তু প্রস্তাবটায় মেজর ম্যাকন্যাবসের সম্মতি 
আছে দেখে এই প্রস্তাবটাই গ্রহণ করা হ'লো। শুধু কাপ্তেন ম্যাঙ্গল্স তখন একটা বাস্তব 
অসুবিধের কথা তুললেন-_“আমরা যদি নদী পেরুতে না-ই পারি, তবে টম অস্টিনের 
কাছে যে যাবে, সে-ই বা নদী পেরুবে কী ক'রে?" 

আয়ারটন এবার তড়িঘড়ি তার পরামর্শ নিয়ে খাড়া । “খামকা কাউকে নদী পেরুতে 
হবে কেন? আমাদের তো এখনও একটা ঘোড়া আছে। সেই ঘোড়ায় চেপে সে লক্ষৌ 
রোডে ফিরে যাবে__সেখান থেকে সোজা চ'লে যাবে মেলবোর্নে। ঘোড়া ছুটিয়ে যেতে' 
বেশিদিন লাগবে না। চট ক'রেই পৌছে যাবে মেলবোর্ন-_সেখান থেকে টুফোল্ডের মুখে 
আসতে আর ক-দিনই বা লাগবে? 

সঙ্গে-সঙ্গে মেজর ম্যাকন্যাবস কথাটায় সায় দিলেন। “এই কথটা আগেই আমাদের 
ভাবা উচিত ছিলো। এতেই সবচেয়ে-তাড়াতাড়ি ঝামেলাটার একটা সুরাহা হবে। 


ইন সার্চ : ৯ ১৯২৯ 


“কিন্ত্র যাবে কে? আমাদের তো কারুই এখানকার পথঘাট জানা নেই,» লর্ড 
গ্লেনারভন জিগেস করলেন। 

“আমাকে এই রাস্তা দিয়েই বুনোদের হাত থেকে পালিয়ে থেতে হয়েছিলো, 
আয়ারটন বললে, “আমি এখানকার রাস্তাঘাট একটু-আধটু জানি । আপনি যদি হুকুম করেন 
তো আমিই যেতে পারি। একটা চিঠি লিখে টম অস্টিনকে নিদেশ দিন-একসপ্তাহের 
মধ্যে ডানকানকে নিয়ে টুফোল্ডের মুখে এসে হাজির হ'য়ে যাবো । 

“না-না, তুমি কেন যাবে ? আপত্তি তুলেছেন জন ম্যাঙ্গলস। “তুমি চ*লে গেলে, 
ব্রিটানিয়া কোথায় ডুবেছিলো, সে-জায়গাটা চিনিয়ে দেবে কে? অন্তত সে-জায়গাটা 
শনাক্ত ক'রে দেবার জন্যেও তোমার এখানে থাকা উচিত। 

কিন্তু তৎক্ষণাৎ আপত্তিটাকে নস্যাৎ ক'রে দিলেন ম্যাকন্যাবস। “না কাণ্তেন, 
আয়ারটনের প্ল্যানটাই ভালো-সে এখানকার রাস্তাঘাট চেনে, সে চট ক'রে পৌছে যেতে 
পারবে মেলবোর্নে । তাছাড়া আমরা তো এখন এখানে নদীর জলের শোভা দেখবো, ঢেউ 
গুনবো আর হাওয়া খাবো-আমরা তো আর এখান থেকে নড়ছি না এখন, যে র্রিটানিয়া 
কোথায় ডুবেছিলো সে-জায়গাটা খুঁজতে বেরিয়ে যাবো। সেই-অর্থে, আয়ারটনের তো 
এখানে কোনো কাজ নেই। সে-ই বরং বার্তাটা নিয়ে যাক 

“তাহলে এই কথাটাই ঠিক হলো» লর্ড এডওয়ার্ড বলেছেন, “আয়ারটনই যাবে।' 
ব'লে তক্ষুনি তিনি চিঠি লিখতে বসে গিয়েছেন। 

আর. অমনি, পলকের জন্যে উদ্ভাসিত হ'য়ে উঠেছে আয়ারটনের মুখ, চোখের 
তারায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গিয়েছে । আর-কারু চোখে না-পড়লেও জন ম্যাঙ্গল্সের সেটা 
চোখ এড়ায়নি। 

লর্ড এডওয়ার্ড যখন চিঠিটার মুসাবিদা করছেন, কাধের কাছে মুখ এনে মেজর 
ম্যাকন্যাব্স ফিশফিশ ক'রে বলেছেন তাকে, “আয়াবটন বানানটা জানা আছে তো?, 

“বাঃ রে, যা হয়, তা-ই। আ-য়া-র-ট-ন।! 

“না। আমরা বলি আয়ারটন, তবে লেখার সময় বেন জয়েস। 

নিচু গলাতেই বলেছিলেন মেজর ম্যাক্ন্যাব্স কিন্ত স্তব্ধ তাবুর মধ্যে তবু যেন নামটা 
গমগম ক'রে বজ্ের মতো ফেটে পড়েছিলো! 

হতচকিত, কেউ কিছু বুঝে ওঠবার আগেই, আয়ারটনের হাতে ঝিলিক দিয়ে 
উঠেছে ছোট্র-একটা আগ্নেয়ান্ত্, আর রিভলভারটি থেকে পর-পর তিনবার গুলি ছুটেছে। 
গুলি খেয়ে তক্ষুনি আছড়ে পড়েছেন লর্ড এডওয়ার্ড, কলমটা তার হাত থেকে ছিটকে 
প'ড়ে গিয়েছে। 

' কিন্তু এই তিনবার-ছোড়া গুলির আওয়াজ বুধি অন্য কোনোকিছুর সংকেতই ছিলো 
-কেননা ঠিক তার প্রতিধবনি তুলেই বাইরে পর-পর শোনা গেছে আরো আগ্রেয়ান্ত্রের 


১৩০ 


আওয়াজ । 

হুটোপাটিটা শুরু হবার আগেই আয়ারটন উধাও। কাণ্তেন জন ম্যাঙ্গল্স অন্য 
মাল্লাদের নিয়ে ছুটে গিয়েও আয়ারটনের নাখাল ধরতে পারেননি, তিন লাফেই সে যেন 
গিয়ে ততক্ষণে পৌছেছে বনের পাশে-যেখানে তার সাগরেদরা এতক্ষণ ধ'রে 
ইঙ্গিতটারই অপেক্ষা করছিলো। 

এই তাবুর মধ্যে থাকলে সবাই তাহ'লে দুশমনদের সহ্জ-চাদমারি হ'য়ে উঠবে 
_তাবুটা তাগ ক'রেই এই নৃশংস দস্যগুলো তাহ'লে মুহমুহু গুলিবর্ষণ করবে। 

লর্ড এডওয়ার্ডের প্রাথমিক অপ্রস্তত অবস্থাটা কেটে যেতেই তিনি লাফিয়ে 
উঠেছেন-তার আঘাত ততটা গুরুতর নয়, গুলিটা তার কাধ ঘেসে আছে, কেননা 
আয়ারটন তখন গুলি চালিয়েছিলো এলোপাথারি, তাগ ঠিক করবার মতো অবসর পায়নি। 
আর একমুহূর্তও সবুর করেননি লর্ড এডওয়ার্ড, মেরি আর হেলেনাকে নিয়ে আশ্রয় 
নিয়েছেন বলদে-টানা গাড়িটার পেছনে- গাড়ির ওপরের ছাউনিটা মোটা-মোটা চামড়া 
আর কাঠে বানানো । অন্য-সবাই ততক্ষণে বন্দুক তুলে নিয়েছেন হাতে, এই দুশমনদের 
যে-ক'রেই-হোক ঠেকাতে হবে। বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণ করা চলবে না। 

কয়েক ঝাক গুলি ছুটেছিলো, তারপরেই সব হঠাৎ এখন চুপ হ'য়ে গেছে, সব 
ঠাণ্ডা, শত্রুদের আর-কোনো সাড়াশব্দ নেই। কিন্তু বনের পাশে সব ভো-ভা, কোনো 
জনপ্রাণীর চিহ্ৃও নেই। আয়ারটন অথবা বেন জয়েস-যে-ই হোক না কেন, সে এই 
ফাকে তার তাবেদারদের নিয়ে চম্পট দিয়েছে- শুধু বারুদের গন্ধ আর ধোঁয়াই বুঝিয়ে 
দিচ্ছে একটু আগেই এখান থেকে গুলি ছুটেছিলো। 

মেজর ম্যাকন্যাব্স তক্ষুনি কাণ্তেনের সঙ্গে ছুটে গিয়েছেন ধাওয়া ক'রে- লড়াইটা 
সামনাসামনিই হোক, অমন আড়াল থেকে শত্রুর মোকাবিলা করা যাবে না। কিন্তু অপ্রস্তুত 
অবস্থাটা কাটিয়ে উঠে ছুটে আসতে যতটা সময় লেগেছিলো তাতে শত্রুরা পালিয়েছে। 

“পালিয়েছে কি না কে জানে । বলেছেন মেজর । “হয়তো কোথাও ওৎ পেতে আছে 
_সুযোগ পেলেই অতর্কিতে এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে । এতে বরং বিপদ আরো বাড়লো । 
কোথায় কোন কোণ থেকে হামলা আসবে, কে জানে । এ-জায়গাটা তো এদের নিজেদের 
হাতের চেটোর মতোই চেনা। মুখোমুখি বাঘের সঙ্গে লড়াই করার চাইতে ঘাসের আড়াল 
থেকে সরসর ক'রে এশিয়ে-আসা সাপের ছোবল ঠেকানো অনেক কঠিন।' 

“আমাদের সারাক্ষণ ছঁশিয়ার হ'য়ে থাকতে হবে।' মেজরের সঙ্গে গাড়িটার পাশে 
ফিরে আসতে-আসতে বলেছেন কাণ্তেন। “সবসময় কাউকে-না-কাউকে পাহারায় 
থাকতে হবে। 

দুজন মাল্লাকে বনের দিকে কড়ানজর রাখতে ব'লে তারা তারপর গাড়ির আড়ালে 
এসেছেন। ততক্ষণে মেরি আর হেলেনা লর্ড এডওয়ার্ডের জখমটার শুশ্ুষা করতে 


রা 


১৯৩১ 


লেগেছে । আঘাতটা, ভাগ্যিশ, তেমন-গুরুতর নয়, গুলিটা চামড়া ছ'ড়ে বেরিয়ে গেছে। 
রক্তত্রাব হচ্ছে, সেটা এক্ষুনি ব্যানডেজ বেধে বন্ধ করা চাই। 

ব্যানডেজ বাধা হয়ে খেতেই মেরি আর লেডি হেলেনাকে হুশিয়ার ক'রে দিয়েছেন 
লর্ড গ্রেনারভন। “সাবধানে থেকো তোমরা । এই গাড়ির আড়াল থেকে বেরিয়ো না 
একবারও । সবচেয়ে-ভালো হ'তো যদি মাথার পেছনে দুটি ক'রে বাড়তি চোখ থাকতো 
তাহ'লে সামনে-পেছনে দু-দিকেই নজর রাখা যেতো ।* এই রসিকতা ক'রে থমথমে 
অবস্থাটা একটু হালকা ক'রে দিয়ে তারপর তিনি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়েছেন মেজরের 
দিকে। 

একটু আগেই যা ঘটেছে, তার আকম্মিকতায় লেডি হেলেনা একেবারে বোমকে 
গিয়েছিলেন। ভয় পাবেন ব'লে, আগে তাকে কেউ পলাতক কয়েদি, রেলণাড়ির হামলা, 
ইনাম ঘোষণা ক'রে হুলিয়৷ বেরুনো-এর কোনো কথাই কখনও বলেননি। এখন তাকে 
সবকিছু খুলে বলতে হয়েছে, একেবারে গোড়া থেকে-অন্তত যতটুকু তারা জানেন। 

মেজর আগেকার কথাটা বলতে-বলতে পকেট থেকে বার ক'রে অস্ট্রেলিয়ান আও 
নিউজিলাও গেজেটের সেই বিশেষ সংখ্যাটা দেখিয়েছেন, যেখানে দুর্ধর্ষ দস্যু বেন 
জয়েসের পালাবার খবর বেরিয়েছিলো। 

“আয়ারটনকে আমার গোড়া থেকেই সন্দেহ হচ্ছিলো-তার হাবভাব খুব-একটা 
ভালো লাগেনি কখনোই। স্পষ্ট ক'রে কোথাও আল রেখে বলতে পারবো না যে এই 
একটা খুঁটিনাটি থেকে বুঝতে পেরেছি যে তাকে দেখে যা মনে হয়, সে আসলে তা 
নয়। কিন্তু কেন যেন তার কোনো কথাই আমার ঠিক বিশ্বাস হয়নি-একেবাবে গোড়া 
থেকেই। কী জানি, সন্দেহ করা হয়তো আমার বাতিক। কিন্ত্ব সন্দেহটা পাকিয়ে উঠেছিলো 
আরো, যখন পর-পর আপাতদৃষ্টিতে কতগুলো তুচ্ছ ব্যাপার নজরে পড়েছিলো। সেই 
যেবার গাড়ি পারাই করার জন্যে মিনি এনেছিলো আয়ারটন, তখন সন্দেহটা আরো দানা 
বাধে। আমি দেখেছিলুম, গাড়ি সারাতে-সারাতে তারা ইশারা-ইঙ্গিতে চোখে-চোখে কথা 
কইছে। তাছাড়া আরো-একটা খটকা ছিলো প্রথম থেকেই। কোনো লোকালয় কাছে 
এলেই আয়ারটন এড়িয়ে-এড়িয়ে যায় কেন, কেন কোনো গ্রামে বা শহরে ঢুকতে চায় 
না।' 

“হ্যা, জন ম্যাঙ্গল্স বলেছেন, “এটা আমিও খেয়াল করেছিলুম। আয়ারটন 
সবসময়েই বলতো একজন কারু গাড়ির কাছে থেকে লটবহরের ওপর নজর রাখা 
উচিত। আর সেই দায়িত্ব সবসময়েই আগবাড়িয়ে সে নিজের কাধেই তুলে নিতো। 

“চোর পালালে বৃদ্ধি বাড়ে, জ্ঞানগর্ভ বাণী আউডেছেন জাক পাঞ্য়ল, “এখন 
হয়তো তার সমস্ত আচার-আচরণ থেকেই আমরা নতুন-নতুন সব অর্থ নিংড়ে নিতে 
পারবো।, 


এই স্বতঃসিদ্ধ আর্ধবচনকে কোনো পাত্তা না-দিয়েই মেজর ফের নিজের কথার 
জের তুলে নিয়েছেন। তাছাড়া আরো-একটা ব্যাপারে আমার কেমন অস্বস্তি লাগছিলো । 
ডানকানকে যাতে টুফোম্ড উপসাগরে নিয়ে-আসা হয়, সেজন্যে সে কী-রকম ঘ্যানঘ্যান 
করতো, মনে আছে ? প্রায় বেন জেদ ধ'রেই বসেছিলো-যে-ক'রেই-হোক, ডানকানকে 
উপসাগরের মুখে নিয়ে আসতে হবে। তাছাড়া, এটা কেউ খেয়াল করেছে কি না জানি 
না-বলদ আর ঘোড়াগুলোর দেখাশুনো করবার ভার ছিলো ওরই ওপর। অথচ সেগুলো 
সব পর-পর রহ্স্যময়ভাবে অজানা কোনো রোগে মারা গেছে! 

“এত-সব জেনেও আমাদের কাউকে কিছু না-বলা ঠিক হয়েছে ?' লেডি হেলেনা 
জিগেস করেছেন। 

“শুধু সন্দেহের ওপর ভর ক'রে তো কারু দিকে আঙুল তুলে বলা যায় না-তুমি 
লোকটা খলনায়ক, তোমাকে সবকিছুর কৈফিয়ৎ দিতে হবে। আমাকে ব'সে থাকতে 
হয়েছে অকাটা প্রমাণের জন্যে-আর সব সন্দেহ বুকের মধ্যে চেপে রেখেছি ব'লে 
ক্রমশই আমার অস্বস্তি বেড়েছে । তারপর শেষটায় কালরাতে যখন উটের পিঠে শেষখড় 
পড়লো, তখন আর আমার সন্দেহ আর নিছক-সন্দেহ থাকেনি--প্রায় হাতে-নাতেই 
প্রমাণটা পেয়ে গিয়েছিলুম।, 

'কেন?' বেশ-কৌতৃহলী হ'য়েই প্রশ্ন করেছেন লেডি হেলেনা। 

“কাল রাতে ঝষ্টি শুরু হবার আগে, হঠাৎ কেন যেন আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি- 
যে তখন উঠে তাবুর বাইরে গিয়েছিলুম, সেটা কেউ জানে না। ফসফর-ফার্নের নীলচে 
আলোয় দেখি কাদার ওপর আমাদেরই ঘোড়ার পায়ের ছাপ দেখে-দেখে চুপিসাড়ে 
আসছে তিনটে ছায়ামূর্তি-গুড়ি মেরে কাছে গিয়ে দেখি সেই-তিনজন ছায়ামূর্তির মধ্যে 
একজন সেই মিস্ত্রি-সেই-যে লোকটা ভাঙাগাড়ি মেরামত করতে এসেছিলো-ভালো 
ক'রে তাকিয়ে দেখি লোকটার হাতে কালো-কালো গোল দাগ- সম্ভবত হাতকড়ারই দাগ। 
অন্তত আমার তা-ই মনে হয়, এখানে কয়েদিদের হাতে আটো ক'রে হাতকড়া পরানো 
হয়।' 

রুদ্ধশ্বাসে লোডি হেলেনা বলেছেন : তারপর? 

“শুনি যে, সেই লোকটাই বলছে-“একটা বাদে সবগুলো ঘোড়াই টেঁশে 
গিয়েছে ।” উত্তরে অন্য-কে-একজন বলেছে-“মরবে না মানে ? এত বিষ হাতিয়ে নিয়ে 
এসেছিলাম যে একটা গোটা ক্যাভালরির খোড়াগুলোকেই খতম ক'রে দেয়া যেতো ।” 
উতীয় লোকটা তখন বলেছে-“বেন জয়েসের এই প্র্যানটা সফল হ'লে বলতে হবে 
যে ওর মতো বাহাদুর কোয়ার্টারমাস্টার আর-কোথাও জম্মায়নি-খোদ ওয়ালটার 
র্লেকেও বুদ্ধির খেলায় ও হারিয়ে দিতে পারতো।” এ-সব কথা শোনবার পর আমার 
আর কিছু জানতে বাকি থাকেনি। সব কী-রকম জলের মতো সরল হ'য়ে এসেছিলো। 


১৩৩ 


আয়ারটন কী ব'লে নিজের পরিচয় দিয়েছিলো, মনে আছে ? সে বলেছিলো, সে 
ব্িটানিয়ার কোয়ার্টারমাস্টার ছিলো। এরপর আর দুয়ে আর দুয়ে যোগ করতে কত বিদ্ো 
লাগে? বেন জয়েস তাহ'লে তারই নাম ? দস্যুরা তারপর বনের মধ্যে মিলিয়ে যেতেই 
সে ফের ফিরে এসেছিলো তাবুতে ৷ 

সবকিছু শুনে খানিকক্ষণ স্তব্ধ হ'য়ে বসে থেকেছেন সবাই, বাক্যহারা। 

তারপর প্রায় বারুদে আগুন লাগার মতো ক'রে ফেটে পড়েছেন লর্ড এডওয়ার্ড। 
“নচ্ছার, পাজি, বেইমান! আমাদের চোখে ধুলো দিয়ে ভুলিয়েভালিয়ে এই জনমনুষ্যহীন 
অঞ্চলটায় নিয়ে এসেছিলো সব্বাইকে খুন ক'রে সবকিছু লুঠ ক'রে নিয়ে যেতে-' 

“নিশ্চয়ই তা-ই ওর মংলব ছিলো। 

“তার মানে আগের বার সেই নদী পেরুবার সময় থেকেই-যখন ও গিয়ে মিস্ত্রি 
ডেকে এনেছিলো--ওর স্যাঙাৎগুলো আমাদের পাছছু নিয়েছিলো।, 

“নিশ্চয়ই, মেজর বলেছেন, “এখন আর এতে কোনো সন্দেহই তো নেই।, 

“বিলজিবাবের বাচ্চা ! তাহ'লে ও কোনোকালেই ব্রিটানিয়ায় কোনো কাজ করেনি। 
শুধু আমাদের ভাটকি দিয়েছে আ্যাদ্দিন !, 

“না, এ-ব্যাপারটায় বোধহয় ধাপ্সা দেয়নি। আমার মনে হয়, ব্রিটানিয়ায় ও নিশ্চয়ই 
কখনো-না-কখনো কাজ করেছিলো। না-হ'লে কাণ্তেন গ্রান্টের কথা ও জানলো ক! ক'রে। 
আমার তো মনে হয়, আয়ারটনই ওর আসল নাম-বেন জয়েস ওর ছদ্মনাম _ হয়তো 
আরো-অনেক নাম আছে লোকটার-_, ্‌ 

“তাহলে ব্রিটানিয়ার কোয়ার্টারমাস্টার সেজে সে অস্ট্রেলিয়ায় আসে কী ক'রে? 

“সেই ধাঁধাটার উত্তর গোয়েন্দারাও খুঁজে পায়নি। হয়তো পরে কোনোদিন সব ফাস 
হ'য়ে যাবে। জানা যাবে, ল কীভাবে এখারন্নে এসেছিলো ।, 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গলস বললেন, গোয়েন্দারা আর কতটুকুই-বা জানে? তারা কি এটা 
জানে যে আয়ারটন আর বেন জয়েস আসলে একই লোক? 

“তার মানে-ও যে খামারে কাজ নিয়েছিলো, সেটা কোনো বদ মংলব 
নিয়েই? জিগেস করেছেন লেডি হেলেনা। 

“সেখানেও নিশ্চয়ই কিছু-একটা বিষম গোল বীধাবার তালে ছিলো-হঠাৎ আমরা 
গিয়ে পড়ায় তার চেয়েও বড়ো-একটা প্রলোভন পেষে গেছে ! 

“মিস গ্রান্ট» কেমন উৎকপ্ঠিত স্বরেই জিগেস করেছেন কাণ্তেন ম্যাঙ্গলস, “মিস 
গ্রান্ট, আপনাকে অমন অসুস্থ দেখাচ্ছে কেন? কী হয়েছে? 

কাণ্তেনের কথায় অমনি সকলের চোখ গিয়ে পড়েছে মেরির ওপর। তার মুখ 
শুকিয়ে আমশি হ'য়ে গিয়েছে । এক্ষুনি বেন চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসবে-মনে 
হয়েছে সকলের । 


১৩৪ 


মেরি ধরাগলায় শুধু বললে, “তাহ'লে বাবা- 

মেরির এই কথাটায় আবার সবাই যেন একঝটকায় বাস্তবের মধো ফিরে এলো। 
আয়ারটন যদি বেন জয়েস হয়, তাহ'লে কাণ্তেন গ্রান্টকে খুঁজে পাবার যে-আশাটা ছিলো, 
সেটা এখন গেলো। ব্রিটানিয়া মোটেই টুফোল্ড উপসাগরের মুখে ঝড়ের পাল্লায় পড়েনি, 
সে যে কোথায় ডুবেছে কে জানে, অর্থাৎকাপ্তেন গ্রান্ট মোটেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পা 
দেননি। 

অর্থাৎ আবারও একবার চিরকুটগুলো প'ড়ে ভুল-একটা মানে বার করেছেন জাক 
পাঞয়ল-_তার এত পান্তিত্য কোনো কাজেই তাহ'লে এলো না! এবার মুখ শুকিয়ে 
গেলো স্বয়ং জাক পাঞয়লের। 

মেরির জন্যে সকলেরই কেমন মায়া হচ্ছিলো, কিন্তু সবজান্তা পাঞয়লের মুখচোখ 
দেখেও মায়াই হয়েছে সকলের । বেচারি তো চেষ্টার কোনো ব্রুটি রাখেননি, মাথাখাটিয়ে 
কোনো-একটা অর্থ তো বার করেছেন-_যতটা তার বুদ্ধিতে কুলিয়েছে। 

লর্ড এডওয়ার্ড গাড়ির আডাল থেকে বেরিয়ে এসেছেন তারপর। সম্ভবত বুঝতে 
পারেননি মেরিকে এখন কী ব'লে সান্ত্বনা দেবেন। বাইরে এসে দ্যাখেন, মাল্লাদের দুজন 
রাইফেল হাতে পাহারা দিচ্ছে। 

এদিকে মেঘ কেটে গিয়ে আলো ক'রে এসেছে তখন--কত নাম-না-জানা পাখির 
কলরব উঠেছে গাছের ডালে। এ্-যে, একটা ক্যাঙারু লাফাতে-লাফাতে গিয়ে বনেন্র 
মধ্যে ঢুকলো, ছানা-রু তার বুকপকেট থেকে মুখ বার ক'রে চারদিক সাগ্রহে দেখে 
নিচ্ছিলো। কাঙারুর নিশ্চিন্তু ভঙ্গি দেখেই বোঝা গেলো, আশপাশে নিশ্চয়ই কোনো মানুষ 
নেই-বেন জয়েস নিশ্চয়ই তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে দূুরে-কোথাও কেটে পড়েছে। 
সম্ভবত মাত্র এই কজন অনুচর নিয়ে সে এখন কোনো মুখোমুখি সংঘর্ষে আসতে চায় 
না। সম্ভবত গেছে দলের বাফি লোকগুলোকে নিয়ে আসতে-তারপর এসে রাতের 
আধারে শিবিরটার ওপর চড়াও হবে। 

রাগে লর্ড এডওয়ার্ডের সর্বাঙ্গ জ্বলে যাচ্ছিলো । পতঙ্গদেব বিলজিবাবের এমনতর 
কোনো সুসম্তানের সঙ্গে এর আগে এমনভাবে তার কখনও দেখা হয়নি। 

আশপাশে একটু টহল দিয়ে তারপর তিনি ফিরে এসেছেন অন্যদের কাছে। 

অন্যরা সেখানে ব'সে-ব'সেই তখনও উত্তেজিতভাবে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে 
আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। লর্ড এডওয়ার্ডকে দেখেই কাণ্তেন মাঙ্গল্স ব'লে 
উঠেছেন : “আমাদের কিন্তু এখন হাত-পা গুটিয়ে অসহায়ভাবে ব'সে থাকলে চলবে 
না। এখানে এই মাউন্ট কশচিউস্কোব আশগাশে হা কারে বসে থেকে আমাদের কী 
হবে? 

“তুমি, তাহ'লে কী করতে বলো আমাদের ? 


১৩৫ 


“এখানে বরং রাত্তিরে কখনও বেন জয়েসের হামলার মুখে পড়তে হবে আমাদের। 
তার চেয়ে বেন জয়েস যা করতে যাচ্ছিলো, ঠিক তা-ই করা দরকার আমাদের? 

“অধার্ৎ ?' 

“ঘোড়। তো একটাই আছে এখনও । সেটায় ক'রে কেউ-একজন এন্নি মেলবোর্নের 
উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ুক-_তারপর যত তাড়াতাড়ি পারে-সাত থেকে দশদিনের মধ্যে_ 
ডানকানকে ডেকে নিয়ে আসুক টুফোল্ডের মুখে! 

ম্যাঙ্গলস ঠিকই বলেছেন। এক্ষুনি একটা-কিছু ব্যবস্থা করা দরকার। 

জ্যান্ত ঘোড়া যেহেতু মাত্র একটাই, অতএব মাত্র একজন ছাড়া আর-কারু যাবার 
কোনো৷ প্রশ্নই ওঠে না। যাবার কথায় কিন্তু সকলেই লাফিয়ে উঠেছেন- এমনকী রবাটের 
উৎসাহটাই মনে হচ্ছিলো সবচেয়ে-বেশি। প্রত্যেকেই পারলে মেন তক্ষুনি ঘোড়া ছুটিয়ে 
টগবগ-টগবগ ক'রে মেলবোর্ন চ'লে যাবে। এই নিয়ে এমন তর্কাতর্কি বেধে গেলো যে 
লেডি হেলেনার প্রস্তাব হ'লো লটারি ক'রেই না-হয় ঠিক করা হবে কে যাবে। শেষপর্যন্ত 
সেই প্রস্তাবটাই মেনে নিয়েছে সবাই। আর লটারিতে শেষটায় নাম উঠে গেলো মাল্লাদের 
মধ্যে একজনের। ঠিক হলো, খাওয়াদাওয়ার পর রাত আটটাতেই সে বেরিয়ে পড়বে। 

যাত্রার যখন প্রস্তুতি চলেছে, তখন মেজর ম্যাকন্যাব্স সবাইকে ডেকে আরেকটা 
বিষয়ে হুশিয়ার ক'রে দিয়েছেন। 

“মনে আছে, ঘোড়াগুলোয় কী-রকম বিশেষ জাতের নাল পরানো হয়েছিলো?" 

হঠাৎ এ-কথা শুনে একটু বুঝি হতভন্বই হ'য়ে গেছে সবাই। 

মেজর ম্যাকন্যাবস নিজেই তারপর হেয়ালিটার সমাধান ক'রে দিয়েছেন। “এ বিশেষ 
নাল পরানো হয়েছিলো এই জন্যে যাতে ঘোড়ার খুরের ছাপ দেখে-দেখে বেন জয়েসের 
লোকেরা জেনে নিতে পারে আমরা কোথায় কোনপথ দিয়ে যাচ্ছি। এখনও নিশ্চয়ই এরা 
আমাদের ওপর কড়া নজর রেখে যাচ্ছে । আয়ারটন তো জানেই যে আমাদের এখনও 
একটা সতেজ ঘোড়া র'য়ে গেছে - সেটাতে ক'রেই তার মেলবোর্নে যাবার কথা হচ্ছিলো । 
তারা নির্ধাৎ টের পেয়ে যাবে যে আমরা নিশ্চয়ই কাউকে মেলবোর্ন পাঠাবো _আর 
তার পেছন নিতে তাদের কোনোই অসুবিধে হবে না-এ ঘোড়ার নালের ছাপ দেখে- 
দেখেই তারা ব্যাপারটা জেনে যাবে। কাজেই আমাদের পক্ষে উচিত হবে এ বিশেষ 
মার্কামারা নালটা খুলে ফেলে নতুন-কোনো নাল পরিয়ে-দেয়া। তা না-হ'লে কারু পক্ষেই 
আর মেলবোর্ন যাবার মানে হয় না-পথেই তারা তার ওপর হামলা চালাবে।, 

মেজর ম্যাকন্যাব্সের কথা শুনে আশঙ্কাটা যে একেবারেই অমুলক নয়, এটা বুঝতে 
কারুই আর দেরি হয়নি। তক্ষুনি ঘোড়ার খুর থেকে বিশেষ মার্কার নালগু লো খুলে ফেলে 
নতুন নাল লাগিয়ে দেয়া হ'লো, যাতে দস্মু্দল কিছুতেই ঘোড়সোয়ার যে কে, কাদের 
জন্যে সাহায্য আনতে যাচ্ছে, সেটা বুঝতে না-পারে। 


১৩৬ 


কিন্তু তখনও সবচেয়ে-জরুরি কাজটাই বাকি ছিলো। টম অস্টিনকে একটা চিঠি 
লিখতে হবে। এতক্ষণ উত্তেজনায় লর্ড এডওয়ার্ড তার কাধ আর হাতের ব্যাথাটাকে 
তেমন আমল দেননি-এখন লিখতে ব'সে আবিষ্কার করেছেন হাতটা একটু নাড়লেই 
অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। দু-একবার যখনই চেষ্টা করতে গেছেন, তখনই তার মুখে ফুটে 
উঠেছে বিষম যন্ত্রণার ছাপ। শেষটায় পাঞয়লই বসেছেন তার হ'য়ে চিঠিটা লিখে দিতে 
লর্ড এডওয়ার্ড মুখে-মুখে ব'লে যাবেন চিঠির বক্তব্য, আর পাঞ্য়ল তা-ই শুনে গুছিয়ে 
লিখে দেবেন। কিন্তু পাঞয়লের মন তখন যে কোথায় পড়ে ছিলো, কে জানে । তখনও 
তিনি ভেবে চলেছেন বোতলে-পাওয়া চিরকুটগুলোর মানে কী হ'তে পারে- আবারও 
তাহ'লে তিনি চিরকুটগুলোর সত্যিকার- মানে বুঝতে পারেননি । অন্যমনক্ষভাবে লিখতে 
ব'সে প্রথমে খানিকক্ষণ কাগজ-কলমের সামনে তিনি হা ক'রে ব'সে থেকেছেন, লর্ড 
এডওয়ার্ড তাকে যা লিখতে বলছিলেন, তার কিছুই যেন তার কানে ঢুকছিলো না! 

লর্ড গ্রেনারভনও আবারও বলেছেন, কিঞ্িৎ বিরক্ত হ'য়েই :'কী হলো? 
লিখুন-_; 

“আয? ব'লে মসিয় পাঞ্য়ল ফ্যালফ্যাল ক'রে তাকিয়েছেন তার মুখের পানে। 

“লিখুন যে : টম অস্টিনকে জানানো হচ্ছে, এই এন্তেলাপাবামাত্রই যেন ডানকানকে 
নিয়ে--, 

এ-তো মহামুশকিল হ'লো। মসির পাঞয়ল এখন ফ্যালফ্যাল ক'রে তাকিয়ে আছেন 
সামনে পস্ড়ে-থাকা অস্ট্রেলিয়ান আও নিউ-জিলাও গেজেট-এর সংখ্যাটার দিকে । ভাজ- 
করা কাগজটার নামটার শুধু একটা টুকরোই পড়া যাচ্ছে। 

“কী হ'লো, মসিয় পাঞ্য়ল ? লিখুন-" 

“ও-হ্যা, লিখছি । কি... আ্যালাগু...আযালাগু... ম্যালাড? আযালাশু মানে ? তড়াক 
ক'রে লাফিয়ে উঠতে গিয়ে আবার কেমন হতভন্বভাবে তিনি ব'সে পড়েছেন । “হা, বলুন 
কী লিখতে হবে-” 

“টম অস্টিনকে জানানো হচ্ছে, এই এন্তেলাটা পাবামাত্র যেন ডানকানকে নিয়ে 
এক্ষুনি যেন অস্ট্রেলিয়ার পুব উপকূলে চ'লে আসে । 

“অস্ট্রেলিয়া?” আবার কেমন যেন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছেন মসিয় পাঞয়ল। “ও- 
হ্যা, অস্ট্রেলিয়া !' 

কলের পুতুলের মতো চিঠিটা কোনোমতে লিখে শেষ করেছেন মসিয় পাঞয়ল, 
তারপর লর্ড এডওয়ার্ডকে দিয়েছেন চিগ্িটায় সই করবার জন্যে। অসহ্য যন্ত্রণা সত্তেও, 
দাত দিয়ে ঠোট চেপে ধ'রে, কোনোরকমে নিজের নামটা সই করেছেন লর্ড এডওয়ার্ড। 
তারপর চিঠিটা ভাজ ক'রে যথারীতি সীলমোহর ক'রে দেয়া হয়েছে । আর কম্পিতহাতে 
লেফাফায় ঠিকানাটা লিখেছেন মসিয় পাঞয়ল : 


১৩৭ 


মিস্টার টম অস্টিন, বরাবরেষু 
ফাস্টমেট, ডানকান 


রা 


মেলবোন 


তারপরেই ধড়মড ক'রে উঠে পদে বেরিয়ে গেছেন বাইরে, তখনও বিড়বিড় ক'রে 
তিনি ব'কে যাচ্ছেন অদ্তুত-একটা শব্দ : “আ্যাল্যাগ্ু...আ্যালাগু...আল্যাণ্ড ! 

মঁসিয় পাঞয়লের খ্যাপামির ধরনধারণ আযাদ্দিনে সকলেরই বেশভালোভাবে জানা 
হ'য়ে গেছে। ফলে তার দিকে আর আলাদা নজর না-দিয়েই সবাই ব্যস্ত হ'য়ে পড়েছেন, 
কখন অন্ধকার হয়, কখন দূত রওনা হবে মেলবোর্নের উদ্দেশে । সাবধানের মার নে; 
ভেবে শুধু-যে ঘোড়ার পায়ের নালগুলোই বদলে দেয়া হয়েছে তা নয়, ক্ষুরগুলো বেঁধে 
দেয়া হয়েছে কাপড় দিয়ে যাতে ছোটবার সময় খটাখট আওয়াজ না-হয়। 

কিন্তু এত-সব সাবধানতা সত্তেও কি আর আশঙ্কাটা কমে ? রাতের আধারে 
কোনখানে যে বেন জয়েস নো কি সে আয়ারটন ?) তার সাগরেদদের নিয়ে ওৎ পেতে 
আছে, তা কে জানে। তাদের চোখে ধুলো দিয়ে ঘোড়াটা যেতে পারলে হয়। আবার 
বইতে শুরু করেছে ঝোড়োহাওয়া, আর বানভাসি নদীটার জলে প্রখর ঢেউয়ের 
আওয়াজও উঠছে তার সঙ্গে তাল রেখে। আর তারই সঙ্গে ছন্দমিলিয়ে যেন বুকে 
টিপটিপ শব্দ বেড়ে যাচ্ছে। আটটার পরেই অন্ধকার লক্ষ ক'রে ঘোড়াটা যখন ছুটে 
চ'লে গেলো, তখন রুদ্ধশ্বাস উতৎনগ্ঠার সঙ্গে সবাই প্রার্থনা কবছেন, যাত্রাটা যাতে নিবিষ্ন 
হয়। আর ঠিক এমন সময়েই বুকের টিপটিপ শব্দ আরো বেড়ে গেছে, যখন হাওয়ার 
শৌ-শৌ আর জলের ছলছল ছাপিয়ে ভেসে এসেছে তীক্ষ একটা শিসের শব্দ। শিসের 
শব্দই তো? না কি পাখির ডাক ? 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গলস বলেছেন, সন্দেহ নেই, কেউ কাউকে এই তীক্ষ শিস দিয়ে যেন 
ংকেত দিচ্ছে। তার অনুমানটা ভুল নয়, যেন সেটা বোঝাতেই দ্বিতীয় আরেকবার সব 
শব্দ ছাপিয়ে আবার রাতের অন্ধকার চিরে গেছে সেই শিসের আওয়াজ । আর তারপরেই 
দূর থেকে ভেসে এসেছে গুলির আওয়াজ--ঠিক যেদিকটায় ঘোড়াটা গেছে, সেদিক 
থেকে। 

তার মানে-_ নিশ্চয়ই তার কোনো বিপদ হয়েছে! 

লর্ড এডওয়ার্ড কী-রকম ক্ষিপ্ত জ্ররাতুর ভঙ্গিতে সেই গুলির শখের দিকেই ছুটে 
যেতে চাচ্ছিলেন, কোনোরকমে তাকে আটকে রেখেছেন মেজর ম্যাকন্যাব্স। 

“এটা তো একটা ফাদও হ'তে পারে! ওরা হয়তো মংলব এটেছে যে গুলির 
আওয়াজ পেয়ে সবাই সেদিকটাতেই ছুটে যাবেন-_আর এই ফাকে ওরা ছুটে এসে 


১৯৩৮ 


অরক্ষিত গাড়িটায় মেয়েদের ওপর হামলা চালাবে-_ 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গলসও সায় দিয়েছেন। “এই পাজির পাঝাড়াগুলো হয়তো এ-রকমই 
একটা ফন্দি করেছে। দিনের আলো ফোটবার আগে কিছুই বোঝা যাবে না। আমাদের 
বরং এখানে আরো-হশিয়ার হ'য়েই থাকা উচিত--' 

লর্ড এডয়ার্ডের গায়ে যেন মন্ত হাতির বল। তিনি এ-সব কথা শুনলে তো? 
কোনোরকমে ধস্তাধস্তি ক'রে তাকে আটকে রেখেছেন মেজর ম্যাকন্যাবস, আর এমন 
সময়ে কানে ভেসে এলো কার যেন কাতর আর্তনাদ-কে যেন অন্ধকারের মধ্যে 
গোঙাচ্ছে : 

“বাচাও ! বাচাও!, 

এই গোঙানিটা শোনবার পর মনস্থির করতে আর একফোটও দেরি হয়নি কারু । 
সেই আর্তনাদের শব্দ শুনেই সেদিকপানে ছুটে গিয়েছেন মেজর, আর তার পেছন- 
পেছন কাণ্তেন। 

এ তো ঝোপের মধ্য থেকে কে যেন কাতরাতে-কাতরাতে প্রায় গড়াগড়ি দিতে- 
হ্যা” তাদের সেই দূতি। রক্তে তার সারা শরীরটা ভেসে যাচ্ছে। পিঠে আমূল বিধে 
আছে একটা ছোরা। 

অমনি তাকে তারা ধরাধরি ক'রে নিয়ে এসেছেন গাড়ির ভেতর। গলগল ক'রে 
রক্ত বেরুচ্ছে ক্ষত থেকে, ছুরিটা বাটশুদ্ধু বসানো; সে-যে বাচবে-এমন মনে হয়নি। 
কী-বকম নিস্তেজ হ'য়ে পড়ে থেকেছে বেচারি, আর কী-রকম যেন অস্ফুটস্বরে জড়ানো 
গলায় আর্তনাদ ক'রে বলছে : “চিঠি...চিঠি...বেন জয়েস !” তারপরেই যে জ্ঞান হারিয়ে 
পড়ে থেবেছে। লেডি হেলেনা আর মেরি তবু তার শুশুষা ক'রে গেছেন-ক্ষতটায় 
কোহল দিয়ে পরিষ্কার ক'রে তাতে বেধে দেয়া হয়েছে ব্যানডেজ। আর তারই মধ্যে 
তার পকেট হাতড়ে দেখেছেন কাণ্তেন ম্াঙ্গলস। না, টম অস্টিনকে লেখা চিঠিটা তার 
কাছে নেই। 

ভোরের আলো ফুটলে একবার সরেজমিন তদন্তে বেরিয়েছেন মেজর ম্যাকন্যাবস। 
তার মুখে গভীর কালোছায়া, কপালে চিন্তার ভাজ। আর ঝোপের পাশে তিনি আবিষ্কার 
করেছেন দস্যুদের দুজনের মুতদেহ-_কাণ্ডেন ম্যাঙ্গলসের মাল্লা যে ছোরার ঘা খাবার * 
আগে যুঝেছিলো প্রাণপণে, এ তারই প্রমাণ। দস্যুদের দুজনের মধো একজন চেনা 
সেই মিস্ত্রি, আয়ারটন যাকে গিয়ে নিয়ে এসেছিলো সে-বার। 

আরো-খানিকক্ষণ পরে মাল্লাটির জ্ঞান ফিরে এলো, কিন্ত্ব অবিশ্রাম রক্তক্ষরণে 
এখনও কী-রকম যেন নেতিয়ে আছে সে। ভাঙা-ভাঙা দু-চার কথায় সে যা বললে, 
তার সারমর্ম দাড়ালো এইরকম : সে যখন অন্ধকারে ঘোড়া ছুটিয়ে খানিকটা দূর গেছে, 


১৩৯ 


তখনই হঠাৎ তার দু-পাশে গাছ থেকে লাফিয়ে পড়ে দস্যুরা। সে এলোপাথারি গুলি 
ক'রে শুধু দুজনকেই ঘায়েল করতে পেরেছিলো, কিন্তু কে যেন পেছন থেকে তার পিঠে 
সজোরে ছুরি বসিয়ে দেয়। অমন ভয়ংকর আঘাত খেয়ে আর সে তাদের কোনো বাধা 
দিতে পারেনি । দস্যুরা নিশ্চয়ই ভেবেছিলো যে সে বুঝি খতম হ'য়ে গেছে । তার পকেট 
হাৎড়ে তারা শুধু চিঠিটা বার ক'রে নেয়। 

“দেখি, দেখি, চিঠিটা, বলেছিলো বেন জয়েস- অথবা সে কি আয়ারটন ? 'এবার 
আমাদের আর পায় কে? আমরাই এ ডানকান জাহাজের মালিক হ'য়ে বসবো। আমি 
এই ঘোড়ায় চেপেই ডানকানে চ'লে যাচ্ছি- তোমরা বরং চ'লে যাও টুফোল্ড উপসাগরের 
মুখে, কেম্পল পায়ার ব্রিজের কাছে। ডানকান একবার আমাদের দখলে এলেই জগৎ 
জানতে পাবে জলদস্যু কাকে বলে-ওয়ালটার র্যলে আর ফ্রান্সিস ড্রেকও আমাদের 
কাছে হার মেনে যাবে !, 

ব'লেই, সে আর একটুও দেরি করেনি, ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছিলো অন্ধকারে। 

এই আশঙ্কাটাই করেছিলেন সবাই। ফলে, পুরো ব্যাপারটা যে অপ্রত্যাশিত, সেটা 
বলা যায় না। কিন্তু তবু বাস্তব তার আঘাতে কেমন যেন ঘায়েলই ক'রে ফেলেছিলো 
লর্ড এডওয়ার্ডকে, ব'লে উঠেছিলেন : “ডানকান কি না শেষকালে জলদস্যুদের দখলে 
চ'লে যাবে 1? 

হঠাৎ সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে লাফিয়ে উঠেছিলেন মসিয় পাঞয়ল। “ককখনো 
নয়। বেন জয়েসের দলবল টুফোল্ডের মুখে পৌছুবার আগেই আমরা সেখানে পৌছে 
যাবে। 

“কেমন করে? 

“কেন? রাস্তাটার কথাটা তো বেন জয়েসই ফাস কে দিয়ে গেছে । এ কেম্পল 
পায়ার ব্রিজ দিয়ে। ব্রিজটা তো এখান থেকে কয়েক মাইল মাত্র দূরে- এক্ষুনি গিয়ে দেখে 
আসছি নদীতে বান ডাকলেও ব্রিজটা এখনও অটুট আছে কি না।' 

এবং যেমন কথা, তেমনি কাজ। কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্সকে নিয়ে তক্ষুনি অন্ধকারে 
বেরিয়ে পড়েছেন মসিয় পাঞয়ল। 

ফিরে যখন এসেছেন, তখন মাঝরাত পেরিয়ে গেছে। 

এবং ফিরে এসেছেন হতাশ ও বিধবস্ত। ধানের জল ফেনিয়ে চর্কি দিয়ে ছুটেছে 
_কিন্তু ব্রজটার কোনে চিহ্ই নেই কোথাও । দস্মুরা নিজেরা নদী পেরিয়ে যাবার পর 
সেতুটায় আগুন ধরিয়ে গেছে-আর ধ্বংসের কাজটা সাঙ্গ করেছে দুরন্ত ক্ষিপ্ত বানের 
জল! 

এবার তাহ'লে বুঝি বোম্বেটেদের হাত থেকে ডানকানকে আর বাচানো গেলো না! 

কাণ্তেন গ্রান্টের হদিশ করার চাইতেও এখন সবচেয়ে-জরুরি যে-ক'রেই হোক, 


১৪০ 


এখান থেকে সবচেয়ে-কাছের কোনো লোকালয়ে গিয়ে ডানকানের সঙ্গে যোগাযোগ 
করার চেষ্টা করা। নিজেদের অসহায় অবস্থায় সবচেয়ে-বেশি ভেঙে পড়েছেন লর্ড 
গ্লেনারভনই। তার এত-সাধের ডানকান কি না শেষটায় জলদস্যুদের কবলে গিয়ে 
পড়বে! 

মেজর ম্যাকন্যাবস আর কাণ্তেন ম্যাঙ্গলস যতই তাকে সান্ত্বনা দিয়ে শান্ত করার 
চেষ্টা করুন না কেন, তারাও এই বিষম সঙিন অবস্থায় প্রচণ্ড হতাশ হ'য়ে পড়েছিলেন। 
অসহায় আক্রোশে নিজেদের হাত কামড়ানো ছাড়া আর-কিছুই যেন তাদের করার নেই। 

শেষচেষ্টা অবশ্য একটা ক'রে দেখতেই হয়। পরদিন ভোরবেলাতেই কাপ্তেন 
ম্যাঙগল্স তার লোকজন নিয়ে একটা ভেলা তৈরি করার কাজে লেগে গেলেন। কাঠের 
গুড়ি আর গাছের বাকল আর দড়ি দিয়ে বেধে কোনোরকমে যদি একটা ভেলা তৈরি 
ক'রে ফেলা যায়, তবে এই বানের জলে ভেসে গিয়ে তারা কোনো লোকালয়ে পৌছে 
যাবেন। 

তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে প্রথম ভেলাটা বোধকরি পলকাই হয়েছিলো খুব-মোটেই 
পোক্ত ছিলো না। জলে নামাতে-না-নামাতেই সেটা এ তীব্র শ্রোতের আবর্তে পড়ে 
ভেঙে গেলো। 

শেষকালে আরো-মজবুত ক'রে আরো-একটা ভেলা বানানে হ'লো-আর একুশে 
জানুয়ারি শতরোতের তোড় যখন খানিকটা কমেছে, লর্ড এডওয়ার্ড তার সঙ্গীদের নিয়ে 
তাতেই উঠে বসলেন। গাড়িটা পড়ে রইলো & বনের পাশে, কাদার মধ্যে । সঙ্গে নেয়া 
হ'লো সামান্য যা খাবারদাবার ছিলো, আর অস্ত্রশস্ত্র 

কিন্তু স্রোতের মুখে যেন খড়কুটোর মতোই ভেসে গেলো তাদের ভেলা। তই 
মজবুত ক'রে বানাবার চেষ্টা করুন না কেন, মাঝনদীতে সেটা বুঝি এবারও ভেঙে যায়। 
গাছের গুড়িগুলো যেন দড়ির বাধন খুলে আলাদা হ'য়ে যাবে । কোনোরকমে যখন ওপারে 
পৌছুনো গেলো, তখন তারা ধুঁকতে-ধুকতে কোনোমতে শুধু নিজেদেরই বাঁচাতে 
পেরেছেন। খাবারদাবার খুব-একটা বাঁচানো গেলো না, অস্ত্রশস্ত্রও না-শুধু মেজর 
নিজের শরীরটারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো দুর্ঘটনা ঘটবার আগেই তারা যে লাফিয়ে 
ঝাপিয়ে তীরে নেমে পড়তে পেরেছেন, সেটাই যেন অনেকখানি। 

তারপর কেমন ক'রে যে তারা শ্রান্তক্রান্ত অবসন্ন বিধবস্ত দেহে টুফোল্ড উপসাগরের 
মুখ থেকে পধ্যশ মাইল দূরে ডেলিগেট নামে একটা ছোট্ট অজপাড়াগায় এসে 
পৌঁছেছেন, সে-কথা তারা যেন নিজেই জানেন না। 

সেখানে সরাইতে যখন সবাই খেয়েদেয়ে কোনোরকমে বিধবস্ত দেহে একটু প্রাণের 
সাড় ফিরে পেয়েছে, লর্ড এডওয়ার্ড সরাইখানার মালিককে জিগেস করেছেন কোনো 


১৪১ 


ঘোড়ার গাড়ি পাওয়া যাবে কি না। 

“এমনিতে কোনো গাড়ি পাবেন না। তবে ডাকের গাড়ি ছাড়বে আজ--সেটায় যেতে 
পারেন, সরাইওলা বলেছে। 

সেটাতেই যাবার ব্যবস্থা হ'লো। কিন্তু দু-দিন দু-রাত যখন একটানা চলে ডাকের 
গাড়ি সীইত্রিশ ডিগ্রি সমান্তরে সমুদ্রের কাছে পৌছুলো, তখন- 

কোথায় ডানকান ? 

শুধু ক্ষিপ্ত সমুদ্র গর্জাচ্ছে সেখানে, দিগন্ত অব্দি সব ফাকা। কোথাও কোনো 
জেলেডিঙিরও দেখা নেই, কোনো জাহাজ তো দূরের কথা। 

তবে কি টম অস্টিন সোজা টুফোল্ডের মুখে ইডেনেই চ'লে গিয়েছে? 

ডাকের গাড়ি তক্ষুনি ছুটেছে ইডেনে। কিন্তু সেখানেও ডানকানের চিহ্মাত্রও নেই। 

একটা সরাইতে উঠেই লর্ড গ্লেনারভন প্রথমেই গেছেন ডাক-তারের আপিশে। 
মেলবোর্নে টেলিগ্রাম করা হ'লো-ডানকান কোথায় গেছে, এক্ষুনি তার ক'রে জানাতে 
বলেছেন তিনি বন্দর কর্তৃপক্ষকে 

তারপর সময় যেন আর কাটতেই চায়নি। শুধু অস্থির হ'য়ে খ্যাপা বাঘের মতো 
ছটফট করেছেন লর্ড এডওয়ার্ড । 

টেলিগ্রামের উত্তর এলো দুপুর গড়িয়ে যাবার পর, বেলা দুটোয়। 


লর্ড এডওয়ার্ড গ্নেনারভন 
ইডেন 


টুফোল্দ্ উপসাগর 
১৮ জানুয়ারি ডানকান মেলবোর্ন থেকে রওনা হয়েছে । কোথায় গেছে কেউ জানে 


না। একটু অগপ্রত্যাশিতভাবেই হঠাৎ নোঙর তুলে বারদরিয়ায় চ'লে শিয়েছে। 


উটের পিঠ যদি আরো-মজবৃত হ'তো, তবু বোধহয় এই শেষখড়টাকে আর বইতে 
পারতো না--ঘাড়মুখ গুজে ছেড়ে প'ড়ে যেতো! এবার সত্যি-সত্যি আক্ষরিকভাবেই 
মাথায় হাত দিয়ে বসলেন লর্ড গ্লেনারভন। আশঙ্কাটা তাহ'লে সত্যি হ'লো শেষপর্যস্ত। 
ডানকান তবে বেন জয়েসের হাতে প'ড়ে শেষটায় বোম্বেটে জাহাজ হ'য়ে শিয়েছে ! 

তাহ'লে এখন কাণ্তেন গ্রান্টের থোঁজে তারা যাবেন কী ক'রে? মেরি আর রবার্টকে 
তবে এখন কী বলবেন লর্ড গ্লেনারভন? 


১৪২ 


তৃতীয় 


এক 


এ-কদিন যেন একটা ঘোরের মতো কেটেছে । দুঃস্বপ্নের ঘোর। 

সে-ই যখন আয়ারটনের খোলশটা খুলে বেরিয়ে এসেছে কুখ্যাত দস্যু বেন জয়েস, 
যার নামে হুলিয়া বেরিয়েছে, সেই যার সম্বন্ধে এতগুলো কথা ব'লে গেলেন মেজর 
ম্যাক্ন্যাব্স, তারপর থেকে মেরি যেন আচ্ছন্নের মতোই হ'য়ে গিয়েছিলো । সেবাশু শ্রষায় 
সে সাহায্য করেছে লেডি হেলেনাকে, প্রথমে লর্ড গ্লেনারভনের শুশ্ুষা, আর তারপর 
এ মান্নাটি যখন ফিরে এলো, প্রায় হতচৈতন্য, ক্ষত থেকে অনর্গল রক্ত বেরুচ্ছে, পিঠে 
ছুরি-বেধা, তখন তাকেও শুশ্ুা করেছে মেরি, লোকটা মনে হচ্ছে এ-যাত্রায় যেন বেচেই 
গেলো, এমনই তার কচ্ছপের প্রাণ, কিন্তু সারাক্ষণ মেরির মনে হচ্ছিলো সে যেন একটা 
কলের পুতুল, চারপাশে কোথায় কী হচ্ছে, সে যেন সব চোখে দেখে যাচ্ছে, অথচ 
কিছুই খেয়াল করছে না, কিছুই যেন তার আচ্ছন্ন মনটায় কোনো দাগ কেটে যেতে 
পারছে না। কেউ যদি তাকে জিগেস করে, এর পর কী-কী ঘটেছে, কোথায়-কোথায় 
গেছেন অভিযাত্রিদল, কী-কী করেছেন, তবে সে সম্ভবত কিছুই তার গুছিয়ে বলতে 
পারবে না, অথচ সে সবসময়েই দলের সঙ্গে ছিলো, সবাই যা-যা করেছে সেও সে- 
সমস্তই করেছে, কিন্তু স্বপ্নে যেমন হড়বড় ক'রে কত-কী ঘ'টে যায় অথচ তারপর তার 
ঝাপসা স্মৃতি ছাড়া আর-কিছুই থাকে না, ঠিক তেমনি হয়েছে তার-সবসময়েই মনে 
হয়েছে আদ্দিন তারা কোন বুনোহীসের পেছনে ছুটছিলো, কিন্তু এখন সেই বুনোহাস 
আর কোথাও নেই-সেও কোন্‌ দূরে দিগন্তের পরপারে মিলিয়ে গেছে। 

আর তারপর- এখন-এখন এই কাগু। ডানকান জাহাজ গিয়ে পড়েছে বেন 
জয়েসের হাতে, লর্ড গ্লেনারভনের এত-সাধের ডানকান; আর তারা যে সেই ডানকান 
নিয়ে সাতসমুদ্রতেরোনদী পেরিয়ে দু-দুটো মহাদেশ পেরিয়ে, এক গোলার্ধ থেকে অন্য 
গোলার্ধে এসে পড়েছে, সে তো তারই জন্যে, না, শুধু তার নয়, রবার্টও আছে, আর 
আছে সেই-ক'বে শেষ-যাঁকে দেখেছিলো সেই বাবার স্মৃতি, কাণ্ডেন গ্রান্টের স্মৃতি । 

আর কী হবে এখন মিথ্যেমিথ্যি এই দুরাশার পেছনে ছুটে ? মেরিকে যেন একটা 


১৯৪৩ 


হালভাঙা ভেলার মতো দেখাচ্ছিলো, সেই-যে ভেলাটায় ক'রে তারা পাড়ি জমিয়েছিলো 
ক-দিন আগেই এঁ বানভাসি নদীতে, আর জলের তোড়ে যে-ভেলা ভেঙে গিয়েছিলো, 
সে যেন এখন সেইরকমই এক ভেঙে-পড়া ভেলা । কেউ ঘদি তাকে জিশেস করে তার 
মনের অনুভূতিগুলোকে পর-পর সাজিয়ে বলতে, তবে তাও সে পারবে না, শুধু-একটা 
হালছাড়া হতাশ আচ্ছন্নরভাব, তা ছাড়া আর-কিছুই না। 

আর নিশ্চয়ই সেজন্যই প্রস্তাবটা প্রথমে এলো মেরির কাছ থেকেই। ধরাগলায় 
থেমে-থেমে সে যা বললে, তার সারমর্ম হ'লো : আর কেন, ঢের তো হ'লো, এবার 
বরং ফিরেই খাওয়া যাক ইওরোপে। আয়ারটনের সঙ্গে আচমকা এঁ খামারে দেখা হবার 
পর দপ ক'রে নতুন-একটা আশা জ্ব'লে উঠেছিলো মনে, আর এ-যেন ঠিক দীপ নেভবার 
আগে শিখা যেমন দপদপ ক'রে, অনেকটা সেইরকম । এখন তো বোঝাই যাচ্ছে আয়ারটন 
তাদের ধাপ্পা দিয়েছিলো, হতভাগা ফেরেববাজ, সে সম্ভবত কোনোদিনই চিনতো না 
কাণ্তেন গ্রান্টকে। শুধু কতগুলো জনরব শুনেছে ব্রিটানিয়া সম্বন্ধে আর নয়তো হয়তো 
সত্যিকার- আয়ারটন, এই বেন জয়েস-আয়ারটন নয়, তার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো কোথাও, 
এই জঙ্গলে সবই সম্ভব, তারপর তার কাগজপত্তর হাতিয়ে নিয়ে এসেই শেষে তা তাদের 
দেখিয়েছে তাদের প্রতারিত করবার জন্যেই। কিন্তু এখন আর খামকা দুরাশার পেছনে 
ছুটে লাভ কী? বরং এবার সবাই মিলে ফিরেই যাওয়া যাক ইওরোপে, সত্যি-তো, লর্ড 
গ্লেনারভন তাদের জন্যে অনেক করেছেন, অনেক লোকসান হয়েছে তার, এমনকী 
প্রাণহানিও হয়েছে এই অভিযানে বেরিয়ে, আর কেন, বাবাকে তো আর পাওয়াই যাবে 
না, এবার বরং- 

এমনি-সব কথা, ভেঙে-ভেঙে, থেমে-থেমে, ছেঁড়া-ছেড়া কতগুলো শব্দ দিয়ে 
সাজানো । হাজার সাস্তৃনা, হাজার প্রবোধ, হাজার সহানুভূতিও এখন বোধহয় তাকে আর 
& দুঃসহ হতাশা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। 

কিন্তু কাপ্ডেন জন ম্যাঙ্গল্সও দমবার পাত্র নন। কাণ্তেন গ্রান্টের মতো তিনিও 
ডাঙার নন, জলেরই মানুষ যেন। তিনিও নাছোড় ব'লে গেলেন কেমন ক'রে তিনি 
খুঁজে বার করবেন কাণ্তডেন গ্রান্টকে, বার করবেনই, দমবার পাত্র নন তিনি, হাল ছেড়ে 
দেয়া তার ধাতেই নেই মোটেই, একদিন-না-একদিন ঠিক তিনি মেরিকে মুখোমুখি দেখা 
করিয়ে দেবেন তার বাবার সঙ্গে, আর তাতেই প্রমাণ হ'য়ে যাবে তিনি, জন ম্যাঙ্গল্স, 
তিনি কাণ্তেন, জাহাজি, কাণ্ডেন কথাটা তার পোশাকি বাহারে অভিধা নয়--সেটা তার 
নামেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। 

সেদিনটা তারপর এমনি-সব কথার পিঠে কথায় কেটে গেলো, ক্লাস্তিটা কেউ যেন 
গায়েই মাথছিলেন না,_মেরির দিকে তাকানো যাচ্ছে না, তাকে অন্তত এঁ সর্বনেশে 
হতাশা থেকে বার ক'রে আনতেই হবে। 


১৪৪ 


পরের দিন ভোরবেলাতেই জন ম্যাঙ্গল্স বেরিয়ে গেলেন জাহাজঘাটায়, মেরিকে 
তিনি কথা দিয়েছেন- অভিযান চলবে, সন্ধান চলবে, তাই শোড়াতেই দরকার একটা 
জাহাজ--যদি মেলবোর্নে যাবার কোনো জাহাজ জোটে। কিন্তু ইডেন ছোট্ট জায়গা, টুফোল্ড 
উপসাগরের মুখে জাহাজ খুব-একটা আসে না, সমুদ্র এখানে উত্তাল, ক্ষিপ্ত, বন্য_-তাছাড়া 
ঠিক-এদিকটায় লোকালয়ও তেমন গসড়ে ওঠেনি। অনেকক্ষণ জাহাজঘাটায় ঘুরেও 
মেলবোর্নগামী কোনো জাহাজের খোঁজ পাওয়া গেলো না। কী করবেন তাহ'লে এখন? 
আর ঠিক সেইসময়েই ম্সিয় পাঞয়ল মুশকিল আসানের ভঙ্গিতে খবরটা দিলেন। 
মেলবোর্ন যে যেতেই হবে, এমন মাথার দিব্ব কে দিয়েছে? এখন যখন ডানকান আর 
ওখানে নোঙর ফেলে দীড়িয়ে নেই তাদের অপেক্ষায়, তখন মেলবোর্ন না-গিয়ে অন্য- 
কোথাও গেলেই তো হয়। আগের দিনই তো জাহাজঘাটায় শিয়ে দেখে এসেছিলেন 
নিউ-জিল্যাণ্ডের অকল্যাণ্ডে যাবার জন্যে একটা জাহাজ তোড়জোড় করছে । সেটায় ক'রে 
অকল্যাণ্ড চ'লে গেলেও তো হয়, সে যখন একটা দেশের রাজধানী, তখন সেখানে 
ইওরোপে যাবার মতো কোনো-না-কোনো জাহাজ পাওয়া যাবেই। অবল্যাগ্ড এখান থেকে 
বেশি-দূরে নয়, তিনি শুনে এসেছেন দিন-দশেকের বেশি লাগবে না এই হাজার মাইল 
পাড়ি দিতে। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো-একটা কথা খতিয়ে দেখে নেয়া উচিত। অকল্যাণ 
পড়েছে সীইত্রিশ ডিগ্রি অক্ষরেখায়-_ প্রথম থেকেই তো, সেই যখন তারা দক্ষিণ 
আমেরিকায় পৌছেছিলেন, তারা এই সীইত্রিশ ডিগ্রি সমান্তর ধ'রেই পাড়ি জমিয়েছেন। 
এই সাইত্রিশ ডিগ্রি সমান্তরেই কোথাও নিশ্চয়ই কাণ্তেন গ্রাস্টকে পাওয়া যাবে। 
শেষচেষ্টার পরেও একটা বিশেষ-শেষ চেষ্টা, যদি সে-রকম কিছু কখনও হয়। 
যখন সমস্ত ব্যাপারটাকে নিছক পগুশ্রম ব'লে মনে হচ্ছে, তখন যদি এমনকী একটা 
উটকো উড়োখবরও এসে পৌছোয়, তখন কেমন যেন নতুন ক'রে একটা উৎসাহ- 
উদ্দীপনার সৃষ্টি হ'য়ে যায়। সাফল্য সম্বন্ধে কোনো ভরসাই হয়তো নেই, কিন্ত্ত তবু তো... 
আর এই তবু অব্য়টা যথার্থই অব্যয়, সেটা আর-কখনও মরে না-সবসময়েই যেন 
ঝোড়োসমুদ্রে উত্তাল উথালপাথাল ঢেউয়ের মধ্যে দূরের-কোনো আলোকস্তস্কের মতো 
আলো দেখাতে থাকে । যখন মেলবোর্নে আপাতত যাওয়া হবে না ব'লে সবাই মনখারাপ 
ক'রে আছে, তখন এই প্রস্তাব_-যেটা নিছক-একটা বিকল্প ব্যবস্থার চাইতেও বেশি! 
আর সেটাকে তক্ষুনি যেন সজোরে আকড়ে ধরলেন সবাই। আর একমুহূর্তও সময়' 
নষ্ট না-ক'রে লর্ড গ্লেনারভনকে নিয়ে কাণ্ডেন ম্যাঙ্গল্স সটান গিয়ে হাজির সেই জাহাজে 
জাহাজিদের নিজেদের মধ্যে নিশ্চয়ই আলাদা-একধরনের বনিবনা থাকে, তাছাড়া 
জাহাজিদের পরিভাষাও তো কাণ্ডেন ম্যাঙ্গল্সের জানা। ফলে জাহাজটা যতই হতচ্ছাড়া 
মালবওয়া জাহাজ হোক না কেন, জাহাজের কাণ্তেন বিল হালি যতই রুক্ষ, বেপরোয়া, 
গোয়ার গোছের লোক হোক না কেন, না-ই বা সে জানুক ভদ্রতা বা সহবৎ, পাইপ 


ইন সার্চ : ১০ ১৪৫ 


টেনে-টেনে যতই কেন-না ঠোঁট দুটো কালো ক'রে ফেলুক, কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স তাকে 
কিন্তু একটুক্ষণের মধ্যেই পটিয়ে ফেললেন। হুম, এটা জানবেন মালবওয়া জাহাজ, কোনো 
প্রমোদতরী নয়, মাল্লাদেরই থাকার ভালো কোনো ব্যবস্থা নেই, তার ওপরে আবার মহিলা, 
ব্যবস্থাও, এখানকার খাবার দীতে কাটা যায় না, এমন অখাদ্য, আর-হ্যা, যখন বিপদে 
পড়েছেন, নিয়ে যেতে পারি, তবে পঞ্চাশ পাউগু ভাড়া লাগবে, আর সেটা আগাম, 
হাতে-হাতে চাই, ফ্যালো কড়ি মাখো তেল, এ-জাহাজে যাত্রীও যা মালের বস্তাও তা- 
ই-_বরং খোল ভর্তি মাল আরো-দামি, সেগুলো সময়মতো অক্ষত পৌছে দিতে না- 
পারলে শেষটায় তাকেই উলটে খেসারৎ দিতে হবে...ইত্যাদি, এবং ইত্যাদি। 

কিন্তু তা-ই সই। কাণ্তেন ম্যাঙ্গলসের মাল্লারা নিজেরাই একটু জায়গা ঝটি দিয়ে, 
ধুয়ে-পুছে, সাফসূতরো ক'রে নিলে। ব্যাঙ্কে গিয়ে সেদিনই লর্ড গ্রেনারভনের চেক 
ভাঙিয়ে নগদ টাকা তুলে এনেছেন মেজর ম্যাকন্যব্স। তা থেকে আগাম পঞ্চাশ পাউগু 
চুকিয়ে দেয়া হয়েছে বিল হ্যালিকে। মসিয় পাঞয়লকে কিনে দেয়া হয়েছে নিউ- 
জিল্যাণ্ডের একটা ম্যাপ। অস্ত্রশস্ত্র সব তো গেছে ভেলাটার সঙ্গে, শুধু তার নিজের 
রাইফেলটাই বেচে ছিলো, এবার সবার জন্যেই নতুন ক'রে অস্ত্রশস্ত্র কেনা হ'লো। আবার 
একটা নতুন দেশে চলেছেন সবাই-কোথায় কোন্‌ আপদ তাদের জন্যে ওৎ পেতে 
আছে, সেজন্যে সাবধান থাকাই ভালো। যাত্রীদের নিয়ে বিল হ্যালির কোনো মাথাব্যথা 
নেই, ছপ্লড় ফুঁড়ে এই অপ্রত্যাশিত কড়কড়ে পাউগড পেয়েই সে খুশি, তাদের কার কী 
নাম, কার কী ধাম--সে-সম্বন্ধে তার কোনো উটকো কৌতুহল নেই--“জাহাজ ছাড়বো 
কাল ঠিক দুপুরবেলায়, কাটায়-কাটায় ঠিক সময়ে জাহাজে না-এলে আমি কিন্তু ফালতু 
সবুর করবো না। আপনাদের না-নিয়েই আমায় জাহাজ ছেড়ে দিতে হবে-_আমার বাপু 
সাফ কথা। 

জাহাজে ওঠবার আগে, শেষবার, এখানেই সাইত্রিশ ডিগ্রি অক্ষরেখার কাছে 
সমুদ্রতীর দেখে এসেছেন লর্ড গ্লেনারভন, বেন জয়েস ডানকান দখল ক'রে নেবার 
পর টম অস্টিন আর অন্য মাল্লাদের কী হাল করে কে জানে। যদি ধ'রে-ধ'রে একেকটা 
ক'রে মৃতদেহ ভাসিয়ে দিয়ে থাকে জলে, আর সেগুলো যদি ভেসে এসে ডাঙায় ঠেকে 
থাকে! 

লর্ড গ্েনারওনের সঙ্গে ছিলেন কাণ্ডেন ম্যাঙ্গল্‌স। না, তীরে কারু মৃতদেহ পড়ে 
নেই। তবে ডানকান যে এখানে এসেছিলো, তারই চিহ্ন তীরের কাছে এ তাবু খাটাবার 
দাগ, আর নিভে-যাওয়া আগুনের কুণ্ড, কয়েদিদের একটা উদ্দিও পাওয়া গেছে তার 
পাশে, আয়ারটন (না কি বেন জয়েস ) তো বলেছিলো এখানে ডানকানকে নিয়ে এসে 
তার স্যাঙাংদের জাহাজে তুলে নেষে। এসেছিলো নাকি তাহ'লে? এ-সব কি তারই 


১৯৪৬ 


চিহ্চ ? 

ইডেনের শাসনকর্তার সঙ্গে একটা মোলাকাৎ অবশ্য হয়েছিলো। এখানকার 
ম্যাজিঙ্লে্টকে লর্ড গ্লেনারভন জানাতে গিয়েছিলেন যে তার জাহাজ দখল ক'রে 
জেলপালানো কয়েদিরা বারদরিয়ায় পাড়ি জমিয়েছে। যদি ভেবে থাকেন যে ম্যাজিস্ট্ট 
তাই শুনে বিষম উত্তেজিত হ'য়ে উঠে ডানকান জাহাজেব উদ্ধারের জন্যে তোড়জোড় 
শুরু ক'রে দেবেন, তবে ভুল ভেবেছিলেন। ম্যাজিস্ট্রেট উত্তেজিত হয়েছিলেন বটে, তবে 
উল্লাসে, আনন্দে প্রায় আত্মহারাই যেন, জেলপালানো দুর্ধর্ষ খুনে-ডাকাতগুলো আর 
অস্ট্রেলিয়ায় নেই-_জাহাজে ক'রে জলে ভেসেছে- এতে অন্তত রাতের ঘুমটা এখন থেকে 
নির্বিযে হবে-তাদের ভয়ে আর সারাক্ষণ আধমরা হ'য়ে থাকতে হবে না--সারাক্ষণই 
তো শঙ্কা ছিলো কোথায় কোন আতঙ্ক লেলিয়ে দেয় বদমায়েশগুলো--এখন বরং হাফ 
ছেড়ে বাচা গেলো। খুশি হ'য়ে তিনি "চারপাশে তারবার্তা পাঠিয়ে দিলেন-“জোর খবর! 
খুশির খবর! কয়েদিগুলো ' অস্ট্রেলিয়ার ডাঙায় আর নেই-জাহাজে ক'রে জলে 
ভেসেছে । 

সত্যি, এই ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে কাণ্তেন বিল হ্যালির যে কী তফাৎ, সেটাই বোঝা 
দায়। সবাই আছে যে যার তালে। অন্য মানুষদের বিপদে-আপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে 
দিয়ে নিজের শান্তি নষ্ট করে কোন্-সে গাড়ল। 

এত-সব জায়গা থেকে বিভিন্ন টুকিটাকি সেরে এসে কাণ্ডেন ম্যাঙ্গল্স দ্যাখেন মঁসিয় 
পাঞয়ল কি-রকম ছটফট করছেন সারাক্ষণ, একটা খাঁচায় পোরা বাঘের মতো তার 
দশা। 

“কী ব্যাপার, মসিয় পাঞ্য়ল ? আপনাকে যে খুব অস্থির দেখাচ্ছে-.আবার-কিছু 
নতুন উৎপাত জুটেছে নাকি। 

“উৎপাত নয়! মসিয় পাঞয়ল যেন ফেটেই পড়েছেন। 'আমরা যে নিউ-জিল্যাণড 
যাচ্ছি হুট ক'রে।' 

কেন? নিউ-জিল্যাড যাবার প্রস্তাবটা তো আপনার কাছ থেকেই এসেছিলো ।' 

“তা বটে। তবে কি জানেন তখন নতুন দেশে যাবার উত্তেজনার চোটে ভুলেই 
শিয়েছিলুম যে নিউ-জিল্যাণ্ডে গেলে কেউ নাকি আর-কখনও ফেরে না! এখন ভাবছি 
কোন কুক্ষণেই যে বাড়ির পড়ার ঘরটা থেকে পা বাড়িয়েছিলুম। কপালে এখন আরো- 
কত দুর্ভোগ আছে, দেখবেন! আমার ধারণা, এ-যাত্রাতেও আমরা নির্বিয়ে দিন কাটাবার 
বরাৎ ক'রে আসিনি । 

অমন ক'রে ভাগ্যকে উসকে না-দিলেই পারতেন বোধহয় মসিয় পাঞয়ল। কোন 
সুঙ্ম লুতাতন্ত্রর জালে যে মানুষের ভগ! ঝোলে আর কোন খেয়ালে আপন মনেই যে 
সে দোল খায় পেতুলামের মতো, এদিক থেকে ওদিক, তা-ই বা কে জানে। তবে গতিক 


১৪৭ 


যে খুব সুবিধের ঠেকছে না তা পরদিন জাহাজে ওঠবামাত্রই টের পাওয়া গিয়েছিলো । 
বি হালির কাছ থেকে কেউই খুব বিনীত ভদ্র সুবোধ ব্যবহার আশা করেনি, সে-যে 
জাহাজে মহিলাদের দেখে বিগলিত হ'য়ে শিয়ে নিজের ক্যাবিনটা তাদের ছেড়ে দেবে 
না-এটা তো জানা কথাই! কিন্তু পাইপমুখে এই হষ্টাকট্টা ইয়াজোয়ানের কাছে প্রত্যাশা 
করা গিয়েছিলো যে সে আর কিছু না-হোক, অন্তত নৌচালনবিদোটা ভালোভাবেই আয়ত্ত 
করেছে-না-হ'লে একটা আস্ত সচল জাহাজের কাণ্তেন হ'লো কী ক'রে। পরে অবশ 
দেখা গেলো এ-ব্যাপারটা যদি তার জানা থেকেও থাকে, জাহাজ ছাড়বার পর নিখুঁতমসণ 
ভাধে সেটাকে চালাবার কোনো মাথাব্যথাই নেই তার। নিজে গিয়ে মাল টেনে পঞ্ড়ে 
থেকেছে নিজের ক্যাবিনে, জাহাজ কোথায় কোন চোরাগোপ্তা ডুবোপাহাড়ে ধাক্কা খেলো 
কি খেলো না-তাতে হয়তো তার থোড়াই আসে যায়। আর যেমন কাণ্তেন, তেমনি 
তার মাল্লারা। তারাও কাণ্ডেনের পন্থা অনুসরণ ক'রে অল্পক্ষণবাদেই মদের ঘোরে বেহুশ 
হ'য়ে পড়লো । 'এ-কী আপদ রে, বাবা! এ-কোন কাপ্তেনের পাল্লায় এসে পড়ল্ম!' 
এ-কথা ভেবে, নিজে থেকে যেচে, আগবাড়িয়ে কাণ্তেন ম্যাঙ্গলস একবার তাকে জাহাজ 
বিষয়ে পরামর্শ দিতে গিয়েছিলেন, অমনি সে তাকে হুংকার দিয়ে নিজের ক্যাবিন থেকে 
বার ক'রে দিয়েছে : 'বলি, এ-জাহাজের কাণ্ডেন কে? আপনি, না আমি? আমি আমার 
যেমন-খুশি তেমনিভাবে আমার জাহাজ চালাবো, তাতে আপনি ফৌপরদালালি ক'রে 
নাকগলাতে এসেছেন কেন ? 

গতিক দেখে ফের মাথায় হাত লর্ড গ্রেনারভনের। জলপথের কোনো-একটা 
চলনসই চার্ট পর্যস্ত ঝুলছে না সারেঙের ঘরে, যে, সেটা দেখে কোনো অনুমতি বিনাই 
কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স জাহাজের হাল ধরবেন--আক্ষরিক অর্থেই ধরবেন। ইডেন থেকে 
অকল্যাগু যায় এ-জাহাজ, আবার সেখান থেকে ফেরে-ফলে পথটা বিল হাযালির চেনা। 
কিন্তু সে তো এখন বেহুশ প'ড়ে নাক ডাকাচ্ছে ! 

“আগেই বলেছি কোন কুক্ষণেই যে বাড়ি থেকে পা বাড়িয়েছিলুম, মঁসিয় পাঞ্য়ল 
ফের ত্বার কপাল-চাপড়াতে লেগে গেছেন, 'এ-যে দেখছি রাক্ষসমূলুকে পা দেবার আগে 
থেকে অবস্থা সঙিন হ'য়ে উঠলো । 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স জিশেস করলেন : 'রাক্ষসমুলুক ? সে আবার কী? আমরা তো 
যাচ্ছি অকল্যাণ্ডে--নিউ-জিল্যাণ্ডে 1 

“আরে-হ্যা-তার কথাই তো বলছি। এই মাওরিদের দেশটা যে রাক্ষসদের দেশ 
-.সে তো সব্বাই জানে । মসিয় পাঞয়ল একটু তেতে উঠেই বললেম। 

“রাক্ষসদের দেশ মানে? 

“মানে ক্যানিবালদের রাজতি--পড়েননি মতেইন--কী-সব লিখে গেছেন এই 
'ক্যানিবালদের ধিবয়ে? নরখাদক একেকটা-- মানুষখেকো! 

১৪৮ 


কথোপকথনের ধরনটা দেখে কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স-এর ধারণা হ'লো ব্যাপারটা একটু 
বাড়াবাড়ি হ'য়ে যাচ্ছে। “তা আপনার মীতেইন এই মাওরিদের দেশে এসেছিলেন বুঝি? 
প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন? একেবারে রাক্ষসদের পেটের ভেতর থেকে তীর 
বাণী বিতরণ করছেন? না-না, মঁসিয় পাঞয়ল, মতেইন কোথায় কোন্‌ দেশ সম্বন্ধে 
কী বলেছেন আমি জানি না। জানবার ইচ্ছেও নেই। শুনে-ছ, মহাকবি শেক্সপীয়ার নাকি 
এই ক্যানিবাল কথাটা ওলোটপালোট ক'রে দিয়েই ক্যালিবানকে পেয়েছিলেন। কিন্তু সেও 
-যন্দুর জানি-আর যা-ই হোক, মানুষখেকো নয়। তা আপনি কি নিউ-জিল্যাণ্ডে যেডে 
চান না নাকি? সত্যিকার মানুষখেকো তো বাঘসিংহ-তা তাই ব'লে কেউ কি বাঘসিংহের 
দেশে যায় না? 

এ-কথায় হয়তো যৎকিঞ্চিৎ চৈতন্যোদয় হ'লো মঁসিয় পাঞয়লের। তিনি একটু 
আপোষ করার ভঙ্গিতে বললেন, “না-না, আমি নিউ-জিল্যাণ্ডে যদি-বা যাইও--উপকূল 
ছেড়ে ভেতরে যাচ্ছি না। কে জানে, বাপু, কোথায় কোন্‌ বিপদ উৎকট একটা লাফ 
দেবে ব'লে উদাত হ'য়ে আছে !, 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স নিজের ঘাড়ে হাত বুলোতে-বুলোতে বললেন, “কী জানেন, মঁসিয় 
পাঞয়ল ? আমি তো সাগরজলের মানুষ ! ঘাড়েগর্দানে নোনা ধ'রে গেছে । আপনার 
এ রাক্ষসরা হয়তো আমার ঘাড়ে দাত বসিয়ে থুঃ থুঃ ক'রেই উগরে ফেলে দেবে । আর, 
তাছাড়া, মাওরিরা কেমন লোক, সেটা আপনার এঁ প্রটীন পণ্ডিতদের মতো আমিও জানি 
না। তবে শাদা শয়তান আমি কয়েকটা দেখেছি-এই আপনার বেন জয়েসের কথাই 
ধরুন না কেন- পৃথিবীর কোন ক্যানিবালই বা তার চেয়ে অধম হবে, বনুন ? 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স মঁসিয় পাঞয়লের এই জুজুর ভয় দেখে ততটা ভড়কে যাননি। 
তার বরং ভয়ই হচ্ছিলো, এই ফরাশি পণ্ডিত এমনিতেই একটু ছিটগ্রস্ত আধাপাগলা লোক 
ছিলেন। এখন এইসব বিদঘুটে উদ্ভট আজগুবি কথাবার্তা যে বলছেন সে কি তার মাথাটা 
পুরোপুরি বিগড়ে গেছে বলেই? না-হ'লে ইনি কেন অবিশ্রাম কন্টিন--কন্টিন__ 
আল্যাও--আল্যাও ক'রে বকে মরছেন। যতই কন্টিন ব'লে বিড়বিড় করুন না কেন, 
এটা তো সববাই জানে যে নিউ-জিল্যাণ্ড মোটেই কোনো কনটিনেন্ট নয়_সেটা বরং 
দুটো দ্বীপ মিলিয়ে তৈরি- নর্থ আইল্যাণ্ড আর সাউথ আইল্যাণ্ড। তবে কি ফের আরেকবার 
তিনি চিরকুটগুলোর নতুন অর্থ বার করবার জন্যে খেপে উঠেছেন? তিনি কি ভাবতে 
শুরু ক'রে দিয়েছেন যে কাণ্তেন গ্রান্টের ব্রিটানিয়া শেষটায় ভেঙে পড়েছিলো নিউ- 
জিল্যাণ্ডরই কোনো উপকূলে? তাহ'লেই তো সাড়ে-সর্বনাশ ! তিনি একবার ক'রে 
চিরকুটগুলোর একটা নতুন অর্থ বার করেন, আর তাদের ছুটে মারতে হয় এই মুলুক 
থেকে সেই মুলুকে! শেষটায় কি কিউয়ি পাখির এই দেশটাতে তাদের একবার এ-ছ্বীপ 
একবার ও-ছ্বীপ ক'রে চর্কি ঘুরতে হবে? তা যদি হয় তাহ'লেই ভাবনার কথা। কোনো- 


১৪৯ 


একটা সম্ভাবনা ঘৃণাক্ষরেও যদি দেখা যায় তাহ'লে কি আর লর্ড গ্রেনারভন সেটার শে 
না-দেখে ছাড়বেন ? 

ছ-দিন হলো পাঞয়ল কেবল কন্টিন-কন্টিন করেছেন, আর ছ-দিন হ'লে 
জাহাজ দিবিব পাল খাটিয়ে জোরালো হাওয়ায় তরতর ক'রে ভেসে চলেছে, তবে সমু 
জাহাজ চালানোর সময় এমনিতেই সবসময়ে খেয়াল রাখতে হয় খুব যেন দোল না 
খায় অথবা ঝাকুনি লাগে। হ্যালির জাহাজ যেন ছুটে চলেছে নিজের খেয়ালখুশি মাফিকই 
জাহাজের গতি মসৃণ না ঝাকি-খেতে-খেতে-চলা, সে-বিষয়ে নজর রাখার জন্যে আর 
যে-ই থাকুক, অস্তত বিল হ্যালি যে নেই, সেটা হয়তো না-বললেও চলে । অতএব ঝাকুনি; 
চোটে যদি সকলেরই মনে হয় সিন্ধুপীড়ার দাপটে পেটের নাড়িভুড়ি শুধুই উলটে আসতে 
চাচ্ছে, তবে বলতেই হয় যে সেটা এ-কদিনে কারুই আর তেমন অপ্রত্যাশিত বলে 
মনে হয়নি। 

তার ওপর ফের শুরু হয়েছে দক্ষিণ গোলার্ধের গ্রীষ্মকালের সেই সুবিখ্যাত বর্ষা 
বৃষ্টির ঝাপট আর দাপট এমনই প্রচণ্ড যে খোলের তেতরে সেধিয়েও যেন তার হাত 
থেকে নিস্তার নেই। শেষটায় মেরিকে নিয়ে লেডি হেলেনাকে বেরিয়ে আসতে হ'লে 
খোল ছেড়ে বাইরে। একে তো মালপত্রের জন্যে একফৌটাও জায়গা নেই, তার ওপর 
এই বিষম খেলা চলেছে সমুদ্রের, এই সাগরদোলা নাগরদোলার দাপট এমনই যে শেষটায় 
বাধ্য হয়েই মেরিকে নিয়ে খোল থেকে বেরিয়ে আসতে হ'লো। এমন তুলকালাম ঝাকুনির 
মধ্যে মালপত্রের গায়ে বেমক্কা ধাক্কা খাওয়ার চাইতে ডেকে শিয়ে সকলের সঙ্গে 
সমানভাবে জাহাজের দুলুনিটা ভাগ ক'রে নেয়াও ভালো। মঁসিয় পাঞয়ল অবশ্য 
জোগাবার চেষ্টা করলেন, তবু সবদিক বিবেচনা ক'রে বলতেই হয় এমন অবস্থায় কি 
কারু মুখেই হাসি ফুটতে পারতো ? 

কিন্তু মেরি বা লেডি হেলেনার চাইতেও অনেকবেশি কাহিল দশা খোদ লর্ড 
গ্লেনারভনের। তার বেজায় মনখারাপ। বার-বার ডেকে এসে পায়চারি করেন, তাকিয়ে 
থাকেন বৃষ্টিতে-ঝাপসা দিগন্তের দিকে, আর ভিজে নেয়ে একশা হয়ে যান। শেষটায় 
আর থাকতে না-পেরে, লর্ড গ্রেনারভনকে চোখে দুরবিন সেঁটে দিগস্ত হাৎড়াতে দেখে, 
কাণ্ডেন ম্যাঙ্গল্স সরাসরি জিগেসই ক'রে বসলেন : “কী খুঁজছেন, বলুন তো? 

'ডানকানকে । 

'ঈশ্বর করুন আমরা যেন ডানকানকে আর না-দেখি।' 

“এ-কী কথা, জন? কী বলতে চাচ্ছো তুমি ?, 

“ঠিক কথাই বলছি। ডানকান এখন জলদন্গুদের জাহাজ । আমাদের দেখতে পেলে 
বে-হাল ক'রে ছাড়বে। এটা কি খেয়াল আছে যে আমাদের সঙ্গে মহিলারা 


১৫০ 


আছেন ? 

কী-রকম মিইয়ে গিয়ে লর্ড গ্নেনারভন বললেন : “এদিকে তো ডাঙার চিচ্মান্র 
দেখছি না। ছত্রিশ ঘণ্টা আগেই তো আমাদের ডাঙা দেখতে পাবার কথা।' 

ঝড়ের তোড় ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বেলা শেষ হ'য়ে রাত যখন নামলো, হাওয়ার 
গর্জানি তখনও একফোটাও কমেনি। বিল হ্যালির শরীরে বোধহয় রক্তের বদলে আছে 
কোহল আর সমুদ্বের নোনাজল। এটা জানতে তার ঠিকে ভুল হয়নি যে গতিক খুব- 
একটা সুবিধের না। মস্ত অবস্থাতেই টলতে-টলতে সে চ'লে এলো ডেকে, রম্ডরাডা 
চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলো দুর্যোগকে, তারপর পাল ঠিক ক'রে দিলে। 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখলেন তার পাকাহাতের কাজ, কিন্তু কোনো 
কথা বললেন না। একবার যখন সাহায্য করার প্রস্তাব নিজে থেকেই উপযাচক হ'য়ে 
গিয়েছিলেন, তখন বিল হ্যালি তাকে যেভাবে তার অধিকারের মাত্রা সম্বন্ধে সচেতন 
ক'রে দিয়েছিলো, সেই অপমানের কথা তিনি এখনও ভুলে যাননি । 

সমুদ্র যেন খেপে উঠেছে। বড়ো-বড়ো উথালপাথাল ঢেউ। জাহাজ একবার 
ঢেউয়ের ওপর উঠছে, পরক্ষণেই কাৎ হ'য়ে নেমে আসছে। ডেকের ওপর দিয়ে ক- 
বার বড়ো-বড়ো ঢেউ গড়িয়ে গেলো। ঢেউয়ের জল প্রবলবেগে বেরিয়ে যাবার সমর 
একবার লম্বা ছিপটাকেও নিয়ে গেলো সঙ্গে-ভাসিয়ে নিয়ে গেলো দূরে-বাধন ছিড়ে 
গেছে তার। 

ঝড়ের মধ্যেই ডেকে দাড়িয়ে রইলেন গ্লেনারভন আর ম্যাঙ্গল্স। দুশ্চিন্তায় দুজনেরই 
চোখ কপালে উঠেছে । এই অচেনা সাগরে শেষটায় এই জাহাজ ভূবে যাবে না তো? 

রাত যখন সাড়ে-এগারোটা, তখন মিশকালো অন্ধকারের মধ্য দিয়ে ভেসে এলো 
অন্যরকম একটা শব্দ--এবার যেন ঢেউ গিয়ে কোনে বালিয়াড়ির গায়ে ভেঙে পড়ছে। 

'ডাগা !' কাণ্তেন ম্যাঙ্গলস ব'লে উঠলেন, “ডাঙা!, 

শিশের ওজন বাধা দড়ি জলে ফেলে দিয়ে জলের গভীরতা মাপলে একজন মাল্লা। 
হিশেব ক'রে বললে, “তিন ফ্যাদম 1” 

শোনবামাত্র কাণ্ডেন ম্যাঙ্গল্স আর স্থির হ'য়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। বিল 
হযালিকে গিয়ে বললেন : “সর্বনাশ হ'তে চলেছে যে! জাহাজ যে এখন ডুবোপাহাড়ের 
ওপর দিয়ে চলেছে !, 

বিল হ্যালির হিশেবে একটা মস্ত তুল হয়েছিলো । সে ভেবেছিলো, ডাগ্ডা বুঝি এখনও 
ত্রিশ-চল্লিশ মাইল দূরে আছে। ঝড়ের মধ্যে মদের ঘোরে সে দূরত্বটা ঠাহর করতে 
পারেনি। এখন মাত্র মাইল-আষ্টেক দূরে ডাঙা চ'লে এসেছে দেখে সে কী-রকম যেন 
ঘাবড়ে গেলো। আর ভার এ বেকুব রাঙা দৃষ্টির ফ্যালফ্যাল ভাবটা দেখে এবার খোদ 
্াঙ্গল্স শিয়েই হাল ধরলেন। 


১৫১ 


মুশকিলটা কম ছিলো না। এখানকার সমুদ্রের চার্ট কখনও দ্যাখেননি ম্যাঙ্গল্স, 
এখানে নৌচালনার অভিজ্ঞতাও নেই। এটুকু শুধু আন্দাজ করা যাচ্ছে, এখানকার জলে 
চারদিকেই ডুবোপাহাড় গিশশিশ করছে। একে ঘুটঘুটে অন্ধকার, হাওয়ার অবিশ্রাম শোঁ- 
শোঁ, ঢেউয়ের উত্তাল কলরোল--শুধু অনুমানে ভর দিয়েই জাহাজ চালাতে হবে, একটু 
এদিক-ওদিক হ”লেই ডুবোপাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ে জাহাজের তলি ফেঁসে যেতে 
পারে। আর, বুঝি তা-ই হ'তে চলেছে । আচমকা কীসের সঙ্গে একটা প্রচণ্ড ঘা লেগে 
থরথর ক'রে কেপে উঠেই দীঁড়িয়ে গেলো জাহাজ। তলিটা তাহ'লে কোনো চড়ায় গিয়ে 
লেগেছে! পরক্ষণেই বিশাল এক ঢেউ এসে লাফিয়ে পড়লো জাহাজে, একধাকায় তাকে 
আরো ভালো ক'রে নিয়ে গেলো চড়ার ওপর। ফোরকাস্ল ভেঙে পড়লো, বিষম একটা 
আর্তনাদ ক'রে যেন মাস্তুল ভেঙে পড়লো। ক্যাবিনগুলোর কাচের শার্শি বনঝন ক'রে 
উঠলো, ভাঙলোও বোধহয় । ম্যাঙ্গল্স-এর বুঝতে অসুবিধে হ'লো না জাহাজ ডাগায় 
উঠে পড়েছে। কিন্তু এ-কোন ডাঙা--? 

এই হুলুস্ুল সংঘর্ষ ও ঝাকুনির পর সকলেই বেরিয়ে এসেছিলেন ডেকে । উৎকণ্ঠিত 
সুরে গ্লেনারভন জিগেস করলেন : “ভেঙে গেছে নাকি জাহাজ? ডুবছে? 

“না। তবে এখন এই অন্ধকারে কিছুই ঠাহর করা যাচ্ছে না। সকাল না-হ'লে বোঝা 
যাবে না কোথায় এসে পৌছেছি। সকাল হ'লে নৌকো নামানো যাবে 

বিল হালি আর তার মাল্লারা ঠিক বুঝতে পারছে না কী করবে। তারা অস্থির হ'য়ে 
ছুটোছুটি করছে। 

গ্নেনারভন যাত্রীদের নিয়ে খোলে নেমে পড়লেন। ওপরে ডেকে অনেকক্ষণ ধ'রে 
বিল হ্যালির সাগরেদদের চীৎকার চ্যাচামেচি ছুটোছুটি চললো। তারপর একসময়ে সমুদ্র 
শান্ত হ'য়ে এলো, ঝড় থেমেছে, অন্তত এ প্রচণ্ড তৃফানটা আর নেই, আর তার সঙ্গে 
তাল রেখে বোধহয় বিল হ্যালি আর তার অনুচরদের দাপাদাপিও অনেকটা ক'মে এসেছে। 

সকালবেলায় আলো ফুটতেই ম্যাঙ্গল্স ছুটে চলে এলেন ডেকে। 

দূরে ডাগা দেখা যাচ্ছে। 

কিন্তু জাহাজে বিল হ্যালি বা তার মাল্লারা কেউ নেই। একমাত্র যে-নৌকোটা অক্ষত 
ছিলো সেটা নিয়েই ঝড় থামতেই তারা কেটে পড়েছে। 

তাহ'লে এঁরা এখন ডাঙায় যাবেন কী ক'রে? তীর দেখা যাচ্ছে, অথচ সেখানে 
যাবার উপায় নেই। 

“উপায় যদি থাকতোও,, এরই মধ্যে মসিয় পাঞয়ল আবার গোঁ ধরেছেন, 
“তাহ'লেও আমি নামতুম না। ক্যানিবালদের পাল্লায় পড়তে চাই না-শুনেছি এখানকার 
আদিবাসীরা সবাই মানুষখেকো । এ একটা রাক্ষসের দেশ।' 

“তা যদি হয়, তবে জাহাজকে এখান থেকে সরিয়ে নেয়া দরকার ।' কাটা-কম্পাস- 


১৫২ 


সেক্সটান্ট দিয়ে হিশেব করতে-করতে বললেন কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স। 'আমরা অকল্যাণ 
থেকে আরো-দক্ষিণে চলে এসেছি-৩৮০ ডিগ্রি অক্ষরেখায়। আরো অন্তত কুড়ি মাইল 
গেলেই আমরা নিউ-জিল্যাণ্ডের রাজধানীতে পৌছুতে পারবো ।” 

তারপরেই নিজেদের মাঝিমাল্লা নিয়ে ব্যস্ত হ'য়ে পড়লেন জন ম্যাঙ্গল্স। খোলের 
মধ্যে প্রায় দুশো টন চামড়া ছিলো-সেটা ফেলে দেয়া হ'লো, আর জাহাজ অমনি এ 
ওজনটা ফেলে দিতেই খাড়া হ'য়ে দীড়ালো। চড়ায় ঘা লেগে যে-দিকটা কাৎ হ'য়ে 
পড়েছিলো, সেদিকটায় একটু ভাঙচুর হয়েছে । দ্রুত হাতে তামার তাপ্লি লাগিয়ে সেদিকটা 
মেরামত করা হ'লো। জোয়ার এলেই যাতে যাওয়া যায়, সেজন্যে তৈরি থাকতে হবে। 

কিন্ত্ত জোয়ার যখন এলো, জাহাজ দীড়িয়ে রইলো যেমনকে তেমন। একটুও নড়লো 
না। শুধু একদিকে নোঙর ফেলে কোনোরকমে জাহাজটাকে খাড়া করাই গেলো। অর্থাৎ 
পরের জোয়ারের জন্যে সবুর ক'রে থাকতে হবে। 

আর তারই মধ্যে পাঞয়ল বায়না ধরেছেন, তিনি নিউ-জিল্যাণ্ডের অচেনা মাটিতে 
পা-ই দেবেন না। অকল্যাণ্ডের মতো রাজধানী শহর হ'লে না-হয় কথা ছিলো, সেখানে 
শাদারা বসতি বানিয়েছে, শাসনের একটা ব্যবস্থা আছে । কিন্তু যে-সব জায়গায় মাওরিদের 
রাজত্ব এখনও কায়েম হ'য়ে আছে, সেখানে পদে-পদে বিপদ হ'তে পারে। এই রাক্ষস 
মুূলুকে নামবে কে? জলপথে না-হয় এখান থেকে ভেসে চ'লে যাবারই ব্যবস্থা করতে 
হবে- সোজা অকল্যাণ্ড অব্দি। 

পরের বার জোয়ার যখন এলো, নিশুত রাতে, জাহাজ একটু দুললো৷ বটে, বিস্তু 
এমনভাবে চড়ায় আটকে গিয়েছে যে তাকে নড়ানো গেলো না। 

উহু, এভাবে বসে থাকলে চলবে না, দেখা গেলো কাপ্ডেন ম্যাঙ্গল্স-এর এই 
কথায় লর্ড গ্রেনারভনেরও সায় আছে। “এ ভাঙা মান্তুল, কাঠের সিন্দ্ুক-এ-সব দিয়েই 
একটা ভেলা বানিয়ে নিতে হবে আমাদের- হাত-পা গুটিয়ে ব'সে-থাকা মানেই বিপদকে 
ডেকে নিয়ে আসা । আরেকবার যদি অমন তুলকালাম তুফান ওঠে, তাহ'লে এই নড়বোড়ে 
জাহাজটাকে আর দেখতে হবে না-ভেঙে টুকরো-টুকরে। হ'য়ে যাবে।' 

সঙ্গে-সঙ্গে ব্ন্তসমস্ত হ'য়ে সবাই ভেলা বানানোর কাজে হাত লাগালেন। ভেলাটার 
পর পর-পর কাঠের বাক্স চাপিয়ে, কোনোরকমে একটা পা্টাতনমতো তৈরি হ'লো, 
যাতে ঢেউ উঠলেও জল এসে পাটাতনে পৌছুতে বা-পারে, একটা মাস্তুলও বসানো 
হ'লো, যাতে পাল খাটানো যায়। আর একদিকে রইলো হাল, অন্যদিকে নোঙর । 

জাহাজ থেকে ভেলায় নামিয়ে নেয়া হ'লো বিস্কুট আর নোনা মাছ। কিন্তু সর্বাগ্রে 
ভেলায় তোলা হ'লো অস্ত্রশস্ত্র, এগুলি এখন অত্যন্ত জরুরি হ'য়ে উঠেছে। 

এইবারে সত্যি-সত্যি বোঝা যাবে জন ম্যাঙ্গল্সের কেরামতি । নৌচালনায় তিনি 
যে কতটা ওস্তাদ, এটা যেন তারই একটা হাতেকলমে পরীক্ষা। 


রী ১৫৩ 


কেমন ক'রে যে তারপর সেই ভেলায় ক'রে পাড়ি দিয়েছেন তারা, সেটা কেউ 
স্পষ্ট ক'রে জানেনই না যেন। কোনো লগবুক নেই যে নথি রাখবে কেউ। দশ মাইল 
পথ পেরুতে দু-দিন লাগলো । অবিরাম যুঝতে হলো আদিম দেবতাদের সঙ্গে-জল, 
হাওয়া-আর মাঝে-মাঝেই আকাশের মুখ কালো হ'য়ে যায় ঘন মেঘে । তবে, না, সে- 
রকম তুফান নয়। শুধু পাগল হাওয়া যখন ভেলাটাকে একঝটকায় একটা চোরা পাথরে 
এনে আছড়ে ফেললো, তখন কয়েক পা এগুলেই মূল মাটি। 

কোনোরকমে সাবধানে, কত জল দেখে নিয়ে, এ কয়েক পা পেরিয়ে এলেন 
সকলে । আর অবশেষে পা দেয়া গেলো ডাঙায়, বিজনবিভুয়ে। 

লর্ড এডওয়ার্ড বলেছিলেন, এই অচেনা জায়গায় আর সবুর না-ক'রে সরাসরি 
হাঁটা দেবেন অকল্যাণ্ডের উদ্দেশে । কিন্তু আকাশ কালো ক'রে যেমন ক'রে মেঘ এলো, 
তাতে এই ইচ্ছেটা আপাতত স্থগিত রাখতে হ'লো। এক্ষুনি বরং কোনোরকমে কোথাও 
গিয়ে আশ্রয় নেয়া উচিত। বৃষ্টি নামবার আগেই। 

জায়গাটা ফাকা, উঁচুনিচি পাথর, পাঞয়ল পাথরের নমুনা দেখে বললেন যে 
বিটের রাগ া গ্রে গরাদর হ*তো, তারই প্রমাণ এই 
ছড়ানো পাথর। 

উইলসন যখন একটা গুহা আবিষ্কার করলে, ততক্ষণে মুষলধারে বৃষ্টি পড়তে শুরু 
করেছে। একমুহুূর্তও দেরি না-ক'রে, ভিজতে-ভিজতেই, ছুটে এসে গুহায় ঢুকলেন 
সকলে। ভেতরটা কিন্তু, আশ্চর্য, দিবিব শুকনো। বোঝা গেলো, এই গুহায় সমুদ্রের 
জলোচ্ছাস ঢোকে না। বিস্তর শুকনো ঘাসপাতা পড়েছিলো ভেতরে--তা যেন প্রায় একটা 
জাজিমের মতো বিছিয়ে রেখেছে প্রকৃতি। কিছু ঘাসপাতা নিয়ে যাওয়া হ'লো গুহার 
মুখে- আগুনের কুণ্ড ভ্বালিয়ে নিতে হবে। 

বৃটি ধরলেই অকল্যাণ্ড রওনা হওয়া যাবে। 

কিন্তু কাজটা যে খুব সহজ হবে, তা নয়। বেশ ক-বছর ধ'রেই মাওরিদের সঙ্গে 
ইংরেজদের ফাটাফাটি লড়াই চলেছে। মিথ্যে ধাপ্পা দিয়ে শ্বেতাঙ্গ ওঁপনিবেশিকরা দখল 
ক'রে বমতে লাগলো নিউ-জিল্যাণ্ডের প্রধান দ্বীপ দুটো--নর্থ আইল্যাণ্ড আর সাউথ 
আইল্যাণ্ড, যারা দ্বীপ দুটোর সত্যিকার মালিক, তারা ভ্রমশ পিছু হঠতে লাগলো। আর 
স্বাধীনতা বিপন্ন দেখে মরণপণ ক'রে মাওরিয়া লড়াই চালাতে লাগলো ইংরেজদের সঙ্গে 
সে-লড়াই এখনও চলছে, কিন্তু মাওরিরা বাধ্য হচ্ছে দ্বীপগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ 
এলাকা ছেড়ে দূর-দুর্গম অঞ্চলে চ'লে যেতে। কিন্তু তাই ব'লে হার স্বীকার ক'রে 
আত্মসমর্পণ করেনি এখনও । 

“খুবই বিপজ্জনক মুহুর্তে এখান এসে পৌছেছি আমরা” মসিয় পাঞয়ল বলে, 
“অকল্যাণ্ডে পৌছুতে পারলেও না-হয় কথা ছিলো। কিন্তু এখানে, পথের মাঝখান 


১৫৪ 


অতর্কিতে যদি মাওরিদের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়ে যায়, তারা যে আমাদের ছেড়ে 
কথা কইবে না-এটা মনে রাখা উচিত। 

“তাহ'লে আমরা কী করবো এখন ? 

“আমরা যেখানটায় এসে নেমেছি, সেখানটতেই বিষম যুদ্ধ চলেছে এখন-এই 
এখান থেকে অকল্যাণ্ড অব্দি-ফলে বিপদ এখানটাতেই সবচেয়ে-বেশি। 

কিন্তু এখানে এই গুহায় বসে থাকলে তো চলবে না-অকল্যাণ্ডে আমাদের যেতে 
হবেই--” লর্ড গ্লেনারভন মনে করিয়ে দিয়েছেন। 

“উত্তরদিক দিয়ে অকল্যাণ্ডে যাবার চেষ্টা করাই ভালো--ঘোরাপথ হবে বটে, তবু 
খেপে-যাওয়া মাওরিদের মুখে পড়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু সমুদ্রের ধার দিয়ে যাওয়া চলবে 
না-সেদিকটা মোটেই নিরাপদ নয়। বরং চেষ্টা করতে হবে ওয়াইপো আর ওয়াইকাতো 
নদীর মোহানায় যদি পৌছুনো যায়-- 

“এবার বুঝতে পারছি, কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স বললেন, “ঝড় কমতেই এঁ একটা মাত্র 
নৌকোয় ক'রে বিল হ্যালি তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে সটকে পড়েছে কেন। সে নিশ্চয়ই 
এ ক্ষুব্ধ মাওরিদের মুখোমুখি পড়তে চায়নি। 

পরদিন বৃষ্টি ধরতেই রওনা হলেন সবাই। পাঞয়লের কথামতোই ঘোরাপর্থটাই 
বেছে নেয়া, হ'লো। উত্তরে তিরিশ মাইল পথ যেতে হবে। কোনোরকমে এ নদী দুটির 
মোহানায় পৌছুতে পারলে পরের পঞ্চাশ মাইল পথ যেতে আর তেমন অসুবিধে হবে 
না। 

তৃতীয় দিনের দিন ধৃকতে ধুকতে অভিযাত্রা পৌছুলেন দুই নদীর সংগমে। প্রচণ্ড 
গর্জন ক'রে স্রোত লাফিয়ে পড়ছে পাথর থেকে পাথরে, ছিটকে উঠছে জল, মিহি একটা 
কুয়াশার আন্তর ঢেকে বেখেছে সব, এদিকে সন্ধেও হ'য়ে এসেছে। ক্লাস্তিতে সকলের 
শরীর এলিয়ে আসছিলো। পথে কখনও কৌটো থেকে নোনা মাছ খেয়েছেন তারা, 
একবার বেলাভূমি থেকে ঝিনুক কুড়িয়েও খেয়েছিলেন। এখন একটু নোনা মাছ আর 
শুকনো বিস্কুট খেয়ে ক্লান্ত অভিযাত্রীরা বিশ্রামের ব্যবস্থা করলেন। কাল দিনের আলো 
ফুটলে এখান থেকে যত-তাড়াতাড়ি-সম্ভব আরো এগিয়ে যেতে হবে। 


কুয়াশাটা প্রধানত তৈরি করেছিলো জলের ঝাপটা, আর তা থেকে ছিটকে-পড়া 
মিহিজলের কুচি। সেই কুয়াশা (দেখা গেলো সকালবেলাতেও আছে। পরে যখন রোদের ' 
তেজ বাড়লো, শুধু তখনই কুয়াশা সরে গেলো-আর অমনি উন্মোচিত হ'লো ওয়াইপা 
আর ওয়াইকাতো নদী দুটো-যেখানে এসে তারা মিলেছে, গোড়ায় খানিকটা গেছে 
পাশাপাশি, তারপরেই দুটো খাত পুরোপুরি এক হ'য়ে গেছে-আর সেখান থেকেই বিশাল 
ধারা অপেক্ষাকৃত শাস্তভাবে এগিয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে। 


৯৫৫ 


আর সেই নদী দিয়েই ছুটে চলেছে বিশাল-একটি ক্যানু--তার গলুই প্রায় সত্তর 
ফিট লম্বা, আর দু-ধার দিয়ে প্রায় তিন ফিট উঠে গিয়েছে ধার। সরু লম্বা ছিপ, তরতর 
ক'রে ছুটে চলেছে মাঝনদী দিয়ে। মন্ত-'একটা দেবদারু গাছ ফৌোপর! ক'রে নিয়ে তার 
খোলটা দিয়ে বানানো হয়েছে এই ক্যানু, ভেতরটায় ঝাউ-দেবদারুর পাতা আর ঝুরি 
বিছিয়েই তৈরি করা হয়েছে পুর আর নরম একটা জাজিম। আটজোড়া দীড় সামনে 
জলে পড়ছে, প্রায় যেন পিছলে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ক্যানুকে। শক্ত হাতে হাল ধ'রে 
আছে আরো-একজন। সে মাওরি, ঠিক তার সঙ্গীদের মতোই; শক্ত সুঠাম দেহ, বুকের 
খাঁচাটা চওড়া, যেমন চওড়া তার কাধ। বলিষ্ঠ বাহুতে আর পায়ের গোছে যেন নেচে 
বেড়াচ্ছে পেশীগুলো। কপালে জটিল ঝুরির মতো কত-যে রেখা কাটাকূটি ক'রে গেছে। 
সারা গায়ে উলকি-কাটা, এমনকী মুখেও। তার ভাবভঙ্গি দেখে এটা বুঝতে অসুবিধে 
হবার কথা নয় যে সে হেজিপেঁজি কেউ নয়, বরং সাধারণ মাওরিদের চাইতে একটু 
আলাদাই। অর্থাৎ কোনো-একটা গোষ্ঠীর সর্দারই হবে সে। গায়ে তার বুনোকুকুরের ফারের 
আলখাল্লা, কানে পোখরাজের দুল, আর মাওরিরা যাকে পুনা পাথর ব'লে সেই পাথরের 
মালা গলায়, তার কাধে ঝুলছে একটা বন্দুক, নিশ্চয়ই ইংরেজদের কারখানাতেই তৈরি 
নইলে এরা আর আগ্নেয়াস্ত্র নির্মাণকৌশল জানবে কী ক'রে, আর আছে একটা দু- 
হাত লম্বা খপ্জর--তার দু-দিকের ফলাতেই ধার, রোদ পড়ে ঝিকিয়ে উঠছে ফলাটা, 
আর সবুজ পাথরের হাতলটাও রোদ্দুরে ঝলমল ক'রে উঠেছে। 

সর্দারের পাশে বসে আছে আরো নজন সশস্ত্র যোদ্ধা। যারা দাড় টানছে তারা 
নিশ্চয়ই সর্দারের অনুচর--যোদ্ধারা যদি সহযোগী হয়, এরা তবে অনুগত প্রজা। 

আর ক্যানুর, ঠিক মাঝখানে প'ড়ে আছে পা-বাধা দশজন শ্বেতাঙ্গ বন্দী--তাদের 
হাতে অবশ্য কোনো বাধন নেই। এঁরা আর-কেউ নন : অভিযাত্রীরা : লর্ড ও লেডি 
গ্লেনারভন, মেরি ও রবার্ট গ্রাণ্ট, মসিয় পাঞয়ল, মেজর ম্যাকন্যাব্স, কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স, 
আর ডানকানের স্টুয়ার্ড অলৰিনেট আর দুজন মাল্লা-উইলসন আর মূলারাডি। 

কাল রাত্তিরে একটা মন্ত ভুল হয়েছিলো অভিযাত্রীদের। একে ঘুটঘুটে কালো রাত্রি, 
তায় পাঁজা-পাজা কুয়াশা, আর তারই জন্যে তারা খেয়াল করেননি যে তারা মাওরিদের 
একটা আডভায় ঢুকে পড়েছেন। তারা ঘুমিয়ে পড়তেই মাওরিরা নিঃশব্দে এসে পাকড়েছে 
তাদের, পা বেধে ফেলেছে, কেড়ে নিয়েছে যাবতীয় অস্ত্রশস্ত্র, কিন্তু কোনোরকম শারীরিক 
নির্যাতন করেনি। 

সর্দারের নাম কাই-কুমু-নামের মানে দুশমনের হাত যে চিবিয়ে থায়_ 
আক্ষরিকভাবে খায় না হয়তো, কিন্তু আলংকারিক ও সম্প্রসারিত অর্থ দীড়ায় যে শত্রুদের 
ঠুটো ক'রে ফ্যালে। কাই-কুমুর মতো বেপরোয়া ডাকাবুকো লোক সহজে দেখা যায় 
না; যেমন দুর্ধর্ষ তেমনি দুরদাস্ত। ইংরেজরা তার মাথার জন্যে ইনাম ঘোষণা করেছে 


৯৫৬ 


-জীবিত বা মৃত তাকে ধ'রে দিতে পারলেই পুরস্কার। অতিসম্প্রতি মুখোমুখি একটা 
ংঘর্ষে হেরে যেতে হয়েছে কাই-কৃমুকে, তাই সে তার কয়েকজন বিশ্বস্ত সহযোদ্ধাকে 
নিয়ে সে চলেছে ওয়াইকাতো নদীর উৎসের দিকে- সেখানে গিয়ে আরো লোকজন 
জড়ো ক'রে ফের গিয়ে আক্রমণ শানাবে। 

পর-পর যত ঘটনা ঘটেছে, তাতে বোধহয় লর্ড গ্লেনারতনের আতকে ওঠার 
ক্ষমতাটাও বিলুপ্ত হয়েছিলো। তাছাড়া, কপালের লেখা কে খণ্ডাবে-কপালে যদি আরো- 
নতুন-কোনো দুর্ভোগ লেখা থাকে, তবে তা-ই হবে। এ ঠিক সুখেদুঃখে-নির্বিকারবাদী 
স্টোয়িকদের মনোভাব নয়, বরং নিয়তিমানা কোনো মানুষের মনের ধাত। এবং এই 
মাওরিরা তো তাদের সঙ্গে গায়ে পড়ে কোনো বাড়তি দুর্যবহারও করছে না, শুধু 
অন্ত্রগুলো ছিনিয়ে নিয়েছে, আর পা বেঁধে রেখেছে। সর্দারকে একবার জিগেসও 
করেছিলেন : “আমাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছো কেন? আমাদের নিয়ে তোমরা কী 
করবে? উত্তরে সর্দার বেশ স্পষ্টগলায় ইংরেজিতেই বলেছিলো : “ইংরেজদের হাতে 
আমাদের যারা বন্দী হ'য়ে আছে, তাদের সঙ্গে তোমাদের বদল করতে চাই। ইংরেজরা 
তোমাদের চায় কি না তারই ওপর তোমাদের জীবন নির্ভর করছে। বদল না-করতে 
চাইলে তোমাদের অবশ্য মেয়ে-ফেলা হবে।' 

তার স্পষ্ট কথা শুনে লর্ড গ্লেনারভন এটুকু অন্তত বুঝেছিলেন যে আপাতত এদের 
হাতে তার কোনো ভয় নেই। যতক্ষণ-না তারা বন্দী বদলাবদলির ব্যাপারটায় একটা 
ফয়সালা করছে, ততক্ষণ অন্তত তাদের কিছু করবে না। নিশ্চয় মাওরিদের যে-যোদ্গারা 
ইংরেজদের হাতে বন্দী হ'য়ে আছে তাদের জীবন এদের কাছে বিশেষ-মৃল্যবান। এবং 
তাই কোনো-একটা বিনিময়ের সুযোগ এরা সহজে হাতছাড়া করতে চাইবে না। 

এই ওয়াইপা আর ওয়াইকাতো নদীদুটো নিউ-জিল্যাণ্ডের আদিবাসিন্দাদের বেজায় 
গর্বের বন্ত। ওয়াইকাতো নদী সবশুদ্ধু ২২০ মাইল অর্থাৎ ৩৫৪ কিলোমটার লম্বা- 
নর্থ আইল্যাণ্ডের উত্তরপশ্চিম থেকে বেরিয়ে এসে তাসমান সাগরে পড়েছে । ঠিক এমনি 
একটা নদী বেরিয়েছে সাউথ আইল্যাণ্ডের দক্ষিণপুব থেকে-সেটা ১৩৫ মাইল অর্থাৎ 
২১৭ কিলোমিটার লম্বা- সোজা পুব-দক্ষিণপুব ধ'রে সেটা নেমে এসে পড়েছে প্রশান্ত 
মহাসাগরে ওয়াইকাতোরই বুকে এসে পড়েছে ওয়াইপো। মানচিত্র দেখে এবং অন্য 
পর্যটকদের বিবরণ মনে করবার চেষ্টা ক'রে মঁসিয় পাঞয়ল অনুমান ক'রে নিতে 
চাচ্ছিলেন এই ওয়ইিকাতোর উৎসমুখে কী আছে। 

সর্দার যখন তার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলছিলো তখন দু-একটা কথা বারে- 
বারেই কানে ভেসে আসছিলো--তার মধ্যে এই কথা কটি কেমন যেন চেনা-চেনা লাগলো 
মসিয় পাঞ্য়লের : তুয়াকাউ, তুয়াহেনি পয়েন্ট, তুয়াই, তাইরাঙা। এ-সব নাম শুনে 
সবকিছু স্পষ্ট বোঝা না-গেলেও এটুকু মোটামুটি ধ'রে নেয়া গেলো নর্থ আইল্যাণ্ডের 


১৫৭ 


দক্ষিণের দিকে চলেছেন তারা-- ওয়েলিংটন পেরিয়েই হয়তো, পার্বত্যঅঞ্চলে, সম্ভবত 
সেখানেই কোনো হুদ থেকে বেরিয়ে এসেছে ওয়াইকাতো নদী। যেভাবে সহজসাবলীল 
ভাবে ক্যানু ছুটেছে, তাতে রাতে বিশ্রামের সময় বাদ দিয়ে, অনুমান করা যায় দিন- 
চারেক পরে তারা ওয়াইকাতোর উৎসমুখে গিয়ে পৌছুবেন। 

এমনিতে সারাদিন ক্ষিপ্রবেগে চলে ক্যানু যারা দাড় টানে তারা যে কী-রকম ওস্তাদ 
সেটা বোঝা যায় যে-রকম মসৃণ সাবলীল ছন্দে ক্যানু এগোয়, বোঝাই যায় কাই-কুমু 
তাদের এইজন্যেই দাড় বাইবার কাজে লাগিয়েছে, রাত হ'লেই তীরে এসে ক্যানু বেঁধে 
ডাঙায় তারা রাত কটায়। এইভাবে দু-দিন কেটে যাবার পরে আরো-একটা ক্যানু এসে 
কাই-কুমুর নাগাল ধরলে। তারা যে সদ্য-কোথাও-থেকে লড়াই ক'রে ফিরছে, সে তাদের 
রক্তমাখা অস্ত্রশস্ত্র দেখেই অনুমান করা যায়। তারা কিন্তু বন্দীদের দেখে অযথা কোনো 
কৌতুহল দেখালে না, নিজেদের মধ্যে কথাবার্তাতেই তারা তন্ময়--উটকো কয়েকজন 
শ্বেতাঙ্গকে নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। 

তারও দু-দিন পরে ক্যান পৌছুলো এমন-এক জায়গায় সেখানকার জল যেন 
সবসময়েই টগবগ ক'রে ফুটছে। বুড়বুড়ি উঠছে জলে, আর সেগুলো ফেটে শিষে কী- 
রকম যেন গ্যাস বেরুচ্ছে অবিশ্রাম। হাওয়ায় গন্ধকের গন্ধ, মাটিতে লৌহ আকরিকের 
রক্তিম আভা। দু-পাঁশের তীর ধ'রে সার-সার গেছে উষ্ণ প্রশ্রবণ, ফুটস্ত জল ফোয়ারার 
রামধনুর সাতরঙের বর্ণালি। নিউ-জিল্যাণ্ডের জ্যান্ত আগ্নেয়গিরি টোনাগারি আর 
ওয়াইকেরির ভ্বালামুখ দিয়ে তপ্ত বাষ্প আর জ্বলন্ত তরল বেরুবার পথ না-পেয়ে যেন 
পাহাড়ের হাজার চিড় আর ফাটল দিয়ে হাজার ধারায় বেরিয়ে আসছে টগবগে জল আর 
বাষ্প। হাওয়া পর্যস্ত কেমন যেন থমথমে, তণ্ত, এমনকী নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। তারই 
মধ্যে প্রায় আড়াই মাইল পথ গিয়ে বীক ফিরে হুদের মধ্যে ঢুকলো ক্যানু--দু-পাশে দুটো 
বিশাল-উঁচু পাহাড়, রক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে মাঙ্গাকিনো আর মাঙ্গাপেহি, আর তারই মধ্যে 
এই হুদ। হুদের একপাশে একটা কুড়ে। তার মাথায় উড়ছে একটা নিশেন। 

মাওরিদের জাতীয় পতাকা। 


১৫৮ 


দুই 
প্রাণ হাতে ক'রে পালিয়ে 


হ্রদের দুই পাশে উতুঙ্গ দুই পর্বত-_মাঙ্গাকিনো আর মাঙ্গাপেহি, তার একটু দূরেই মোকাই 
-_একটা জনপদ। নর্থ আইল্যাণ্ডের প্রায় মাঝখানে এই দুটি পাহাড়-অকল্যাণ্ড থেকে 
যতটা দূরে, প্রায়-ততটা "দূরেই আছে ওয়েলিংটন। অর্থাৎ মাওরিরা দু-দিক থেকে 
ইংরেজদের হাতে মার খেতে-খেতে শেষটায় একেবারে নর্থ আইল্যাণ্ডের দুর্ঘম-মাঝখানে 
এসে আশ্রয় নিয়েছে-সম্ভবত শ্বেতাঙ্গ কোনো পর্যটক এখনও এখানে পা দেয়নি, হয়তো 
জানেই না যে এখানে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী সানুদেশে স্বাধীন মাওরিরা তাদের স্বাধীনতার 
শেষ লড়াই লড়বার জন্যে এসে জড়ো হয়েছে। 

এতটা রাস্তা পেরিয়ে এসে এখানে ঢোকবামাত্র মনে হয় যেন ভূম্বর্গে এসে পৌছেছে 
কেউ। বিস্তীর্ণ শনখেতে ফুল ফুটে আছে, আর সেই ফুলের মধু খাবে ব'লে হরেক রঙের 
জানা-অজানা পাখি উড়ছে সেখানে । শনের ডাটা থেকে আঠা হয়, প্রায় মোমের মতো 
ঘন-কত-যে কাজে লাগে। পাতা থেকে তৈরি হয় কাগজ, আর শুকনো পাতা থেকে 
হয় ভ্বালানি, শন কেটে পাকিয়ে দড়ি আর সুতো দিয়ে বোনা হয় গায়ের ঢোলা জামা, 
মাদুর, চাটাই। মাওরিরা লাল আর কালো রঙে রাঙিয়ে নেয় এই জামা, আর এটাই সম্ভবত 
তাদের প্রিয়পসন্দ-কেননা অনেকেরই পরনে এই লাল-কালো আলখাল্লা। একটা গোটা 
অর্থনীতিই শধু নয়, জীবনযাপনের যাবতীয় উপকরণ যেন জোগায় এই শনখেত-যা 
গজায় উর্বর জলাভূমিতে--কোনো হুদ বা নদীর ধারে--কিংবা সমুদ্রতীরে। 

তীর থেকে দুই ফার্সং দূরে পাহাড়ের ঢালে মাওরিদের একটা নগরদুর্গ--তাদের 
ভাষায় তারা তাকে ব'লে পাহ। এই পাহ্‌ ঘেরা তিন দিক থেকে তিন পল্লা বেড়া দিয়ে 
_বাকি দিকটা যেন পাহাড়ের ঢালে বসানো। 

প্রথম বেড়া ছ্ুচলো লাঠি দিয়ে তৈরি-- প্রায় পনেরো ফিট উঁচু। তারপর শক্ত খুঁটির 
বেড়া, সবশেষে পাকানো বেত বেঁকিয়ে আরেকটা পল্লা। তারই মধ্য দিয়ে গেছে ভেতরে 
যাবার দরজা। বেড়া তিনটে পেরিয়ে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ের গায়েই সমতল খানিকটা 
জায়গা। সেখানে পর-পর সাজানো রয়েছে চল্লিশটা কুড়েঘর। 

কিন্তু যে-দৃশ্টা দেখে আতঙ্কে বন্দীদের চোখ বিশ্ফারিত হ'য়ে গেলো, সেটা আর 
কিছু নয়, দ্বিতীয় বেড়ার খুঁটিগুলোর ওপরে সারি-সারি গেঁথে-রাখা নরমুণ্ড, শূন্য কোর 
থেকে মণিবিহীন চোখ মেলে পলকহীন যেন বন্দীদের দিকেই তাকিয়ে আছে 
নরমুণ্ডগুলো। শত্রুপক্ষের লোকদের মুণ্ড কেটে এইভাবে সাজিয়ে-রাখার রীতিই আছে 


১৫৯ 


মাওরিদের মধ্যে-তারা সেই রহস্য বার ক'রে ফেলেছে, সেই প্রক্রিয়াটা, যার সাহাযে 
নৃমুণ্ডের অভ্যন্তর থেকে মগজ এবং চোখের কোটর থেকে চোখের তারা বার ক 
এনে দীর্ঘ দিন অবিকৃত রেখে দিতে পারে মুগুগুলো। আর এগুলো তো তাদে 
পুথিপুরাণইতিহাসের অংশ--একেকটা মুগুর সঙ্গে জড়ানো আছে শৌর্যবীর্য-দেশদ্রোহিত 
বিশ্বাসঘাতকতার পরিণাম-- প্রত্যেকটা মুণ্ডই যেন একেকটা কাহিনী শোনাতে চাচ্ছে 

কাই-কুমুর কুঁড়েঘরটা এই নগরদুর্গ পাহ-এর একেবারে শেষমাথায়। দৈর্ঘ্যে বি' 
ফিট, প্রস্থে পনেরো ফিট আর উচ্চতায় দশফিট--এই ঝুঁড়ের চাল ঘরের দেয়াল ছু 
মাটি অব্দি নেমে গিয়েছে । কুড়ের সামনে প'ড়ে আছে খানিকটা ফাকা জমি, সেখাে 
দরকার হ'লে অন্য কুড়ে থেকে লোকজন এসে জমায়েৎ হয়, কখনও-কখনও এই ফাব 
জমিতেই ব্যবস্থা হয় রণসাজে-সেজে কুচকাওয়াজের। ঘরের দেয়ালগুলো কিন্ত্বী অজ 
ছবিতে ভরা--যেমন আছে গাছপালা জীবজস্তর ছবি-.এ-তো একটা কিউয়ি পাখির ছা 
--তেমনি আছে ঘটনাপরম্পরারও ছবি-যেন সরল ও গতিময় টানটোনের মধ্যে শিষ্ 
ধ'রে রাখতে চেয়েছে তাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি । দুরমুশপেটানো মাটির মেঝেয় শুকনে 
ঝাউপাতা দেবদারুপাতা বেছানো, আর তার ওপরেই পেতে রাখা হয়েছে টাইফা-পাতা 
মাদুর, লাল আর কালোয় তার ওপরেও আছে অলংকরণ । মেঝের ঠিক মাঝখানটাতে 
পাথরঢাকা একটা মস্ত গর্ত--এটাই তাদের চুল্লি--আর তারই মাথাবরাবর চালেও একটু 
ফোকর--সেখান দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে যায় বাইরে। নর্থ আইল্যাণ্ডের প্রচণ্ড ঠাগডার দিতে 
ঘর গরম রাখবার জন্যে এভাবেই ব্যবস্থা ক'রে রেখেছে এরা--এদের ফায়ারপ্লেস, 
কোনোদিক থেকেই কম কাজের নয়। 

যেখানে তার শোবার ব্যবস্থা-করা, তার পাশেই তার ভাড়ারঘর। অনেক ধরনে; 
উত্তিদ, গাছের পাতা, শেকড়বাকড় জমানো রয়েছে সেখানে । একপাশে রসুই পাকাবা; 
জন্যে তোলাউনুন রয়েছে-.আর তারপরেই তার কোর্যাল-ওর ছাগল রাখার জায়? 
-সেই যবে কাণ্তেন কুক এই জীবজস্ত্রগুলোকে নিউ-জিল্যাণ্ডে আমদানি করেছিলেন 
সেই-থেকেই এয়া ক্রমাগত বংশবৃদ্ধি ক'রে মাওরিদের খাদ্য জুগিয়ে গেছে। 

কাছেই ফাকা একটা কুঁড়েঘরে বন্দীদের নিয়ে ঢোকানো হ'লো। এখনও অবি 
মাওরিদের কাছ থেকে ব্যবহারে ভয় পাবার মতো কিছু পাওয়া যায়নি, আবার আশ্বং 
হবার মতো কোনো ভরসাও কোথাও জোটেনি-তাদের সম্বন্ধে সকলেরই মধ্যে নির্লি€ 
ও নির্বিকার-একটা ওঁদাসীন্যের ভাব বন্দীরা লক্ষ করেছেন। সোজা একেবারে পাহ্‌-এ 
অর্থাৎ নগরদুর্গের মধ্যে এনে হাজির করেছে ব'লেই বন্দীদের উৎকষ্ঠার ভাবটা বেশি 
কী মর্জি হবে এদের, কে জানে। শুধু-কি সর্দারের ইচ্ছেতেই সবকিছু হয়, না বি 
অন্যসকলের কাছ থেকেও মতামত চাওয়া হয়? ভাবগতিক দেখে কিছুই বোঝবার জে 
নেই। বল্সীবিনিময়ের প্রস্তাবটায় যদি ইংরেজ কর্তৃপক্ষ রাজি না-হয়, তাহ'লে নিশ্চয়ই 


১৬০ 


এরা তাঁদের গায়ে আঁচড়টি না-কেটেই ছেড়ে দেবে না? মনের মধ্যে আরো-কোনো 
দুরভিসন্ধি নেই তো? 

কাই-কুমুর মনের মধ্যে কী আছে না-জানা গেলেও অন্যদের মনের ভাব যে কী, 
তা একটু জানা গেলো যখন দল বেধে মেয়েরা এসে হাজির হ'লো বন্দীদের দেখতে। 
কোলাহল-কলরবের মধ্যে থেকে দু-একটা যা ইংরেজি কথাবার্তা কানে এলো, তা থেকে 
বোঝা গেলো-এরা কেউই মোটেই করুণাময়ী বা মমতাময়ী দেবীপ্রতিমা নয়--বরপ্রী 
সকলেরই সাধ যেন বন্দীদের প্রকাশ্যে মুণ্ডচ্ছেদ হয়। প্রতিশোধ নেবার জন্যে তেরিয়া 
মেজাজ একেকজনের। এদেরই কারু ছেলে, কারু ভাই, কারু স্বামী ইংরেজদের 
আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে প্রাণ হারিয়েছে- এতদিন ধ'রে এই সংঘর্ষ চলেছে যে কতজনের যে 
জীবননাশ হয়েছে তার ঠিক নেই; নানারকম নিগ্রহ-নিপীড়ন হয়তো সহা করতে হয়েছে 
এদের প্রত্যেককেই, মৃত্যু হানা দিয়েছে অনবরত, আর ছিনিয়ে নিয়ে গেছে তাদের 
আপনজনদের। এদের চক্ষু দিয়ে যদি অনবরত দয়ার অশ্রু দরদর ক'রে বয়ে যেতো, 
' তাহ”লেই বরং 'অবাক হবার কিছু থাকতো । না-জেনে, অপ্রস্তুত অবস্থায়, নিউ-জিল্যাণ্ডের 
ইতিহাসের এমন-একটা দুঃসময়ে তারা এখানে এসে পা দিয়েছেন, যে এখন তাদের 
নিজেদেরই জীবন বিষম একটা সংকটে পড়েছে। 

বেশিক্ষণ আর অপেক্ষা করতে হ'লো না। একটু পরেই সামনের ফাকা মাঠটায় 
দলে-দলে মাওরিরা এসে হাজির হ'লো, আর তাদের আসতে দেখে মাওরি মেয়েরাও 
গিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দিলে। নানা বয়সের সব মানুষ । নেহাৎই কচি-কচি সব কিশোর 
থেকে মুখে বলিরেখার কুঞ্চনেভরা অতিবৃদ্ধ মাওরি--কেউই বোধহয় বাদ যায়নি। 
সকলেরই মুখ গম্ভীর, শোকাচ্ছন্ন। কেউ এখানে ফুর্তি করতে আসেনি, এটা তাদের জীবনে 
উৎসবের কোনো মুহূর্ত নয় যে তারা আনন্দের হাট বসাবে। যারা লড়াই করতে 
গিয়েছিলো, তাদের মধ্যে অধিকাংশই আর ফিরে আসেনি । কাই-কুমু নিশ্চয়ই তার সঙ্গে 
মাত্র এই ক-জন সহযোদ্ধা নিয়ে যায়নি--তাকেও রণস্থল থেকে ফিরতে হয়েছে 
বেশিরভাগকেই পেছনে ফেলে রেখে। 

কাই-কুমু কী য়েন বললে সবাইকে সম্ভাষণ ক'রে; শান্ত হ'য়ে চুপচাপ তার কথা 
শুনলে সবাই। কিন্তু তার কথা থামতেই শুরু হ'য়ে গেলো বিষম কোলাহল--সকলেই 
যেন একসঙ্গে কথা কইতে চাচ্ছে; বুড়ো-বুড়িরা কেউ কপাল চাপড়াচ্ছে, কেউ-বা 
চাপড়াচ্ছে বুক। হাত-পা ছুড়ে অন্যরা যা বলছে, তা জানবার জন্যে হয়তো ভাষান্ড 
জানতে হয় না-.কেননা তাদের বলার স্বর ক্ুদ্ধ ও রুষ্ট, প্রায় যেন সহোর শেষসীমায় 
এসে পৌছেছে তারা। 

বন্দীরা তাদের খুপরিটা থেকে সবাই যেন চোখ দিয়ে গিলছিলেন। কানে যা 
আওয়াজ, আসছিলো, তার মর্মার্থ বুঝতে এখন আর বাকি নেই। জমায়েতের বেশির 


ইন সার্চ : ১১ ডিও 


ভাগেরই মনোভাব ঠিক তাদের অনুকূলে নয়। তবে তাদের নিয়ে এরা যে কী করবে 
এখনও ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কারণ আবার একটা হাত তুলে কাই-কুমু সবাইকে থামিয়ে 
দিয়েছে, তারপর সবাই চুপ করলে পর কী যেন বলেছে তাদের হাত-পা নেড়ে। 
তারপরেই দেখা গেলো কাই-কুমুর পাশে দাড়িয়ে-থাকা একজন মাওরি এই বন্দীদের 
খুপরিটার দিকে আসছে। 

এখনই তবে জানা যাবে জমায়েতের সিদ্ধান্ত কী হ'লো। 

হঠাৎ লেডি হেলেনা লর্ড এডওয়ার্ডের কাছে এসে তার হাতটা ধ'রে শাস্ত কিন্তু 
ধরাগলায় বললেন, “এডওয়ার্ড, অন্তত একটা জিনিশ তোমাকে করতেই হবে। জীবন 
থাকতেও আমাকে বা মেরিকে এই মাওরিরা যেন তোমাদের কাছ থেকে হিচ্ছিন্ন ক'রে 
নিয়ে যেতে না-পারে। মরতে হ'লে সবাই একসঙ্গে মরবো।” তারপর জামার ভাজের 
মধ্য থেকে একটা ছোট্ট চকচকে রিভলভার বার ক'রে লর্ড এডওয়ার্ডের হাতে গুজে 
দিয়ে বললেন : “এই রিভলভারটা আমি আমার পোশাকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলুম। 
এরা কেউ আমার গায়ে হাতও দেয়নি, আমাকে তেমন ক'রে খানাতন্লাশও করেনি- 
সেইজন্যেই এতক্ষণ লুকিয়ে রাখতে পেরেছিলুম। এখন এটা আমি তোমাকেই দিলুম। 
তুমি এটা দিয়ে যা ভালো বোঝো, তা-ই কোরো ।' 

লেডি হেলেনার হাতে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে একটা চাপ দিয়ে লর্ড এডওয়ার্ড চট 
ক'রে সেটা তার পোশাকের মধ্যে লুকিয়ে ফেললেন। তার মুখটা কি-রকম কালো হ'য়ে 
শিয়েছে, শুকনো, ছায়াবিধুর আর গস্তীর। 

ঠিক সময়মতোই রিভলভারটা লুকোতে পেরেছিলেন লর্ড এডওয়ার্ড, কেননা 
পরক্ষণেই খুপরিটার দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো একজন মাওরি, লোকটা তাদের চেনা 
_ক্যানুতে সে কাই-কুমুর সঙ্গেই ছিলো, হয়তো তার ডানহাতই সে। সে ইঙ্গিতে সবাইকে 
বললে তাকে অনুসরণ ক'রে বাইরে বেরিয়ে আসতে। 

তারই পেছন-পেছন, জমায়েতের একটা ধার দিয়ে, কাই-কুমুর কাছে গিয়ে হাজির 
হলেন সবাই। জমায়েতের লোকেরা চুপচাপ হা ক'রে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে- 
তাদের মধ্যে উত্তেজনার একটা ঢেউ খেলে গিয়েছে, যেই তারা পর-পর এসে দীড়িয়েছেন 
কাই-কুমুর সামনে। তাদের চোখমুখ দিয়ে আগুন ঝরছে; মানুষের দৃষ্টি যদি কাউকে 
ভল্ম ক'রে ফেলতে পারতো, তাহ'লে এক্ষুনি হয়তো তারা জীবস্তই ঝলসে মরতেন। 

কাই-কুমুকে ঘিরে যারা দাড়িয়ে আছে, তাদের অনেককেই আগে তারা দেখেছেন 
ক্যানুতে। পরে মাঝপথে আরো-একটা ক্যানৃতে ক'রে যারা এসে যোগ দিয়েছিলো 
তাদেরও কাউকে-কাউকেও সেখানে জটলার মধ্যে দেখা গেলো। ছিতীয়-ক্যানূর 
সর্দারটিকে লর্ড এডওয়ার্ডের মনে ছিলো, কেননা প্রায় একটা দৈত্যের় মতো আকার 
তার, মুখে ভয়-ডরের কোনো লেশ নেই, সর্ধাঙ্গের উ্লকিগুলোয় ভীষণ-সব জীবজস্তর 


১৬২ 


হা করা মুখ, যেন গিলে খাবে শক্রকে। তার বয়েসও বেশি নয়, অন্তত চল্লিশের বেশি 
হবে না। হঠ্টাকট্রা জোয়ান। পথে কাই-কুমুকে দেখা গিয়েছিলো এর সঙ্গে বেশ সমীহ 
ক'রেই কথা বলতে । নিশ্চয়ই দলের লোকদের ওপর তার প্রচণ্ড প্রভাব আছে--কাই- 
কুমু তাতে যদি মনে-মনে একটু ঘাবড়ে গিয়েও থাকে, মুখে সেটা সে প্রকাশ করেনি- 
তবে একে চটিয়ে দেবার মতোও কিছু করেনি, এমন খাতির ক'রে চলেছে যেন সে 
কিছুতেই কাই-কুমুর ওপর খেপে না-যায়। মাওরিরা যখন ইংরেজদের বিরুদ্ধে নিজেদের 
অধিকার ও দাবিদাওয়া নিয়ে লড়ছে, তখন সে অহেতুক কোনো গৃহযুদ্ধের কারণ ঘটতে 
দিতে চায় না-দুজনের মধ্যে দ্বেববিদ্বেষ রেষারেষি যা আছে তা না-হয় আপাতত চাপাই 
থাকুক। এই বেপরোয়া মাওরিটির নাম কারা-টিটি--আর এমন নামেই মালুম তার 
প্রকৃতিটা কী-কারণ তাদের ভাষায় কারা-টিটি কথার মানে রগচটা, বদমেজাজি । সে 
এখন কাই-কুমুর পাশে দাড়িয়ে বেশ-তালেবর ভঙ্গিতে সবকিছুর ওপর নজর রেখে 
যাচ্ছে। বন্দীদের আসতে দেখেই তার মুখচোখে উৎকট-একটা হাসি ফুটে উঠলো। 

লর্ড গ্লেনারভন কাছে এসে দাড়াতেই কাই-কুমু জিগেস করলে : “তোমরা কারা? 
ইংলণের লোক? 

হ্া।, 

“তোমাদের যদি আমরা ইংরেজ সরকারের হাতে তুলে দিই, তবে কি তারা এর 
বিনিময়ে আমাদের দলের লোকদের ছেড়ে দেবে? বিশেষ ক'রে আমাদের পুরুৎ 
তোহোনগাকে? 

“জানি না।' 

“জানো না মানে? 

“আমরা নেহাংই সাধারণ লোক। আমরা যে এখানে এসেছি, তা-ই ইংরেজ 
সরকারের কেউ জানে না। তাছাড়া আমরা কেউ জাদরেল সেনাপতিও নই, পুরুৎও 
নই।' 

*কিস্তব আমরা তোমার বদলে আমাদের পুরোহিতকে ফেরৎ চাই। তোমাকে তার 
ব্যবস্থা করতে হবে। 

“আমি কী ব্যবস্থা করতে পারি-.সরকারের কাছে আমার তো কানাকড়িও দাম 
নেই।' তারপরেই লর্ড গ্লেনারভনের চোখ প'ড়ে গেলো লেডি হেলেনা আর মেরির ওপর। 
অমনি গলার স্বর পালটে তিনি বললেন : “তবে সরকার হয়তো এদের কথা বিবেচনা 
করবেন।' মেয়েদের দিকে দেখালেন তিনি। 'এরা আমাদের দেশের অভিজাত সমাজের 
মানুষ-সরকারের কাছে নিশ্চয়ই এঁদের মূল্য অনেকা। 

কথাটা কানে যেতেই কাই-কৃমুর মুখে একটা ধূর্ত মূদুহাসি খেলে গেলো। 

. “তুমি কি আমাদের বোকা ঠাউরেছো? ভেবেছো, যা-খুশি তা-ই বালে দিয়ে পার 


১৬৩ 


পাবে ? কাই-কুমুর চোখকে ধুলো দেবে? শেষ কথাটা বলবার সময় কাই-কুমুর গলার 
স্বরে যেন যতরাজ্যের উদ্মা ঝরে পড়লো। আঙুল তুলে লেডি হেলেনাকে দেখিয়ে সে 
বললে : “এ তো তোমার বৌ-এ যদি কোনো ওপরমহলের মেয়ে হয়, তাহ'লে তুমি 
বুঝি ওপরমহলের কেউ নও ?, 

লর্ড গ্রেনারভন কিছু বলবার আগেই কাই-কুমুর পাশ থেকে এগিয়ে এলো কারা- 
টিটি, সোজা গিয়ে লেডি হেলেনার একটা হাত ধ'রে বললে : “এ যদি ওর বৌ না-হয়, 
তবে তো বোঝাই যাচ্ছে-এ আমার বৌ-- 

কারা-টিটি আর কী বলতো, কোনোদিনই জানা যাবে না। কেননা তার কথা শেষ 
হবার আগেই তড়িৎগতিতে লর্ড গ্লেনারভনের হাতে উঠে এসেছে সেই খুদে রিভলভারটা, 
আর এমনকী ঠিকমতো তাগ ঠিক না-ক'রেই লর্ড গ্লেনারভন ঘোড়াটা টিপে দিয়েছেন : 
“গুডুম !' এবং, পরক্ষণেই, মাটিতে লেডি হেলেনার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েছে কারা- 
টিটির প্রাণহীন দেহ, ব্যাপারটা ঘটতে সময় লেগেছে বোধহয় চোখের একটা পলক, 
কেননা কারা-টিটির দেহটা যখন মাটিতে আছড়ে পড়েছে তখনও রিভলভারের নল 
থেকে ধোয়া বেরুচ্ছে। 

কিন্ত্ত ততক্ষণে লর্ড গ্লেনারভনের ওপর ঝাপিয়ে পড়েছে কাই-কুমুর দেহরক্ষীরা_ 
এক হ্যাচকা টেনে কেড়ে নিয়েছে তার হাতের রিভলভারটা। তারা হয়তো লর্ড 
গ্লেনারভনকে ছিড়েই ফেলতো, যদি-না সেই মুহূর্তে শোনা যেতো কাই-কুমুর 
বজ্রনির্ধোষ : “ছাড়ো ! ছাড়ো ! এর গায়ে হাত দেয়া চলবে না! অমঙ্গল! অমঙ্গল! 

আর যেন মন্ত্রের মতো কাজ করেছে কথাগুলো--প্রায় ছিটকেই লর্ড গ্লেনারভনের 
কাছ থেকে স'রে গিয়েছে দেহরক্ষীরা, যদি ধর্মবিরুদ্ধ ব'লে কাউকে স্পর্শ করাও নিষিদ্ধ 
ক'রে দেয়া হয়, যদি ট্যাবু বলা হয় তাকে, যদি বলা হয় অমঙ্গল, যেমন বলে পলিনেশিয়ার 
আদিবাসিন্দারা, তবে কেউ তাকে ছোয় সাধ্য কী। 

ট্যাবু কথাটা এসেছে পলিনেশিয়ার দ্বীপের আদিবাসিন্দার ভাষা তোঙ্গান থেকে- 
আর তাদের এই ট্যাবুর প্রয়োগই দেখা গেছে ভিন্ন-ভিন্ন দ্বীপে ও দেশে--তাদের 
আদিবাসীদের মধ্যে, তারা কখনও বলেছে অমঙ্গল বা অভিশাপ, কখনও-বা বলেছে 
ধর্মবিরদ্ধ বা দেবতার রোষ, আর কতগুলি বস্তু বা জীবকে পুরে দিয়েছে নিষেধের 
পটভূমিকায় । 

আর এমন না-ক'রে তাদের কোনো উপায় ছিলো না। বেচে থাকার জন্যেই তাদের 
এমন ক'রে নিতে হয়েছিলো । আর এই পুরো ধারণাটা উৎসারিত হয়েছিলো আদিম 
একটা প্রবৃত্তি--ভয় থেকে, আতঙ্ক থেকে । বিশেষ ক'রে কাউকে যদি থাকতে হয় কোনো 
একটা স্বীপে, যেখানে সমুদ্র গর্জায় আক্রোশে, ঝঞ্জা হানে ধবংস, অগ্নুদ্গার করে 
আগ্নেয়গিরি, যেখানে যা অজানা, অচেনা তারই মধ্য থেকে হঠাৎ দুম ক'রে বেরিয়ে 


১৬৪ 


আসে সর্বনাশ, যেমন এঁ-যে শিকড়বাকড় তা থেকে যদি আসে গরল, এঁ-ষে লতাপাতা 
এঁ-যে সুন্দর দেখতে ফল তার ভেতর লুকিয়ে থাকে হলাহল, তাহ'লে সাবধান না- 
থেকে উপায় নেই, কেননা সাবধানের মার নেই-আবার মারেরও তো সাবধান নেই 
-কোথেকে যে সে কখন এসে ঝপিয়ে পড়ে ঠিক কী। যেমনভাবে মা তার শিশুকে 
ভয় দেখায় না-না, আগুনে হাত দিতে নেই, তেমনিভাবেই কোনো-কোনো গোষ্ঠীকে 
ঠিক ক'রে নিতে হয়--না-না, এটা ছোয়াও চলবে না, ছুলেই বিপদ হবে, সর্বনাশ হবে, 
ভয়ংকর-কিছু-একটা হবে ষেটাকে আর-কিছুতেই শামাল দিয়ে ওঠা যাবে না। এমনতন 
যে হু'লো, তা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। এই রুক্ষ বন্ধুর সিন্ধুজলে ঘেরা মাটির একরত্তি 
একটা জায়গান্তে এসেই প্রাণ তার জয়ের নিশান উড়িয়েছে, আর সে-জায়গাটাকে 
সুরক্ষিত রাখতে হবে, সাবধানে আগলে-আগলে রাখতে হবে, এ তো দ্যাখোনি সেবার 
বন্যায় সব কুড়েবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে গেলো, নদী কী-রকম ফুলে ফেঁপে উঠে ঝাপিয়ে 
পড়েছিলো গোটা লোকালয়ের ওপর-ফলে নদীকে কখনও চটতে দিলে চলবে না, 
দেখতে হবে কিছুতেই নদীর যেন আবার মেজাজ খারাপ না-হয়, সে যেন আবার সকলের 
ওপর রাগ না-ক”রে বসে ! তেমনি আগুনের পাহাড়টাকেও চটিয়ে দিলে চলবে না, ঝড়ের 
রাতের এঁ বাজবিদ্যুংকেও না; বরং যে-সব জায়গায় থাকলে অতর্কিতে মরণ এসে 
ঝাপিয়ে পড়তে পারে, সে-সব জায়গা থেকে হাজার হাত দূরে থাকাই ভালো, এখনও 
তো ভালো ক'য়ে জানা নেই কেন মাটি কেপে ওঠে হঠাৎ-হঠাৎ আর পাহাড় থেকে 
গড়িয়ে পড়ে বড়ো-বড়ো পাথরের চাই, ভেঙে পড়ে গাছপালা, ঘরবাড়ি, গোটা-গো্টা 
সবপাহ । অমঙ্গল! অমঙ্গল ! ঘোর অমঙ্গল ! ছিটকে দূরে সবে এসো তার কাছ 
থেকে- কিছুতেই আর তার সঙ্গে গা ঘেঁসাঘেসি করতে যেয়ো না-বন্ধভাবেও না, 
শত্রভাবেও না--জানো না তো কীসে সে খেপে উঠবে, তারপর একেবারেই আর বাগ 
মানানো যাবে না তাকে। 

আর এই বোধ থেকেই জন্ম নিলো রীতিনীতি পালপার্বণ অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠান। কেননা 
কাকে কীভাবে ছুলেই যে তার ভেতর জেগে ওঠে প্রচণ্ড অতিপ্রাকৃত শক্তি অথবা সে 
দূষিত হ'য়ে গিয়ে সবকিছু বিপজ্জনকভাবে নষ্ট ক'রে যায়-তার কোনো হদিশই তো 
জানা নেই। ন্যায়নীতিই হোক, রুচিকুরুচিই হোক-কোনো-কোনো জিনিশ তাই গহিত, 
কোনো-কোনো কাজের মধ্যে তাই মারাত্মক ঝুঁকি আছে, কোনো-কোনো বস্তুর মধ্যে 
তাই লুকিয়ে আছে অপরিসীম রহস্যময় কোনো শক্তি, মানুষের-চাইতেও-বড়ো,--যেটা 
হয়তো পান থেকে চুন খসলেই লাগামছেঁড়া কোনো দুর্যোগের মতো ধেয়ে আসবে। 

আর এই মঙ্গল-অমঙ্গলের বোধই ধ'রে রেখেছে গোটা সমাজটাকে। 

ঘে-মুহূর্তে তাই কাই-কুমু চেঁচিয়ে উঠলো : “ছাড়ো-ছাড়ো! এর গায়ে হাত দেয়া 
চলবে না। অমঙ্গল! অমঙ্গল !', অমনি তার দলের লোকেরা আতকে উঠে পেছিয়ে এলো, 


১৬৫ 


লর্ড গ্লেনারভনকে ছেড়ে দিলো। 

লর্ড গ্লেনারভনকে ধ'রে তার দলের লোকেরা যখন ছিড়ে ফেলতে গেছে, তখনই 
কেন কাই-কুমু অমঙ্গল! অমঙ্গল! ব'লে চেচিয়ে উঠেছে? সে কি তবে ভেবেছে যে 
তার মধ্যে অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তি আছে--যার বলে নিরস্ত্র হওয়া সত্বেও জামার ভেতর 
থেকে বার-ক'রে এনেছেন আগুনওগরানো রিভলভার? না কি সে ভেবেছে, লর্ড 
প্লেনারভনকে মেরে ফেললে কিছুতেই আর দরকষাকষি করা যাবে না ইংরেজদের সঙ্গে, 
তার বিনিময়ে মুক্তি কিনে-আনা যাবে না তাদের জাদুজানা অসীম শক্তিধর পুরুৎ্প্রধান 
তোহোনগার? না কি সে হঠাৎ আবিষ্কার ক'রে বসেছে এই লর্ড গ্লেনারভনের জন্যেই 
এখন অপসৃত হয়েছে তার প্রতিদ্বন্দ্বী, তারই পদাকাঙক্ষী রগচটা এঁ কারা-টিটি, আর 
তাই এইমুহূর্তে সে কৃতজ্ঞতার বশেই প্রাণে মারে ফেলতে চায়নি লর্ড গ্লেনারভনকে ? 

কারণ যা-ই থাক না কেন, কাই-কুমুর নিদেশে মাওরিবা লর্ড গ্রেনারভনের সঙ্গে 
অন্য বল্দীদেরও টেনে-হিচড়ে নিয়ে গেলো পাহাড়ের ঢালে, আরো-ওপরে, যেখানে 
থেকে দরজা বন্ধ ক'রে দিয়ে চ'লে গেলো মাওরিরা--বাইরে কড়াপাহারায় রইলো সশস্ত্র 
একদল প্রহরী । 

আর ঠিক তক্ষুনি লর্ড গ্লেনারভন আবিষ্কার করলেন, মসিয় পাঞয়ল আর রবার্ট 
ছাড়া তারা সবাই আছেন এখানে । মেরির অবস্থা ক্রমশই সঙিন হয়ে উঠছে । আর তাকে 
সান্তনা দেবার মতো কোনো কথাও ঠিক খুঁজে পাচ্ছেন না লেডি হেলেনা । জন ম্যাঙ্গল্স 
সমুদ্রের তুলকালাম ঝড়েও কোনো ভয় পান না, এখন তিনিও কী-রকম যেন ঘাবড়ে 
গিয়ে ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছেন। মেজর ম্যাক্ন্যাব্সকে সবাই জানে হাজার বিপদেও 
চিরকাল মাথাঠাণ্ডা রাখেন, আর মাথা হ্যতো এখনও তার ঠাণ্ডাই আছে, কিন্তু এটা তিনি 
জানেন না মাঙ্গাকিনো আর মাঙ্গাপেহির মাঝখানে, এই পাহাড়ঘেরা উপত্যকায়, মাওরিদের 
এই মন্দিরে এইভাবে যে তিনি বল্দী হ'য়ে আছেন--এই অবস্থায় তিনি ঠিক কী করবেন। 
কারা-টিটিকে ও-রকম অতর্কিতে অপ্রত্যাশিতভাবে হত্যা করার জন্যে লর্ড গ্নেনারভনকে 
একটা মাশুল দিতেই হবে, এবং সেটা মৃত্যু-আর একবার যদি তাকে এরা হত্যা করে, 
তবে অন্যদেরও এরা নিশ্যয়ই ছেড়ে কথা কইবে না। কাই-কুমুর মনের মধ্যে যে সত্যি 
কী আছে, সেটা অনুমান করাও অসম্ভব-যতই “অমঙ্গল! অমঙ্গল ! ব'লে সে চেচিয়ে 
ট্াবুর স্মরণ নিক, তাদের সে অক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দেবার জন্যেই নিশ্চয়ই এখানে 
বন্দী ক'রে আনেনি। আর--কোথায় গেছে রবার্ট গ্রান্ট-আর সেই সঙ্গে, এ আধপাগলা 
ফরাশি পণ্ডিত--জাক পাঞয়ল? তাদের কি এর মধ্যেই বধ্যডভূমিতে নিয়ে গেছে এরা? 
কোথায় তাহ'লে সেই বধাভূমি? 

এইসব বিদথুটে সব ভাবনায় তার মাথার মধ্যেটা কেমন যেন অস্থির হ'য়ে উঠতে 


১৬৬ 


চাচ্ছে। ছটফট ক'রেই কেটেছে সারা রাত--কিস্তু রবার্ট আর জাক পাঞয়লের কী হ'লো, 
সেটা জানবার কোনো উপায় খুঁজে পাননি মেজর ম্যাকন্যাব্স--বাইরে যে সশস্ত্র যোদ্ধার 
দল পাহারা দিচ্ছে, তারা হয়তো জানে এ দুজনের হদিশ--কিন্তু তাদের জিগেস করবার 
কোনো সুযোগ হয়নি-কেননা তারা কখনও এমনকী এই বন্দীশালার দরজার কাছেও 
আসেনি। ৃ 

অথচ সময় যখন থেমে গেছে ব'লে মনে হচ্ছে, তখনও একসময় ভোর হ'য়ে 
এলো । মাওরিদের দিক থেকে তবু কোনো সাড়া এলো না। সারাদিন কাটলো সেই অস্থির 
জিজ্ঞাসায়-কী করতে চাচ্ছে এরা, তাদের বন্দী ক'রে রেখে? যদি দেবতার কাছে বলি 
দেবে বলেই ঠিক ক'রে থাকে, তাহ'লে তাদের আর খোঁজখবর নিচ্ছে না কেন? পুরুত্রা 
কি কোনো বিশেষ লগ্নের অপেক্ষায় আছে এখন ? তারা কি এমন-কোনো বিশেষ ক্ষণের 
অপেক্ষা করছে, যখন এই-যারা তাদের অমঙ্গল ডেকে এনেছে, তাদের মহাধুমধাম ক'রে 
বলি দিলে দেবতারা আর রুষ্ট হবেন না? না কি বন্দী-বিনিময়ের ভাবনাটাই কাই-কুমু 
এখন বাতিল ক'রে দিয়েছে? 

নিজেদের মধ্যে কথা বলতেও ইচ্ছে হচ্ছিলো না। মেজর ম্যাক্ন্যাব্সের শুধু মাঝে- 
মাঝে মনে হচ্ছিলো, কারা-টিটিকে হত্যা ক'রে লর্ড গ্লেনারভন বোধকরি কাই-কুমুর 
শত্রুকেই উৎপার্টিত করেছেন-তার হয়তো মনে হয়েছে যে সে কাটা দিয়েই কাটা 
তুলেছে, যে-প্রতিদ্বন্দীকে সে তার পথ থেকে সরাতে চাচ্ছিলো, তাকে হত্যা ক'রে লর্ড 
গ্নেনারভন হয়তো তার সাহায্ই করেছেন? 

পর-পর তিন দিন বাইরে শয়ান রইলো কারা-টিটির মৃতদেহ, প্রায় রাজকীয় 
শোকপালনের মতোই যেন ব্যাপারটা। তারপরে তারা তার অস্তেষ্টি সারবে, আর তখনই 
নিশ্চয়ই বন্দীদের সম্বন্ধে কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেবে। অন্তত তিনদিন পরে যখন 
বন্দীশালার দরজা খুলে দেয়া হলো, তা-ই মনে হ'লো মেজর ম্যাকন্যাব্সের : এবার 
একটা-কিছু ফয়সালা হবে। কারণ নগরদুর্গের বড়ো চকটায় জড়ো হয়েছে কয়েকশো 
মাওরি নারীপুরুষ- আবালবৃদ্ধবনিতা--কিন্তু তারা কেমন থম মেরে আছে, অস্বাভাবিক 
শান্ত, যেন ঠিক ঝড়ের আগেকার আকাশ-বাতাস। 

কাই-কুমু এসে উঠে দীড়িয়েছে একটা ছোট্ট টিবির ওপর। তার পেছনে চাদের 
কলার মতো অর্ধবৃত্তীকারে গোল হ'য়ে ঘিরে দাঁড়িয়েছে কয়েকজন মাওরি যোদ্ধা। আর 
পাহারারা এসে বন্দীদের নিয়ে গেলো কাই-কুমুর সামনে। 

বন্দীরা সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই, গম্ভীরগলায় লর্ড গ্লেনারভনকে জিগেস করলে কাহি- 
কুমু : 'কারা-টিটিকে তুমি হত্যা করেছো? 

এমন প্রশ্নের উত্তর কী হয়? “হ্যা 

“কাল সকালে সূর্যোদয়ের সময় তোমার মরণ হবে।' 


১৬৭ 


শুধু আমার? 

শুধু তোমার। অন্যরা থাকবে, তোহোনগাকে ফিরিয়ে আনবার জন্যে তাদের চাই 
--বদলাবদলির জন্যে দরকার হবে। 

ঠিক এমন সময়ে একটা উত্তেজিত কোলাহল উঠলো জমায়েতের একপ্রান্তে। দেখা 
গেলো, দ্রুতপায়ে ভিড় ঠেলে এশিয়ে আসছে একজন যোদ্ধা, তার সারা-গা ধূলিধূসর, 
মুখে প্রচণ্ড ব্রান্তির ছাপ, কিন্তু কোন-এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞায় সে তবু এগিয়ে আসছে এইদিকেই। 

তাকে দেখেই কাই-কুমু কেমন যেন উদ্বিগ্ন হ'য়ে উঠলো। বন্দীরা যাতে বুঝতে 
পারে, সম্ভবত সেইজন্যেই পরিষ্কার ইংরেজিতে জিগেস করলে : “পাকিহাদের 
( শ্বেতাঙ্গদের ) শিবির থেকে আসছো ?, 

সে শুধু ঘাড় নেড়ে জানালে, “হ্যা। 

“এখনও কি তোহোনগা সেখানে আছে? তার সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছে ?' 

«দেখেছিলাম একবার, যখন ইংরেজরা তাকে একটা খুঁটির গায়ে বেধে গুলি ক'রে 
মেরে ফেললো !, | 

এইই তবে শেষ! ফায়ারিংস্কোয়াডের গুলিতে তোহোনগার এই মৃত্যু বন্দী- 
বিনিময়ের সমন্ত চেষ্টাকেই যেন বিষম উপহাস ক'রে একধাক্কায় ধূলিসাৎ ক'রে দিয়েছে। 

ঘুরে দাঁড়ালে কাই-কুমু। “কাল সকালে সূর্য ওঠবার সময়, খুব শাস্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে 
সে বললে, “তোমাদের প্রত্যেককে মরতে হবে।, 

ব'লেই সে আবার ব্যস্ত হ'য়ে পড়লো। তার নিজের ভাষায় সে অনুচরদের দিকে 
ফিরে হুকুম দিলে কারা-টিটির অস্তেষ্টির-আর অমনি জমায়েতের মধ্য থেকে উঠলো 
হাহাকারের রোল--বুক চাপড়ে টেনে-টেনে সুর ক'রে কাদতে লাগলো মাওরিরা। 

আসলে এই অপঘাতমৃত্যু তো শুধু কারা-টিটির নয়--তার সঙ্গে-সঙ্গে এখন 
পরলোকে যেতে হবে তার স্ত্রীকেও--কেননা মৃত্যুর পরপারে গিয়েও তাকে সঙ্গ দিতে 
হবে তার স্বামীকে, যাতে সে একা-একা হন্যে হ'য়ে প্রেতলোক থেকে ফিরে এসে পুরো 
পাহ-র ওপর আর হানা না-দেয়। বেচে থাকবার সময় কারা-টিটি যেভাবে জীবনযাপন 
করতো, মৃত্যুর পরেও সে যাতে সেইভাবেই তার দিন কাটাতে পারে, সেইজন্যে শুধু 
তার স্ত্রীকেই নয়, যারা তার সেবা করতো সেই অনুচর-পরিচরদেরও এবার মৃত্যুর 
পরপারে যেতে হবে তাকে সঙ্গ দেবার জন্যে । আর এরা যাতে মৃত্যুর জনো তৈরি হ'তে 
পারে, সেইজন্যেই কারা-টিটির মৃত্যুর পর তার অস্ত্েষ্টির ব্যবস্থা করতে এই তিনটে 
দিন গেছে। অর্থাৎ, মরা নেতার যাতে সেবার কোনো ত্রুটি না-হয়, সেইজন্যে মরতে 
হবে অন্য মানুষদেরও। বহযুগের ওপার থেকে এই-যে অনড় এবং অমোঘ নিয়ম চ'লে 
আসছে, এটা সমাজের সবাই জানে : এই ব্যবস্থাই তো চ*লে আসছে যুগ থেকে যুগে, 
স্মরণাতীত কাল থেকে । এই নিয়ম যে কখনও বাতিল ক'রে দেয়া যায়, এটা কখনোই 


৯৩৮ 


কারু মাথায় আসে না- সবাইকেই বরং বিনাপ্রতিবাদে মেনে নিতে হয় এই মৃত্যু--এবং 
যারা মরবে তাদের ঘিরে বেজে-ওঠে ডুকরে-ওঠা হাহাকার; কিন্তু এই হাহাকার বোধহয় 
যারা এখন মরবে, তাদের জন্যে নয়, বরং যে আগেই ম'রে গিয়েছে, তার জন্যে। মাঙ্গাপোহি 
পাহাড়ের চূড়ায়, এখান থেকে দূরে, তৈরি হয়েছে সমাধিভবন-_-তার চারপাশে লালরং- 
করা সারি-সারি খুঁটি বসানো-একটা চৌখোপ-মতো- সেখানে নিয়ে-যাওয়া হবে স্বামী- 
স্ত্রীর মৃতদেহ, সঙ্গে তাদের সেবকদের প্রাণহীন দেহও যাবে-সেখানে এর মধ্ই নিয়ে 
যাওয়া হয়েছে প্রেতাত্মাদের তৃপ্তির জন্যে খাদ্য ও পানীয়, আর চারপাশে থরে-থরে 
সাজিয়ে রাখা হয়েছে অস্ত্রশস্ত্র, বাসনকোশন, গয়নাগাটি আর সাজগোজের আয়োজন 
_যাতে কোনোরকম কষ্টই না-হয় এই মৃতদের। আর একবার সেখানে তাদের রেখে 
আসার পর এঁ লাল খুঁটি দিয়ে ঘেরা জায়গায় আর-কারু যাবার অধিকার থাকবে না 
_এটা তখন হ'য়ে যাবে কারা-টিটির জায়গা, বাকিদের কাছে এ-জায়গা হবে নিষিদ্ধ, 
সেখানে অনধিকার প্রবেশ ক'রে মৃতের শাস্তিভঙ্গ করার কথা এমনকী দুঃন্বপ্রেও আর- 
কারু মনে হবে না, এ-জায়গাটা অন্যদের কাছে ট্যাব হ'য়ে যাবে, অমঙ্গলের অকুস্থল 
_কেননা যে-ই এখানে পা দেবে তারই কাধে চেপে বসবে প্রেতাত্মা-আর গোটা 
গোষ্ঠীর জীবনই তাতে বিপন্ন হয়ে উঠবে। 
যখন শোভাযাত্রা ক'রে মৃতদেহ নিয়ে-যাওয়া হ'লো এ লাল খুঁটিতে ঘেরা 
প্রেতভবনে, বন্দীদের ফের ফিরিয়ে আনা হ'লো মন্দিরের সেই বন্দীশালায়। পরদিন 
মাঙ্গাকিনোর ওপর সূর্যের প্রথম আলো পড়বার সঙ্গে-সঙ্গেই বন্দীদের নিয়ে-যাওয়া হবে 
বধ্যভূমিতে। মাত্র একটা রাত, তারপরেই সব শেষ হ'য়ে যাবে। 
এরই মধ্যে তাদের জন্যে বন্দীশালায় খাদ্য ও পানীয় রেখে গেছে প্রহরীরা । নিঃশব্দে 
সবাই তাদের শেষ-পানভোজন শেষ করলেন_কারু মুখে টু শব্দটি নেই, কে যে কী 
ভাবছে কেউ জানে না; সত্যি-তো, কী ভাবে লোকে, যখন জানে আর কয়েক ঘণ্টা 
বাদেই অমোঘ মৃত্যু এসে হানা দেবে ? কিশোরী মেরি গ্রযান্ট কী ভাবছে এখন; কাণ্ডেন 
'দন মাঙ্গল্সের সঙ্গে তার যে মন-দেয়া-নেয়ার পালা শুরু হয়েছিলো এই দীর্ঘ 
মুদ্রযাত্রায়, তার যে পরিণাম এমন হবে, সে কি কখনও তা স্বপ্রেও ভাবতে পেরেছিলো 
-ব্যর্থ, বিফল, অপূর্ণ! আর লেডি হেলেনা ও লর্ড গ্রেনারভন--তারা সবে তাদের 
'মোদতরণী তৈরি ক'রে মহড়া দিতে বেরিয়েছিলেন সমুদেে, আর হঠাৎ একটা হাঙরের 
পট থেকে বেরিয়ে পড়লো একটা বোতল--আর জলে-ধুয়ে-যাওয়া তিনটে চিরকুট ! 
র সেটাই যেন ছিলো নিয়তির ডাক--এত-পথ তাদের নাকেদড়ি দিয়ে ঘুরিয়ে শেষটায় 
নে হাজির করেছে এই-কোন বিদেশ-বিভুয়ে, ঠিক মৃত্যুর আগের রাতটায়! বেচারি 
গ্রান্ট-ভেবেছিলো কাপ্তেন গ্রান্টের মতোই জাহাজ চালাবে, সে এমনকী জাহাজ 
লাবার ঘাতঘৌৎ এখনও শিখে উঠতেই পারেনি, যতই কেননা তার থাক দুর্মর অধ্যবসায় 


১৬৪৯ 


আর দূর্জয় উৎসাহ! আর কাণ্তেন জন ম্যাঙ্গল্স--সদ্য একটা চমৎকার স্টিমশিপের 
পূর্ণদায়িত্ব পেয়েছিলেন--আর মনে হয়েছিলো এই বুঝি তার জীবনে সুদিন সবেমাত্র 
শুরু হ'লো, কেননা প্রায়-তৎক্ষণাৎ তার পরিচয়--.আর ঘনিষ্ঠতাও--হ'লো তরুণী মেরি 
গ্রান্টের সঙ্গে-কিন্তু সব পথ এসে শেষকালে শেষ হ'য়ে গেলো এই মৃত্যুপুরীতে ! মেজর 
ম্যাকন্যাব্স--তার এই পথ্গশ বছরের জীবনে কম বার তো মুখোমুখি হননি মৃত্যুর-কিন্তু 
তিনিও কি কখনও ভাবতে পেরেছিলেন এমনিভাবে একদিন মৃত্যু তার ভয়াঙ্গ চোখ 
মেলে তার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকবে? 

চারদিন আগে লাঞ্কনার ভয়ে নিজের জামার মধ্যে লুকোনো রিভলভারটা লর্ড 
গ্লেনারভনের হাতে তুলে দিয়েছিলেন লেডি হেলেনা, “যদি দ্যাখো আমার ইজ্জতে টান 
পড়েছে, আমাকে গুলি ক'রে মারতে দ্বিধা কোরো না, বলেছিলেন এইরকম কোনো 
কথা, এখন সেই রিভলভার কেড়ে নিয়ে গেছে মাওরিরা--কারা-টিটিকে গুলি করার 
পর। এখন আর-কোনো অস্ত্রই নেই তীদের হাতে । না কি আছে কোনো শেষঅস্ত্র? 

গ্লেনারভন চাপাগলায় জন ম্যাঙ্গল্সকে জিগেস করলেন : “জন, মেরি তোমাকে 
যা বলেছে, সেটা তুমি করতে পারবে তো? হাত কাপবে না তো? 

“নিশ্চয়ই, বলেই জামার ভেতর থেকে একটা ছোরা বার ক'রে দেখালেন কাণ্তেন, 
“আপনি কারা-টিটিকে গুলি করবামাত্র যে-হুলুস্থুলু বেধে গিয়েছিলো, সেই সুযোগে আমি 
কোমর থেকে ছুরিটা টেনে নিয়েছিলুম।' 

মেজর ম্যাক্ন্যাব্স শাস্তগলায় শুধু বললেন, “দুম ক'রে হঠাৎ কিছু ক'রে-বসা ঠিক 
হবে না। 

লর্ড গ্লেনারভন দৃঢস্বরে বললেন : “আমরা তো সবাই মরতেই বসেছি-তাহ'লে 
মিথ্যে আর মরণকে অত ভয় পাবো কেন? কিন্তু মৃত্যুর বাড়াও একটা জিনিশ আছে 
--সেটা কারু ইজ্জত, মানসম্মান-তাতে কোনো আচড় পড়ুক, তা আমি চাই না। 

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স উঠে গেলেন একবার, দরজায় মাদুরের পন্লা ঝোলানো, সেটার 
একটা কোণা তুলে উকি দিলেন বাইরে। দূরে, ঘন অন্ধকারের মধ্যে একটা আগুনের 
কুণ্ড জুলছে। তার পাশ থেকেই জনাপচিশ সশস্ত্র প্রহরা কড়ানজর রেখে যাচ্ছে এইদিকে। 
সেখান থেকে সরু-একটা পথ পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে এসেছে দরজাটা অন্দি--সজাগ 
পাহারার চোখ এড়িয়ে এ-পথ দিয়ে দু-পাঁও যাওয়া যাবে না। এছাড়া এই বন্দীশালার 
দু-পাশ দিয়ে নেমে গেছে গভীর খাদ, কম ক'রেও একশোফিট গভীর খাদ--পাহাড়ের 
ঢাল নেমে গেছে সোজা, খাড়াই, সরাসরি ঘন অন্ধকারের মধ্যে-সেখান দিয়ে বেটে 
পালাতে পারবে শুধু-কোনো সরীসৃপ, আর-কেউ নয়। অর্থাৎ : পালাবার কোনো রা; 
নেই কোথাও। 

আকাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, ঘন মেঘে ঢাকা পড়েছে চাদ আর তারারা, কেম 


১৪০ 


যেন থমথম করছে সব, শুধু উদ্দাম হাওয়ার ঝাপটা আসছে মাঝে-মাঝে, আর দপদপ্প 
ক'রে লাফিয়ে উঠছে আগুনের শিখা । অমনি চোখে প'ড়ে যাচ্ছে পাহারাদের, কেউ 
বসে কেউ-বা দাড়িয়ে, তাদের কারু চোখে ঘুম নেই। 

ঘুমকে অবশ্য বিদায় দিয়েছেন বন্দীরাও, সেইসঙ্গে বিদায় নিয়েছে কথা, হয়তো 
এখন আর চিস্তারও কোনো অবকাশ নেই কারু মনের মধ্যে-বুকের মধ্যেটা কি-রকম 
ফাকা লাগছে, যেন যেখানে হৃৎপিগু ছিলো সেখানে শুধু ফাকা-একটা গহুরের মধ্যে 
ধুপ-ধাপ শব্দ ছাড়া আর-কিছুই নেই৷ 

আর কখন যে এরই মধ্যে রাত চারটে বেজে গেছে কারু খেয়াল ছিলো না। হঠাৎ 
অন্যমনস্ক মেজরের কানে কি-রকম অস্পষ্ট একটা আওয়াজ এসে পৌছুলো। উৎকর্ণ 
হ'য়ে শুনলেন মেজর--আওয়াজটা যেন আসছে বন্দীশালার পেছন দিক থেকে । কীসের 
আওয়াজ ওটা ? কেউ যেন মাটি আচড়াচ্ছে। না-না, কেউ বোধহয় মাটি খুঁড়তে চাচ্ছে। 

নিঃশব্দে মেজর ম্যাকন্যাবস উঠে গেলেন লর্ড গ্রেনারভন আর জন ম্যাঙ্গল্সের 
কাছে। ঝুঁকে, চাপাগলায়, প্রায় ফিশফিশ ক'রেই যেন, বললেন, 'এ শোনো! 

আওয়াজটা যেন ভ্রমশই স্পষ্ট হ'য়ে উঠছে। কেউ যেন কোনো ধারালো যন্ত্রের 
ঘায়ে মাটি খসিয়ে দিচ্ছে--একটা খশখশ শব্দ হচ্ছে, আর ঝুরঝুর ক'রে গুড়োমাটি ঝ'রে 
প'ড়ে যাচ্ছে। 

কেউ নিশ্চয়ই বাইরে থেকে গর্ত খুঁড়ে এদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে! 

তক্ষুনি এদিক থেকেও হাত লাগিয়ে দিলেন এরা। ছোরা আছে একটাই, সেটা 
কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্সের কাছে, কিন্তু তার জন্যে যেন আর তর সইছিলো না--আর-কিছু 
না-থাকে তো আঙুল তো আছে, আঙুলে তো নখ আছে। এরই মধ্যে একবার মাদুরের 
পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে এলো মুলারাডি। না, প্রহরীরা কিছু টের পায়নি। তারা সজাগ 
কিন্তু নিশ্চিন্ত বসে আছে এখন-নিভূনিভূ ই আগুনের কুগুটা ঘিরে। 

এদিকে আওয়াজটা এখন আগের চাইতে অনেক জোরালো হ'য়ে উঠেছে। নিশ্চয়ই 
কেউ একটা ফাকফোকর তৈরি করতে চাচ্ছে দেয়ালে। কিন্তু কেন? মংলব কী তার? 
সেকি কোনো অজ্ঞাত বন্ধু? শত্রই যদি হবে, মাওরিদেরই কেউ, তাহ'লে সে খামকা 
কেন এভাবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে চাইবে? 

এ-কথা ভাবামাত্র পাঁচজোড়া হাত চললো দুনো উৎসাহে ভর দিয়ে। নখের ডগা 
ভেঙে গেলো, রক্ত ঝরতে লাগলো, বিশ্রীরকম ব্যথা করছে, কিন্ত্ব তবু কার মধ্যে দ'মে 
যাবার কোনো লক্ষণ নেই। প্রায় হাত-তিনেক গর্ত হ'য়ে যাবার পর হঠাৎ ধারালো একটা- 
কিছুতে হাত কেটে গেলো মেজর ম্যাক্ন্যাবসের। অস্ফুট আর্তনাদটা গিলে ফেলে 
ম্যাকন্যাব্স' একটা হ্যাচকা চান দিয়ে হাতটা সরিয়ে আনলেন। 

আর,অমনি দেয়ালের গায়ের ফোকর দিয়ে বেরিয়ে এলো ছুরি-সমেত একটা হাত। 


১৭১ 


কিছু না-ভেবেই তক্ষুনি কাণ্ডেন ম্যাঙ্গল্স শক্ত ক'রে চেপে ধরেছেন মণিবন্ধটা, আর 
কজ্জিতে চাপ পড়তেই: ছুরিটা মুঠো থেকে খ'সে পাড়ে গেলো। কিন্তু হাতটা কার? এ 
তো কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের চওড়া ও কঠিন মণিবন্ধ নয়। কোনো মেয়ের? কোনো 
অল্পবয়সি ছেলের? কিন্তু যারই হাত হোক না কেন-এটা কোনো মাওরির হাত নয়, 
একজন শ্বেতাঙ্গের হাত। 

নিচুগলায় অনুমানটা উচ্চারণ ক'রেই ফেললেন লর্ড গ্রেনারভন : “রবার্ট! 

এইসব অর্ধস্ফুট আওয়াজে ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো লেডি হেলেনার। মেরি নামটা 
শুনেই প্রায় যেন ছিটকে চ'লে এলো ফোকরটার কাছে, সরু মণিবন্ধটা চেপে ধ'রে 
কম্পিত বিহ্বল স্বরে বলে উঠলো : “রবার্ট ! রবার্ট!” 

ফোকরটার মধ্য দিয়ে ভেসে এলো রবার্টের গলা : “হ্যা, আমি সব্বাইকে উদ্ধার 
ক'রে নিয়ে যেতে এসেছি।' 

“ছেলেটা দেখছি বেপরোয়া-একটুও ভয়ডর নেই, গ্লেনারভন ব'লে উঠেছেন 
তখন। 

ওধার থেকে নিচুগলায় আওয়াজ এলো : “আগে দেখে নিন--ওখানে পাহারারা কী 
করছে? 

মুলারাডি জানালে, “শুধু চারজন দাঁড়িয়ে আছে--বাকিরা বোধহয় ব'সে-ব'সে 
ঢুলছে। 

এদিকে কিন্তু সেই গর্ভের মুখটা বড়ো ও সুপরিসর করার কাজ অবিশ্রাম চলেছে। 
আর তারপরেই তার মধ্যে দিয়ে বুকে হেঁটে ভেতরে গ'লে এলো রবার্ট । সারা গায়ে 
জড়ানো এ শনের দড়ি-যে-শন দিয়ে সব কাজই সারে মাওরিরা। 

“কেমন ক'রে পালিয়েছিলি তূই, এতক্ষণে আবেগবিহৃল মেরির মুখে বুলি ফুটেছে। 

“এ যখন হুলুস্ুল পড়ে গেলো--কারা-টিটি ম'রে যেতেই--কেউ কি তখন আর 
অন্য কোনোদিকে তাকাচ্ছিলো নাকি ? দু-দিন দু-রাত জঙ্গলের মধ্য ঘাপটি মেরে 
লুকিয়েছিলুম, তারপর মাওরিরা যখন অস্তেষ্টির জন্যে দলে-দলে নিজেদের কুড়ে ছেড়ে 
বেরিয়ে গেলো, তখন ফাকা-একটা কুড়েঘরের মধ্য থেকে এই দড়ি আর ছোরা নিয়ে 
এসেছি তোদের নিয়ে যেতে। বুনো আগাছার চাপড়া আর কাটাগাছের ঝোপ ধ'রে ওপরে 
বেয়ে উঠেছি কোনোরকমে--তারপর বেশ-খানিকটা উঠে আসার পর একটা পইঠার 
মতো পেয়ে গেলুম-ধস নেমে একটা জায়গা বেশ-একটা সিঁড়ির ধাপের মতো হ'য়ে 
উঠেছে। তারপর ছোরার ঘায়ে মাটি খসাতে-খসাতে-এই-তো, আমি এখন তোদের 
কাছে এসে হাজির। চল, আর দেরি নয়। দিন হবার আগেই আমাদের কেটে পড়তে 
হবে। 

“মসিয় পাঁঞয়ল বুঝি নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন?” গ্রেনারভন জিগেস 


১৭২ 


করলেন। 
এবারে করিৎকর্মা রবার্টের একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে যাবার পালা। “কই--না তো?, 
“মঁসিয় পাঞয়ল তোমার সঙ্গে পালাননি?' 
“না। আমি তো ভেবেছি উনিও আপনাদের সঙ্গেই বন্দী হ'য়ে আছেন। 
আরো হয়তো কথা চলতো, কিন্তু মেজর ম্যাকন্যাব্স তাড়া লাগিয়েছেন তখন- 
“মসিয় পাঞ্য়লের কথা পরে বরং ভেবে দেখা যাবে। এখন চটপট এখান থেকে 
আমাদের স'রে-পড়া উচিত। 
এঁ গর্তটা দিয়ে কোনোরকমে শরীরটা গলিয়ে নিয়ে এক-এক ক'রে সবাই নেমে 
এলেন পাহাড়ের গায়ে ধস-নেমে-গণ*ড়ে-ওঠা সেই খাঁজটায়--রবার্ট যেটাকে সিঁড়ির ধাপ 
ব'সে বর্ণনা করেছিলো। তারপরেই কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স একটা তেরচামতো প্রকাণ্ড পাথরের 
গায়ে বেধে দিয়েছেন দড়ি। এ দড়ি বেয়েই নেমে যেতে হবে নিচে, খুব-সাবধানে, একটু 
ফসকালেই নিচে খাদে প”ড়ে যেতে হবে। 
সবচাইতে আগে নেমে গেলো রবার্ট-দড়ি ধ'রে ঝুলতে সে ওস্তাদ, কতবার 
ডানকানের মাস্তুলের দড়ি বেয়ে-বেয়ে সে ওঠানামা করেছে। তারপর একে-একে 
নামলেন ম্যালকম কাস্লের তরুণ দম্পতি--লর্ড গ্রেনারভন ও তর স্ত্রী। আর লেডি 
হেলেনার পা বোধহয় একটু বেকায়দায় পড়েছিলো পাহাড়ের ঢালে-কতগুলো আলগা 
নুড়িপাথর বেশ শব্দ ক'রেই খ'সে পড়লো নিচে। 
অমনি ওপর থেকে নিচুগলায় “শৃশৃশ !' ব'লে সাবধান ক'রে দিলেন কাণ্তেন 
ম্যাঙ্গল্স। গ্লেনারভনরা তখনও পুরো নেমে যেতে পারেননি, দড়ি ধ'রেই তারা শূন্যে 
ঝুলতে লাগলেন। 
উইলসন তখনও পাহারায় ছিলো বন্দীশালার মাদুরের পাশে। সে দেখতে পেলে, 
এ পাথর খ'সে-পড়ার আওয়াজ শুনে পাহারাদের একজন এদিকে চ'লে আসছে ব্যাপার 
কী দেখতে, আর অমনি সে সাবধান ক'রে দিয়েছে কাণ্ডেন ম্যাঙ্গল্সকে। মাওরিটি কিন্তু 
বন্দীশালার দরজার কাছে এসেও ভেতরে ঢোকেনি বা মাদুরের পর্দাটা সরিয়ে ভেতরে 
মাথা গলায়নি--হয়তো তার সেই অধিকার ছিলো না। সে একটুক্ষণ চুপ ক'রে দাড়িয়ে 
কানখাড়া ক'রে রইলো, কিন্তু আর-কোনো সন্দেহজনক আওয়াজ না-শুনে সে আবার 
আগুনের কুণ্ডের দিকেই ফিরে গেলো। 
ইকে জানালেন সাবধানে নিচে নেমে যেতে, খুব হুশিয়ার, ও-রকম শব্দ যেন আর 
হয়। 
তারপর নেমে এলেন কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স নিজে, মেরিকে নিয়ে, এবং তারপর এক- 
৷ ক'রে ঘাকি সবাই। 


১৭৩ 


এবং সবাই নেমে আসতেই আর দেরি নয়। সবাই খুব-সন্তর্পণে প্রেতপাহাড়ের 
দিকে চললেন। পা টিপে-টিপে, চুপি-চুপি, প্রাণ হাতে ক'রে--একটুও শব্দ যেন না-হয়, 
অথচ যত-তাড়াতাড়ি-সম্ভব পালাতে হবে। আর একটু পরেই দিনের আলো ফুটবে- 
আর তারপরেই ফাস হ'য়ে যাবে বন্দীশালায় কেউ নেই, বরং পেছনের দেয়ালে একটা 
গর্ত__যেটা দেখে সবচেয়ে আকাট বোকারও বুঝতে অসুবিধে হবে না বন্দীরা কোন পথ 
দিয়ে পালিয়েছেন। 

আর তারপরেই উঠে এলো সূর্য! 

আর অমনি চারপাশে খ্যাপা কোলাহল, চীৎকার, চ্যাচামেচি, হুলুস্থুল ! 

পুরো পাহাড়টাই যেন ঘুম ভেঙে ধড়মড় ক'রে উঠে পড়েছে । আর তাদের পেছনে 
হৈ-হৈ ক'রে ছুটে চ'লে আসছে মাওরিরা, হন্যে, ক্ষিপ্র, সশস্ত্র 

এবার আর গোপনে গাঢাকা দিয়ে চলা নয়--প্রাণ হাতে ক'রে ছোটা! 

আরো অন্তত শোখানেক ফিট উঠে গেলে, পাহাড়ের চুড়োয় পৌছুনো যাবে, তারপর 
ছুটে নামতে হবে অন্যদিকের ঢালটা বেয়ে। কোথায় যাবে--কারু জানা নেই। কিন্তু যে 
ক'রেই হোক, এখন এদের নাগাল থেকে পালাতে হবে। এবার এদের কবলে পড়লে 
শুধূ-যে মৃত্যুই অবধারিত তা নয়--নিশ্চয় তার আগে নৃশংসভাবে তাদের নির্যাতন করবে 
মাওরিরা। হাতের শিকার এভাবে পালিয়ে গেলে কেউই খুব-একটা খুশি হয় ন!। পেছনে 
রে-রে চীৎকার আর হৈ-হৈ হাকডাক ক্রমেই কাছে গিয়ে আসছে । আরো জোরে ন 
ছুটলে প্রায় ধরেই ফেলবে তাদের। 

“চলো, চলো, পেছনে তাকিয়ো না, সোজা ছোটো সামনে ।' লর্ড গ্নেনারভন কেব 
তাতাচ্ছেন সহ্যাত্রীদের। অনবরত কথা ব'লে তিনি যেন নিজের ভেতরকার সব শঙ্কাকে 
দূর ক'রে দিতে চাচ্ছেন। ্‌ 

হাফাতে-হাফাতে যখন গিরিশিখরে পৌছুলেন সকলে, শুধু তখনই মনে হ* 
পেছন ফিরে তাকিয়ে একঝলক দ্যাখেন, যারা তাদের তাড়া ক'রে আসছে, তারা এ 
কতদূরে আছে। মাওরিদের তখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে_দু-দলের ব্যবধান তখন পাঁচ 
ফিটও হবে কি না সন্দেহ। আরেকটু পরেই নিশ্চয়ই তারা নাগাল ধ'রে ফেলবে। এম 
যদি শিখর থেকে অন্যদিকে নেমে না-আসেন, তাহ'লে আর রক্ষে নেই। পাহাড়ের ' 
বেয়ে অন্দিকে নেমে গেলেও যে নিস্তার আছে তা হয়তো নয়। কিন্তু এই উঁচু দে 
নিচে দেখা যাচ্ছে, রোদ প'ড়ে ঝিকিয়ে উঠেছে তাওপো হুদের স্বচ্ছনীল জল । ডানা 
দূরে টোনগারিরো পাহাড়ের ভ্বালামুখ থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে, কিন্তু পূবদিফে দাঁড়িয়ে € 
ওয়াইহিতির ছোটো-বড়ো শিখরগুলো--হয়তো & দিকেই কোনো ছোটো শুড়িপথ প 
যাবে কোথাও! 

আবার তাড়া লাগালেন লর্ড গ্লেনারভন, “চলো ! চলো। ছুটে নামো- 


১৭৪ 


একফৌটাও সময় নেই! 

ক্লান্তিতে তখন সকলের হাঁটুর জোড়া যেন খুলে আসতে চাচ্ছে। এমনভাবে পাহাড় 
বেয়ে ছুটে ওঠা বা নামার অভ্যাস নেই কারু-শেষটায় এতটা পালিয়ে এসেও ধরা প”ড়ে 
যেতে হবে কাই-কুমুর লোকজনদের হাতে ! 

ছুটে নামতে যাবেন, হঠাৎ বাধা দিলেন মেজর ম্যাক্ন্যাব্স, “থামো! আর বোধহয় 
প্রাণ হাতে ক'রে ছুটতে হবে না আমাদের। এঁ দ্যাখো, কী-রকম অদ্তুতভাবে থমকে 
পড়েছে মাওরিরা! আশ্চর্য! ওরা আর তাড়া ক'রে আসছে না কেন?' 

আশ্চর্যই বটে ! যেন আচমকা একটা অদৃশ্য দেয়ালে এসে ধাবা খেয়েছে কাই- 
কুমুর দলবল । দূরে দাঁড়িয়েই তারা চ্যাচাচ্ছে, নানারকম উৎকট অঙ্গভঙ্গি করছে, কিন্তু 
একপাও এগুচ্ছে না কেউ! সে-কার অদেখা হাত তার অঙ্গুলিহেলনে মন্ত্রবলে থামিয়ে 
দিয়েছে তাদের? সে-কোন মন্ত্রবলে পায়ে শিকড় গজিয়ে তারা থমকে থেমে পড়েছে 
পাচশো ফিট দূরে? 

হঠাৎ অস্ফুট টেচিয়ে উঠেছেন জন ম্যাঙ্গল্স, সামনেই চড়ার পাশে কী-একটা 
যেন দেখাচ্ছে তার হাত ! 

মাত্র কয়েক পা দূরে, সারি-সারি লাল-লাল খুঁটি ঘিরে আছে একটা ছেটো কুড়ে! 

দেখেই লাফিয়ে উঠলো রবার্ট : “কারা-টিটির সমাধিভবন।, 

“তা-ই বুঝি ?' জানতে চেয়েছেন লর্ড গ্লেনারভন। 

"হ্যা, কারা-টিটিরই সমাধিভবন! দু-দিন জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে থেকে আমি সব 
খেয়াল ক'রে দেখেছি। দেখেছি, অস্তযষ্টির সময় ওরা কোনদিকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো 
মৃতদেহগুলো-' 

না, কোনোই ভুল হয়নি রবার্টের। তারা যে কখন প্রাণ নিয়ে ছোটবার সময় এই 
সমাধিভবনের দিকেই হুড়মুড় ক'রে এগিয়ে এসেছেন, সেটা কেউ এতক্ষণ খেয়ালই 
করেননি। 

আর মৃতের এই আবাসই তাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে। 

এই পাহাড় এখন নিষিদ্ধ অঞ্চল মাওরিদের কাছে--ট্যাবু--অমঙ্গলভূমি। প্রাণ 
গেলেও তারা আর এদিকে এগুবে না। কারণ এটা এখন প্রেতাত্মার আবাস--সদ্য তারা 
এখানে রেখে গেছে কারা-টিটিকে। তার ক্ষুধিত প্রেতাত্মা এখনও শান্ত হয়নি--পুরো 
অঞ্চলটা এখন তার দখলে। এখানে তার দলের কারু আসারই অধিকার নেই আর। কেউ 
যদি ভূল ক'রেও এদিকটায় পা দেয়, তবে তার যা পাপ হবে, তাতে সবাই শুদ্ধু মরবে, 
মর্বনাশ হ'য়ে যাবে কারা-টিটির গোষ্ঠীর । হয়তো প্রকৃতি গা ঝাড়া দেবে আচম্বিতে, হয়তো 
স্বালামুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে আগুনের হলকা আর তরল লাভা! কার সাধ্যি, এখন 
এই অমঙ্গলের গণ্ডি পেরিয়ে আসে! 


১৭৫ 


আতঙ্ক--সব মিলিয়ে এখন বাচিয়ে দিয়েছে পলাতকদের । অন্তত এই জায়গাটায় আপাতত 
মাওরিরা কেউ আর আসবে না। 

সমাধিভবনের দিকে এগুতে গিয়েও, এবার যেন কোন-এক আতঙ্কের হ্যাচকা টানে, 
থমকে পেছিয়ে এলেন পলাতকেরাই। 

এঁ-তো, কে-একজন বসে আছে সমাধিভবনে! 

মাওরিরা তবে কি আজকাল আর ট্যাবু মানে না? নিষিদ্ধ ভূমিতেও পা দেয়? 
না কি কেউ-একজন বেপরোয়া স্পর্ধায় অস্বীকার ক'রে বসেছে তার জাতির বিশ্বাস? 

সির মারি হিরিতি অভি হিরা “প্রেতের বাসায় জ্যান্ত 
মানুষ? অসম্ভব! 

“অসম্ভব নয়-এ দ্যাখো- সত্যি-" 

ভেতরটা অন্ধকারে ঢাকা । কিন্তু তারই মধ্যে আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে কে-একজন 
মাওরিদের এ লাল-কালো ঢোলা জামায় গা-মাথা মুড়ে বসে আছে-শুধু-যে বসে আছে 
তা-ই নয়-ব'সে-ব'সে একমনে কী যেন খাচ্ছে। কোনোদিকেই তার কোনো দৃকপাত 
নেই। আপাতত যেন ক্ষুপ্রিবৃত্তির এই প্রক্রিয়াটা ছাড়া আর-কিছুই সে জানে না। 

লর্ড গ্নেনারভন কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মুখের কথাটা তাকে তক্ষুনি খপ 
ক'রে গিলে ফেলতে হ*লো। সেই লাল-কালো জামায় আপাদমস্তক মোড়া লোকটা হাত 
নেড়ে তাদেরই ডাকছে, ০০০০০০০০৪০০ 
পরিষ্কার, প্রাঞ্জল : 

“ব'সে পড়ুন, টিনটিন বক বন ধ্রনিররনরির 
ক'রে দিন! 

গলার সুর শুনে চিনতে কারুই ভূল হ'লো না। 

মসিয় পাঞয়ল! 

“আপনি এখানে! কিন্তু মাওরিরা কোথায়? 

“মাওরিরা আবার কোথায় থাকবে--যেখানে ছিলো, সেখানেই আছে! এ-জায়গাটা| 
ওদের কাছে নিষিদ্ধ না? ট্যাবু না? এখানে তো অমঙ্গল ওৎ পেতে আছে!” 

সত্যি, পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখা গেলো, মাওরিরা সেই অদৃশ্য গণ্ডির কাছে এসে 
তেমনি থমকে দাঁড়িয়ে আছে-হাত-পা নাড়ছে, উৎকট নাচ জুড়ে দিয়েছে, চীৎকারও 
করছে-কিস্তু একপাও আর এগোয়নি। 

“কিন্তু নিষিদ্ধ কেন? কালকেই তো এখানে এসেছিলো!” 

“আর তাইতেই তো গোল বাধিয়েছে ! কাল এখানে এসে কারা-টিটিকে এ 
সমাহিত করেছে না? তারপর থেকেই এ-জায়গাটা শুধু অপবিত্র হ'য়ে যায়নি, ' 


১৭৬ 


ডিপো হ'য়ে গেছে। সোজা কথা নাকি? ভূত-পেত্বি দত্যিদানার আস্তানা ! কার ঘাড়ে 
ক-টা মাথা আর একপা এগুবে? প্রেতাত্মা তার অশীরীরী হাত বাড়িয়ে ঘাড় মটকে 
দেবে না?” 

“অর্থাৎ ?, 

“অর্থাৎ কারা-টিটিকে কাল ওরা এখানে মাটির তলায় শুইয়ে রেখে গেছে বলেই 
আজ আমরা এখানে নিরাপদ । এটা যে ওদের কাছে নিষিদ্ধ এলাকা হ"য়ে গেলো, 
সেইজন্যেই তো সকলের চোখে ধুলো দিয়ে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছি আমি ! 

কিন্তু ওরা যে এখনও ওখানে দীড়িয়ে আছে ! এ তো একটা মানুষের তৈরি পরিখা 
হয়ে গেলো আর-কি ! আমরা কি তাহ'লে আর এ-জায়গা ছেড়ে একপাও নড়তে পারবো 
না_ এখানেই ঠায় বসে থাকতে হবে আমাদের ?' 

“তা কেন? এটুকু ঠিক যে ওরা মাঝখানের এ জমিটা পেরিয়ে আযদ্দুর আর আসবে 
না। কিন্তব এখান থেকে কেটে পড়বার একটা উপায় বার ক'রে নিতে হবে আর কি 
আমাদের । নিন, হাত লাগান, কিছু খাবার দাতে কাটুন । 

এই প্রায়-কল্পনাতীত উপায়ে আপাতত রেহাই পেয়ে গিয়ে অভিযাত্রীরা সব 
উত্তেজনার শেষে এখন যেন গা ছেড়ে দিয়েছেন। সত্যি-তো, এখানে যখন আচমকা 
কোনো হামলা হবে না, তখন উদ্ধারের কথা না-হয় একটু ধীরে-সুস্থে পরেই ভাবা যাবে, 
সবদিক বিবেচনা ক'রে দেখতে হবে তো! 

জায়গাটা অবিশ্যি মৃতের সুখ-সুবিধে-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবেই তৈরি, জ্যান্ত মানুষের 
কথা আদৌ ভাবেনি মাওরিরা, সেটা তাদের রীতিও নয়, তবে সুখের চাইতে স্বস্তি ভালো। 
অন্তত এক্ষুনি তো আর প্রাণ হাতে ক'রে পালাতে হবে না! 

কিন্তু তাজ্জব ব্যাপাব ! মঁসিয় পাঞয়ল কারু-অনুরোধেই নিজের কাহন নিয়ে একটি 
কথাও বলতে চাচ্ছেন না। সকলের সব প্রশ্নের উত্তরেই ইলেকট্রিক ঈল মাছের মতো 
হাত পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছেন যেন। সেদিন তিনি এ হৈ-চৈ-এর মধ্যে মাওরিদের হাত 
এড়িয়ে কীভাবেই যে প্রাণ নিয়ে সটকেছিলেন, সে-সম্বন্ধে যেন টু-শব্দটি করতে তিনি 
রাজি নন। 

ব্যাপার দেখে সবচেয়ে অবাক মানলেন মেজর ম্যাক্ন্যাব্স। এ-কী কাণ্ড! মঁসিয় 
পাঞ্য়ল হঠাৎ এমন পালটে গিয়েছেন কী ক'রে? ধিনি সবসময় হাজার কথায় নিজের 
কেরামতি দেখাতে পারলে আর-কিছুই চান না, তার স্বভাবের এমন আদ্যোপান্ত বদ 
সম্ভব হদলো কী ক'রে? শেষটায় কারা-টিটির প্রেতাত্মা এসেই তার কাধে ভর করেছে 
নাকি? তার ওপর, এ আবার কী কাণ্ড? তার দিকে তাকালেই কী-রকম যেন কুঁকড়ে 
গুটিয়ে যাচ্ছেন। গায়ে জড়িয়ে রেখেছেন এ শনের ফেসোর তৈরি লাল-কালো আলখাল্লা, 
পারলে যেন গুটিয়ে কোনো খোলের মধ্যে ঢুকে যাবেন শামুকের মতো! 


৭৭ 
ইন সার্চ : ১২ ৯ 


যাক-গে! মসিয় পাঞয়লের মাথায় যে ছিট আছে, সবাই জানে । কোনো নতুন 
খেয়াল চেপেছে হয়তো মাথায়। খামকা এ নিয়ে আর প্রশ্ন ক'রে তাকে বিব্রত ক'রে 
লাভ কী? কারা-টিটির ভূত এসে যতই তার ঘাড়ে চেপে বসুক না কেন, একসময়- 
না-একসময় তো পেট ফুলে ম'রেই যাবেন ভূগোল-বিশারদ এই পণ্ডিতমানুষ--পেটের 
মধ্যে যত কথা গিজগিজ করছে, সে-সব তিনি কতক্ষণ আর চেপে রাখবেন। 

তাকে মিথ্যে নানা প্রশ্ন ক'রে উত্ত্যক্ত না-ক'রে, তার পরামর্শমতো কাজ করাই 
বরং ভালো এখন। পেটে যখন যতরাজের ছুঁচো ডনবৈঠক দিচ্ছে তখন তার সাজিয়ে- 
রাখা ছোটোহাজরির সদ্ধ্বহার করাই ভালো। 
দিলেন। 


তিন 
একদিকে তপ্ত তাওয়া অন্যদিকে জলস্ত আগুন 


কথা বলাবার জন্যে শ্রীল-শ্রাযুক্ত জাক-য়েলিয়াস ফ্রাসোয়া মারি পাঞয়লকে সাধ্যসাধনা 
করতে হচ্ছে, এমনটা তো সাধারণত হয় না। তার মানেই হ'লো বিষম গোলমেলে কিছু- 
একটা হয়েছে, বিদঘুটে কোনো-এক বিড়ম্বনা, আর তাইতেই রয়্যাল জিওগ্র্যাফিক্যাল 
আগ ঈস্ট-ইগ্ডিয়া ইন্স্টিটিউটের্ এই মাননীয় সদস্য এতটা বিব্রত বোধ করছেন। 
অতএব আপাতত' তাকে আর ঘাটানো খুব-যে সুবিবেচনার কাজ হবে, এমনটা লর্ড 
গ্লেনারভনের বোধ হ'লো না। 

কিন্তু কথা সম্ভবত হাচোড়াঁচোড় ক'রে পেট থেকে বেরুতে চাচ্ছিলো, ফলে তাদের 
এই প'ড়ে-পাওয়া ছোটোহাজরি শেষ হবার আগেই অবশ্য পাঞয়ল তার কাহন শুনিয়ে 
ফেললেন। তারও মধ্যে তো-তো বিব্রতভাব, কিন্তু শেষ অব্দি তিনি যা বললেন তার 
সারসংক্ষেপ করলে এইরকম দাঁড়ায় : 

রবার্টের মতোই, কারা-টিটির মৃতদেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়বার সময়, যে-হুলুস্ুল 
কাণ্ড শুরু হয়েছিলো, তারই সুযোগ নিয়ে সটকে পড়েছিলেন পাঞয়ল। কিন্তু কপাল 
মন্দ হ'লে যা হয়। চম্পট দিতে গিয়ে পড়বি তো পড়, পড়লেন আরেকদল মাওরির 
খপ্নরে। এদের সর্দারের চেহারাছিরি ভালো, ঘটের মধ্যে বুদ্ধিও ধ'রে ঢের-সে শুধু 
নামকাওয়ান্তেই বাপঠাকুর্দার দৌলতেই সর্দার হ'য়ে বসৈনি, বেশ জানে-শোনে; তাছাড়া 


১৭৮ 


ইংরেজ মিশনারিদের সঙ্গে এককালে বেশ মাখামাখি হয়েছিলো ব'লে ইংরেজি ভাষা 
বলতে-কইতেও পারে, শাদাআদমিদের ধরনধারণ ভালোই জানা ছিলো তার। পাঞয়লকে 
দেখেই বেশ ক'রে জড়িয়ে ধ'রে নাকে নাক ঘ'ষে যথাবিধি অভার্থনাও জানিয়েছিলো 
সে। ককখনো এমনভাব করেনি যে পাঞয়ল তাদের বন্দী। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই হাড়ে- 
হাড়ে টের পাওয়া.গিয়েছিলো যে এঁ সর্দার সঙ্গে না-থাকলে কোথাও এক পাও যাবার 
অধিকার নেই তার--সারাক্ষণই সে তার পায়ে-পায়ে ঘুরঘুর করছে, ছায়ার মতোই 
লেপটে থাকছে পাশে। 

নাম তার হি-হি, যার মানে রোদ্দুর। মানুষটা দিবিব। পাঞয়লের নাকের ডগায় 
চশমা আর বুকে-ঝোলানো দুরবিন দেখে শ্রদ্ধায় এতটাই অভিভূত হ'য়ে গিয়েছিলো যে 
তাকে সে কোথায় রাখবে--পায়ে, না মাথায়-এটাই বোধহয় ঠিক করতে পারেনি- 
সেইজন্যেই অনেক মাথা খাটিয়ে সে একটা উপায় বার ক'রে নিয়েছিলো, দড়ি দিয়ে 
একেবারে নিজের সঙ্গেই বেধে রেখে দিয়েছিলো তাকে । এইভাবেই গেছে তিন-তিনটে 
দিন। এ যেন তপ্ত তাওয়া থেকে পালাতে গিয়ে জ্বলস্ত আগুনে ঝাপ খাওয়া। 

“তবে যে বললেন, রীতিমতো আদর ক'রেই রেখেছিলো- কখনও আপনাকে 
বুঝতেই দেয়নি যে আপনি হি-হি-র বন্দী? মৃদু হেসে জিগেস করেছেন গ্লেনারভন। 

পাঞয়ল উত্তরে বলেছেন : “কথাটা ঠিক। বন্দীও বটে, আবার নয়ও বটে। এমনিতে 
দারুণ খাতিরদারি করছে, আরামেগরমে রাখছে_অথচ কাছ ছাড়ছে না একমুহূর্তের 
জন্যেও। একে যদি বন্দিত্ব বলে, তবে তা-ই। মোটমা্ট এইভাবেই কেটেছে তিনটে দিন 
_-কিস্তু শেষটায় এত আদরযত্ব আমার আর সহ্য হয়নি। শেষটায় একদিন হি-হি যেই 
একটু চোখ মুদেছে, অমনি দড়ি কেটে ফের চম্পট দিয়েছি।' 

আর এবার পালিয়ে এসে দেখতে পেলেন, বেশ-জমকালো অনুষ্ঠান ক'রেই কারা- 
টিটিকে অস্তেষ্টির জন্যে মিছিল ক'রে এই পাহাড়টায় নিয়ে-আসা হচ্ছে। “ও-সব ট্যাবু- 
ফ্যাবুর কথা আমার বেশ জানাই ছিলো। এর আগে পারী থেকে একপাও না-বেরুলে 
কী হয়, পলিনেশিয়ার কোথায়-কোথায় ট্যাবুর চল আছে, সে-সব আমি পুথি পড়ে 
একেবারে গুলেই খেয়েছিলুম, ফলে এটাও তক্ষুনি ধরতে পেরেছিলুম যে একবার 
পাহাড়ের এই অনুষ্ঠানটা শেষ হ'য়ে গেলেই এ-পাহাড়টা এদের কাছে নিষিদ্ধ পাহাড 
হ'য়ে যাবে-আর-কেউ ভুলেও এ-তল্লাট পায়ে মাড়াবে না। তাই মাওরিরা সবাই চ'লে 
যাবার পর লুকিয়ে এই পাহাড়ে এসে সোজা এই সমাধিভবনেই আশ্রয় নিয়েছি আমি। 
আপনাদের কার কী গতি হ'লো-সেটা না-জেনে কোথায় যাই, বলুন? সেজন্যেই সেই 
থেকে এখানেই রয়ে গেছি । 

জাক পাঞয়ল এত-সব বললেন বটে, তবু খটকাটা কিন্তু কাটলো না। তিনি যেন 
সব কথা খুলে বলছেন না, কী যেন এখনও চেপে যাচ্ছেন, কিন্তু সেটা যে কী তা হয়তো 


১৭৯ 


তার পেটে বোমা মারলেও এখন আর জানা যাবে না। ফের কখনও শুভলগ্ন এলে তিনি 
নিজেই হয়তো সব ফাস ক'রে দেবেন, এই কথা ভেবে তাকে আর কেউ খোঁচালেন 
না। বরং এখন তো শিরে-সংস্রাস্তি- এখানে মৌরসি পাট্টা গেড়ে বসে থেকে তো কোনো 
লাভ নেই--বরং এখন ভাবতে হবে, এখান থেকে কী ক'রে পালানো যায়। পালাবার 
রাস্তা তো একটাই--এই অন্য ঢালটা দিয়ে নেমে গিয়ে একবার এ উলটোদিকের পাহাড়ের 
মধ্যে ঢুকতে পারলে আপাতত অন্তত কাই-কুমুর রোষ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। গ্লাসগো 
থেকে তারা সেই-কবে-যেন বেরিয়েছিলেন ব্রিটানিয়ার খোঁজে, তো সেই ব্রিটানিয়ার 
কোনো হদিশ তো মিললোই না-বরং এখন তাদের হন্যে হ'য়ে খুজতে হবে তাদের 
নিজেদের জাহাজ ডানকান কোথায় গেছে । আর ডানকানকে খুঁজে পেতে হ'লেও তো 
এইসব পাহাড়পর্বত পেরিয়ে উপকূলের দিকে যেতে হয়, যেখানে সমুদ্বে আছে। অন্তত 
কোনো বন্দরে গিয়ে জাহাজিদের কাছে এই খোঁজটা নেয়া যায়-_ ডানকান কোথায় গেছে, 
সে-খবর তারা কেউ জানে কি না। 

আলোচনা ক'রে আপাতত এটাই সাব্যস্ত হ'লো যে এই পাহাড়ের ঢাল থেকে নেমে 
দূরের এঁ অন্য পাহাড়গুলোর মধ্যে অন্তত টুকে-পড়া যাক। আর সে-চেষ্টা করতে গিয়েই 
বোঝা গেলো, কাই-কুমু মোটেই অমন হাদা নয়। খুব-একটা মাথা না-খাটিয়েও সেও 
এটা ধরতে পেরেছে যে পলাতকেরা এখন এই অন্য ঢালটা দিয়ে নেমেই কেটে পড়বার 
তালে থাকবে। সেইজন্যে সে তক্ষুনি কড়া পাহারা বসিয়ে দিয়েছে। পাহারা অবশ্যি দূরেই 
থাকবে, এদিকটার ছায়াও মাড়াবে না কেউ, কিন্তু রাইফেলের গুলি তো আর এখানে 
আসতে ভয় পাবে না-দূর থেকে এদের তাগ ক'রে গুলি করলেই বাছাধনদের আর 
এখান থেকে বেরুতে হবে না। 

নিশ্চয়ই এ-কথাই ভেবেছিলো কাই-কুমু। কেননা একটু নেমে যাবার পরেই তাদের 
তোপ দেগে সম্বর্ধনা জানাার মভো করেই ঝাকে-ঝাকে ছুটে এলো বন্দুকের গুলি। 
ফের উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এসে পাহাড়ের চুড়োয় আশ্রয় নিয়ে তবে স্বস্তি। 

কতগুলো কাগজ উড়ে এসেছিলো বন্দুকের গুলির সঙ্গে। পাঞয়লের কৌতৃহল 
উদগ্র-তাছাড়া বইয়ের পাতা দেখলে সেটায় কী লেখা আছে না-জানা অব্দি তার শাস্তি 
নেই। একটা কাগজ কুড়িয়ে নিয়ে প'ড়ে দেখলেন পাঞয়ল। “আরে ! এ-যে দেখছি 
বাইবেল-এর একটা পাতা। হতচ্ছাড়ারা দেখছি বাইবেলের পাতা ছিড়ে বন্দুকে বারুদ 
ঠাশে। এই শুনুন, কী লিখেছে--“ মহাবিপদে পতিত হইয়া আমি কায়মনোবাক্ো 
সদাপ্রভুকে ডাকিয়াছিলাম, এবং প্রভু তাহা শুনিয়াছিলেন”।, 

“ঠিক কথা--প্রভুকে কায়মনোবাক্যে ডাকলে তিনি তা শুনবেন না কেন?” এই 
বিপদের মধ্যে বাইবেল-এর এই বয়ান একটু পরিহাসের মতোই ঠেকেছিলো 
প্লেনারতনের, কিন্তু এটাও মনে হ'লো হঠাৎ বিশেব ক'রৈ এই গাতাটা কুড়িয়ে পাবার 


১৮০ 


মধোই হয়তো ঈশ্বরের অপার করুণার কোনো ইঙ্গিত আছে । 'আমরা তো “মই থেকে 
তাকেই একমনে ডেকে যাচ্ছি-_নিশ্চয়ই এই সংকট থেকে তিনিই আমাদের উদ্ধার 
করবেন।' 

আর যেন ঠিক তার কথার উত্তরেই পায়ের তলায় থেকে-থেকে কেপে উঠলো 
পাহাড়। কাকতাল ? না অন্যকিছু ? আরো-কোনো বিষম সংকটের ইঙ্গিত নাকি 'এই 
ভূকম্পন? 

মাটির নিচে পাতালে আগুন জ্বলছে--আর তারই ধাক্কায় কি পাহাড় কেগে উঠছে 
এখন ? অসম্ভব নয়। এখানটায় আসবার সময় যখন ওয়াইকাতো পেরিয়ে আসছিলেন, 
তখনই দেখেছিলেন অগুনতি উষ্ প্রশ্রবণ।...মনে পড়ে গেলো ভাপে দম আটকে যেতে 
চাচ্ছিলো, গন্ধকের গন্ধ ঝিম ধরিয়ে দিয়েছিলো হাওয়ায়। 

অর্থাৎ আগুনের পাহাড় আছে এখানে--হয়তো পুরো তল্লাটটা জুড়ে ভূগর্ভে একটাই 
মস্ত আগুনের কুণ্ড জুলছে, আর তার জ্বালামুখও আছে অজশ্র। মাটি এখানে ফেন ঝাঝরা 
হ'য়ে গেছে-কোথাও একটু ফাটল থাকলেই তার ফাক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসছে 
আগুন, তপ্ত খ্যাপাজল, গন্ধকের গন্ধেভরা কুগুলিপাকানো বাম্প। সেইজন্যেই হাওয়া 
এখানে কেমন ঝিম-ধরা, যেন থম মেরে গেছে সবকিছু । 

কোনটাকে যে বেশি ভয় পাওয়া উচিত--কাই-কুমুর লোকদের গুলিবর্ষণ, না 
পাহাড়ের এই আচম্বিতকম্পন--সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছিলো না। পাঞ্য়ল বললেন, “এই 
পাহাড়ও একদিন আগুন ওগরাবে! মাটির তলায় যত গ্যাস জ'মে আছে, তা পাহাড় 
ফাটিয়ে বেবিয়ে আসনে) 

“কিন্ত্র এখন ? হঠ।ৎ এমনভাবে মাটি কাপছে কেন?" গ্রেনারজন খঝি একটু শঙ্গিত 
বোধ করেছেন। “ডানকানের বয়লারও তো! জাহাভ যখন জোরে ছোটে, কেমন খরথর 
ক'রে কাপে? এও কি সে-রকমই কিছু ? না কি একটা-কোনো মারাত্বক --' 

তার মুখের কথা প্রা কেড়ে নিয়েই যেন বলেছেন মেজর মাকন্যাব্স : 'বয়লারও 
পুরোনো হ”লে ফেটে যায়। অথবা তাকে দিয়ে যদি তার সাধোর অতিরিক্ত কিছু করাবার 
চেষ্টা করা হয়_ 

পাঞয়ল সায় দিয়ে বলেছেন.“হ্যা। ব্যাপারটা সুবিধের ঠেকছে না। এখানে বেশিক্ষণ 
থাকা আদৌ নিরাপদ নয়। হঠাৎ পাহাড়ের এই জেগে-ওঠাটাকে খুব ভালো লক্ষণ ব'লে 
মনে হচ্ছে না। এ যেন হঠাৎ আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠবার চেষ্টা করছে !, 

গত্যন্তর না-দেখে আবার এসে কারা-টিটির সমাধিভবনে ঢুকেছেন পলাতকেরা 
-আর দূর থেকেই তা দেখে মাওরিরা যেন আরো চ'টে গেছে। শুধু গায়ের ঝাল মেটাবার 
জন্যেই এলোপাথাবি গুলি চালাতে শুরু করেছে তারা, যদিও জানে যে এত-দূর অব্দি 
তাদের গুলি পৌছুবে না। 


১৮১ 


শক্ত কাঠের খুঁটি বসিয়ে মজবুত বেড়া বেধেছে মাওরিরা এই সমাধিভবনের 
চারদিকে । ভেতরে মৃত যোদ্ধার স্মরণে রেখে গিয়েছে বিস্তর গোলাবারুদ আর পান্নার 
হাতল দেয়া খঞ্জর--যাতে প্রেতাত্মা অস্ত্রের অভাবে শিকার করা থেকে বঞ্চিত না-হয় 
তাছাড়া রয়েছে অন্তত ক-দিনের উপযোগী খাবারদাবার অর্থাৎ ফলমূল, আর পানীয় 
জল। আছে রাঙাআলু, নানারকম কন্দমূল, আলুও--কিন্তু ফলমূল কাচা যদি-বা খাওয়া 
যায়, এ আলু ইত্যাদি রান্না না-ক'রে খাওয়া যাবে কী ক'রে? এখানে কতদিন এভাবে 
আটকে থাকতে হবে কে জানে । রান্না না-ক'রে এ-সব তারা খাবেন কী ক'রে ? ভাড়ারের 
হাল দেখে মন্ত-একটা সমস্যাতেই প'ড়ে গেছেন পলাতকেরা। 

কিন্তু পাঞয়লের মগজে কতরকম যে উত্তবনীকৌশল খেলে যায়। ফাটল দিয়ে 
গ্যাস বেরুচ্ছে দেখে তার মাথায় চমৎকার একটা মতলব খেলে গিয়েছে । এসব আল 
রাঙাআলুকে মাটিতে পুঁতে দিলেই তো হয়-_-দিবিব গ্যাসের আঁচে ঝলসানো যাবে এদের । 

এবং অলবিনেটকে ডেকে তার ব্যবস্থা করতেই ব'লে দিয়েছেন পাঞ্য়ল। “কোনো 
তাপমানযস্্র থাকলে বোঝা যেতো এঁ-সব ফাটলের কাছে জমি কতটা তেতে আছে 
_-প্রায় দেড়শো ডিগ্রি ফারেনহাইট তো হবেই। তবে আর ভাবনা কী?" 

তার পরামর্শ শুনে মাটি খুঁড়তে গিয়ে অলবিনেট তো বুঝি নিজেই জ্যান্ত ঝলসে 
মরে। একটু গর্ত করা মাত্র সেখান দিয়ে হিসহিস ক'রে বেরিয়ে এলো গরম বাস্প_ 
আরেকটু হ'লেই ছোবল মারতো বুঝি অলবিনেটকে। সে যদি আঁকে চিৎপটাং হ'য়ে 
না-পড়তো, তবে আর-কিছু না-হোক, তার শ্রীমুখটি যে ঝলসে যেতো তাতে কোনো 
সন্দেহ নেই। 

অবস্থা সঙিন দেখে হুড়মুড় ক'রে ছুটে এলেন মেজর ম্যাকন্যাবস--আরো দুজন 
মাল্লাও এলো সঙ্গে। তাড়াহুড়ো ক'রে মাটি আর পাথর দিযে বুজিয়ে দেয়া হ'লো গর্তের 
মুখ কিন্তু পাতালের এ গ্যাসের গায়ে যেন হাজারটা দানবের শক্তি «দানবের নয়, 
অশ্বশক্তি বলুন, তো-তো ক'রে বলতে চেয়েছেন পাঞয়ল)_এঁ পাথর ঠেলেই যেন 
সে বেরিয়ে আসবে । বোতলের ছিপি খুলে দিতেই যেমন বিপদ হয়েছিলো আরবারজনীর 
জেলেটির-বেরিয়ে এসেছিলো জিন-সে তো এই বাম্পের মতোই। গর্তের মুখটায় 
কিছুতেই যেন আর এই মাটিপাথরের ছিপিটা আটকানো যাচ্ছে না। 

গোড়ায় পাঁঞয়লের মুখটা একটু বিমর্ষ হ'য়ে উন্েছিলো। তার পরামর্শই তো নতুন 
ক'রে একটা ভয়ংকর কেলেঙ্কারি ঘটাতে যাচ্ছিলো। কিন্তু তার মগজে হরদম নতুন-নতুন 
ভাবনা খেলে যায়-_হয়তো মাথার খুলি ফাটিয়েই বেরিয়ে আসতে চায় এ বাম্পের মতো। 
কেননা পরক্ষণেই তিনি লাফিয়ে উঠেছেন। 'ইউরেকা! ইউরেকা!' নিজেকে বোধহয় 
উনবিংশ শতাব্দীর নতুন-কোনো আর্কিমিদেস ব'লেই মনে হয়েছে তার। “আবার 
আমাদের কপাল ভালো। একবার পেলুম কারা-টিটির জন্যে রেখে-যাওয়া খাবার, এখন 


১৮ 


পাচ্ছি মাটির তলার আগুন। এ-যে দেখছি মেঘ না-চাইতেই জল ! এ-পাহাড় তো 
আমাদের সবকিছু জুগিয়ে দিচ্ছে! 

হ্যা, তা জোগাচ্ছে--যতক্ষণ-না বয়লারের মতো ফেটে যায়, কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স 
অন্তত জাহাজের বয়লারের তুলনাটা সহজে ভোলবার পাত্র নন। 

“আরে ! এতে এত ভয় পাবার কী আছে! পাঞয়ল অভয় দেবার ভঙ্গিতে 
বলেছেন। “এত বছর যখন পাহাড়ের খোলটার বাধন সয়েছে, তখন নিশ্চয়ই আরো 
ক-দিন সইতে পারবে । আর তার মধ্যেই আমরা পালাবো। কিছু-একটা উপায় তার মে, 
বার ক'রে নিতে পারবোই। 

পাহাড়ের দুলুনি কমেনি বটে, তবে গোড়ায় যেমন থরহরি কাপছিলো, এখন আর 
সে-রকম কাপছে না। 

“ছোটোহাজরি তৈয়ার, গন্তীরভাবে জানালে অলবিনেট। ভাবখানা এমন, যেন সে 
ডানকান জাহাজেই তার স্টুয়ার্ডগিরির কেরামতি দেখাচ্ছে। 

ঝাউগাছের শেকড় আর পোড়া রাঙাআলু খিদের মুখে তেমন মন্দ লাগেনি । চটপট 
ডানহাতের কাজ সেরেই তাজা হ'য়ে গিয়ে পরামর্শসভা বসাতে হবে। 

' আর পরামর্শসভায় এঁক্যমত্য হ'তে একটুও দেরি হ'লো না। আজ বরাতের আধারেই 
গা ঢাক! দিয়ে পালাতে হবে। মাওরিদের গুলির আওয়াজ থেমে গিয়েছে এখন-তবে 
তারা নিশ্চয়ই কাছে-পিঠেই আছে সজাগচক্ষু পাহারায়। ঠিক হ'লো, গোড়ায় লর্ড 
গ্রেনারভনই ম্যাঙ্গলসকে নিয়ে একটা সরেজমিন তদন্ত ক'রে আসবেন মাওবিরা কোথায়- 
কোথায় ঘাপটি মেরে আছে। পথ পরিষ্কার কি না দেখে এসে জানালে সবাই মিলে বেরুতে 
হবে। পথ না-থাকলেও যে-ক'রেই হোক একটা পথ ক'রে নিতে হবে-পথ কেউ অমনি- 
অমনি দেয় না। 

তারা যখন সমাধিভবন থেকে বেরুলেন, তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। আকাশে একটাও 
তারা নেই-মেঘ ঝুলে আছে নিচু আর ভারি আর কালো। এ দুরে ছোট্র-একটা আগুনের 
কুণ্ড জ্বলছে-_নিশ্চয়ই সেখানে কাই-কুমু সদলবলে ও পেতে আছে পাহারায়। সরু 
যে-আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথটা নিচে নেমেছিলো, সেটা &ঁ মাওরিদের ঘাঁটির পাশ দিয়েই 
গেছে। সেইজন্যেই রাস্তা আটকে তারা ওখানটাতেই আগুন জ্বালিয়েছে। কিন্তু সেই 
আগুনের আলো কতদূর অব্দি পৌছুবে? যদি কোনোমতে আলোর নাগালের বাইরে, 
আধারে গা-ঢাকা দিয়ে ওটুকু পথ পেরুনো যায়, তাহ*লেই তাদের আর পায় কে? কিন্তু 
তা বুঝি আর হয় না। গ্রেনারভন আর ম্যাঙ্গল্স যেই চুপিসাড়ে একটু এগিয়ে গেছেন 
আগুনের কুণ্ড লক্ষ্য ₹'রে, অমনি আচমকা তাদের সব আশায় বাদ সেধে ডানদিক থেকে 
পর-পর কতগুলো বন্দুক গণর্জে উঠেছে! দুটো গুলি তো গ্রেনারভনের কাধ ঘেসেই 
বেরিয়ে গেছে! আমনি ছুটে পালিয়ে আসতে হয়েছে তাদের। 


১৮৩ 


অসম্ভব! এরা বন্দুক চালাতে জানে, মোটেই আনাড়ি নয়; তাছাড়া অন্ধকারে বনে- 
জঙ্গলে থেকে-থেকে এদের চোখ যেন বেড়ালের মতোই অন্ধকারেও দেখতে পায়। এদের 
নজর এড়িয়ে পালানো যাবে না। 

তাহ'লে উপায়? 

আধোঘুম আর আধোজাগরণের মধ্যেই কারা-টিটির সমাধিভবনের মধ্যে রাত 
কাটিয়ে দিলেন সবাই। তারপর যখন দিনের আলো ফুটলো, বাইরে এসে দাড়ালেন সবাই। 
দিনের আলোয় দূরের এ আগুনের কুণ্ডের আলো এখন মিইয়ে এসেছে-কিন্তু কাই- 
কুমুর সাঙ্গোপাঙ্গরা যে ওখানেই আছে এবং সজাগই আছে, তার প্রমাণ হলো, তাদের 
বাইরে বেরুতে দেখেই তারা সমস্বরে বিকট আওয়াজ ক'রে উঠেছে ! 

একটু ঘাবড়ে গেলেও এটা তারা জানেন যে &ঁ দূর থেকেই তারা খ্যাপার মতো 
চ্যাচাবে, এই ট্যাব ভেঙে যে ওপরে উঠবে সেই দুঃসাহস তাদের আর হবে না। 

চারদিক থেকে কুয়াশা তখনও মেলায়নি। কিন্তু ঝিরঝিরে একটা হাওয়া দিয়েছে। 
হাওয়ার জোর অবশ্য এমন নয় যে সে এক্ষনি এক ঝটকায় এই কুয়াশাকে সরিয়ে নিয়ে 
যেতে পারবে। 

হঠাৎ ফের পাঞয়লের মাথায় যেন কারা-টিটির ভূত এসে চেপেছে। তিনি ফের 
চেঁচিয়ে উঠেছেন : “ইউরেকা! ইউরেকা!' 

তার মাথায় কোনো ফন্দি এলেই তিনি যে কেন গ্রিক বলেন, সেটা বোঝা দায়! 

“আমরা এদের বিশ্বাস আর সংস্কারকেই কাজে লাগাবো। 

মেজর ম্যাকন্যাব্স বুঝি অনবরত তার এই ইউরেকা! ইউরেকা! হুংকার শুনে একটু 
বিরক্তই হচ্ছিলেন। মনের ভাবটা না-চেপেই তিনি ব'লে উঠেছেন, “কিপ্তু সেটা কীভাবে 
কাজে লাগাবেন তা এই অধমদের একটু খুলে ধললেই পারেন।, 

“এদের তো বিশ্বাস এটাই যে ট্যাব ভেঙে যে-ই এই পাহাড়ের ওপরে উঠবে, 
দেবতাদের রোষ তাকে প্রাণে মারবে । বেশ-তো, কাই-কুমু তাহ'লে ভেবে নিক যে আমরা 
ট্যাব না-মানার জন্যে জ্যান্ত ঝলসে মরেছি- দেবতাদের অগ্নিচক্ষু আমাদের ভস্ম ক'রে 
ফেলেছে! একবার যদি তাদের মনে হয় যে আগুনের দেবতা আমাদের কাউকেই রেহাই 
দেয়নি, তাহ'লে তারা তাদের পাহারা তুলে নিয়ে যে যার নিজের জায়গায় ফিরে যাবে। 
তখন ফাকা রাস্তা পেয়ে আমরাও এখান থেকে কেটে পড়বো । 

“সেটা আপনি ওদের বিশ্বাস করাবেন কী ক'রে?” একটা ফ্যাকড়া তুলেছেন লর্ড 
গ্রেনারভন। “বিশ্বাস করাতে পারলে হয়তো মুশকিল আসান হ'তো। কিন্তু ওবা তো 
দেখেছে--দিবিব চব্বিশ ঘণ্টার ওপর হ'লো আমরা বহাল তবিয়তে এখানে কাটিয়ে 
দিয়েছি-ওদের দেবতা আমাদের গায়ে আঁচড়টিও কাটেননি। 

“কাটবেন, কাটবেন, আশ্বাস দিয়েই বলেছেন পাঞয়ল। “দেবতার রোষ তো দাউ- 


১৮৪ 


দাউ জ্বলছেই মাটির তলায়-এখন ছিপি খুলে তাকে বের ক'রে আনলেই হয়! 

“সর্বনাশ!” ম্যাঙ্গল্স যেন চোখের সামনে বিভীষিকা দেখেছেন। “আপনি কি 
আগ্নেয়গিরির কাচাঘুমটা ভাঙিয়ে দিতে চাইছেন নাকি? মুখ খুলে দিতে চাচ্ছেন 
জ্বালামুখের? জানেন তো, বোতলের ছিপি খুলে দেবার পর জিন এসে প্রথমে যাকে 
পায় তারই ঘাড় মটকে দেয়।” 

“আগ্নেয়গিরিকে জাগিয়ে দেবার কথা কে বলছে ?' পাঞ্য়ল যেন বোকা ছাত্রদের 
মাথায় গজাল মেরে কথাটা ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছেন। “আমরা একটা নকল অগ্নযুৎপাত 
বানাবো-যেটা আমরা নিজেদের বশে রাখতে পারবো, নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবো। যে- 
সব ফাকফোকরফাটল দিয়ে আগুন বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে, আমরা তাকে আর বাধা 
দেবো না-বরং সহজে যাতে বেরিয়ে আসতে পারে, তারই ব্যবস্থা ক'রে দেবো। নকল 
একটা লাভার শ্রোত বইয়ে দেবো, যাতে তারা ভয় পেয়ে যায়! মনে রাখতে হবে, সেটা 
শ্রেক ওদের ধাপ্পা দেবার জন্যেই করতে হবে-আমরা আস্ত আগ্নেয়গিরিটাকে জাগিয়ে 
দিতে চাচ্ছি না। 

“যদি অগ্যুদগারটাকে নিজের বশে রাখতে পারেন, মেজর ম্যাকন্যাব্সের কথায় 
তারিফ আর অবিশ্বাসের একটা বিচ্ছিরি মিশোল ছিলো, 'তবে পাগলা ঘোড়াকে বশে 
আনার চাইতেও সেটা অনেক কঠিন। যদি ভাবনারা হতো পক্ষিরাজ ঘোড়া--, 
আউড়েছেন তিনি পুরোনো প্রবচন। 

“আমরা শুধু এমন-একটা ধারণার সৃষ্টি করবো, যাতে ওরা ভেবে নেয় যে ওদের 
দেশের অশ্নিদেবতা আমাদের তার লেলিহান লোলশিখায় ঝলসে খেয়েছেন। আসলে 
যখন এখান দিয়ে আগুন বেরুবে, আমরা সবাই কারা-টিটির সমাধিঘরে গিয়ে লুকিয়ে 
থাকবো! 

“কিন্ত কতক্ষণ লুকিয়ে থাকবো ?” গ্রেনারভনের সংশয় যেন কিছুতেই যাবে না। 
'একবার আগুনের লকলক শিখা যদি পাতাল থেকে বেরিয়ে এসে আকাশ চাটতে শুরু 
ক'রে দেয়, তবে আগুন কি আমাদের দেখেশুনে ছেড়ে দিয়ে শুধু বেছে-বেছে অন্যকিছু 
ভস্ম ক'রে দেবে? 

“তাছাড়া সত্যি আমরা পুড়ে মরেছি কি না দেখবার জন্যে ওরা য